সেইম সাইড

ঢাকা, শুক্রবার   ২২ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৮ ১৪২৭,   ০৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সেইম সাইড

মোঃ জাকির হোসেন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:২৭ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২০  

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

গত কয়েকদিন ধরে ভয়াবহ এক যন্ত্রণা বয়ে বেরাচ্ছে শিহাব। কিছু লিখতে পারছে না। না গল্প, না উপন্যাস, না প্রবন্ধ কিছুই আসছে না মাথায়। কিবোর্ডে আঙুল রেখে শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।

মাথাভর্তি শূন্যতা। এখন নিজেকে আর লেখক ভাবতে পারছে না সে। মনে হচ্ছে ঘাড়ের ওপর যে মাথাটা আছে, সেটা তার না। অন্য কারো। লিখতে না পারার কষ্টটা কাউকে বোঝানো যায় না। এটা অন্যরকম কষ্ট। তারপরও ভক্ত অনুরাগী দু’একজনের সঙ্গে বিষয়টা শেয়ার করে শিহাব। তাদের পরামর্শ হলো, লেখা ভেতর থেকে না বেরুলে জোর করে লেখা যায় না। কিছুদিনের জন্য অফ যাও। মানে লেখালেখি বন্ধ রাখ। কম্পিউটারের সামনে নিজেকে বন্দি না রেখে, মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে যাও। মন যেদিকে চায় সেদিকে যাও। দেখবে আপনা আপনি লেখা বেরিয়ে আসবে। লেখার দিকে ছুটতে যেও না। একসময় লেখাই তোমার দিকে ছুটে আসবে।

শিহাবও উপলব্ধি করল, আসলে লেখালেখি জোরাজুরির বা তাড়াহুড়োর বিষয় না। যখন আসবে বন্যার জলের মতোই আসবে ঠেকানো যাবে না। মনটাকে একটু ফুরফুরে করার জন্য পড়ন্ত বিকেলে বেরিয়ে পড়ে। নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। বেরিয়েই গলির মুখে চায়ের দোকান। গন্তব্যহীন যাত্রা এককাপ চা দিয়েই শুরু হোক। সেখানেও বিপত্তি! পাড়ার একদল বখাটে আড্ডা দিচ্ছে। সবগুলো মিলে যেভাবে সিগারেট ফুঁকছে তাতে মনে হচ্ছে আজ যেন, বিশ্ব ধুমপান দিবস!

গলির চায়ের দোকান এড়িয়ে এলেও চায়ের নেশা এড়াতে পারছে না। ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে চায়ের দোকানই খুঁজছে সে। গাঢ় লিকার দিয়ে কড়া এককাপ চা খাওয়া দরকার। তারপর এক খিলি পানও খাবে ভাবছে। কবি লেখকদের কোনো একটা নেশা না থাকলে কি মানায়! এখানেও ভাবনার পরাজয়। দেখতে দেখতে বাসস্ট্যান্ড অবধি চলে এসেছে। কিন্তু চায়ের দোকানের সন্ধান মিলল না। আজকের যাত্রাটাই কেমন যেন খাপছাড়া।

স্ট্যান্ডে বিআরটিসির ডাবলডেকার দাঁড়িয়ে আছে। কিছু না ভেবেই উঠে পড়ল। ডাবলডেকারের চড়ার মজাই দোতলায়। দোতলায় উঠে দেখল, শূন্য আসনগুলো হা করে তাকিয়ে আছে। হেলেদুলে গিয়ে একদম সামনের সিটে বসল। একটু পর কন্ডাক্টর ভাড়া কাটতে এলে, জিজ্ঞ্যেস করে জানতে পারল, বাসটি শাহবাগ হয়ে গুলিস্তানের দিকে যাচ্ছে।

যাক, ভালোই হলো। শাহবাগ হচ্ছে গিয়ে কবি-লেখকদের তীর্থস্থান। এই বিশাল এলাকাজুড়ে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি, হাইকোর্ট, জাতীয় গ্রন্থাগার, জাতীয় জাদুঘর, রাস্তার একদিকে রমনা অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। আরো কত কী। প্রতিদিন কত মতের কত জাতের মানুষ যে এখানে আসে তার ইয়ত্তা নেই। প্রেমিকযুগল এদিকটায় না আসলে তো তাদের প্রেমের পূর্ণতাই পায় না।

বাস থেকে নেমে সোজা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে ঢুকল। এখানে এসেও আশাহত হলো। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের হতশ্রী অবস্থা। আগের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য নেই। গাছপালা কেটে অনেকটাই ফাঁকা করে ফেলা হয়েছে। বেলাও পড়ে এসেছে। অন্যদিকে গিয়েও সুবিধা হবে না। বসার জায়গা খুঁজতে খুঁজতে স্বাধীনতা স্তম্বের দিকে হাঁটতে থাকে। যা-ও কিছু বেঞ্চ চোখে পড়ছে তার সবগুলোই প্রেমিকযুগল আর কিছু ছিন্নমূল মানুষের দখলে। সিঙ্গেল মানুষ নেই বললেই চলে। সবাই জোড়ায় জোড়ায় প্রেম-ভালোবাসা, মান-অভিমান, হাসি-ঠাট্টা আর গল্পে মশগুল।

অবশেষে বকুল গাছের নিচে বসার মতো একটা জায়গা পেয়ে বসে পড়ল শিহাব। বসার সঙ্গে সঙ্গে বকুল ফুলের ঘ্রাণ নাকে এলো। গাছের দিকে তাকিয়ে দেখল ফুলে ফুলে ভরে আছে গাছটা। নিচেও অনেক ফুল পড়ে আছে। আহ্ কী মিষ্টি গন্ধ! বুকভরে লম্বা শ্বাস নেয়। হেলেপড়া সূর্যের আলো বুকুল পাতার ফাঁক গলে এসে পড়েছে বেঞ্চ ও তার আশেপাশে। ঝিরিঝিরি বাতাসে ছায়া দুলছে।

প্রকৃতির সাণ্নিধ্যে শিহাবের মনের রঙ ম্যাজিকের মতো বদলে যেতে থাকে। আহ কী আনন্দ! বেঞ্চে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে শিহাব। ভাবের সমুদ্রে সাঁতার কাটতে থাকে।

এভাবে কতক্ষণ কেটে গেছে কে জানে! একটি মেয়েলি কণ্ঠস্বরে তন্দ্রাভাব কাটল। চোখ মেলে দেখল, একটি মেয়ে ম্লানমুখে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পোশাক-আশাকে শালীন। মুখে হালকা সাজ। ভদ্র শান্ত মায়াকাড়া চেহারা। কাঁধে ঝোলানো সবুজ রঙের একটা ব্যাগ।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মেয়েটি বলল, ‘ভাই, কিছু যদি মনে না করেন, একটা কথা বলতে পারি?’

মেয়েটা একা। আশেপাশে আর কাউকে দেখতে পেল না। সন্ধ্যায় ঘনিয়ে এসেছে। ভাবনায় পড়ে শিহাব। মেয়েটা তার কাছে কী মতলব নিয়ে এসেছে? মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ভালো করে পড়তে চেষ্টা করে। পার্কের মধ্যে তো কতরকেম মেয়ের আনাগোনা। কুমতলবেরও শেষ নেই। কিন্তু এই মেয়েটাকে দেখে সেরকম কিছু মনে হচ্ছে না।

‘কী বলতে চাও? বলো।’
‘আমার একটা কল করা খুব জরুরি। কিন্তু মোবাইলে আমার ব্যালান্স শেষ।’
‘কার সঙ্গে কথা বলবে?’
‘আমার বয়ফ্রেন্ড।’
‘বয়ফ্রেন্ড!’
‘হ্যাঁ, ওর সঙ্গে পার্কে ঘুরতে এসেছিলাম। ওইদিকে একটি বেঞ্চে বসে আমরা গল্প করছিলাম। হঠাৎ দুইজন লোক এসে ওকে ডেকে নিয়ে গেল। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে ফিরে আসছে না। আমার খুব ভয় করছে। ওর যদি কিছু হয়ে যায়! প্লিজ, আপনার ফোন দিয়ে একটা কল দিয়ে দেন।’ বলেই মেয়েটা শিহাবের পাশে বসে। এবার শব্দ করে মেয়েটি কাঁদতে থাকে। কান্না দেখে শিহাবের সত্যি সত্য মায়া হয় মেয়েটির প্রতি। আহা বেচারি ভয়ানক সমস্যায় পড়ে গেছে!
‘আচ্ছা, নম্বর বলো।’

মেয়েটি তার হাতের মোবাইল সেট থেকে নম্বর বের করে শিহাবকে বলতে থাকে। নম্বর টেপার সঙ্গে সঙ্গে কল ঢুকে যায়। রিং হতে থাকে। শিহাব স্পিকার অন করে মেয়েটির হাতে মোবাইল সেটটি দিয়ে বলল, ‘নাও কথা বলো।’

‘হ্যালো, ‘কোবরা, কী সমস্যা? কই তুমি? কতক্ষণ হয়ে গেল তুমি গেছ। ওরা কারা?’
‘আরে প্যারা নিও না। ওরা আমার ফ্রেন্ডস্টাফ। একটু অপেক্ষা কর, আমি আইতাছি।’
‘তাড়াতাড়ি আসো। আমার খুব ভয় লাগতাছে।’
‘তুমি এখন ঠিক কোথায় আছো?’
‘বড় বকুল গাছটার নিচে। গেল সপ্তায় আমরা যে বেঞ্চে বইছিলাম সেইখানে।’
‘আচ্ছা, ধৈর্য্য ধইরা ওইখানেই থাকো। এক মিনিটের মধ্যে আইতাছি।’
কথা শেষ করে শিহাবের উদ্দেশে মেয়েটি বলল, ‘বড় উপকার করলেন ভাই। ও এখনই এসে যাবে।’

কথা শেষ করে মোবাইল হাতে রেখেই আচমকা শিহাবের গা ঘেঁষাঘেসি করে বসে মেয়েটি। ভাব জমানোর জন্য হাসতে হাসতে এটা সেটা বলতে শুরু করে। 
মেয়েটির হঠাৎ পাল্টে যাওয়া আচরণে অবাক হয় শিহাব। একটু সরে বসে ও। কিন্তু মেয়েটি নাচোড়বান্দা। শিহাবের গায়ের ওপর পুরো শরীর হেলিয়ে দিয়ে অন্যরকম হাসি হাসে। শিহাবের সন্দেহ হয়। সে বলে, 
‘এই মেয়ে, আমার মোবাইল দাও।’
মেয়েটি বোল পাল্টে ফেলে।

‘মোবাইলের হিসেব পরে। আগে তোর মানিব্যাগটা দে।’
শিহাব চেঁচিয়ে ওঠে।
‘আমার সঙ্গে ফাজলামি?’
‘একদম চুপ। আর একটা কথা বললে, এমন চিল্লানি দিমু। পাবলিক আইয়া মাইরা তক্তা বানাইয়া ফালাইবো। পার্কে মাইয়া মানসের লগে ফষ্টিনষ্টি।’
‘দে মানিব্যাগ। তারপর ভাগ এখান থেকে।’

শিহাব ভয়ে ভয়ে বলে, ‘এই মেয়ে, আমি কী করলাম! আমি লেখক মানুষ। মিথ্যে বদনাম দিচ্ছ কেন আমার নামে?  মোবাইলটা দাও। ওতে আমার অনেক গুরুত্বপূর্ণ নম্বর।’

মেয়েটি শক্ত গলায় বলল, ‘ভালোভাবে বলছি, সময় নষ্ট না করে মানিব্যাগটা দিয়ে দে। ওরা এসে পড়লে লেখকের ইজ্জতটা তো খুয়াবিই সঙ্গে জানটাও যাইতে পারে।’
‘না তুমি আমার মোবাইল দাও’ বলেই মেয়েটির হাত থেকে ছোঁ মেরে মোবাইলটি নেয়ার চেষ্টা করে শিহাব। ঠিক তখনই তিন যুবক ঘিরে দাঁড়ায়। ওদের মধ্যে থেকে কোবরা হুঙ্কার ছাড়ে।
‘কী হইছেরে চুমকি?’

সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, ‘দেখ কোবরা, এই লুচ্চা বদমাইসটা আমারে একলা পাইয়া জড়াইয়া ধরছে।’
‘ওই মাদারচোদ!’ বলেই খামচা দিয়ে শিহাবের কলার চেপে ধরে। প্রচণ্ড শক্তিতে মুষ্টিবদ্ধ করে ঘুষি মারার জন্য উদ্যত হয়। কিন্তু মুষ্টি শিহাবের নাক স্পর্শ করার আগেই মুহুর্তের মধ্যে কোবরা তার হাত থামিয়ে ফেলে।

‘ওহ্ নো...’ বলে মাথা ঝাঁকায়।
লজ্জিত ভঙ্গিতে বলে, ‘শিহাব ভাই, আ...আপনি?’
শিহাব কোবরাকে চিনতে পারল। প্রায়ই গলির মুখে চায়ের দোকানে আড্ডা  দেয়। মহল্লায় ও কবির নামে পরিচিত। এখানে এসে হয়তো কোবরা নাম লাগিয়েছে। মহাল্লারই ছোট ভাই। শিহাবকে লেখক হিসেবে সম্মান করে। শিহাব ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। কথা বলে না।

কোবরা মাথা নিচু করে বলল, ‘সরি, শিহাব ভাই। সেইম সাইড হইয়া গেছে। কিছু মনে করবেন না। আজকের বিষয়টা আপনার কোনো লেখায় চালাইয়া দিয়েন। বাস্তব কোনো অ্যাকশনে না যাওয়াই ভালো হবে।

অন্যরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শিহাবের দিকে। শিহাব ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। চুমকিও যেন একটু লজ্জা পেয়েছে। সে কোনো কথা বলছে না।

কোবরা চুমকির উদ্দেশ্যে বলল, ‘তোর অ্যাকটিংটা পারফেক্ট হইছে। আজকেরটা মহড়া হিসেবে ধইরা নে। ফাইনাল টেকটা অন্যদিন হবে।’

শিহাবের ঘোর কাটেনি। বকুল গাছটার নিচে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এখনো। কোবরা বলল, ‘সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আসেন আপনাকে শাহবাগ বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।’

‘না-না, কবির। তা আর দরকার হবে না।’ বলেই শিহাব হাঁটতে শুরু করে। উদ্যান থেকে বের হয়ে সে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পত্রিকা অফিসে গেল। ওখানে কাজ সেরে মহল্লায় পৌঁছতে পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে যায়।

বাসায় ঢুকতে চায়ের দোকানে কবির ওরফে কোবরার সঙ্গে আবার দেখা  হয়ে গেল। কোবরা শিহাবকে দেখেই হাসিমুখে সালাম দিল।

শিহাবও হাসি মুখেই সালামের উত্তর দিল। অথচ ইতিপূর্বে উভয়ের মধ্যে যে ভয়ংকর একটি সেইম সাইডের ঘটনা ঘটেছে তা কেউ বুঝতে দিল না। শিহাব নিঃশব্দে বাসার দিকে পা বাড়াল।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে