ক্যাম্পে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ১৪ ১৪২৭,   ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

প্রবন্ধ

ক্যাম্পে

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

 প্রকাশিত: ১৫:৩৮ ১৬ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৫:৩৯ ১৬ আগস্ট ২০২০

ছবি: জিয়া মাহমুদ খান রাতুল

ছবি: জিয়া মাহমুদ খান রাতুল

‘আমার হাতের তালুতে আকাশ
রাতের গভীরে ঢাকা সপ্তর্ষি
কে আমাকে খুঁজে পাবে?’–
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ছোটবেলা থেকেই বনে ও পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে আমার। আদিম মানুষদের মতো। একদম প্রাগৈতিহাসিক আমাজন রেইন ফরেস্টের মতো হবে সেই বন। ঢুকলে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না কোনোদিন। নিবিড় বন-পাহাড়ের ভেতরে পথ হারিয়ে আমি ঘুরতে থাকবো অনন্তকাল। আর পাহাড়গুলো হবে আমাদের বাড়ির উঠোন থেকে দৃশ্যমান দূরদিগন্তের ওপারের গারো পাহাড়ের মতো। নীলাভ।

আমার ইচ্ছের সূত্রপাত একজন বালকের তীব্র ব্যক্তিগত ঔৎসুক্য ও স্বাধীনতার অপ্রতুলতা থেকে। আমাদের বাড়ির কাছেই ঝাড়কাটা নদী। নদী পেরিয়ে মেঠোপথ ধরে নয় মাইল গেলেই মেলান্দহ বাজার রেল স্টেশন। সেখান থেকে লোকাল ট্রেনে করে আট মাইল দূরে জামালপুর শহর। মহকুমা শহর। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। ময়মনসিংহের দিকে। ডিঙি নৌকায় করে আড়াআড়িভাবে ব্রহ্মপুত্র পেরুলেই শেরপুর। শেরপুরের উত্তরে ঝিনাইগাতি থানা। এই থানার শেষ সীমান্ত বাংলাদেশেরও সীমান্ত। এখানেই গারো পাহাড়। বিস্তৃত হয়ে আছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ভেতরে। আমাদের বাড়ির উত্তর দিকের উঠোন থেকে বর্ষাকাল ও শীতকাল ভিন্ন অন্য সকল ঋতুতেই গারো পাহাড়ের গাঢ় নীলাভ রিজলাইন দেখা যায়। মনে হয় খুবই কাছে!। কিন্তু শুধুমাত্র শিশু হবার কারণেই সেখানে যাবার কোনোই স্বাধীনতা নেই আমার।

আবার যেমন, প্রতিদিন আমাকে স্কুলে যেতে হতো। কিন্তু ওই সময়ে আমি ঝাড়কাটা স্কুলের খোলা মাঠের ভেতরে খেলতে, দৌড়াদৌড়ি করতে অথবা ঘুড়ি ওড়াতে পারতাম। কিন্তু সূর্য ডুবে যাবার পূর্বেই আমাকে বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করতে হতো। অতঃপর হারিকেন বাতির কাঁচের চিমনি পরিস্কার করে একান্ত বাধ্যগতের মতো সন্ধ্যার অব্যবহিত পরেই পড়তে বসতে হতো। নৈমিত্তিক। টিমটিমে মৃদু আলোতে। অথচ পৃথিবীর সকল বালকদের মতো আমার অন্তর্গত স্বত্বা ছিলো পরাধীনতার ঘোর বিরোধী। আমার ইচ্ছে করতো গোধূলির আলো মিলিয়ে যাবার পরও খোলা মাঠের ভেতরে শুয়ে থাকতে। তৃণ শয্যায় চিৎ হয়ে সন্ধ্যাতারা, সপ্তর্ষিমণ্ডল অথবা কালপুরুষ অবলোকন করতে। নিদেনপক্ষে উঠোনের প্রায়ান্ধকারে ঘুরে বেড়ানো জোনাকিদের সঙ্গ দিতে। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ শিশুর মতই আমার এই ন্যূনতম মানবিক স্বাধীনতাগুলো ছিল না। সুতরাং রাতের অন্ধকারে পরিবারের সবাই যখন গভীর ঘুমে অচেতন, তীব্র অভিমানে আমি খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতাম। ইচ্ছে হতো সিদ্ধার্থের মত বেরিয়ে যাই। আর কখনোই ফিরে না আসার জন্যে।

এরপর ছয়বছর। বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাবার স্বাধীনতা এসেছে আমার। টাঙ্গাইল থেকে অদূরে মধুপুর গড়ের নিকটবর্তী এক জঙ্গলাকীর্ন স্থানে মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজ নামক আধাসামরিক এক রেসিডেন্সিয়াল বিদ্যাপীঠে আমি ভর্তি হয়েছি, ছয় বছর সময়ের জন্যে। সপ্তম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করার জন্যে। বাড়ির শৃঙ্খলা এখানে নেই, তবে যা আছে তা বাড়িরটার চেয়ে কঠিন। এই বিষয় নিয়ে আমি অন্যত্র লিখব। ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করার পর দুই বছর বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে কঠোর অনুশীলনের পর ১৯৮৫ সালের মে মাসে আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমিশন্ড অফিসার হলাম। এক মুক্ত জীবনের অর্থাৎ জল, স্থল, অন্তরীক্ষ সকল স্থানে যাবার শপথ নিয়ে সেখান হতে বের হলাম। কিন্তু আমার জীবনের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা আসল না। প্রথমে আমি নিয়ন্ত্রিত হতাম পরিবার দ্বারা। তারপর নিয়ন্ত্রিত হতাম বিদ্যাপিঠ দ্বারা। এবং সর্বশেষে নিয়ন্ত্রিত হতে লাগলাম বাংলাদেশের সবচেয়ে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দিয়ে।

১৯৮৮ সাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বসন্তের মাতাল সমীরণে সত্যি সত্যিই বনে যাবার সুযোগ এলো আমার জীবনে। অবিচ্ছিন্ন-নিবিড় বন-পাহাড়ের জীবন কাটানোর। রাজধানী ঢাকার সেনাবাহিনী সদরদপ্তর থেকে বিচ্ছিন্ন করে আমাকে সংযুক্ত করা হল পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জোনের ৯ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সাথে (বর্তমানে বিজিবি ব্যাটালিয়ন)। অনূর্ধ্ব এক বছর সময়কালের জন্যে। আমার আনন্দযাত্রা শুরু হল রাঙ্গামাটি সদর হতে। গভীর নিশীথে। অর্ধ রাত ও পুরো একদিন চাঁদের আলোয়, বনের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে এবং প্রখর সূর্যকিরণের ভেতরে দল বেঁধে পায়ে হেঁটে পেট্রোলিং করে আমার গন্তব্যে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে। গন্তব্য- বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী স্থানে স্থাপিত কাউন্টার ইন্সারজেন্সি অপারেশন ক্যাম্প (সিআইও ক্যাম্প)। ক্যাম্পটির নাম ‘দশরথ’ ক্যাম্প। ‘রামায়ণ’ এ উল্লেখিত রাম, লক্ষণ ও ভরতের পিতা রাজা দশরথের নামে নাম।

দশরথ ক্যাম্প দেখে আমি যুগপৎ ভাবে অবাক ও আনন্দিত হয়েছিলাম। ইউনিট অধিনায়ক মেজর হুমায়ুন ও উপ অধিনায়ক ক্যাপ্টেন সাইফ এর নেতৃত্বে মধ্যরাতের পর থেকে লিঙ্ক পেট্রোল করে পথিমধ্যে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্পের সাময়িক আতিথেয়তা গ্রহণ করতে করতে দুপুরের কিছুক্ষণ পূর্বে আন্দরমানিক নামক ক্যাম্পে পৌঁছলাম। সেখানে লাঞ্চ করে পুনরায় পদব্রজে উঁচু-নিচু সবুজ পাহাড়গুলোকে অতিক্রম করে দশরথ ক্যাম্পে পৌঁছাতেই সূর্য ডুবে গিয়েছিল পাহাড়ের পেছনে। পথিমধ্যেই আমি দেখেছি পাহাড়ের অপরুপ সৌন্দর্য। সমুদ্রের ঢেউয়ের মত পাহাড়ের সারি; দুই সারি পাহাড়ের মধ্য দিয়ে জঙ্গলের বুকে গভীর ক্ষতচিহ্নের মতো বিসর্পিত রেখায় বয়ে যাওয়া ঝর্ণার স্বচ্ছ জল। ঝর্ণার দুপাশ ঘিরে ঘন-বিন্যস্ত ঝোপের ভেতর বুনো ফুলের গন্ধ, মাথা সমান উঁচু এলিফেন্ট গ্রাস (elephant grass)।

আমার ক্যাম্পের উচ্চতা পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ৩০০ ফুটেরও বেশি। পাশাপাশি কয়েকটা উঁচু পাহাড়ের মাথা বা টিলার ওপরে ক্যাম্পটা স্থাপন করা হয়েছে। আমার কুঁড়ে ঘরটা সবচেয়ে উঁচু টিলার ওপরে। এখান থেকে ক্যাম্পের অন্যান্য টিলার ওপরে স্থাপিত লোকেশনগুলো ছাড়াও সমস্ত বিশ্বচরাচর পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। প্রতিটি টিলা পরস্পর সংযুক্ত হয়েছে সেগুলো থেকে আসা রিজলাইন দিয়ে। কেন্দ্রে কোম্পানি সদর দপ্তর। কেন্দ্র থেকে একটা রিজলাইন উত্তরের দিকে প্রবাহিত হয়ে গোলাকৃতি হেলিপ্যাডে গিয়ে মিলেছে। এটা তৈরি করা হয়েছে রেশন সরবরাহ ও ক্যাজুয়ালটি ইভাকুয়েশনের জন্যে।

হ্যালিপ্যাডের চারপাশ ঘিরে থাকা অনেকগুলো পাহাড়। এগুলোর শীর্ষ ছেয়ে আছে রঙ-বেরঙের গাছপালা দিয়ে। আমি প্রতিদিন সকালে সূর্যোদয়ের কিছু পূর্বে এখানে দৌড়িয়ে আসি ব্যায়াম করতে। একাকী। আমার ক্যাম্পের উপ অধিনায়ক একজন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার। তিনি আমাকে বেশ কয়েকবার আমাকে নিষেধ করেছেন একাকী এতদূরে না আসার জন্য। নিরাপত্তাজনিত কারণে। বলেছেন, ‘স্যার, আপনি দৌড়াতে গেলে আপনার রানার ও আরো দুই তিন জনকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন, অস্ত্রসহ’। কিন্তু সকালের এই সময়টাতে আমার একাকী হাঁটতেই ভালো লাগে। সকালের নরম আলোতে আমি হেলিপ্যাডের কেন্দ্রে যেয়ে দাঁড়াই। চারপাশের গাছ-গাছালির মাথা থাকে আমার পায়ের নীচে। সেগুলোর শীর্ষ রঙিন হয়ে থাকে হাজারো বুনো ফুলের ছড়াছড়িতে। মনে হয় ফুলরুপী এক নক্ষত্রের বাগানে আমি যিশু খ্রিস্টের মত দাঁড়িয়ে আছি, সপ্তম আসমানে। কিছুক্ষণ পর পূবদিকের রিজলাইনকে অপরূপ সোনালী আভায় রাঙিয়ে দিয়ে উদীয়মান হয় দিবাকর। হলুদ নরম আলোয় ভরে যায় চারদিক। প্রতিটা মুহূর্তকে তখন মনে হয় প্রাচীন স্ফটিকের মত। উজ্জ্বল–মনোহর!

ক্যাম্প থেকে তিন লাইন পরস্পরের সমান্তরাল পাহাড়ের ওপারে উঁচু নীলাভ একটা পাহাড়ের গা-ঘেঁষে একটা ভারতীয় শহর। এই বিশাল চরাচরের মধ্যে ওই শহরেই শুধুমাত্র বিদ্যুতের অস্তিত্ব আছে। বোঝা যায় শুধুমাত্র সূর্যাস্তের পর। রাতের অন্ধকারে মনে হয় হাজার হাজার জোনাকিরা খেলছে। ছোটবেলার অন্ধকার মাঠের ওপরে জোনাকির মেলার মত। প্রতিদিন সকালে সূর্য বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এই শহরটা কুয়াশার মত অস্পষ্ট হয়ে যায়। তখন পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় এর ওপরের পিচের রাস্তাটিকে। পারদের আঁকাবাঁকা স্রোত নিয়ে সেটা যেন ছুটে চলেছে ক্ষুধার্ত কোনো অজগরের মতো। অনির্দেশ্য কোন গন্তব্যের পানে। যেন মুখ থেকে ছিটকে পালিয়ে যাওয়া শিকারের সন্ধানেই এই অভিযান।

আমার ক্যাম্পের তলায় পূর্বদিকে ঝর্ণা সৃষ্ট একটা জলাভূমি। স্বচ্ছ জল। এই জলাভূমির হাঁটুজলের ভেতরে বন্য কচুর গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাম্পের ওপর থেকে এগুলোর ওপরে জমে থাকা জলের উপরে সূর্যকিরণ পড়ে ঝিকমিক করতে থাকে। দুষ্প্রাপ্য কোনো স্ফটিক বা মুক্তার মত। জল পেরিয়ে সামনে গেলেই কয়েকটি ছোট ছোট পাহাড়। এগুলোর মাথা ঢেকে আছে ছেদহীন অরণ্যে। এই বিশাল অরন্যে বসবাস করে চিতাবাঘ, চিত্রল হরিন, শম্বর হরিন অথবা নীলগাই।

প্রতিদিন দুপুরের কিছু পূর্বে আমাকে স্নান করতে নামতে হয় ক্যাম্পের নিচের ঝর্ণাতে। এই ঝর্ণাটি প্রবাহিত হয়ে এসেছে আমার ক্যাম্পের শীর্ষের অদৃশ্য কোনো উৎস হতে। উপর থেকে বোঝা যায় না যে, এখানে কোন ঝর্ণা আছে। তবে পাহাড়ের গা বেঁয়ে প্রায় ১০০ ফুট নিচে নামলেই বোঝা যায় এর অস্তিত্ব। এখানে প্রবাহটা দিকেই প্রবল। বৃষ্টির মত অবিরাম জল পড়তে থাকে। এই ঝর্ণার জলেই আমি প্রতিনিয়ত অবগাহন করি।

ঝর্ণার ঠিক উলটোদিকের পাহাড়ের পাদদেশে একটা কালো রঙের অতিকায় চিতাবাঘ (প্যান্থার) সকাল-বিকেল বিচরণ করে। এর কারণে আমাদের জল সংগ্রহ অথবা স্নান করার জন্যে দল বেঁধে নিচে নামতে হয়। সশস্ত্র এস্কর্ট নিয়ে। আমার ক্যাম্প ও সামনের পাহাড়ের মাঝখানে জলাভূমিটি একটি জলজ ‘ডেড গ্রাউনড’ সৃষ্টি করেছে। আমার অস্ত্র প্রশিক্ষণের শিক্ষা অনুযায়ী এ ধরণের ভূমির উপস্থিতি দূরত্ব সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করে থাকে। ফলে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী দূরত্বকে প্রকৃত দূরত্বের চেয়ে কম মনে হয়। বিষয়টি আমি প্রথম বুঝতে পারি চিতাবাঘটিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ার পর। আমাদের প্রতিটা গুলিই সামনের জলাভূমির স্বচ্ছ জলের ভেতরে পতিত হয়ে সামান্য বুদ্বুদ সৃষ্টি করে মিলিয়ে যাচ্ছিল। কখনোই প্যান্থারের ধার-পাশ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছিল না। এমনকি আমাদের গুলির বিপরীতে চিতাবাঘটি কোনো প্রতিক্রিয়াই প্রদর্শন করছিল না। শুধু মাঝে-মধ্যে অবজ্ঞা ভরে আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকাচ্ছিল। হয়ত বা আমাদের করা গুলির শব্দগুলোকে তার কাছে মনে হচ্ছিল বন-পাহাড়ের কিছু আনুষঙ্গিক শব্দ হিসেবে। আমাদের নিক্ষিপ্ত গুলির শব্দ পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে আমাদের কাছেই ফিরে আসছিল। দুই-একবার প্যান্থারটাকে শিকার করার জন্য পেট্রোল নিয়ে বের হয়েছিলাম। কিন্তু জলাভূমি অতিক্রম করে ওটার ধারে কাছে পৌঁছানোর আগেই ওটা তালেবান জঙ্গিদের মত প্রতিবারই গহীন অরন্যের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। আবার কোন নিরাপদ মুহূর্তে পুনঃ প্রত্যাবর্তনের জন্য!

প্রায় প্রতিরাতেই আমরা পেট্রোল নিয়ে ক্যাম্প থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে যেতাম। আমাদের পথের দু’ধারের শালবন, জংলী কলারগাছ এবং এলিফেন্ট গ্রাসগুলো কাঁপতে থাকত। রাতের প্রায়ান্ধকারে অথবা জ্যোৎস্নার আলোতে এদেরকে অলীক মনে হত। মনে হত অন্য কোন পৃথিবীর। আমাদের চেনাশুনার বাইরের। আমাদের টহল দলের পথের পাশেই অন্ধকারে বুনো হরিণগুলো আমলকী গাছের নিচে সারারাত ধরে আমলকী খেত। আমরা পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময়ে মাঝে মধ্যে মাথা তুলে আমাদের দিকে তাকাত। অন্ধকারের ভেতরেও তাদের চোখগুলো জ্বলজ্বল করতে থাকত। তবে বেশির ভাগ সময়েই ভ্রুক্ষেপ করত না আমাদের উপস্থিতিকে। সম্ভবত এটা তাদের পৃথিবী বলেই।

এই এলাকায় একটু পর পর ঝর্ণা পার হতে হয়। ছোট ছোট ঝর্ণা। সবাই ডাকে ছরা বলে। তির তির করে স্বচ্ছ জল বয়ে যায় এদের ভেতর দিয়ে। জলের পরিমাণ খুবই কম। হাটুঁ পর্যন্তও ডুবে না। হেঁটেই পার হওয়া যায়। কিন্তু বৃষ্টি বাদলের দিনে এই ছরা গুলোই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। তখন এর প্রবল স্রোতকে এড়িয়ে সাঁতার কেটেও পার হওয়া অসম্ভব। ঘণ্টায় বিশ ত্রিশ মাইল বেগে দুর্দান্ত স্রোতে প্রবল শব্দ করে জল নেমে আসতে থাকে তখন ছরাগুলোর ভেতর দিয়ে। অনেকটা স্বপ্ন থেকে হঠাৎ-জাগা নির্ঝরের বজ্র-গর্জনের মত। ঝর্ণার স্বপ্নভঙ্গের কলরোল তখন মাইল মাইল দূর থেকেও কানে আসত। পাখির কলরবের মতো।

মাঝে মধ্যে রাতে প্রবল চাঁদ উঠত। অর্ধতন্দ্রায়, অথবা পরিপূর্ণ স্বপ্নের মধ্যেই আমি এবং ক্যাম্পের অন্য সবাই দেখত যে, চাঁদের আলোয়, জল-কল্লোলে আর বনের মর্মরে সমস্ত পৃথিবীটাই অবাস্তব হয়ে গেছে। আমরা কেউই অবাক হতাম না। গাভীর পেট থেকে সদ্য বের হওয়া বাছুরের মত আমরা সবাই জানতাম যে, এমন আশ্চর্য পটভূমিতে সবই সম্ভব ও স্বাভাবিক। সেই সময়ে পাশের পাহাড় থেকে কানে ভেসে আসত হরিনের মিষ্টি ডাক অথবা বিরহের আর্তনাদ। এমন অপরূপ বন-জ্যোৎস্নায় হরিণ সম্ভবত তার হরিণীকেই সন্ধান করে ফিরত। যেমন করে আমরা পুরো দেশবাসী নিরন্তর খুঁজে ফিরি হিংসা–হানাহানি মুক্ত এক স্বদেশভূমি!

‘এখানে বনের কাছে ক্যাম্প আমি ফেলিয়াছি;
সারারাত দখিনা বাতাসে
আকাশের চাঁদের আলোয়
এক ঘাইহরিণীর ডাক শুনি—
কাহারে সে ডাকে!’
জীবনানন্দ দাশ

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর