চাঁদের হাট

ঢাকা, শুক্রবার   ২২ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৮ ১৪২৭,   ০৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

চাঁদের হাট

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৫৯ ১১ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৭:০০ ১১ জানুয়ারি ২০২১

ছবি: সাইফুল ইসলাম

ছবি: সাইফুল ইসলাম

“এখানে নদীর ঘুম ভাঙে ভোরবেলা
মধুর দিগন্ত থেকে উড়ে আসে পাখি
তার ডানা বাতাসের মতন স্বাধীন।” -জাহাঙ্গীর ফিরোজ

শরৎকালের মাঝামাঝি সময়। কাশফুলে ছেয়ে আছে যমুনার তীর। বালিজুরি হাটের ভেতর থেকে একটা মাটির রাস্তা বের হয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে আধা মাইল দূরে চাঁদপুর গ্রামের সন্নিকটে অবস্থিত বিশাল এক অশ্বত্থ বৃক্ষের ঠিক সামনে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। হাটবারে বালিজুরি হাট এই বটগাছ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ে। বামদিকের পথটা গাছকে ডান পাশে রেখে সরাসরি মাদারগঞ্জ আশেক মাহমুদ স্কুলের পশ্চিম পাশ দিয়ে মাদারগঞ্জ থানাকে অর্ধবৃত্তাকারে ডানদিক দিয়ে অতিক্রম করে হাট খোলা প্রাইমারি স্কুলের সামনে দিয়ে খরকাবিলের তীর ঘেঁষে উঁচু-নিচু স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা অতিক্রম করে আমিনুলদের বাড়ির উত্তর পাশ দিয়ে পূর্বদিকে চলে গেছে। খরকা বিলেরও শেষ সীমানা এটাই। এই পথের শেষ প্রান্তে একটা বালির চর, যা শেষ হয়েছে প্রায় দুই মাইল দূরের যমুনা নদীর তীরে। চর জুড়ে আছে দিগন্ত বিস্তৃত কলাই, কুমড়া, তরমুজ, বাংগি, করল্লা ও বেগুনের ক্ষেত। আমিনুলের খুব প্রিয় জায়গা এটা। বাবার সঙ্গে সে প্রায়ই আসে এখানে। অদ্ভুত সুন্দর জায়গা। নানা রঙের ফুল, রবিশস্য, ঘাস ফড়িং ও হলুদ প্রজাপতিদের উড়া-উড়িতে মাতাল হয়ে থাকে পুরো প্রান্তর। একবার মাঠের ছেলেরা তাকে কলাইয়ের গাছ পুড়িয়ে কলাই-ভাজা খাইয়েছিল। আমিনুলের মন পড়ে থাকে এই বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে। প্রায়ই লতানো ডালের ওপরে টুনটুনি পাখিরা এসে বসে এবং তাদের ভারে নুইয়ে যায় বেগুনের কচি ডালগুলো, লজ্জাবতী লতার পাতাদের মতো। মাঝেমধ্যেই কোত্থেকে উড়ে আসে এক ঝাঁক টিয়ে পাখি। আমিনুলদের মরিচের ক্ষেতে এসে বসে, সবুজে-সবুজে মিশে যায়। আমিনুল শত চেষ্টা করেও সেগুলোকে খুঁজে পায় না। কিন্তু কাছে যেতেই ঝাঁক বেঁধে পুনরায় উড়ে যায় সেগুলো।

চাঁদপুর গ্রামের কাছে ভাগ হয়ে যাওয়া অন্য পথটি অশ্বত্থ বৃক্ষটিকে হাতের বাম পাশে রেখে একটা আলোকিত প্রশস্ত মেঠো পথ দিয়ে চাঁদপুর গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। চাঁদপুরের শেষ প্রান্তে এসে সেটি তালুকদার বাড়ির সদর আর অন্দরমহলের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপিত নীল রঙের টিনের প্রাচীরের পাশ দিয়ে পশ্চিমে যমুনার দিকে চলে গেছে। নদী থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে হাটখোলা বাজার এবং খরকাবিলকে পেছনে ফেলে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়েছে মাইলের পর মাইল। অতঃপর তারাকান্দি হয়ে এই রাস্তা সরিষাবাড়ি আলহাজ জুটমিলের পাশ দিয়ে জামালপুরের দিকে চলে গেছে। জামালপুর থেকে মেলান্দহ বাজার, ইসলামপুর, দুরমুঠ ও দেওয়ানগঞ্জ হয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাট দিয়ে ফেরী বা স্টিম ইঞ্জিনে করে ফুলছড়ি ঘাট হয়ে উত্তরবঙ্গে যাওয়া যায়। আবার জামালপুর থেকে রেলগাড়িতে করে ময়মনসিংহ, ত্রিশাল, শ্রীপুর, জয়দেবপুর, টঙ্গী হয়ে ঢাকায় যাওয়া যায় এবং সেখান হতে সিলেট, এমনকি চট্টগ্রামেও চলে যাওয়া যায়। তারপর পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফ এবং নাফ নদী অতিক্রম করলেই বার্মা। বাবার কাছে গল্প শুনেছে আমিনুল যে, জীবনযুদ্ধে টিকতে না পেরে এক সময়ে এই অঞ্চলের মানুষেরা রংপুর-দিনাজপুর অথবা বার্মার দিকে চলে যেতো। আর কখনোই ফিরে আসতো না। তারাকান্দি হতে অদূরেই জগন্নাথগঞ্জ ঘাট বা বন্দর। এই ঘাট দিয়ে যমুনা অতিক্রম করে সিরাজগঞ্জ ঘাট হয়ে রেলপথে পার্বতীপুর জংশন হয়ে কুষ্টিয়া, যশোর, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ এবং পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা দিয়ে সমগ্র ভারতবর্ষ পরিভ্রমণ করে আসা যায়। আমিনুল মাঝে-মধ্যেই অবাক হয়ে ভাবে তার সেই হারিয়ে যাওয়া সন্ন্যাসী দাদা কোন পথে হারিয়ে গিয়েছিলেন। অজ্ঞাত কোনো কারণে পিতার মতো সন্ন্যাসী দাদার বিষয়ে তার প্রবল আগ্রহ। কিন্তু বর্তমান পর্যন্ত কেউই স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেনি তার সম্পর্কে। আমিনুলের প্রবল ইচ্ছে এই জায়গাগুলো সে একাকী ঘুরে বেড়াবে।

প্রতিদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পথে আমিনুল প্রতিনিয়ত যমুনা পাড়ের রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরে। মুলত না জেনেই যে, এই পথ তার জন্যে বিস্তীর্ণ জীবনের অপার কোন সম্ভাবনাকে ধারণ করে আছে। যমুনা নদী আর এই রাস্তার মধ্যবর্তী স্থান মূলত বিস্তীর্ণ একটা চর। এই চরের শরীর জুড়েই বিশাল কাশবন। মনে হয় আকাশের এক চিলতে মেঘকে এনে এখানে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। জলের ভেতরে কাশবনের প্রতিবিম্ব। ফলে নদীর জলের ভেতরেও আরেক কাশবন। মনে হয় ভাঙা আরশিতে মুখ দেখছে উদ্ভিন্ন যৌবনা কোন নারী। আমিনুলদের বাড়ি থেকে কয়েক গজ দূরেই খরকা বিল। কিন্তু খরকা বিলের স্বচ্ছ জলরাশি তার পছন্দ নয়। তার পছন্দ যমুনার অবিরল ঘোলা জলধারা, ঘূর্ণিজল!

আজ বিকেলে এই গোধূলি বেলায় আমজাদ তার ছেলে আমিনুলকে সাথে নিয়ে বাড়ি থেকে এক মাইল পশ্চিমে যমুনার তীরে এসেছে। মাত্র দুইদিন আগে ঈদুল ফিতরের মেলা থেকে আমিনুল একটা ঘুড়ি কিনেছে। কিন্তু ঘনবনে ঢাকা সুখ নগরী গ্রামে ঘুড়ি উড়ানোর কোন প্রশস্ত মাঠ নেই। তাই আমজাদ তাকে এখানে এনেছে ঘুড়ি উড়ানোর জন্যে। আর নিজে যমুনার মৃদুমন্দ বাতাসে বিকেলটা কাটাবে বলে। আমিনুল এখন বালিজুরি বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে ক্লাস সিক্সে পড়ে। মাদারগঞ্জ আশেক মাহমুদ স্কুলে তাকে ভর্তি করিয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি, নিরাপত্তাজনিত কারণে। পঞ্চম শ্রেণিতে হাটখোলা প্রাইমারি স্কুলের সহপাঠীদের সাথে আমিনুলের একবার নিঃশব্দ বিবাদ হয়েছিল কোন কারণে। এরই জের হিসেবে আমজাদ একদিন বাড়িতে ফিরে দেখতে পায় যে, আমিনুল অজ্ঞান অবস্থায় উঠোনে পড়ে আছে। বিবাদকারী ছেলেরা স্কুল ছুটির পর আমিনুলকে খরকা বিলের জলে চুবিয়েছে অন্তত ঘন্টাখানেক সময়। সুখনগরী গ্রামের মক্তবের হুজুর সেই সময়ে খরকা বিলে গোসল করতে না গেলে তারা হয়তো তাকে মেরেই ফেলতো। সুতরাং আমিনুলকে দূরবর্তী বালিজুরি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া ছাড়া আর বিকল্প ছিল না আমজাদের নিকট। প্রতিদিন সকাল বেলায় নিজে হাটখোলা স্কুলে যাবার আগে আমিনুলকে সে পায়ে হেঁটে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসে। স্কুল ছুটির পরেও একই নিয়ম। এত সতর্কতার পরেও আমিনুল তিনবার হারিয়ে গিয়েছিল। ভবিষ্যতেও হারিয়ে যাবে না, তার নিশ্চিতি নেই। 

শেষবার হারিয়ে যাবার পর আমিনুল ফিরে এসেছিল একদিন পর। তার চিন্তায় অস্থির হয়ে আমিনুলের মা যখন মাগরিবের নামাজের পর জলচৌকিতে উপুড় হয়ে সিজদায় গিয়ে অবিরাম কান্না করছিলেন, সেই সময়ে মুখে প্রবল মৃদু হাসি দিয়ে গোধূলির অন্ধকারে ঘর আলো করে আমিনুল ফিরে এসেছিল নিজ গৃহে। যথারীতি তার কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। কারণ জন্মলগ্ন থেকেই আমিনুল কথা বলতে অক্ষম।

নিজের সন্তানের বাকহীনতার বিষয়টি আমজাদকে ভীষণ কষ্ট দেয়। আমিনুলের নিশ্চয়ই সবার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু পারে না। জন্মলগ্ন হতেই স্বরতন্ত্র ঠিকভাবে গঠিত না হওয়ার কারণে, সে জোরে শব্দ করতে পারে না। হাঁসের মতো ফিসফিস শব্দ করে। নিজের শৈশবের কাইজ্জার চরের বন্ধু নজরুল ও তার শেষ পরিণতির কথা মনে পড়ে যায় আমজাদের। নজরুলও আমিনুলের মতো কথা বলতে পারতো না। শৈশবে আমজাদ ও নজরুল কাইজ্জার চরে একটা আনন্দময় দিন যাপনের মাত্র কয়েকদিন পর এক রাতে নজরুলকে বা কারা মেরে কলাইয়ের ক্ষেতের ভেতরে ফেলে গিয়েছিল। বাঁশের লগি অথবা বৈঠার আঘাতে নজরুলের মাথা ফেটে দুভাগ হয়ে গিয়েছিল এবং তার মাথার নীচে রক্ত লাল কার্পেটের মত জমাট বেঁধেছিল। সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকলেও শব্দহীনতার কারণে তার কথা কেউ বুঝতে পারেনি। ফলে নজরুলের মৃত্যু রহস্যটা অমীমাংসিতই রয়ে গিয়েছিল। আমিনুলকে তাই একা ছাড়তে আমজাদের প্রবল ভয় করে।

আমিনুলের মনে কি কোন দুঃখ আছে? আমিনুলের হাসিখুশি মুখ থেকে আমজাদ কিছুই আন্দাজ করতে পারে না। এই মুহূর্তে সে প্রবল আনন্দ নিয়ে ঘুড়ি উড়াচ্ছে। দূর থেকে কাশবনের আড়ালে তার ঘুড়িকে দেখে মনে হচ্ছে যমুনার উপরে পাল তুলে কোনো নৌকা যাচ্ছে।

আমজাদ পুনরায় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। যমুনা অতিক্রম করে তার দৃষ্টি চলে যায় সুদূর সারিয়াকান্দির দিকে। অন্তত দেড় যুগ পূর্বে। ফাতেমা ও দরবেশ চাচার মুখকে যুগপৎভাবে স্মরণ করার চেষ্টা করে সে। ভাবতেই চন্দনবাইশার পুরাতন কাছারিঘরের দৃশ্য আমজাদকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। অথচ আমজাদ জানে কয়েক বছর পূর্বে যমুনার ভাঙনে চন্দনবাইশার একাংশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সেই সাথে এই কাছারিঘরও।

বিলুপ্ত কোনো নগরীর কথা ভেবে লাভ নেই! সুতরাং আমজাদ জীবন্ত ফাতেমার কথা ভাবতে চেষ্টা করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ফাতেমার পুরো মুখমণ্ডলকে স্মৃতির ভেতরে আনতেই তার কয়েক মিনিট সময় লেগে যায়। প্রথমে ফাতেমার দুগ্ধ ধবল হাত, অনুপ্রেরণাদায়ী উজ্জ্বল কাজল কালো চোখ, বিদিশা’র রাত্রির মতো কালো চুল, অনিন্দ্য সুন্দর মুখ এক এক করে দৃশ্যমান হতে থাকে। খণ্ডিত ফাতেমাকে এক এক করে জোড়া লাগাতে লাগাতেই যমুনার ওপারে, যেখানটায় ফাতেমাদের বাড়ি ছিল, সেখানে সূর্য ডুবে যায়।

নরম হাতের স্পর্শে অথবা মৃদু কণ্ঠস্বরে সম্বিত ফিরে পেতেই আমজাদ দেখতে পায় আমিনুল তার হাত ধরে টানছে! আমজাদের মনে হলো, আমিনুল তাকে বলছে, “বাবা, বাড়িতে চলো। সূর্য ডুবে যাচ্ছে!” আমিনুল কি কথা বলতে পারে? নিবিড় মমতায় আমজাদ আমিনুলের দিকে তাকায়। চারপাশের অন্ধকার তখন ক্রমশ নিবিড় হয়ে উঠছে!

“ওখানে খিড়কিতে ঢেউ খেলে সময়ের স্রোত
কবে একদিন যাওয়া হবে- ভাবি
আর রক্তে জ্বলে ওঠে সীমাহীন বিদ্যুৎ।” – মাসুদ আল মামুন

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর