উত্তরাধিকার

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৪ জুন ২০২১,   আষাঢ় ১২ ১৪২৮,   ১২ জ্বিলকদ ১৪৪২

উত্তরাধিকার

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২৪ ১৭ ডিসেম্বর ২০২০  

ছবি কৃতজ্ঞতা:  জিয়া মাহমুদ খান রাতুল ( প্রতীকী ছবি)

ছবি কৃতজ্ঞতা:  জিয়া মাহমুদ খান রাতুল ( প্রতীকী ছবি)

সিদ্ধার্থ রাজার ছেলে, জানতেন
গৃহত্যাগ করলেও তাঁর স্ত্রী ও পুত্র কোনোদিন
রাজৈশ্বর্য থেকে বঞ্চিত হবে না,
আর নিম্নমধ্যবিত্ত এই আমি
যদি বাড়ি ছেড়ে চ'লে যাই
অনাহারে মারা যাবে আমার স্ত্রী, মারা যাবে
আমার অসুস্থ কন্যা বিনা চিকিৎসায়।
- সুজিত সরকার

চন্দনবাইশা থেকে সুখনগরী গ্রামে আমজাদ ফিরে এসেছিল ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর, ১৯৫৪ সনে। ভাষা আন্দোলনের দুই বছর পর। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠিত এবং সেই পাকিস্তান সৃষ্টির দাবির উত্থাপনকারী মুসলিম লীগের জন্মস্থান ঢাকা হলেও ৫২’র ভাষা আন্দোলন পূর্ববাংলার মানুষদের মনোজগতে এক নবজাগরণের সৃষ্টি করে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী এবং এক তরুণ নেতা শেখ মুজিব বাঙালির এই স্বাধিকার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। 

ফলে ১৯৫৪ সালে গঠিত হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট। এ বছরই মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হয় পূর্বপাকিস্তান পরিষদের নির্বাচন। সেই নির্বাচনে  যুক্তফ্রন্ট মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ৩ এপ্রিল শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল  হক চার সদস্য বিশিষ্ট যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয় ১৫ মে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। অবশ্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের এই যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র এক পক্ষকাল পর ১৯৫৪ সালের ৩১ মে তারিখে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করে দিয়ে শাসনতন্ত্রের ৯২ (ক) ধারা জারির মাধ্যমে এই প্রদেশে গভর্নরের শাসন প্রবর্তন করেন।

এর পরের ইতিহাস আরো দুঃখজনক। ১৯৬৫ সনের পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানকে অরক্ষিত রেখে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা এদেশের মানুষের প্রতি তাদের অবজ্ঞা প্রকাশ করে। এমন প্রেক্ষাপটেই ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘৬ দফা দাবি’ পেশ করেন। এই আকস্মিক ও অদ্ভুত উচ্চারণের পর ক্রমশ সরগম হয়ে উঠতে থাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার আকাশ-বাতাস। 

আমজাদের বর্তমান জীবন ভিন্ন ছকে বাঁধা হয়ে গেছে। ভিন্ন ধরনের এক নিস্তরঙ্গ কিন্তু কিছুটা অস্থির এক জীবন। তার সব দৈনন্দিন কার্যক্রমের সমান্তরালে একটা কাজে তাকে সর্বক্ষণ নিয়োজিত থাকতে হয়। তার আট বছর বয়সী সন্তান আমিনুলের তত্ত্বাবধান করা। লোকচক্ষুর অন্তরালে যাতে সে যেন হারিয়ে না যায়! বুদ্ধিলগ্ন থেকেই আমিনুল খুবই চঞ্চল ও অস্থির মতির বালক। অনেকটা গোঁকুলের  শিশু শ্রীকৃষ্ণের মতো। সারাক্ষণ দুরন্তপনা ও নতুন বিষয়ের অবতারণা আমিনুলের প্রধানতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তার কর্তৃক নব আবিষ্কারের বিষয় সমূহের অন্যতম প্রধান হল সাময়িকভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং প্রত্যাবর্তনের পর প্রতিবেশীর ভেতরে এর কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা নিঃশব্দভাবে পর্যবেক্ষণ করা। অনেকটা এইচ জি ওয়েলস এর বিখ্যাত উপন্যাস ‘টাইম মেশিন’ গল্পের নায়কের মতো। এরই মধ্যে সে দুইবার নিখোঁজ হয়েছে নিজ বাসস্থান ও পরিচিত প্রতিবেশের ভেতরেই। 

আমিনুলদের পারিবারিক ঘরটি উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত। একটা উঁচু বালির ডিবির উপরে পলিমাটির আস্তরণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। আমজাদের জন্মের বছর দুই পরে তার পিতা ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন। চতুষ্কোণ আয়তক্ষেত্রের একটা ঘর। আমিনুল তখনও হাঁটতে বা কথা বলতে শিখেনি! অদ্ভুত কোনো কারণে যথাসময়ে দেখা গেল সে হাঁটছে না। সারাক্ষণ হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করছে, সরীসৃপের মতো। অন্য কেউ খেয়াল না করলেও আমজাদের স্ত্রী চানমনি বিষয়টা খেয়াল করে খুবই বিস্মিত ও শঙ্কিত। প্রতিরাতেই সে আমিনুলের না হাঁটা ও কথা না বলা নিয়ে আমজাদের সঙ্গে আলাপচারিতা করে কান্নাকাটি করে। প্রতিবেশীদের অনেকেই আমিনুল মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী বলে তাকে ইঙ্গিতের মাধ্যমে বলেছে। আমজাদকে সে কয়েকবার কবিরাজের কাছে পাঠিয়েছিল। কবিরাজ তার বাহুতে মাদুলি পরিয়ে দিয়েছেন। কিছু জলজ ওষুধও দিয়েছিলেন তাকে পান করানোর জন্যে। কিন্তু কিছুই কাজে দেয়নি। আমজাদ ভেবেছিল তাকে নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাবে, বড় ডাক্তার দেখানোর জন্যে। কিন্তু ঘরটি নির্মাণের সময়ে আমিনুল মহানন্দে সদ্য ফেলা বালির উপরে হামাগুড়ি দিতে থাকে এবং মাত্র দুইদিনের মাথায় সোজা হয়ে হাঁটতে শিখে। চানমনি ও আমজাদ আনন্দে আত্মহারা। আমজাদ বিশ্বাস করে যে, এই বিষয়টিতে তার দরবেশ চাচার কোনো হাত রয়েছে। ভবিষ্যতের কোনো মহার্ঘ লগ্নে আমিনুল কথা বলতেও শিখবে, আকস্মিকভাবেই!

আমিনুলের প্রথম অন্তর্ধান পাঁচ বছর বয়সে। আমজাদদের বসত ঘরের দুটো অংশ। উত্তরদিকের অংশে একটি বিশাল বাঁশের তৈরি মাচা। বাঁশের চটির তৈরি একটা প্রাচীর দিয়ে ঘরের অন্য অংশ হতে পৃথক করা হয়েছে। দিনের আলোতেও ঘরের এই অংশটি প্রায় অন্ধকার থাকে। এই মাচার ভেতরে একটা বাঁশের তৈরি ধানের গোলা এবং অনেকগুলো বিভিন্ন আকৃতির পোড়ামাটির তৈরি হাড়ি ও জালা ছিল। এই হাড়িগুলোর ভেতরে চাল, ডাল, মরিচ, হলুদ, আদা ইত্যাদি সারা বছরের জন্যে মজুদ করে রাখা হতো। আমিনুল একদিন সকাল বেলায় পরিবারের আর কারো যখন ঘুম ভাঙ্গেনি, তখন মাচার ভেতরের হাঁড়িকুঁড়ির ফাঁকফোকরে অথবা ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’ এর সারি  সারি তেলের ডিব্বার মতো সাজিয়ে রাখা ধানের জালার মধ্যে লুকিয়ে গিয়েছিল, রাত নয়টা অবধি। এই সময়কালে পুত্রহারা আমজাদের অস্থির মাতম কিংবা মায়ের হৃদয় কাঁপানো আর্তনাদও তাকে জালার ভেতর থেকে টু শব্দ করতে প্রলুব্ধ করেনি। আমার ধারণা একমাত্র ‘আরব্য রজনী’র মর্জিনা ছাড়া পরিবার বা সংসারের অন্য কারো তার উপস্থিতি শনাক্ত করার মেধা ও যোগ্যতা ছিল না। কাজেই নিঃসহায়ভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাকে অনুসন্ধান করা, খরকা বিলের জলে কোনো শিশুর শরীর ভেসে উঠেছে কি-না অথবা স্রষ্টার কাছে পুত্রকে ফিরিয়ে দেয়ার প্রার্থনা করা ছাড়া আমজাদ এবং তার স্ত্রীর কিছুই করনীয় ছিল না। রাত নয়টার দিকে আমজাদের স্ত্রী যখন জলচৌকির উপরে উপুড় হয়ে সিজদায় জায়নামাজকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল, তখন মাচার ভেতর থেকে নেমে এসে ছায়ামূর্তির মতো আলো-আঁধারির ভেতরে মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল সে। সারাদিন কোথায় ছিল– এর কোনো সদুত্তর তো দূরের কথা, কোনো প্রতিক্রিয়াই পাওয়া যায়নি তার কাছ থেকে। শুধু অসাধারণ এক হৃদয় জুড়ানো হাসি ছাড়া। 

আমিনুলের দ্বিতীয় অন্তর্ধান তার ৭ বছর বয়সে। সুবেহ সাদিকের সময় থেকে অপরাহ্ন পর্যন্ত দিনের দুই-তৃতীয়াংশ সময়ের জন্যে। খরকা বিলের শেষপ্রান্তে সুখ নগরী গ্রাম যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে শুরু হয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত এক ফসলের মাঠ। শীতকালে এই প্রান্তরে রবি শস্যের চাষ হয়। এই শস্য ক্ষেত পেরিয়ে সামনে গেলেই খিলকাটি গ্রাম। এই গ্রামেই আমজাদের একমাত্র বোন সালমার বিয়ে হয়েছে। এক কন্যা সন্তানের জননী সালমা। স্বামী পরিবার-পরিকল্পনা অফিসে কাজ করে। সালমার শ্বশুরবাড়ি হতে অদূরেই যমুনা নদী।  উত্তরে রংপুর, দিনাজপুর হয়ে আসামের মেঘালয় পর্বতমালা থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ নামে সৃষ্ট হয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সাগরের দিকে চলে যাওয়ার পথে ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জের নিকটে এটা যমুনা নদী নাম ধারণ করেছে। নদীর প্রস্থ বরাবর পশ্চিমদিকে সাঁতরে ওপাড়ে উঠলেই  চন্দনবাইশা। ফাতেমাদের বাড়ি। যেখানে একদা আমজাদ লজিং থাকতো। 

সেদিন প্রত্যুষে ঘুম ভাঙার পর সূর্য ওঠার অনেক আগেই বালক আমিনুল গ্রামের প্রান্তের শেষ বাঁশঝাড়টা অতিক্রম করে। দুই দিকে ফসলের মাঠকে রেখে মাঠের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে একটা চিকন আইল। সূর্য তখনও  দিগন্তরেখার ওপরে না উঠলেও সর্ষে ফুলের হলুদ রঙে আলোকিত হয়ে আছে সারা প্রান্তর। সামনে এগিয়ে গেলে প্রান্তরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে একটা বুড়ো বটগাছ। সকালের আলো-আঁধারির ভেতরে আরো ঘন অন্ধকার তৈরি করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে পাহারা দিচ্ছে মাঠ-ঘাট আর ফসলের প্রান্তর। যদিও তার ফুপু সালমার বাড়িতে যাওয়ার জন্যে আমিনুল রওনা দিয়েছিল। কিন্তু বাঁশঝাড় অতিক্রম করতেই সকালের নরম আলোতে সামনের প্রান্তর আর এর কেন্দ্রের গাছটা তাকে অমোঘ আকর্ষণে টানতে থাকে। সে দ্রুত পায়ে আইলের ওপর দিয়ে দুলতে দুলতে বটবৃক্ষের নীচে এসে স্থির হয়। লাল বটফল নিচে পড়ে আছে। গাছের ডালে কয়েকটা চিল ঝিমুচ্ছে। সে জানে না কেন সে এখানে এসেছে। বছরের এই সময়টাতে বিশাল প্রান্তর হলুদ সরিষা ফুলে ঢেকে আছে। আমিনুলের চোখে মায়ার অঞ্জন বুলিয়ে দেয় কেউ। সমগ্র চরাচরকে তার কাছে মায়াবী নদীর পাড়ের দেশ বলে মনে হয়। অন্য কোনো পৃথিবী তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।  ফেলে আসা সব পথকে তার অপরিচিত মনে হয়। অনির্দেশ্য এক কেন্দ্রীভূত শক্তির দুর্নিবার আকর্ষণে সর্ষে ফুলের হলুদ প্রান্তরের ভেতরে শুয়ে থাকে।

সারাদিন অনুসন্ধানের পর বিলম্বিত অপরাহ্নে আমজাদ খুঁজে পায় তার নিরুদ্দিষ্ট সন্তানকে। গ্রামের সবাই বলাবলি করে যে, আমজাদের ছেলেবেলার স্বভাব পেয়েছে আমিনুল।

“I shall have to controvert one or two ideas that are almost universally accepted.” - H.G. Wells

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর