প্রেমাক্রান্ত সামসা
SELECT bn_content.*, bn_bas_category.*, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeInserted, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeInserted, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeUpdated, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeUpdated, bn_totalhit.TotalHit FROM bn_content INNER JOIN bn_bas_category ON bn_bas_category.CategoryID=bn_content.CategoryID INNER JOIN bn_totalhit ON bn_totalhit.ContentID=bn_content.ContentID WHERE bn_content.Deletable=1 AND bn_content.ShowContent=1 AND bn_content.ContentID=205299 LIMIT 1

ঢাকা, সোমবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ৭ ১৪২৭,   ০৪ সফর ১৪৪২

প্রেমাক্রান্ত সামসা

হারুকি মুরাকামি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩১ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০  

ছবি: আন্তর্জাল

ছবি: আন্তর্জাল

মূল গল্প: Samsa in Love by Haruki Murakami

 (গল্পটির ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ। অনুবাদটির স্বত্ব সংরক্ষিত।)

ঘুম থেকে জাগার পর আবিস্কার করল যে, নিজে সে গ্রেগর সামসায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে।

বিছানায় শুয়ে পিঠের উপরে সটান হয়ে সে প্রথমে ছাঁদের দিকে তাকাল। আলোর সল্পতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার জন্যে তার চোখ কিছুটা সময় নিল। ছাঁদটাকেও তার সাধারণই মনে হল। প্রতিদিন যে রকম থাকে। কখনও সাদা রঙ, কখনও বা ম্লান ক্রিম রঙ করা। বছরের পর বছর ধরে জমে উঠা ময়লা ও ধূলার কারণে অবশ্য দেখতে মনে হচ্ছিল নষ্ট দুধের রঙ। রঙটির কোন আলঙ্কারিক বা নির্ধারিত বৈশিষ্ট ছিল না। সেটা বিশেষ কোন বার্তাও দিচ্ছিল না। শুধুমাত্র নিজের গঠনিক দিকটাকে প্রতিফলিত করছিল। তার বেশী নয়। 

রুমের পাশে লম্বা একটা জানালা। বাম পাশে। তবে সেটার পর্দা সরিয়ে জানালার ফ্রেমের উপরে কয়েকটা মোটা বোর্ড লোহা দিয়ে গেঁথে দেয়া হয়েছে। বোর্ডগুলো আনুভূমিকভাবে রাখা। পাশাপাশি বোর্ডগুলোর মধ্যে এক ইঞ্চি বা সমপরিমাণ জায়গা ফাঁক রাখা হয়েছে। কি উদ্দেশ্যে অথবা এমনিতেই কিনা, তা বোঝা যাচ্ছে না। ফাঁকগুলো দিয়ে সকালের সূর্যের আলো এসে পড়ছে। মেঝের উপরে তা উজ্জ্বল সমান্তরাল সমান্তরাল রেখা সৃষ্টি করেছে। জানালাটাকে এমন কঠিন করে বন্ধ করে রাখা হয়েছে কেন? সম্ভাব্য কোন বিশাল ঝড় বা টর্নেডো কি এগিয়ে আসছে? নাকি কেউ যাতে এই কক্ষে প্রবেশ না করতে পারে, সেজন্যে? অথবা কাউকে (সম্ভবত তাকেই) কি চলে যাওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে? 

পিঠের উপরে শুয়ে থেকেই সে মাথা ঘুরিয়ে রুমের অবশিষ্ট অংশকে নিরীক্ষা করল। যে বিছানাতে শুয়ে আছে, সেটা ছাড়া সে আর কোন আসবাবপত্র দেখতে পেল না। চেস্ট অফ ড্রয়ার্স, ডেস্ক, চেয়ার – কোনকিছুই না। দেয়ালগুলোতেও কোন পেইন্টিং, ঘড়ি বা আয়না নেই। বাতি নেই। মেঝের উপরে কার্পেট বা অন্যকিছু নেই। শুধুই খোলা কাঠ। দেয়ালগুলো জটিল নকশার ওয়ালপেপার দ্বারা আবৃত। কিন্তু সেগুলো এতই পুরনো ও ম্লান হয়ে গেছে যে, নকশাটি আদতে কী রকম ছিল তা বোঝা যাচ্ছে না।

রুমটিকে সম্ভবত পূর্বে সাধারণ শোবার কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হত। তবে সেখান থেকে মানব জীবনের নিদর্শন সমূহ মুছে গেছে। শুধুমাত্র যে জিনিসটা অবশিষ্ট রয়ে গেছে, তা হল কক্ষের কেন্দ্রের একাকী বিছানা। এবং সেটার উপরে কোন বেডিং, বিছানার চাদর বা কভার, এমনকি বালিশও নেই। শুধুমাত্র একটা প্রাচীন তোষক ছাড়া। 

সামসার কোন ধারণাই নেই যে কোথায় সে, তার কি করা উচিত? শুধু জানে যে সে এখন একজন মানুষ, যার পূর্বে নাম ছিল গ্রেগর সামসা। কিভাবে জানল? সম্ভবত কেউ তার কানে ফিসফিস করে বলে গেছে, যখন সে ঘুমাচ্ছিল। কিন্তু গ্রেগর সামসা হবার পূর্বে সে কি ছিল? কি ধরণের প্রাণী সে ছিল? 
যে মূহুর্তে সে এই প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করল, সেই মূহুর্তেই মশার তৈরী একটা কাল স্তম্ভ তার মাথার ভেতরে ঘুরতে লাগল। স্তম্ভটি আরও মোটা ও ঘনীভূত হয়ে ক্রমশ মস্তকের নরম অংশের দিকে সরে গেল। গুনগুন করতে করতে। সামসা সিদ্ধান্ত নিল কোন চিন্তা না করার। এই ধরণের একটা মূহুর্তে চিন্তার চেষ্টা করাটাই বিশাল বোঝা। 

তবে ঘটনা যাই হোক, তাকে নিজের শরীর নাড়াতে পারতে হবে। এভাবে সিলিং এর দিকে চিরকাল তাকিয়ে থাকা সম্ভব নয়। শুয়ে থাকার এই অঙ্গভঙ্গিটাই আসলে বিপদজনক। এই অবস্থায় কেউ আক্রমণ করে বসলে বাঁচার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, বিশেষ করে তা যদি শিকারী পাখির আক্রমণ হয়। প্রাথমিক চেষ্টা হিসেবে সে আঙুল নাড়ানোর চেষ্টা করল। লম্বা দশটা আঙুল; দুই হাতের সাথে যুক্ত। প্রত্যেকটারই আবার কয়েকটা করে জয়েন্ট রয়েছে, যে গুলো আঙুলগুলোর নড়াচড়াকে সামঞ্জস্য দিতে যেয়ে জটিল করে তুলেছে। ব্যাপারটাকে অধিকতর খারাপ করার জন্যে তার শরীরটাও অসাড় হয়ে আছে। মনে হচ্ছে ঘন আঠালো কোন তরলের ভেতরে সে ডুবে আছে। ফলে পা পর্যন্ত শক্তি পৌঁছাচ্ছে না। 

বেশ কয়েকবার চেষ্টা ও ব্যর্থতার পর চোখ বন্ধ ও মনকে নিবিষ্ট করার পর আঙুলগুলোকে সে কিছুটা নিয়ন্ত্রণের ভেতরে আনতে সমর্থ হল। একটু একটু করে সে শিখতে লাগল সেগুলোকে একসাথে কীভাবে কাজ করানো যায়। আঙুলগুলো চলৎশক্তি ফিরে পাবার পর যে অসারতা তার শরীরকে গ্রাস করেছিল, তা বিলীন হয়ে গেল। তার পরিবর্তে একটা দুঃসহ যন্ত্রণাদায়ক ব্যাথা তাকে গ্রাস করল। ভাটার স্রোতে যেভাবে অপসৃয়মান অন্ধকার ও অশুভ প্রবাল দৃশ্যমান হয়ে উঠে। 
কিছুক্ষণ পর সামসা বুঝতে পারল যে, ব্যাথাটি আর কিছু নয় – প্রবল ক্ষুধা। বুভুক্ষ ধরণের ক্ষুধা তার কাছে নতুন। অন্তত এই রকমের ক্ষুধার অতীত অভিজ্ঞতা তার স্মৃতিতে নেই। মনে হচ্ছিল যে, বিগত এক সপ্তাহ যাবত সে কিছুই খায়নি এবং তার শরীরের কেন্দ্র একটি সর্বভূক শূন্যতায় পরিণত হয়ে আছে। তার হাড়ে চিড় ধরেছে, মাংসপেশিগুলো টানটান হয়ে গেছে এবং শরীরের অঙ্গগুলো কামড়াচ্ছে। 

ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে সামসা তার কনুই দুটোকে তোষকের উপরে স্থাপন করে নিজেকে উপরের দিকে ঠেলে দিল। এই প্রক্রিয়ায় তার মেরুদন্ডে কয়েকবার নিদারুণ বিরক্তিকর ফাটল অনুভূত হল। মাই গড, আমি কতক্ষণ এভাবে শুয়ে ছিলাম? সামসা ভাবল। তার শরীর সকল নড়াচড়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করল। কিন্তু সর্বশক্তি দিয়ে সে চেষ্টা করতে লাগল এবং অবশেষে বসতে সমর্থ হল। 

আতংকিত হয়ে সে নিজের উলঙ্গ শরীরের দিকে তাকাল। কী অদ্ভুত- কদাকার আকৃতির! কদাকারের চেয়েও খারাপ। এই শরীরের কোন স্বপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই নেই নিজেকে বিপদআপদ থেকে রক্ষা করার জন্যে। সাদা মসৃণ চামড়া (শুধুমাত্র ভাসাভাসা কিছু লোম দ্বারা আবৃত), যেগুলোর ভেতর দিয়ে নীলাভ শিরা দৃশ্যমান; একটা নরম অরক্ষিত পেট; হাস্যকর ধরণের অসম্ভব কিম্ভুতকিমাকার একটা যৌনাঙ্গ, শুকনা ও দীর্ঘ বাহু ও পা (শুধুমাত্র দুটো করে); একটা অস্থিসার ও ভঙ্গুর ঘাড়; একটা বিশাল ও অদ্ভুত মস্তক, যার উপরে কিছু শক্ত চুল; দুইটা খুবই কদাকার কান, যেগুলো একজোড়া সামুদ্রিক শামুকের মত উপর থেকে ঝুলে আছে।

এই প্রাণীটাই কি আসলে সে? এই রকম অদ্ভুত ও অতি সহজে ধ্বংসযোগ্য শরীর (উপরে কোন খোল নেই, অন্যকে আক্রমণ করার জন্যেও কোন অস্ত্র নেই) নিয়ে কেউ কি পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে সক্ষম? কেন তাকে একটি মাছে রুপান্তরিত করা হল না? অথবা একটি সূর্যমুখী ফুলে? মাছ অথবা সূর্যমুখী ফুলও তবু কিছু বোধগম্যতা সৃষ্টি করে। অনেক বেশী বোধগম্যতা থাকত গ্রেগর সামসা নামের একটি মানুষ হবার চেয়ে। 

বিছানার পাশ দিয়ে আলতোভাবে পা নামিয়ে দিল সে। পায়ের গোঁড়া মেঝে স্পর্শ করতেই মেঝের খোলা কাঠের অচিন্তনীয় শীতলতার কারণে খাবি খেল কয়েকবার। প্রতিবার চেষ্টাতেই মেঝের উপরে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল সে। কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টার পর পা দুটোর উপরে নিজেকে ব্যালেন্স করতে সমর্থ হল। থেঁৎলানো ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল, এক হাত দিয়ে বিছানার ফ্রেমকে আঁকড়ে ধরে। নিজের মাথাকে খুবই ভারী মনে হচ্ছিল এবং শরীরকে সোজা করে ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছিল। বগল বেয়ে ঘাম ঝরছিল অবিরল এবং প্রবল মানসিক চাপের কারণে জননেন্দ্রিয় সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছিল। কয়েকবার গভীর শ্বাস গ্রহণের পর সঙ্কুচিত মাংশপেশীগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসল। 

দাঁড়াতে অভ্যস্ত হয়ে যাবার পর তাকে হাঁটা শিখতে হল। দুই পায়ের উপরে ভর দিয়ে হাঁটা তার কাছে এক ধরণের অত্যাচার বলে মনে হল। প্রতিটা অঙ্গসঞ্চালনই ব্যাথাময় অঙ্গে অনুশীলন যেন। ডান ও বাম পা পরম্পরায় রেখে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। বিষয়টিকে প্রাকৃতিক সকল নিয়মের উর্ধ্বে মনে হচ্ছিল। একই সাথে চোখ থেকে ভূমি পর্যন্ত অনিশ্চিত দূরত্ব তাকে সন্ত্রস্ত করে তুলল। তাকে শিখতে হল কিভাবে নিতম্ব ও হাঁটু সন্ধিকে সমন্বয় করতে হয়। প্রতি পদক্ষেপেই হাঁটুদ্বয় কাঁপছিল এবং দুই হাত দিয়ে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে নিজেকে স্থির করতে হচ্ছিল তাকে। 

কিন্তু একটি বিষয় সে নিশ্চিতভাবে বুঝতে পেরেছিল যে, এই কক্ষে চিরকাল থাকা সম্ভব নয়। যদি সে খাদ্যের সন্ধান না পায়, তবে শীঘ্রই তার ক্ষুধার্ত পেট নিজের মাংশ খাওয়া শুরু করবে। এবং তাকে অস্তিত্বহীন হয়ে যেতে হবে। 

টলায়মান পদক্ষেপে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দেয়াল আঁকড়ে ধরে। এই যাত্রাকে একটি অন্তহীন ভ্রমণ মনে হচ্ছিল, যদিও তার কাছে সময় মাপার কিছু ছিল না। শুধুমাত্র ব্যাথা দিয়ে ছাড়া। চলাচল খুবই অদ্ভুত ধরণের এবং পদক্ষেপগুলো শামুকের মত হচ্ছিল। কোনকিছুর সাথে হেলান দেওয়া ব্যতীত সে সামনের দিকে এগোতে পারছিল না। সুতরাং সে নিশ্চিত ধরে নিল যে, রাস্তার উপরে উঠার পর লোকজন তাকে বিকলাঙ্গ ভাববে। 

দরজার হাতল ধরে টান দিল। ওটা বিন্দুমাত্রও নড়ল না। সামনের দিকে ধাক্কা দিল। পুনরায় একই ফলাফল। অতঃপর সে দরজার গোল মাথার হাতলকে ডানদিকে ঘুরিয়ে টান দিল। সামান্য কিচমিচ শব্দ করে আংশিকভাবে সেটা খুলে গেল। খোলা অংশের ভেতর দিয়ে মাথা বের করে সে সামনের দিকে তাকাল। হলঘরটি জনশূন্য। সমুদ্রের তলদেশের মত নিশ্চুপ। দরজার ভেতর দিয়ে সে বাম পা’কে এগিয়ে দিল। শরীরের উপরের অংশকে সামনের দিকে আন্দোলিত করল। এক হাতে দরজার চৌকাঠ ধরে, এবং ডান পা দিয়ে অনুসরণ করল। খুব ধীরে ধীরে সে করিডোর দিয়ে নীচে নামতে লাগল, দেয়ালে হাত রেখে। 

অর্ধেক পথ পেরোতেই চারটা দরজা। যেটাকে সে অতিক্রম করে এসেছে, সেটা সহ। সবগুলো দরজাই দেখতে একই রকমের। আবলুশ কাঠ দিয়ে নান্দনিকভাবে তৈরী। ওটার ওপারে কি বা কারা আছে? সে দরজাগুলো খুলে অনুসন্ধান করতে চাইল। সম্ভবত তখনই সে বুঝতে পারবে কি রহস্যময় পরিস্থিতিতে সে আছে। অথবা সে সম্পর্কিত কোন সূত্র খুঁজে পাবে। যাই হোক, প্রতিটা দরজাই সে কোন রকমের শব্দ ছাড়াই নিঃশব্দে অতিক্রম করল।

পেট পূর্তি করার প্রয়োজন তার ঔৎসুক্যকে অতিক্রম করে গেল। আহার করার জন্যে কিছু একটা খুঁজে পাওয়া তার একান্ত প্রয়োজন। এবং এখন সে জানে কোথায় তা সে খুঁজে পাবে। 

হঠাৎ সে আঘ্রাণ পেল। রান্না করা খাবারের ঘ্রাণ। বাতাসে খাবারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাগুলো তার দিকে উড়ে আসছিল। নাকের ঘ্রাণ সংক্রান্ত রিসেপটরগুলো দিয়ে সেই সংগৃহীত তথ্যগুলো মস্তিষ্কে প্রবাহিত হয়ে এক ধরণের পূর্বজ্ঞান সৃষ্টি করছিল তার ভেতরে। স্পষ্ট ও আগ্রাসী সেই অনুভবের কারণে তার নাড়ীভুঁড়িগুলো দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। ক্রমাগতভাবে। এক সময়ে লালা এসে তার মুখ পূর্ণ করে দিল। 

গন্ধের উৎসের কাছে যেতে হলে অবশ্য খাঁড়া সিঁড়ি দিয়ে নামতে হবে তাকে। মোট সতেরটি। সমতল ভূমিতে হাঁটতেই তার প্রাণান্তকর অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। এক্ষণে সিঁড়িগুলো দিয়ে নামা তার কাছে দুঃস্বপ্নের মত মনে হল। সিঁড়ির রেলিঙের খুঁটিগুলো আঁকড়ে ধরে নীচের দিকে অগ্রসর হতে লাগল সে। এই সময়ে চামড়া সর্বস্ব গোড়ালিকে মনে হচ্ছিল শরীরের ওজনের ভারে নুয়ে পড়েছে। এবং বলতে গেলে প্রায় গড়াগড়ি দিয়েই সে সিঁড়ি বেয়ে নামল। 

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়ে সামসার কি মনে ছিল? মূলত, মাছ ও সূর্যমুখীর কথা। “আমি যদি মাছ অথবা সূর্যমুখী ফুলে রূপান্তরিত হতে পারতাম, তাহলে আমি শান্তি পেতাম। অন্তত এভাবে সিঁড়ি বেয়ে আমাকে নামতে হত না।“ 

সতের নম্বর সিঁড়ির নীচে নামার পর নিজের শরীরকে সোজা করল সে। অতঃপর অবশিষ্ট সমস্ত শক্তি একত্রিত করে, যেদিক থেকে গন্ধটা আসছিল, সেদিকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে গেল। উঁচু ছাঁদের প্রবেশ কক্ষ পেরিয়ে ডাইনিং রুমের খোলা দরজার ভেতরে পা রাখল। একটা ডিম্বাকৃতি বড় টেবিলের উপরে খাবার সাজানো ছিল। পাঁচটা চেয়ার ছিল, কিন্তু কোন লোকজন সেখানে ছিল না। খাবারের প্লেটগুলো থেকে বাষ্পীভূত ধুঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছিল। টেবিলের কেন্দ্রে একটা কাঁচের ফুলদানীতে ১২টি পদ্মফুল ভাসছিল। টেবিলের চারটি স্থানে ন্যাপকিন ও কাঁটাচামচ রাখা ছিল। সেগুলো কেউ স্পর্শ করেনি। মনে হচ্ছিল যে, কয়েকজন মানুষ তাতে খেতে বসেছিল। এমন সময়ে আকস্মিক ও অভাবিত কোন ঘটনা ঘটার প্রেক্ষিতে দ্রুত তারা সেই স্থান ত্যাগ করে চলে গেছে। কি ঘটেছিল? কোথায় গেছে? অথবা তাদেরকে কি অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে? তারা কি নাশতা করার জন্যে পুনরায় ফিরে আসবে? 

কিন্তু এই ধরণের বিষয় নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করার সময় সামসার ছিল না। সবচেয়ে কাছের চেয়ারটিতে বসে পড়ে সে খালি হাত দিয়ে যতটুকু সম্ভব খাবার মুখের ভেতরে পুরল। পাশের ছুরি, চামচ ও ন্যাপকিনকে ছুঁয়েও দেখল না। পাউরুটিকে ছিন্নভিন্ন করে ছিড়ে, জ্যাম অথবা বাটার ছাড়াই খেয়ে ফেলল। সসেজকে পুরো গিলে ফেলল। সিদ্ধ কঠিন ডিমকে এতই দ্রুততার সাথে ভক্ষণ করল যে, সেগুলোকে ছিলতে ভুলে গেল। মুঠ ভর্তি করে গরম আলুর ভর্তা এবং আঙুল দিয়ে আচার তুলে নিল। সেগুলোকে একসাথে চিবাতে থাকল এবং অবশিষ্ট খাবারগুলোকে জগের পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলল। স্বাদ তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। টক, ঝাল, মিষ্টি – সবকিছুই তার কাছে সমান। শুধুমাত্র একটা জিনিসই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তা হল নিজের শরীরের ভেতরের শূন্য গর্ত। একাগ্রচিত্তে এমনভাবে সে আহার করছিল, যেন সময়ের সাথে যুদ্ধ করছিল। আহারে নিবিষ্টতার কারণে আঙুল চাঁটার সময়ে ভুলক্রমে দাঁত দিয়ে সেগুলোকে কামড়ে দিচ্ছিল। যত্রতত্র খাবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছিল। এমনকি প্লেট হাত থেকে মেঝেতে পড়ে ভেঙ্গে গেলেও খেয়াল করার সময় ছিল না তার। 

আহার শেষ করে সামসা যখন স্থির হল, তখন খাবারের টেবিলে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। ডাইনিং টেবিলটিকে বিদঘুটে বলে মনে হচ্ছিল। যেন কয়েকটা কলহপ্রিয় কাক খোলা জানালা দিয়ে উড়ে এসে খাবারগুলোকে সাবাড় করে পুনরায় উড়ে চলে গেছে। যে জিনিসটা শুধুমাত্র তার স্পর্শের বাইরে ছিল তা হল পদ্মফুলের সেই ফুলদানীটা। ওখানে কোন খাবার ছিল না। নতুবা সেটাকেও সে গ্রাস করে ফেলত। 

আহার শেষে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে চেয়ারের উপরে অনেকক্ষণ বসে থাকল। হাতকে টেবিলের উপরে রেখে অর্ধ নিমীলিত চোখে পদ্মফুলের দিকে তাকিয়ে। পর্যায়ক্রমে দীর্ঘ ও ধীরভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করল। এই সময়ে খাবারগুলো তার পাকস্থলীর ভেতরে হজম হচ্ছিল, কন্ঠনালী থেকে ক্ষুদ্রান্ত্র পর্যন্ত দৈর্ঘের ভেতরে। ক্রমশ উদ্বেলিত জোয়ারের মত তৃপ্তির একটা অনুভূতি তাকে পূর্ণ করল। একটা ধাতুর পাত্র থেকে সাদা সিরামিক কাপে সে কফি ঢালল। কফির তীব্র গন্ধ তাকে কিছু একটা মনে করিয়ে দিল। পর্যায়ক্রমে ও কয়েকটি ধাপে। সেটা ছিল অদ্ভুত ধরণের অনুভূতি। ভবিষ্যতে অবস্থান করে বর্তমানকে রোমন্থন করার মত। আশ্চর্য কোন কারণে সময় দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে এবং স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাগুলো বন্ধ চোখের ভেতরে ঘুরছে। পরস্পরকে অনুসরণ করে। উদারভাবে সে কফির ভেতরে ক্রিম ঢালল, আঙুল দিয়ে নাড়ল এবং পান করল। কফিটা শীতল হয়ে গেলেও ভেতরে সামান্য উষ্ণতা অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল। গলার ভেতরে চালিয়ে দেবার পূর্বে সেটাকে সে কিছুক্ষণের জন্যে মুখের উপরে ধারণ করছিল, যা তার ভেতরে কিছুটা স্বস্তির অনুভূতি তৈরী করছিল। 

অকস্মাৎ ঠান্ডা অনুভব করল সে। ক্ষুধার আতিশয্য এতক্ষণ তার অন্য সকল অনুভূতিকে ভোঁতা করে রেখেছিল। এক্ষণে পূর্ণপরিতৃপ্ত অবস্থায় সকালের শীতল বায়ু তার চামড়াকে কাঁপিয়ে দিল। আগুণ নিভে গিয়েছিল। কোন হিটারই অন করা ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা হল যে, সে একেবারেই উলঙ্গ ছিল। এমনকি এমনকি তার পাগুলোও ছিল খালি ও অনাবৃত। 

সে বুঝতে পারল যে, তার কিছু পরিধান করা উচিৎ। এই অবস্থায় সে খুবই শীতল হয়ে আছে। এছাড়াও হঠাৎ কেউ এসে পড়লে পোষাক তার জন্যে একটা বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে। কেউ হয়ত দরজায় নক করতে পারে। অথবা যে লোকগুলো কিছুক্ষণ পূর্বে ব্রেকফাস্ট করার জন্যে বসেছিল, তারা ফিরে আসতে পারে। কে জানে তারা কি ভাববে তাকে এই অবস্থায় দেখতে পেলে? 

সবকিছুই সে বুঝতে পারছিল। কিন্তু কিভাবে, সে সম্পর্কে ধারণা ছিল না তার। বিশেষ করে এর বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যা। সে শুধু জানত সত্যিকার ও সরলভাবে।আর কোন ধারণাই ছিল না এই জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে। সম্ভবত ভেতরের ঘুর্ণায়মান স্মৃতির সাথে এটা সম্পর্কিত হতে পারে।

চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে সে ফ্রন্ট হলের দিকে হেঁটে গেল। এখনও অদ্ভুত, তবে অন্তত এখন সে দুই পায়ের উপরে দাঁড়াতে ও হাঁটতে সক্ষম। কোন অবলম্বন করা ছাড়াই। হলের ভেতরে পেটা লোহা দিয়ে তৈরী একটা ছাতা ছিল। সেটার ভেতরে কয়েকটা ওয়াকিং স্টিক ছিল। সে ওক কাঠের তৈরী কাল একটা স্টিক টেনে বের করল। হাঁটার কাজে সহায়তা নেয়ার জন্যে। ওটার শক্ত হাতল তাকে আশ্বস্ত ও অনুপ্রাণিত করল। এখন অন্তত তার কাছে একটা অস্ত্র আছে, যা দিয়ে সে পাখির আক্রমণকে প্রতিহত করতে সক্ষম। সে জানালার কাছে গেল এবং পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। 

বাসাটি ছিল একটা সড়কের দিকে মুখ করা। খুব বড় সড়ক নয়। সড়কের উপরে খুব বেশি লোকজনের চলাচলও দেখা যাচ্ছিল না। যাই হোক, সামসা খেয়াল করল যে, সড়কের উপরে চলাচলরত প্রতিটি ব্যক্তির শরীরেই পোষাক আছে। বিভিন্ন রঙের ও ফ্যাশনের। পুরুষ ও নারীদের পোষাক পরস্পর থেকে ভিন্ন। শক্ত চামড়ার জুতো দিয়ে তাদের পাগুলো মোড়ানো। অনেক নারী পুরূষেরাই টুপি পরে ছিল। তাদেরকে দেখে মনে হচ্ছিল না যে, দুই পায়ের উপরে হাঁটতে পারা কঠিন কোন ব্যাপার। সবাই নিজেদের যৌনাঙ্গকে আবৃত করে রেখেছিল। সামসা হলঘরের বিশাল আয়নায় নিজের প্রতিফলনকে বাইরে হাঁটা মানুষদের সাথে তুলনা করল। আয়নায় নিজেকে জরাজীর্ণ ও শীর্ণ দেহের অধিকারী বলে মনে হল। নিজের পেটটাকে মনে হল রসালো ও পাউরুটির মত নরম। গুপ্তলোমের উপরে তুলার মত ঝুলে আছে। শরীর থেকে হাত দিয়ে সে ঝেটে ময়লা সরিয়ে দিল। এবং পুনরায় ভাবল যে, শরীরকে ঢাকার জন্যে কিছু একটা তার অবশ্যই প্রয়োজন। 

অত:পর সে রাস্তার দিকে আরেকবার তাকাল। পাখিগুলো সেখানে আছে কিনা, তা নিশ্চিত হবার জন্যে। কিন্তু দৃষ্টিসীমার ভেতরে কোন পাখি দেখতে পেল না। 
গ্রাউন্ড ফ্লোরে হলঘর ছাড়াও ডাইনিং রুম, রান্নাঘর ও একটি লিভিং রুম ছিল। কিন্তু যতটুকু সে দেখতে পেল সেখানে পরিচ্ছদ সদৃশ কিছু ছিল না। এর অর্থ হল যে, কাপড় পরা ও খোলার বিষয়গুলো অন্য কোথাও সম্পাদিত হয়ে থাকে। সম্ভবত সেকেন্ড ফ্লোরের কোন কক্ষে। 

পুনরায় সে সিঁড়ির কাছে ফিরে এল এবং উপরে উঠতে শুরু করল। নীচে নামার চেয়ে উপরে উঠা তার জন্যে কতই না সহজ, বিষয়টা আবিষ্কার করে সে অবাক হয়ে গেল। রেলিং ধরে সে সতেরটা সিঁড়িই দ্রুততার সঙ্গে কোন ধরণের ব্যাথা-বেদনা বা ভয় ছাড়াই উঠতে সমর্থ হল। শুধুমাত্র নিঃশ্বাস গ্রহণের জন্যে খুব সল্প সময়ের জন্যে বিরতি দিয়ে। 

কেউ হয়ত বলতে পারেন যে, সামসার ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল। কারণ সেকেন্ড ফ্লোরের কোন দরজাই বন্ধ ছিল না। হাতলের গাঁট ঘুরিয়ে ঠেলা দিতেই প্রতিটি দরজা খুলে যাচ্ছিল। খোলা মেঝের একটা হিমঘর ছাড়া সেখানে মোট চারটি কক্ষ ছিল। এর একটাতেই তার ঘুম ভেঙ্গেছিল। সবগুলোই আসবাবপত্র দ্বারা সুসজ্জিত। প্রতিটা কক্ষেই পরিষ্কার চাদরের বিছানা, ড্রেসিং টেবিল, একটা লিখার ডেস্ক, সিলিঙ থেকে ঝুলানো বাতি এবং জটিল নকসার কার্পেট ছিল। বুকশেলফে বইগুলো সুন্দর করে সাজানো ছিল। দেয়ালগুলোর প্রত্যেকটি সজ্জিত ছিল তেলরঙের ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং দিয়ে। প্রত্যেকটা কক্ষেই কাঁচের তৈরী একটা করে ফুলদানী ছিল। জানালাগুলোর বাইরে দিয়ে কোন ধরণের বোর্ড আঁটকে দেয়া ছিল না। সেগুলোতে জরি দেয়া পর্দা লাগানো ছিল, যাদের ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো গড়িয়ে পড়ছিল। আশির্বাদের মত। বিছানাগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে, সেগুলোতে নিয়মিত কেউ ঘুমায়। বালিশের উপরে সে মাথার ছাপও দেখতে পেল। 

সবচেয়ে বড় কক্ষটিতে সে আলমারির ভেতরে তার সাইজের একটি ড্রেসিং গাউন খুঁজে পেল। মনে হল যে, এটা সে ব্যবহার করতে সক্ষম হবে। অন্য জামাকাপড়গুলো কিভাবে পরতে হয় সে সম্পর্কে তার কোন ধারণা নেই। সেগুলো আসলেই জটিল ধরণের। প্রত্যেকটিতে অনেকগুলো বোতাম। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল যে, সে কিছুতেই বুঝতে পারল না যে, জামাগুলোর সামনের ও পিছনের এবং উপর বা নীচের দিক কোনটা? কোন অংশটা শরীরের উপরে দিকে থাকবে এবং কোন অংশটি নীচের দিকে? অন্যদিকে ড্রেসিং গাউনটি খুবই সরল, ব্যবহারিক এবং অলংকারমুক্ত। ওটার নরম কাপড় তার চামড়ার উপরে আরামদায়ক মনে হল। রঙ গাঢ় নীল। এমনকি ওটার সঙ্গে ম্যাচ করে এমন একজোড়া চপ্পলও সে খুঁজে পেল। 

ড্রেসিং গাউনটা সে নিজের উলঙ্গ শরীরের উপরে চড়িয়ে দিল এবং অনেক শুদ্ধাশুদ্ধির পর বেল্টটিকে কোমরে বাঁধতে সমর্থ হল। গাউন ও চপ্পল দ্বারা সজ্জিত হয়ে আয়নার ভেতরে নিজের দিকে তাকাল। উলঙ্গ হয়ে হাঁটাহাঁটি করার চেয়ে এই অবস্থা তার কাছে নিশ্চিতভাবে অধিকতর ভাল বলে মনে হল। চারপাশটা যতটা উষ্ণ হবার কথা ততটা উষ্ণ ছিল না। তবে যতক্ষণ সে ঘরের ভেতরে অবস্থান করবে, ততক্ষণ শীতকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। সবচেয়ে ভাল ব্যাপার হল, তাকে আর হিংসুক পাখিদের আক্রমণ থেকে নিজের নরম চামড়াকে রক্ষা করতে হবে না। 

দরজার বেলটি বাজার সময়ে সামসা সবচেয়ে বড় কক্ষের সবচেয়ে বড় বিছানাটিতে তন্দ্রা যাচ্ছিল। লেপের পালকের নীচে যথেষ্টই উষ্ণ ছিল। ডিমের ভেতরে ঘুমানোর মত আরামপ্রদ। সে স্বপ্ন থেকে উত্থিত হল। কোন কিছুই বিস্তারিতভাবে মনে করতে পারল না, কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে আনন্দময় ও সুখকর বলে মনে হল। যাই হোক, ঘন্টার শব্দের প্রতিধ্বনি তাকে শীতল বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনল। 

বিছানা থেকে নিজেকে টেনে তুলল, গাউনটাকে শরীরের সাথে বাধল, গাঢ় নীল রঙের চপ্পলটাকে পরল, ওয়াকিং স্টিকটাকে আঁকড়ে ধরল এবং রেলিঙ এর উপরে হাত রেখে সে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকল। প্রথমবারের চেয়ে এবারে এই কাজটিকে তার সহজতর বলে মনে হল। তারপরেও পড়ে যাবার সম্ভাবনা দূর হল না এবং ভারমুক্ত হতে পারল না সে। পায়ের দিকে নিবিড় দৃষ্টি রেখে ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকল। প্রতি পদক্ষেপে একটামাত্র করে সিঁড়ি অতিক্রম করে। এই পুরো সময়ে বেলটা বাজতেই থাকল। যেই বেলটা চাপ দিয়ে থাকুক না কেন, সে নিশ্চয়ই খুবই ধৈর্যহীন ও একগুঁয়ে মানুষ হবে। বামহাতে ওয়াকিং স্টিক ধরে সে সামনের দরজার দিকে অগ্রসর হল। হাতলের গাঁটটিকে ডানে ঘুরিয়ে টান দিলে দরজাটা খুলে গেল। 

একজন ছোটখাট নারী বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। যথেষ্টই ক্ষুদ্রাকৃতির মহিলা। ওটা আসলেই অবাক করা ব্যাপার ছিল যে, মহিলাটি বেলের বাযার (buzzer) পর্যন্ত পৌঁছুতে পেরেছিল। অবশ্য, যখন সে আরও নিবিড়ভাবে তাকাল, তখন বুঝতে পারল যে, বিষয়টা মহিলার ক্ষুদ্রাকৃতির সাথে সম্পর্কিত ছিল না। ওটা ছিল আসলে তার পৃষ্ঠদেশ, যা সামনের দিকে চিরস্থায়ীভাবে ঝুঁকে ছিল। একারণেই তাকে ক্ষুদ্র লাগছিল। অন্যথায় তার শরীরের কাঠামো স্বাভাবিক আকৃতিরই। একটা রাবার ব্যান্ড দিয়ে সে তার চুলগুলোকে চুড়ো করে বেঁধে রেখেছিল, যাতে সেগুলো মুখের উপরে গড়িয়ে না পড়ে। চুলগুলো ছিল গাঢ় বাদামী রঙের এবং খুবই ঘন। মাথায় কোন হ্যাট ছিল না। জুতোগুলো ছিল লম্বা ফিতেওয়ালা। বয়স আনুমানিক বিশ। ভেতরে একটা বালিকাসুলভ ভাব। চোখ দুটো বড় বড়, নাকটা ছোট এবং ঠোঁটটি একদিকে মৃদু বাঁকা, শীর্ণ চাঁদের মত। গভীর কাল চোখের ভুরূ দুটো কপালের উপরে দুটো সোজা রেখার সৃষ্টি করেছিল, যা তার চেহারাকে কিছুটা সন্দেহপ্রবন রূপ দিয়েছিল। 
“এটা কি সামসার বাসা?” মহিলাটি বলল, নিজের মাথাটিকে যতদূর সম্ভব উঁচু করে। তারপর শরীরটাকে পুরো এক মোচড় দিল। ঠিক যেভাবে প্রবল ভূমিকম্পের সময় পৃথিবী মোচড় দেয়।

প্রথমে অবাক হয়ে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে গুছিয়ে নিল। “হ্যা,” সে জবাব দিল। যেহেতু সে গ্রেগর সামসা, সেহেতু এটা তারই বাড়ি হবার কথা। অন্তত কোনভাবেই এটা বললে কোন ক্ষতি হবার সম্ভাবনা নেই। 

তারপরেও মেয়েটি তার উত্তরে সন্তুষ্ট হল বলে মনে হল না। ভুরূতে ঈষৎ ভ্রূকুটি দেখা গেল। সম্ভবত সামসার কণ্ঠস্বরের ভেতরে কিছুটা জড়িমা খুঁজে পেয়েছে সে।
“সুতরাং এটাই আসলে সামসার বাসস্থান, তাই না?” ধারালো কন্ঠে বলল সে। ঠিক যেভাবে একজন অভিজ্ঞ দ্বাররক্ষী জীর্ণ পোষাকে সজ্জিত আগন্তুককে জেরা করে। 
“ হ্যা, আমিই গ্রেগর সামসা,” সামসা যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক স্বরে বলল। এই একটা বিষয়ে সে নিশ্চিত।

“আমি আশা করছি যে, তুমি ভুল বলছ না,” পায়ের কাছে একটা কাপড়ের ব্যাগ তোলার জন্যে নীচু হয়ে সে বলল। ওটা ছিল কাল রঙের এবং ভারী। কয়েকটা জায়গায় ছেঁড়া। নিশ্চিতভাবেই ওটার একাধিক মালিক ছিল। “তাহলে, আস আমরা কাজ শুরু করি।“ 

কোন উত্তরের অপেক্ষা না করে সে বাসার ভেতরে প্রবেশ করল। সামসা তার পেছনের দরজাটাকে বন্ধ করল। মেয়েটি সেখানে দাঁড়িয়ে তাকে আপাদমস্তক দেখল। সম্ভবত সামসার গাউন ও চপ্পল তার ভেতরে সন্দেহের উদ্রেক করেছিল। 
“মনে হয় তোমাকে আমি ঘুম থেকে জাগালাম,” শীতল কন্ঠে সে বলল। 
“একেবারেই অসুবিধা নেই, “ সামসা বলল। সে মেয়েটির চোখের তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তি থেকে বুঝতে পারছিল যে, তার পরিচ্ছদ ঠিক নেই।“ আমার চেহারার জন্যে আমি ক্ষমাপ্রার্থী,” সে বলল। “ এর কিছু কারণ আছে.........” 
মহিলাটি তার কথাকে গ্রাহ্যের ভেতরে আনল না। “তারপর কি?” কুঞ্চিত ঠোঁটে সে বলল। 
“তারপর কি?” সামসা প্রতিধ্বনি করল। 
“তারপর, সেই তালাটা কোথায় যেটা সমস্যার সৃষ্টি করেছে?” মহিলাটি বলল। 
“তালা?” 
“যে তালাটা ভেঙ্গে গেছে,” সে বলল।“ তুমি সেটাকে মেরামত করার জন্যে আসতে বলেছ।“ 
“হ্যা হ্যা” সামসা বলল।“ সেই ভাঙ্গা তালাটি।” 

সামসা মনের ভেতরে তন্নতন্ন করে খুঁজল। যখন সে বিষয়টার উপরে চিন্তাকে কেন্দ্রীভূত করতে সমর্থ হল, তখনই মশার কাল সেই স্তম্ভটি পুনরায় উদয় হল। 
“আমি কোন তালা সম্পর্কে জানি না,” সে বলল।“আমার ধারণা সেটা সেকেন্ড ফ্লোরের কারও হবে।“ 

মহিলা দগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। “তোমার ধারণা?” সে তার মুখের দিকে তীর্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল। তার কন্ঠ আরও শীতল রূপ ধারণ করেছে। চোখের ভ্রু অবিশ্বাসের কারণে বাঁকা হয়ে গেছে। “ অন্য কোন দরজার?” সে বলল। 

সামসা মহিলাটির মুখটিকে রক্তিম হয়ে যেতে দেখল। তালা সম্পর্কে নিজের অজ্ঞতা তাকে যারপরনাই বিব্রত করল। খাঁকারি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে সে কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু একটা শব্দও বের হল না। 
“মিঃ সামসা, বাসায় কি তোমার পিতা-মাতা আছেন। আমার মনে হয় তাদের সাথে কথা বলতে পারলেই ভাল হত।“ 
“তারা সম্ভবত কিছু আনতে বাইরে গেছেন,” সামসা বলল। 
“কিছু আনতে?” সে বলল ভয়ার্ত কন্ঠে। “এই ধরণের সমস্যার মধ্যে?” 
“আমার আসলে স্পষ্ট ধারণা নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠার পরই আমি দেখতে পাই যে উনারা চলে গেছেন,” সে বলল। 
“অদ্ভুত,” কম বয়সী সেই মহিলাটি বলল এবং একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল।“আমরা তাদেরকে জানিয়েছিলাম যে, আজ এই সময়ে কেউ আসবে।“ 
“আমি অত্যন্ত দুঃখিত।“
মহিলাটি কিছুক্ষণের জন্যে দাঁড়াল। তারপর চোখের পাতা নামিয়ে নিয়ে সামসার বাম হাতের উয়াকিং স্টিকের দিকে তাকাল। “তোমার কি পায়ে সমস্যা আছে, গ্রেগর সামসা?” 

“একটু সমস্যা আছে,” সে কৌশলে প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। 
মহিলাটি পুনরায় হঠাৎ শরীরে একটি মোচড় দিল। সামসার কোন ধারণাই নেই যে এই মোচড়ের কি অর্থ অথবা উদ্দেশ্য হতে পারে। তবুও নিজের অন্তর্গত স্বভাবের কারণে মহিলার জটিল চলাচলের পরম্পরার প্রতি সে আকৃষ্ট হল। 
“ঠিক আছে,” হতাশার সুরে মহিলাটি বলল। “আস, সেকেন্ড ফ্লোরের দরজাগুলো দেখে আসি। আমি ভয়ংকর সব উঁচুনিচু রাস্তা ও সাঁকো অতিক্রম করে এখানে এসেছি। বলতে গেলে জীবনকে বিপন্ন করে। সুতরাং এখানে কেউই নেই বলে ফিরে যাওয়া আমার জন্যে সমীচীন হবে না। এছাড়া পরের বার ফিরে আসাও আমার জন্যে কষ্টকর।“ 

‘ভয়ংকর উঁচুনিচু’ - সামসা বুঝতে সক্ষম হল না যে, মহিলাটি কি বুঝাতে চাচ্ছে। কি ঘটেছে চারপাশের পরিবেশের ভেতরে? তবে সে সিদ্ধান্ত নিল বিস্তারিত জানার জন্যে আর প্রশ্ন না করতে। নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে প্রকাশ না করাই অধিকতর শ্রেয় বলে মনে হল। 

মহিলাটি নিচু হয়ে কাল ভারী ব্যাগটা ডানহাতে নিল এবং সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগল। হামাগুড়ি দিয়ে চলা কোন পোকার মত। সামসা তাকে পেছন থেকে অনুসরণ করল। রেলিঙ এর উপরে হাত রেখে। মহিলার এই বিসর্পিত চলার ভঙ্গী সামসার ভেতরে সহমর্মিতার সৃষ্টি করল। তাকে কিছু একটার কথা মনে করিয়ে দিল। 

উপরের সিঁড়িতে উঠার পর মহিলা থামল এবং হলঘরের পথটি পর্যবেক্ষন করল। “সম্ভবত এই চারটে দরজার একটার তালা ভেঙ্গে গেছে, ঠিক?” 
সামসার মুখ লালচে হল।“হ্যা,” সে বলল। “এরই একটা হবে। ওটা হলঘরের শেষপ্রান্তে, বামদিকে হতে পারে। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল। এটা হল সেই খালি কক্ষ, যেখানে সে আজ সকালে ঘুম থেকে জেগেছিল। 
“হতে পারে,” মহিলাটি বলল নিষ্প্রাণ কন্ঠে। “সম্ভবত।“ সামসার মুখ নিরীক্ষা করার জন্যে সে পিছনে ফিরল। 
“ হয়ত অথবা অন্যটি,” সামসা বলল।

মহিলাটি পুনরায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “গ্রেগর সামসা,” সে শুষ্কভাবে বলল। “তোমার সাথে কথা বলা সত্যিই মজার ও আনন্দের। তোমার শব্দভান্ডার খুবই ঐশর্যশালী, এবং তুমি সঠিক সময়ে সঠিক কথাগুলোই বলতে পার।“ অতঃপর তার কন্ঠস্বর পরিবর্তিত হল। “যাই হোক, আস আমরা হলঘরের শেষপ্রান্তে বামদিকের দরজাটা প্রথম দেখি।“ 

মহিলা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার হাতলের গাঁটটিকে সামনে-পিছনে ঘুরিয়ে এবং সামনের দিকে ঠেলে দরজাটিকে খুলতে সমর্থ হল। ভেতর দিকে। কক্ষটি পূর্বাবস্থায়ই রয়ে গেছে। শুধুমাত্র খালি তোষকসহ বিছানাটিকে আরও মলিন মনে হচ্ছিল। মেঝেটিও খালি ছিল এবং জানালায় বোর্ড লোহা দিয়ে আটকানো। মহিলাটি হয়ত খেয়াল করেছে, কিন্তু সে কোন বিস্ময় ভাব করছে না। তার ভাব দেখে মনে হচ্ছে এই ধরণের রুম সারা শহরেই আছে।

সে হামাগুড়ি দিয়ে বসল, কাল ব্যাগটি খুলল, একটা সাদা ফ্লানেল কাপড় বের করল এবং সেটাকে মেঝের উপরে বিছিয়ে দিল। অনেকগুলো টুল বের করে সেগুলোকে সতর্কতার কাপড়ের উপরে সারিবদ্ধ করে রাখল। অনেকটা পাষাণ কোন অত্যাচারীর মত, যে তার অশুভ অস্ত্রগুলোকে হতভাগা বন্দীদের সামনে প্রদর্শন করে থাকে তাদেরকে মেরে ফেলার পূর্বে। 

মাঝারী বেধের একটা তার নিয়ে সেটাকে সে দক্ষ হাতে তালার ভেতরে প্রবেশ করাল। বিভিন্ন কোণ থেকে। নিবিষ্টতার কারণে তার চোখগুলো সরু হয়ে যাচ্ছিল। সামান্য শব্দেই তার কান সতর্ক হচ্ছিল। এরপর সে আরও চিকন একটা তার নিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটির পুনরাবৃত্তি করল। তার মুখমন্ডল গম্ভীর হল। তার মুখ বাঁকা হয়ে একটা নিষ্ঠুর রূপ ধারণ করল। চাইনিজ তরবারির মত। একটা বড় ফ্ল্যাশলাইট নিয়ে চোখের কাল দৃষ্টি দিয়ে সে তালাটাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। 
“তোমার কাছে কি এই তালার চাবি আছে?” সে সামসাকে জিজ্ঞেস করল।

“এর চাবি কোথায় আছে, সে সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই,” সে সততার সাথে উত্তর দিল। 
“গ্রেগর সামসা, কোন কোন সময়ে তোমার কথা শুনে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে,” সে বলল। 

এরপর সামসাকে অগ্রাহ্য করে সে একটা স্ক্রুডাইভার বের করে কাপড়ের উপরে রাখল এবং তালাটিকে দরজা থেকে খোলার চেষ্টা করল। তার সকল নড়াচড়াই ছিল ধীরগতির এবং সতর্ক। কিছু কিছু সময়ে সে থামছিল মোচর দেয়ার এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলার জন্যে। পূর্বের মত। 

পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে তার চলনভঙ্গি দেখতে দেখতে সামসার নিজের শরীর অদ্ভুতভাবে সাড়া দিতে শুরু করল। সে গরম অনুভব করছিল এবং তার শ্বাসরন্ধ্র জ্বলছিল। মুখ এতই শুষ্ক হয়ে যাচ্ছিল যে, তাকে বড় বড় ঢোক গিলতে হচ্ছিল। তার কানের লতিগুলো চুলকাচ্ছিল। এবং তার জননেদ্রিয় দোলায়মান হয়ে সিক্ত, প্রসারিত ও শক্ত হয়ে যাচ্ছিল। এটার উত্থানের কারণে তার গাউনের উপরে একটা স্ফীতি জন্মাচ্ছিল। অন্ধকারের ভেতরে থাকলেও সামসা বুঝতে পারছিল যে, এর অর্থ ভিন্ন। 

দরজা থেকে তালা খোলার পর কম বয়সী মহিলাটি জানালার পাশে গেল। জানালার সাথে আটকে রাখা বোর্ডগুলোর ফাঁক দিয়ে আসা আলোতে তালাটিকে দেখার জন্যে। তার দিয়ে সেটার ভেতরে নাড়াচাড়া করল। জোরে জোরে ঝাঁকি দিল তালাটিকে কেমন শব্দ করে তা শোনার জন্যে। এই পুরো সময়টাতেই তার মুখ ছিল বিষাদগ্রস্ত ও ঠোঁট দুটো কুঞ্চিত। অবশেষে সে পুনরায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবং সামসার দিকে ফিরল। 

“তালাটির ভেতরে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে,” মহিলাটি বলল। “ হ্যা, এটাই সেই তালা, যেমনটা তুমি বলেছ।“ 
“ঠিক আছে,” সামসা বলল। 

“না, ঠিক নেই,” মহিলাটি বলল।“এখানে বসে এটাকে ঠিক করার কোন উপায় নেই। এটা বিশেষ ধরণের তালা। এটাকে আমার নিয়ে যেতে হবে। আমার পিতা অথবা বড় ভাইদের কাছে। তারা সম্ভবত এটাকে মেরামত করতে পারবেন। আমি একজন শিক্ষানবিশ। শুধুমাত্র সাধারণ তালাগুলো নিয়ে আমি কাজ করতে পারি। 
“বুঝতে পেরেছি,” সামসা বলল। এই যুবতী মেয়ের পিতা ও কয়েকটি ভাই আছে। পুরো পরিবারটিই তালার কারিগর। 
“আসলে আমার এক ভাইয়ের আসার কথা ছিল আজ। কিন্তু শহরে খুব গোলমাল হচ্ছে বলে তারা আমাকে পাঠিয়েছে। পুরো শহর জুড়ে চেকপয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে।“ হাতের ভেতরে রক্ষিত তালাটির দিকে সে তাকাল।“কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি এমন অদ্ভুতভাবে তালাটি ভাঙ্গল কে? কেউ একজন বিশেষ যন্ত্র দিয়ে এটার ভেতরে গর্ত করেছে। এর বাইরে আর কোন ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই।“ 

পুনরায় সে মোচড় দিল। দুই বাহুকে চক্রাকারে ঘুরালো। যেমন করে সাঁতারুরা নতুন কোন স্ট্রোক অনুশীলন করে। সামসা মেয়েটির এই কাজে খুবই মোহিত ও উত্তেজিত হল। 

সামসা মনঃস্থির করল এবং বলল,”আমি কি তোমাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারি?” 
“প্রশ্ন?” সে তার দিকে তাকিয়ে সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টিতে বলল। “আমি বুঝতে পারছি না কি, তবে করতে পার।“ 
“কিছুক্ষণ পর পর তুমি এমনভাবে শরীর মোচড় দাও কেন?” 
ঠোঁট সামান্য ফাঁক করে সে সামসার দিকে তাকাল। “মোচড়?” মূহুর্তের জন্যে চিন্তা করল।“তুমি কি বলতে চাচ্ছ এভাবে?” বলেই সে পুরো প্রক্রিয়াটির পুনরাবৃত্তি করল। 
“হ্যা, এভাবে।“ 
“ব্রেসিয়ারটি আমার শরীরের সাথে ফিট করে না,” জেদী মেয়ের মত বলল সে। “আর কোন কারণ নেই।“ 
“ব্রেসিয়ার?” সামসা নীরস কন্ঠে বলল। এই শব্দকে সে স্মৃতির ভেতর থেকে স্মরণে আনতে সক্ষম হল না। 
“ব্রেসিয়ার। তুমি জান সেটা কি? জান না?” মহিলাটি বলল। “ নাকি একজন কুঁজো মহিলা ব্রেসিয়ার পরছে, এটাই তোমার কাছে অদ্ভুত লাগছে? তুমি কি মনে কর আমার মত মেয়ের জন্যে ওটা অতিরিক্ত আভরণ?” 
“কুঁজো?” সামসা বলল। এই শব্দটাও তার স্মৃতির বিশাল শুন্যতার ভেতরে ডুবে গেল। তার কোন ধারণাই জন্মালো না, মেয়েটি কি বলছে সে সম্পর্কে। তারপরেও মনে হল যে তার কিছু একটা বলা দরকার। 
“না, আমি কিছুই মনে করছি না,” সে বিড়বিড় করল। 
“শোন, আমরা যারা কুঁজো, তাদেরও দুটো বুক আছে, অন্য মেয়েদের মত। এবং সেগুলোর জন্যে আমাদেরকে ব্রেসিয়ার ব্যবহার করতে হয়। গাভীর মত ঝুলন্ত উলান নিয়ে আমরা চলাফেরা করতে পারি না।“ 
“অবশ্যই না,” সামসা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গেল। 

“কিন্তু কুঁজো মেয়েদের জন্যে কোন ব্রেসিয়ার ডিজাইন করা হয় না। ফলে এগুলো আলগা হয়ে যায়। আমাদের শরীরের গঠন স্বাভাবিক মেয়েদের চেয়ে ভিন্ন, বুঝতে পেরেছ? সুতরাং আমাদেরকে কিছুক্ষণ পর পর মোচড় দিয়ে সেগুলোকে সঠিক স্থানে ফিরিয়ে আনতে হয়। তুমি যা চিন্তা করতে পার, তার চেয়ে বেশী সমস্যা কুঁজো মেয়েদের আছে। এই কারণেই কি তুমি পেছন থেকে আমার দিকে তাকিয়েছিলে? এটাই কি তোমাকে আনন্দ দিচ্ছে?” 
“কখনই না। আমি শুধু আগ্রহী হয়েছিলাম জানার জন্যে যে, তুমি কেন ওটা কর।“

সুতরাং সামসা সিদ্ধান্তে উপনীত হল যে, ব্রেসিয়ার বা বক্ষবন্ধনী হল এক ধরণের যন্ত্রপাতি যা বুককে স্ব-স্থানে রাখে এবং কুঁজো হল একজন ব্যক্তি যার শরীরের গঠন এই মহিলার মত। এই পৃথিবীতে কত কিছুই না জানার আছে। 
“তুমি কি নিশ্চিত যে তুমি আমাকে নিয়ে কৌতুক করছ না?” মহিলাটি জিজ্ঞেস করল।
“আমি তোমাকে নিয়ে কৌতুক করছি না।“ 

মহিলা মাথা উর্ধ্বমুখী করে সামসার দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারল যে, সে সত্য বলছে । তাকে অপমান করার কোন অপচেষ্টা তার ভেতরে নেই। ছেলেটির মস্তিষ্ক একটু দুর্বল, এই যা। সম্ভবত সে বয়সে তার চেয়ে কয়েক বছরের বড় হবে। খোঁড়া হবার সমান্তরালে মনে হচ্ছে মানসিকভাবেও সে প্রতিবন্ধী। তবে সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান, এবং আদবকায়দাও খুবই ভাল। চেহারাটাও সুন্দর। যদিও শরীর কৃশকায় ও পাণ্ডুর মুখের অধিকারী। 
এই সময়েই সে লক্ষ্য করল সামসার গাউনের নীচের অংশের উত্থিত অংশ।
“ওটা কি?” কঠিন স্বরে সে বলল। “ওই উঁচু জিনিসটা?”

সামসা নীচু হয়ে গাউনের সামনের অংশটা দেখল। আসলেই যথেষ্ট ফুলে আছে। মেয়েটির কন্ঠস্বর থেকে সে বুঝতে সক্ষম হল যে, তার এই অবস্থাটি সঠিক নয়।
“বুঝতে পেরেছি,” মেয়েটি ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে উঠল। “তুমি ভাবছ যে, একটা কুঁজো মেয়ের সাথে যৌনসংগম করতে কেমন লাগবে, ভাবছ না?”
“যৌনসংগম?” সে বলল। আরেকটি নতুন শব্দ, যেটার অর্থ সে জানে না।

“তুমি ভাবছ যে, কুঁজো মেয়ে মানুষ যেহেতু কোমরের দিকে বাঁকা হয়ে থাকে, সুতরাং পেছন থেকে তার সাথে সংগম করা কোন সমস্যাই নয়, ঠিক বলেছি?” মেয়েটি বলল।। “বিশ্বাস কর, তোমার মত অনেক বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষই পৃথিবীতে আছে, যারা আমাদেরকে সহজলভ্য ভাবে, কারণ আমরা কুঁজো। কিন্তু শোন বৎস, আমরা কখনই সহজলভ্য নই।“

“আমি খুবই বিভ্রান্ত হয়ে আছি,” সামসা বলল।“ আমি যদি কোন কারণে তোমার মন খারাপের কারণ হয়ে থাকি, তাহলে আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি মাফ চাচ্ছি। অনুগ্রহ করে ক্ষমা করে দাও। তোমার কোন অপকারই আমি করতে চাই না। সম্ভবত আমি অসুস্থ্য এবং অনেক বিষয়ই আমি বুঝতে পারছি না।“
“ঠিক আছে, আমি কিছুটা বুঝতে পারছি।“ সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “তুমি সম্ভবত কিছুটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, ঠিক? তবে তোমার অঙ্গটি বড় আকার ধারণ করেছে। সম্ভবত বিগড়ে গেছে।“

“আমি দুঃখিত,” সামসা পুনরায় বলল।
“ভুলে যাও।“ সে নরম কন্ঠে বলল।“ আমি ছেলেবেলা থেকেই এ সম্পর্কে জানি। বাড়িতে আমার চারটা অপদার্থ ভাই আছে, যারা আমার শৈশবেই সবকিছু দেখিয়েছে। কৌতুক করে।“

সে হাঁটু গেঁড়ে নিচু হয়ে সরঞ্জামগুলো তুলে ব্যাগের ভেতরে স্থাপন করল। ভাঙ্গা তালাটিকে ফ্লানেল কাপড়ে মুড়িয়ে সেটাকে সেগুলোর পাশে রাখল।
“আমি তালাটিকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি,” সে বলল দাঁড়িয়ে উঠে। “তোমার বাবা-মাকে বলো। আমরা ওটাকে মেরামত অথবা প্রতিস্থাপন করব। যদি নতুন কিনে দিতে হয়, তাহলে কিছুটা সময় লাগবে। এটাই নিয়ম। তাদেরকে বলতে ভুলো না, ঠিক আছে? বুঝতে পেরেছ আমার কথা? মনে রাখতে পারবে?”
“আমি তাদেরকে বলব,” সামসা বলল।

মেয়েটি ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামল। সামসা পেছন থেকে তাকে অনুসরণ করল। দুজনে মিলে একটা বৈপরীত্যমূলক দৃশ্যের অবতারণা করল। মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছিল সে চার পা দিয়ে হামাগুড়ি দিচ্ছে। অপরদিকে সামসা পেছনের দিকে খুবই অস্বাভাবিকভাবে ঝুঁকেছিল। তারপরেও তাদের পদক্ষেপগুলো ছিল প্রায় একই ধরণের। সামসা প্রাণপণে তার শরীরের স্ফীতিটাকে দমানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু কিছু সেটা কোনক্রমেই পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসছিল না। মেয়েটিকে সিঁড়িতে অনুসরণ করার সময়ে তাকে দেখে তার হৃদ-কম্পন শুরু হল। শিরার ভেতর দিয়ে উত্তপ্ত রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল। কিন্তু একগুঁয়ে স্ফীতি কমল না।

“আমি তোমাকে আগেও বলেছি যে, আমার এক ভাই আসার কথা ছিল আজ,” সামনের দরজায় পৌঁছানোর পর মেয়েটি বলল। “কিন্তু সমস্ত রাজপথ আজ সৈন্য আর ট্যাংকে ভর্তি। লোকজনকে গ্রেফতার করছে। একারণেই আমার পরিবারের ছেলেরা বের হতে পারছে না। একবার যদি এরেস্ট করা হয় তাদের, বলা যায় না হয়ত আর কোনদিন ফিরে নাও আসতে পারে। সেকারণেই আমাকে পাঠানো হয়েছে প্রাগ শহরকে অতিক্রম করে এখানে। ‘কেউই একটা কুঁজো মেয়েকে খেয়াল করবে না’ বলে।“

“ট্যাংক?? সামসা বিড়বিড় করল।
“হ্যা, অনেক ট্যাংক। কামান ও মেশিনগান লাগিয়ে শহরের বুকে ঘুরছে। কামানগুলো দেখতে খুবই চিত্তাকর্ষক,” সে বলল সামসার গাউনের নীচের স্ফীতিকে নির্দেশ করে। “তবে ঐ কামানগুলো অনেক বড়, আরও কঠিন এবং প্রাণঘাতী। তোমার পরিবারের সবাই যাতে নিরাপদে ফিরে আসে, সে প্রার্থনাই করছি।“
সামসা সিদ্ধান্ত নিল সরাসরি প্রশ্ন করার। ”আমাদের কি আর কখনও দেখা হতে পারে?” সে বলল।
কম বয়সী মেয়েটি সামসার দিকে মুখ ফিরালো, “তুমি কি বলছ যে, তুমি আমাকে আবার দেখতে চাও?”
“হ্যা। আমি তোমাকে আরেকবার দেখতে চাই।“
“তোমার এইরকম উত্থিত অবস্থায়?”

সামসা পুনরায় তার স্ফীত হয়ে উঠা অঙ্গের দিকে তাকাল। “আমি জানি না, বিষয়টাকে আমি কিভাবে ব্যাখ্যা করব, তবে আমার অনুভূতির সাথে এটার কোন সম্পর্ক নেই। এটা সম্ভবত হৃদয়ের কোন সমস্যা হতে পারে।“
“শিশুর মত কথা বলো না,” সে বলল, আনন্দিত স্বরে। “হৃদয়ের সমস্যা। খুবই নতুন দৃষ্টিতে বিষয়টিকে দেখছ তুমি। আমি এর আগে কখনই এরকম শুনিনি।“
“তুমি দেখতেই পাচ্ছ যে, ওটা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।“
“এবং যৌনসংগমের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই, তাই বলতে চাচ্ছ?”
“সত্যি বলছি, এ ধরণের কোনকিছুই আমার মনের ভেতরে নেই।“
“সুতরাং সোজাসুজিই বলছি। যখন তোমার সেই অঙ্গটা বড় ও শক্ত হয়ে যায়, তখন তোমার মস্তিষ্ক নয়, বরং হৃদয়ই সেটা ঘটাচ্ছে বলে তোমার ধারণা?”
সামসা সম্মতিসূচক মাথা নাড়াল।
“ঈশ্বরের কসম?” মেয়েটি বলল।
“ঈশ্বর,” সামসা প্রতিধ্বনি করল। এই আরেকটি শব্দ সে কখনও শুনেছে বলে মনে করতে পারল না। নিশ্চুপ হয়ে গেল।
মেয়েটি উদ্বিগ্নভাবে মাথা নাড়াল। মোচড় দিয়ে ঘুরল এবং ব্র্যাসিয়ার ঠিক করল।
“ভুলে যাও এসব কথা। মনে হচ্ছে কয়েকদিন পূর্বে ঈশ্বর এই শহর ছেড়ে অন্যকোথাও চলে গেছেন। এসো, আমরাও তাকে ভুলে যাই।“
“সুতরাং, তোমার সঙ্গে কি আমার পুনরায় দেখা হচ্ছে?”
মেয়েটির মুখে একটা নতুন দৃষ্টি ফুটে উঠল। তার চোখকে মনে হল দূরতর এবং কুয়াশাচ্ছন্ন ল্যান্ডস্কেপের উপরে নিবদ্ধ।“ তুমি কি সত্যিই আমাকে আবার দেখতে চাও?”
সামসা মাথা নাড়াল।
“দেখা হলে কি করব, আমরা?”
“পরস্পরের সাথে কথা বলব।“
“কি বিষয়ে?” মেয়েটি জিজ্ঞেস করল।
“অনেক বিষয় নিয়ে।“
“শুধুই কি কথা বলব?”
“আমি তোমার কাছ থেকে অনেক বিষয়ে জানতে চাই,” সামসা বলল।
“কি কি বিষয়ে?”
“এই পৃথিবী সম্পর্কে। তোমার সম্পর্কে। আমার সম্পর্কে। মনে হয় অনেককিছু নিয়েই আমাদের কথা বলার প্রয়োজন রয়েছে। যেমন, ট্যাংক, ঈশ্বর, ব্র্যাসিয়ার, তালা ইত্যাদি।“
আরেকটা নীরবতা তাদের উপরে নেমে আসল।

“আমি জানি না,” মেয়েটি বলল, শেষ পর্যন্ত। সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ছিল, তবে তার কন্ঠের শৈত্যতা এখন আর স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না।“ আমার চেয়ে তোমাকে অনেক বেশী ভালভাবে লালনপালন করা হয়েছে। এবং আমি কখনই ভাবি না যে, তোমার পিতামাতা তাদের অমূল্য সন্তানকে আমার মত একজন কুঁজো মেয়ের সাথে জড়াতে দেখলে খুশী হবেন। যদিও তাদের ছেলেটি খোঁড়া এবং ধীরবুদ্ধি সম্পন্ন। সবচেয়ে বড় কথা হল আমাদের শহর এখন বিদেশী সৈন্যদল ও ট্যাংক দিয়ে ভরে আছে। ভবিষ্যতে কি হতে যাচ্ছে কে জানে!“ 

নিশ্চিতভাবেই সামসার কোন ধারণা ছিল না ভবিষ্যতে কি হতে পারে সে সম্পর্কে। কোনকিছু সম্পর্কেই তার কোন ধারণা ছিল না। ভবিষ্যত, এমনকি বর্তমান ও অতীত সম্পর্কেও। ঠিক কোনটা? বেঠিক কোনটা ? পোষাক পরতে পরাটাই তার কাছে এখনও ধাঁধার মত মনে হয়। 

“যে করেই হোক, কয়েকদিন পর আমি এখানে আবার আসব,” কম বয়সী খোঁড়া মেয়েটি বলল। “আমরা যদি তালাটি ঠিক করতে পারি, তবে ওটাকে নিয়ে আসব। ঠিক করতে না পারলেও তালাটিকে আমরা ফিরিয়ে দিয়ে যাব। অবশ্য, তোমাকে সার্ভিস চার্জ দিতে হবে। তুমি যদি তখন এখানে উপস্থিত থাক, তবে আমরা পরস্পরকে দেখতে পাব। সে সময়ে আমরা দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলতে পারব কিনা, আমি জানি না। কিন্তু আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম তবে অন্তত পিতামাতার নিকটে ঐ স্ফীত অঙ্গটা লুকিয়ে রাখতাম। এই ধরণের একটা জিনিস প্রদর্শন করে তুমি কখনই বাহবা পাবে না।“ 
সামসা মাথা নাড়ল। যদিও সে বুঝতে পারছিল না এই ধরণের একটা জিনিসকে কিভাবে দৃষ্টির বাইরে রাখা সম্ভব।

“খুবই অদ্ভুত,” বিষন্নভাবে মেয়েটি বলল। “আমাদের চারপাশের সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার পরেও কেউ কেউ আছে যারা একটা ভাঙ্গা তালা নিয়ে চিন্তা করে, এবং এমন মানুষও আছে যারা দায়িত্বের সাথে সেগুলো মেরামত করতে আসে ............ সম্ভবত এরকমই হবার কথা। হতে পারে যে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজগুলো সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠার সাথে করে আমরা প্রকৃতিস্থ থাকতে পারি, যখন পৃথিবী ধ্বসে পড়ছে।“ 

মেয়েটি মাথা উপরে তুলে সামসার মুখে তাকাল। “আমি আড়িপাতার কথা বলছি না, তবে দ্বিতীয় ফ্লোরের সেই কক্ষটিতে আসলেই কি ঘটেছিল? কেন তোমার পিতামাতা কক্ষটির দরজায় এত বড় একটা তালা লাগিয়েছিলেন, যে কক্ষটিতে মূলত একটা বিছানা ছাড়া কিছুই ছিল না? তালাটি ভাঙ্গার পর তারা এত উদ্বিগ্ন হয়েছিলেনই বা কেন? এবং জানালার উপর দিয়ে লোহার পেরেক দিয়ে বোর্ডগুলোই কেন লাগিয়েছিলেন তারা? কক্ষটির ভেতরে কাকে আটকে রাখা হয়েছিল? কেন?” 

সামসা মাথা নাড়ল। যদি কাউকে বা কোন জিনিসকে যদি সেখানে আঁটকে রাখা হয়ে থাকে, তাহলে সেটা অবশ্যই ছিল সে নিজে। কিন্তু এটার প্রয়োজন হয়েছিল কেন? কোন সূত্রই খুঁজে পেল না। 

“আমার ধারণা, এ বিষয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করে কোন লাভ নেই,” মেয়েটি বলল। “ঠিক আছে, আমাকে এখন যেতে হবে। দেরী হয়ে গেলে ওরা আমাকে নিয়ে চিন্তায় পড়বে। প্রার্থনা কর আমার জন্যে, যাতে আমি একবারেই শহর অতিক্রম করে চলে যেতে পারি। এবং সৈন্যরা যাতে আমার মত দরিদ্র কুঁজো মেয়ের দিকে নজর না দেয়। তাদের কেউই যাতে বিকৃত মনের (perverted) না হয়। এমনিতেই আমরা সকলে যথেষ্ট ধর্ষিত হচ্ছি।“ 
“আমি তোমার জন্যে প্রার্থনা করব,” সামসা বলল। কিন্তু তার কোন ধারণা ছিল না বিকৃত মনের (perverted) বলতে কি বোঝায়। অথবা “প্রার্থনা’ বলতেই বা কি বোঝায়। 

মেয়েটি তার কাল ব্যাগটি তুলে নিল, এবং পূর্বের মতই নিচু হয়ে সে দরজার দিকে অগ্রসর হল। 
“আমি কি তোমাকে আবার দেখতে পাব?” সামসা তাকে শেষ বারের মত জিজ্ঞেস করল। 
“তুমি যদি কাউকে অনেক বেশী ভাব, তাহলে অবশ্যই তার সাথে তোমার পুনর্বার সাক্ষাত হবে,” বিদায় নেয়ার সময়ে মেয়েটি বলল। তার কণ্ঠস্বরের ভেতরে সত্যিকারের উষ্ণতা ছিল। 

“বাইরের পাখিগুলোকে খেয়াল রেখ,” সামসা মেয়েটিকে বলল। মেয়েটি তার দিকে ফিরল এবং মাথা নাড়ল। অতঃপর প্রধান সড়কের দিকে এগিয়ে গেল। 
সামসা পর্দার ফাঁক দিয়ে তার কুঁজো শরীরটাকে পাথরের নুড়ি অতিক্রম করতে দেখল। খুবই বেঢপভাবে মেয়েটি এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু অদ্ভুত দ্রুততার সাথে। মেয়েটির প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিকেই তার কাছে মুগ্ধকারী বলে মনে হল। মেয়েটি তাকে একটি জলপোকার (water strider ) কথা মনে করিয়ে দিল, যে জল ছেড়ে শুষ্ক ভূমির উপরে ছুটছিল। যতটুকু সে ভাবতে পারল, তা থেকে এভাবে হাঁটাকে তার নিকটে দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটার চেয়ে অনেক বেশী যৌক্তিক ও সুন্দর বলে মনে হল। 

মেয়েটি দৃষ্টির বাইরে চলে যাবার একটু পরেই সে খেয়াল করল যে তার যৌনাঙ্গ পূর্বের নরম ও সংকুচিত অবস্থায় ফিরে গেছে। সেই সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রকট ধরণের স্ফিতিটা, কোন এক সময়ে অন্তর্হিত হয়ে গেছে। সেটা এখন তার দুই পায়ের মধ্যে প্রতিরোধহীন ও অপাপবিদ্ধ একটা ফলের মত ঝুলছে। তার তার অন্ডকোষদ্বয় স্বচ্ছন্দে গর্তের ভেতরে ঢুকে গেছে। গাউনটাকে ঠিক করে সে ডাইনিং রুমের টেবিলে বসল এবং ঠান্ডা কফির অবশিষ্ট অংশ পান করল। 

যারা এখানে বাস করত, তারা অন্য কোথাও চলে গেছে। সে তাদের কোন পরিচয় জানে না, তবে অনুমান করে নিতে পারল যে, তারা তার পরিবার ছিল। হঠাৎ কিছু একটা হয়েছিল, যার কারণে তাদেরকে চলে যেতে হয়েছে। সম্ভবত তারা আর কখনই ফিরে আসবে না। “পৃথিবী ধ্বসে হয়ে যাচ্ছে” এই কথার অর্থ কি? গ্রেগর সামসার এ সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই। বিদেশী সৈন্যদল, চেকপয়েন্ট, ট্যাংক – সবকিছুই তার কাছে রহস্যে মোড়া বলে মনে হল। 

শুধুমাত্র একটা জিনিসকে তার কাছে সত্য ও নিশ্চিত বলে মনে হল। তা হল কুঁজো মেয়েটাকে সে আবার দেখতে চায়। তার সামনে মুখোমুখি বসে হৃদয়ের তৃষ্ণা মিটিয়ে গল্প করতে চায়। তার সাথে একত্রে বসে পৃথিবীর ধাঁধাঁগুলো সমাধান করতে চায়। চায় প্রতিটি কোণ থেকে দেখতে যে মেয়েটি কিভাবে মোচড় দেয় এবং পরিশেষে নিজের বক্ষবন্ধনীটিকে সঠিকাস্থানে ফিরিয়ে আনে। সম্ভব হলে সে হাত দিয়ে তার শরীরকে স্পর্শ করবে। সম্ভব হলে তাকে পাশে রেখে সে হাঁটবে এবং পৃথিবীর সিঁড়িগুলোকে প্রদক্ষিণ করে দেখবে। 

শুধুমাত্র মেয়েটির ভাবনাই তাকে উষ্ণ করে তুলল। কখনই তার আর সুর্যমুখী ফুল, মাছ অথবা অন্যকিছু হতে ইচ্ছে করল না। একজন মানুষ হতে পেরে সে আনন্দিত বোধ করল। যদিও দুই পায়ে হাঁটা ও পোষাক পরা তার জন্যে আসলেই অস্বস্তিকর এখনও। পৃথিবীর অনেক কিছুই তার নিকটে এখনও অজ্ঞাত। তারপরেও তার কাছে মনে হল যে, সে যদি মানুষ না হয়ে মাছ অথবা সূর্যমুখী হত, তবে সে কখনই তার বর্তমান আবেগকে অনুভব করতে পারত না। এরকমই অনুভব করল সে। 
চোখ বন্ধ করে সামসা অনেকক্ষণ বসে রইল। অতঃপর মনস্থির করে দাঁড়াল। কাল ওয়াকিং স্টিকটাকে আঁকড়ে ধরল, এবং সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। সে দ্বিতীয় ফ্লোরে ফিরে যাবে এবং সেখানে কিভাবে সঠিকভাবে পোষাক পরতে হয় সে সম্পর্কে জানবে। অন্তত, এখন থেকে এটাই হবে তার পরবর্তী মিশন। পৃথিবী তার জন্যে অপেক্ষা করছে। শেখার জন্যে।

(সমাপ্ত) 

(২০২০ সালের বইমেলায় ‘মুরাকামির ছোটগল্প সংকলন’ বইয়ের একটি গল্প হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশকঃ স্বরে 'অ' - Swore 'O' প্রকাশনী।)

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ