হৃদয়পিতা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ১৪ ১৪২৭,   ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বঙ্গবন্ধুর জন্য কবিতা

হৃদয়পিতা

চন্দন চৌধুরী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৪ ১৫ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৭:০৩ ১৫ আগস্ট ২০২০

প্রতিকৃতি: আনিস মামুন

প্রতিকৃতি: আনিস মামুন

একটি মাটির প্রদীপ জ্বেলে তুমি সমস্ত জীবন প্রতীক্ষা করেছ; নিজের ভেতর থেকে গোপন পরাগ খুলে রাঙাতে চেয়েছ বাংলার বাগান - কারো চুলে গোঁজা ফুল, কারো জমিয়ে রাখা হাসি - তাও কুড়িয়ে এনেছ আমার অরণ্যে-

যারা ঢেউয়ের মতো দুঃখ বাজায়, সামান্য আঘাতে ছেড়ে যায় লোকালয়, তাদের জায়গা দিয়েছ তোমার গোপন চত্বরে - ভালোবাসার এমনই বাঁধন, ঘর পুড়লেও থাকে সম্পর্কেও দাবি - শুধু এই দাাবিতেই আমি তোমার কাছে যাই - বন্ধু, তুমিই যে আমার বৃক্ষবিতান, ছায়াপ্রাণ


যেখানে বন্ধন বলতে ছিল শুধু রক্তের লেবাস, ছিল বংশপিপাসার গান - তুমি এই মিষ্টিমধুর উপহাসকে দূরে রেখে, ধূসরের জয়কে পেছনে ফেলে শেখালে আত্মার উড়াল; বুঝালে, যত ঢেউই থাকুক, নদীরা ঘুঙুর পরে কখনো হাঁটে না - প্রেম থাকে জ্ঞানের গভীরে, দেশমাতৃকায়...

যারা এতদিন ধরেছিল ময়ূরপুচ্ছের বেশ, কাকজোছনায় দেখছিল শূন্য প্রতিচ্ছবি, তারা এবার পেল আলোর স্ফটিক - ঘুমন্ত পাথর থেকে বের করে আনল মোমের আগুন...

বন্ধু, তুমিই জানো, কী করে মানুষকে দিতে হয় তার নিজের আশ্রয়


আমার ধারণা ছিল - মানুষ শুধু নিজের জন্য কাঁদে আর ঈশ্বর কাঁদে সবার জন্য; তুমি রাখলে না কোনো বিকল্প প্রস্তাব - বুঝালে একটা বিহঙ্গ সকল আকাশে উড়ে তবু তার ঘর থাকে বৃক্ষডালে - আমি আড়াআড়ি সম্পর্কের এসব জটিলতা বুঝি না, শুধু বুঝি দৃশ্যের প্রতাপ - যা দেখি তা-ই সত্য -

এই সত্য প্রতিষ্ঠায় তুমি মানুষের কাছে গেলে, বুঝালে, মানুষ কাঁদে মানুষের জন্য আর ঈশ্বর কাঁদে নিজের জন্য


আমি আমাকে জানি, যতটা জানি সাদা উঠোনের গল্প, ধুলোওড়া বিকেলের মায়াবি আলোয় কীভাবে দেখতে হয় দিবসের শেষ- এও আমার জানা; কেননা আমার দৃষ্টি এখনো মাখেনি কাজল, চেনেনি দূরের গ্রাম - বাতাবিনেবুর ঝাড় থেকে এখনো বেরিয়ে যায়নি কোথাও কোনো দূরে জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়- আমার দৃষ্টি যখন এতটা বদ্ধ, তুমি ছিন্ন করলে ব্রতচারীর দিন - তুমি বুঝালে কীভাবে বেরিয়ে আসতে হয় বিক্ষত সন্ধ্যা থেকে

আর তখনই আমি খুব খুব অনুভব করলাম - আমার আত্মায় বাংলার গন্ধ, হৃদয়বেদীতে জ্বলছে তোমার মতো সূর্যের আহ্নিক


কেউ কোরান তেলওয়াত শেষে দেখতে যায় স্বপ্নগাছের ডালে তখনও কতটা লেগে আছে কুয়াশার রেণু; কেউ জায়নামাজ থেকে উঠেই মুখ রাখে নিজের সোনার বাটিতে - দেখেছি, কোনো মা গীতা পাঠ শেষে তুলশীতলার অন্ধকার খুঁড়ে বের করতে চাইছেন অধিষ্ঠাত্রী দেবীর আঁচল - এইসব হৃদয়যন্ত্রণা, স্বপ্নজাল কিছুই ছিল না তোমার

তোমার গাঙচিল মন খুঁজেছে শুধু নদীর নির্যাস, প্রাচীন কবির পদ বেয়ে আসা সবুজ সুন্দর এক বাংলার গান


বন্ধু, দূর পাহাড়ের মাথায় চুমু খাচ্ছে দ্যাখো নীল পোশাকের আকাশ। আমি সহজ আয়েশে তাকে আনতে চাই এই দরগাতলায়, ফলমূল দিয়ে তাকে ঢেলে সাজাতে চাই হৃদয়াত্মায় - অথচ আমি মুখচোরা, বলতে পারছি না কিছুই - জ্যোৎস্নার মতো মুখ লুকিয়ে দেখাচ্ছি শিল্পের সাহস, কখনো ফুটাচ্ছি ক্রিসেনথিমাম, কখনো শ্বেতপদ্ম - কিন্তু চাই তোমার মতো স্থির নিখুঁত চোখ, ধীরদৃষ্টির ঢেউ... 

তুমি আমার ভেতর ঢুকে জ্বেলে দাও প্রার্থনার পিলসুজ


নিরব ঈশ্বর আমাকে দিয়ে লিখিয়েছেন পুষ্পময় পৃথিবীর গান, অথচ আমি জানি আমার মগ্নতায় বাস করে হিজল জারুল - আমার রাতের বাতাসে ডানা মেলে লক্ষ্মীপেঁচা, ব্যাকুল বাদুড় - আমি জানি না আমার হৃদয়ের রঙ এত গাঢ় কেন! জানি না নদীতে চোখ রাখলে আমার মধ্যে কেন নীড় বাঁধে বালিহাঁসের দিন - সিম্ফনির সুরে আমি কেন শুনি ভাটিয়ালী

বন্ধু, আমার অসুখের ভার পুরোটা তোমার


পানকৌড়ির বুকে কান রেখে আমি আমার বাদ্যই শুনেছি - বুঝেছি জীবনদোলক ঘুরছে, আবেগ ছড়াচ্ছে আন্দোলনে, চোখ চলে যাচ্ছে অরণ্যের দিকে - আমার ঘুম, দীর্ঘ অবসাদ, অতিরিক্ত তর্ক, আহত আকাক্সক্ষার আলো সব নিয়ে ঘুরছে ঋতুর পাখিরা; আমার গতির প্রবাহ থেকে ক্রমশ বেরিয়ে যাচ্ছে ক্লান্তির নুন। একাত্তরের আগে এইসব ছিল আমার নিরব যৌবন- আর তোমার নৌকার বৈঠার শব্দ ছাড়া আমি কিছুই শুনিনি


বাসনার বুকচেরা লাল, আহত ড্রেজার দু’চোখে দিয়েছে ধাঁধা। বারবার হেরে যাওয়া বাস্তবের কাছে বাংলা যেন ছিল কোনো নীচু ডাল - যার ফুল ফল পাড়া যেত খুব সহজেই, অল্প প্রলোভনেই নেয়া যেত তার ছায়ার দখল - আমার আহত পেশীতে তখন টান লেগে গেছে - বাংলার নাভির ফুল নিয়ে বুকের গঠন সাজাচ্ছে অন্য কেউ - ঠিক তখন তুমি দেখালে দারুণ আক্রোশ - এক সূর্যসুধাদিনে বুঝালে আঙুলের সরল উপমা -

৭ মার্চ থেকে বয়ে চলল বাংলার আয়ুর নদী

১০
জলভাত খেয়ে গেয়েছি শস্যের গান - মেঠোপথে হেঁটে ফোস্কাপরা পায়ের বেদনা খুব সওয়া যেত - ফুলতোলা রুমালে থরথর কাঁপত গোপন সোহাগ - এইসব খুব ছিল আয়েশের দিন - যেন পরাগমাখা ভোর, স্পর্শের সুদূর - শিল্পের সজ্জায় রয়ে গেছে গল্পের শিয়রে -

বন্ধু, একসাথে খাব বলে দু’জনার ভাত রেখেছি মাটির শানকি ভরে...

১১
আমি আমার বক্ষদেশ খুলে দেখেছি শুধু গোপন বিষাদ, ভ‚ভাগের চিহ্ন লেগে আছে নিভৃতের ভাঁজে; সেখানে জীবন যেন আওলানো শাড়ি, কোথাও কুচকানো, কোথাও সাদাসিধে -

বুকের ভেতর অদ্ভুত বনচারী, ঝোপের মায়াবি মাখামাখি করছে আবেগের বন - তার প্রলোভনে আমি আদিম মন্দির থেকে কখন বেরিয়ে এসেছি, কখন হাতে তুলে নিয়েছি রাজদণ্ড, বিস্ময়ের ভার - আমাকে গান শুনিয়ে যাচ্ছে বাংলা, সানাই তোমার

১২
আমাদের ছিল না কোনো জলের স্বভাবী ধর্ম - আমাদের মুখে ছিল বন্য পানলতার গন্ধ, আমাদের স্বপ্নে ছিল অসাধ্য সাধন, আমাদের আকাক্সক্ষা ছিল জীবনের ঢেউগুলোকে অবাক রঙিন করা; আমাদের শরম ছিল চুম্বনের দাগে - আমাদের আনন্দ ছিল সুগন্ধি পরাগে - আমাদের ভাবনা আলাদা ছিল - আমাদের তৃষ্ণা, গান, সন্তানের দাবি, তাও আলাদা ছিল; আলাদা ছিল না শুধু ধর্ম -

আমাদের ধর্মের নাম বাংলা

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর