ছায়াজগৎ

ঢাকা, শুক্রবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ২ ১৪২৮,   ০৮ সফর ১৪৪৩

ছায়াজগৎ

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২৩:১৪ ২৪ ডিসেম্বর ২০২০  

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

আমিনুল যে ঘরটায় থাকে তা দক্ষিণমুখী। উত্তর দিকেও একটা দরজা আছে। তবে এই দরজাটা সর্বক্ষণ বন্ধ রাখা হয়। প্রকৃত পক্ষে এই দরজা খোলার কোনো দরকারই হয় না। কারণ দরজার সামনে তেমন কোনো জায়গাই নেই। কারণ এটাই বাড়ির শেষপ্রান্ত। এর পরেই খরকা বিল। আগে ৫০ গজ দূরে ছিল। বছরের এই সময়ে ঘরের পেছন পর্যন্ত চলে এসেছে। 

বিলের পাড় ঘেঁষে আমিনুলের ঘরের দরজার বাইরে অনেকগুলো কলার গাছ অবিন্যস্তভাবে একটা গভীর প্রাচীর সৃষ্টি করেছে। বিলের কেন্দ্র হতে আমিনুলদের বাড়িটাকে জলের ভেতর থেকে গজিয়ে ওঠা কোনো সবুজ দ্বীপের মতো  মনে হয়। আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলে পশ্চিম আফ্রিকার বুন্স আইল্যান্ডের মতো। সারাদিনমান বিলের উপর দিয়ে প্রবাহিত এলোমেলো বাতাসে কলাগাছের পাতাগুলো পতাকার মতো পতপত করে উড়তে থাকে। ঘরের  উত্তর দিকের দরজা থেকে দুই ফুট পূর্বদিকে একটা জানালা আছে। আড়াআড়ি ভাবে লাগানো লোহার পাতলা পাতগুলো জানালাটাকে চালুনের মতো শতভাগে ভাগ করেছে। দরজা ও জানালাটি সারাক্ষণ বন্ধ থাকে। সারাদিনরাত। আমজাদ তাকে বলেছে দরজা ও জানালাটি না খুলতে।  

রাতের বেলায় এই দরজা ও জানালা আমিনুলের ভেতরে একটা ব্যাখ্যাতীত অনুভূতির সৃষ্টি করে। তার মনে হয় এই দরজা ও জানালা এই বাড়ির কোনো অংশ নয়। অন্য কোনো অন্য কোনো পৃথিবী বা জগতের দরজা ও জানালা এগুলো।  গভীর রাতে এই দরজা বা জানালা দিয়ে ভিন্ন এক পৃথিবীর সাথে তার সংযোগ স্থাপিত হবে। তিন পুরুষ ধরে আমিনুলের পরিবারের সদস্যরা এই ঘরে বসবাস করে আসছে। একসময়ে আমিনুলের দরবেশ দাদা অর্থাৎ আমজাদের চাচা বসবাস করতেন। অতঃপর আমজাদ। এখন আমিনুল। 

রাতের বেলায় খরকা বিলের জলের ওপরে চাঁদের আলো পতিত হয়ে অদ্ভুত এক আলোছায়ার সৃষ্টি করে। আজ পূর্ণ পূর্ণিমার রাত। আমিনুলের ঘরের উঠোনে চাঁদের আলো চুইয়ে পড়ছে। আকাশে চাঁদের অবস্থান খরকা বিলের মাঝ বরাবর। এই ঘর হতে সরাসরি চাঁদ প্রত্যক্ষ করা সম্ভব নয়। তবে উঠোনে দাঁড়ালে কলাগাছের ফাঁকগুলোর মধ্য দিয়ে বহুদূর পর্যন্ত দৃষ্টি যায়। জলের ওপর দিয়ে। বিলের ওপরে পতিত হওয়া চাঁদের প্রতিবিম্বকে মনে হয় বিশাল কোনো রুপার থালা। অকারণে ভেসে বেড়ায় বিলের বুকে। বাবার কাছে শুনেছে সে যে তার ছোটবেলায় একটা ‘দেও’ দিনের বেলাতেই কড়াইয়ের উল্টো পিঠের মতো পানির নিচ দিয়ে সারা বিলময় ঘুরে বেড়াতো। এখন আর দিনের বেলায় সেই ‘দেও’ দৃশ্যমান হয় না। তবে একবার পূর্ণিমা রাতেই সে দেখেছে যে,  চাঁদ বিশাল রূপোর থালা হয়ে খরকা বিলের জলের উপরে ভাসছিল। চালকহীন কোনো পানসি নৌকার মতো। 

আজ রাতে হঠাৎ আমিনুলের মানসিক বিভ্রান্তি ঘটে। বাবার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সে জানালাটি খুলে এবং বিলের দিকে তাকায়। প্রথমে অসাধারণ কিছুই হয় না। কিন্তু একটু পরই তার চোখের দৃষ্টি পড়ে বিলের কেন্দ্রস্থলে। সে দেখতে পায় চাঁদটা আকাশে নয়, একাকী ভাসছে বিলের কেন্দ্র বিন্দুতে। তবে রূপার থালার মতো নয়। একটা কালো থালার মতো। হয়ত বা এটা অমাবস্যার চাঁদ। আমিনুল কিছু মনে করে না। একটু পর তার মনে হয় এটাই তার বাবার দেখা দেও। সে আরো মনোযোগী হয়। 

এক সময়ে তাকে অবাক করে দিয়ে কালো রঙের থালাটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। দুটো ভাগই জলের উপরে লাটিমের মতো ঘুরতে থাকে। এক সময়ে তারা দুটো গোলকের রূপ ধারণ করে। একটা বড় গোলক ও একটা ছোট গোলক। মানচিত্রের বইতে সৌরজগতের ছবিতে পৃথিবীর পাশে চাঁদকে যেমন দেখতে লাগে।

এরপর গোলক দুটো অদৃশ্য কোন বাতাসে জলের ওপর ভাসতে ভাসতে আমিনুলদের বাড়ির দিকে আসতে থাকে। থালার প্রান্তগুলো গলে পড়তে থাকে জলের ভেতরে। দূরত্ব কমতে থাকে। বড় গোলকটা ক্রমশ দীর্ঘতা প্রাপ্ত হয়। ছোট গোলকটা পূর্বের মতোই থাকে। আমিনুলদের বাড়ি হতে মাত্র ২০০ গজ দূরে সে দেখতে পায় ক্রমান্বয়ে বড় হতে হতে বড় গোলকটা একটা মানুষের অবয়ব ধারণ করছে। এবং ছোট গোলকটি তার উপরে স্থাপিত হয়ে একটা মুখন্ডলের সৃষ্টি করেছে! যদিও তাতে চোখ, নাক, ওষ্ঠ কোনো কিছুর আকৃতিই ফুটে উঠছে না। 
আমিনুল বিস্ময়াভিভূত হয়ে তাকিয়ে থাকে। খরকা বিলের দিক থেকে আমিনুলদের বাড়ির দিকে বাতাস বইতে থাকে। সেই মৃদু বাতাসে আমিনুলের চোখ বুজে আসে। কিছুক্ষণ পর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আমিনুল।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ