আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি 

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ১৪ ১৪২৭,   ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি 

কামরুন মুন্নি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৩ ৯ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৬:০৯ ৯ আগস্ট ২০২০

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

এ কথা অনস্বীকার্য যে বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃতে অবদান আছে অনেকের তথাপি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেকে অনন্য মাত্রার এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সূচনা হয়েছিল দত্ত কুলোদ্ভব কবি, মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাত ধরেই। বাংলা সাহিত্যে প্রথম মহাকাব্য ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’র হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় বাংলা মহাকাব্যর।

প্রহসনমূলক নাটক রচনা করে বাংলা নাটকে সংযোজন করেন আরেক নতুন মাত্রা। প্রবর্তন করেন অমিত্রাক্ষর ছন্দের- উন্মোচন করেন বাংলা সাহিত্যের নতুন এক দুয়ার আর আমরা পাই ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের স্বাদ। এছাড়াও বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করান নতুন এক কাব্যধারার যার নামকরণ করেন ‘চতুর্দশপদী’। ইংরেজিতে সনেট। ষোড়শ শতাব্দীতে সনেটের প্রয়োগ দেখা যায়, যার মূল বিষয় ছিল নারীর প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু মধুসূদন রচিত চতুর্দশপদী কাব্যে আমরা দেখি ভূত ভবিষ্যতের মাঝে বিরাজমান চিত্তের আকুলতা কখনো মা ও মাটির প্রতি ব্যকুলতা কখনোবা আত্মার উপলব্ধ অনুভূতির বিবিধ দর্শন।     

১৮২৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি যশোরের সাগরদাঁড়ির দত্ত পরিবারে মধুসূদন দত্তের জন্ম। দানে দাক্ষিণ্যে দত্ত বাড়ির সুনাম পুরো যশোরে প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং উত্তরাধিকারসূত্রে মধুসূদন দত্তের স্বভাবেও এর প্রভাব কম ছিল না। একইভাবে কবিতার প্রতি ভালোবাসা এবং জ্ঞান অর্জনের প্রবল আকাঙ্ক্ষাও অনেকাংশে উত্তরাধিকার সূত্রেই পাওয়া।

মধুসূদন দত্তের ছোট ঠাকুরদা, মানিকরাম দত্ত ছিলেন পার্সি ভাষায় অতি পারদর্শী এবং কবিতানুরাগি এক ব্যাক্তি। যে মুসলামান জমিদারের অধীনে মানিকরাম কাজ করতেন সেখানে রোজ পার্সি ভাষায় রচিত একটি করে কবিতা শুনাতে হতো জমিদারমশাইকে। মধুসূদন দত্তের জ্যাঠামশাই  রাধামোহন দত্ত ও  ছিলেন একাধিক ভাষায় পারদর্শী এবং কবিতানুরাগি এক মানুষ। তৃতীয় জ্যাঠামশাই দেবিপ্রসাদ ছিলেন স্বভাব কবি, কথিত আছে তিনি সবার সঙ্গে কথার ছলেই কবিতা রচনা করতেন। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত নিজেও ছিলেন কবিতা, সঙ্গীত এবং শিল্পের প্রতি বিশেষ অনুরাগী এবং পার্সি ভাষায় তার বিশেষ পারদর্শিতার কারণে তাকে মুন্সি উপাধি দেয়া হয়।  এছাড়াও পিতার সংগ্রহও ছিল প্রচুর যা ছোটবেলা থেকেই মধুসূদনের মননশীলতা এবং চিন্তার বিকাশে বিশেষ প্রভাব পালন করেছে। ঐশ্বর্যশালী পিতার একমাত্র সন্তান হিসেবে মধুসূদন উচ্চাভিলাষী ছিলেন কেবলি বিদ্যার্জনে আর একটা বিষয়ে তার প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা ছিল শ্রেষ্ঠ হবার, তা ছিল কবিতা। মধুসূদন চেয়েছিলেন বড় কবি হবেন, শ্রেষ্ঠ কবি হবেন। শারীরিক অসুস্থতা, দারিদ্রতা, পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক কটূক্তি যা কিছু মানুষের জীবনে কর্মের এবং সাধনার অন্তরায় তার সকল কিছুই মধুসূদনকে দিনের পর দিন ভুগিয়েছে তবু লক্ষ্য বিচ্যুত করতে পারেনি। সমস্ত অশান্তি আর অসুখের আশ্রয় হিসেবে সে বেছে নিয়েছিল তার কবিতার প্রতি অনুরাগকে আর জ্ঞানঅর্জনস্পৃহাকেই।  

যদিও সাগরদাঁড়িতে তার জীবনের সামান্য সময়ই পার করেছেন তবু সেই জীবনের ছাপ তার পরবর্তী জীবনেও ফুটে উঠেছে। তার ইচ্ছে ছিল কপোতাক্ষের তীরে একটি উদ্যান তৈরি করে সেখানে শিশুদের জন্য একটা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে শিশুরা পাবে জীর্ণ, ক্ষয়িষ্ণু সমাজের বিপরীতে জ্ঞানের সত্যরূপ। তার সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে চিঠিতে, ভ্রমণে বার বার তার শৈশবের সেরূপকে তিনি স্মরণ করেছেন। মধুসূদনকে বুঝতে হলে, জানতে হলে তার শৈশব থেকে শুরু করে তৎকালীন সময়কেও জানতে বুঝতে হবে। শুধুমাত্র সাহিত্যক মধুসূদনকে জানা সম্ভব হলেও অজানা থেকে যায় আরও অনেক কিছু। মধুসূদন এমনই এক মহাকাব্যর নাম যা বুঝতে হলে ডুব দিতে হবে অনুভূতির আরো গভীরে, তবেই ধীর লয়ে উঠে আসবে প্রেম এবং বিদ্রোহের এক মহৎ রূপ। 

প্রথমেই যেমন বলা হয়েছে, কাব্যচর্চার সঙ্গে পরিচয় তার সেই শৈশব থেকেই। মায়ের কাছ থেকে, শিক্ষকের কাছ থেকে রামায়ণসহ সংস্কৃত আর পার্সিভাষায় যত কবিতা শুনতেন নিজে নিজেই পরে তা আওড়াতেন আর ভুলে গেলে নিজেই দু’লাইন জুড়ে দিতেন। স্কুলের অন্যান্য সঙ্গীদের শুনাতেন নিজের কল্পনায় বানানো সব গল্প আর বলতেন ‘অমুকের কাছ থেকে শুনেছি’। বয়স যখন প্রায় বারো বা তের তখন পিতা সিদ্ধান্ত নেন মধুসূদনকে কলকাতায় হিন্দু কলেজে পরবর্তী শিক্ষার জন্য প্রেরণ করা হবে। তৎকালীন সময়ে এই কলেজেরই শিক্ষক ডিরোজিওর একটা শিক্ষা-প্রভাব তৈরি হয় তরুণদের মধ্যে। প্রায় একই সময়ে এসে উপস্থিত হন কিশোর মধুসূদন যদিও তার কিছু আগেই ডিরোজিও কলেজ ত্যাগ করেন তবুও পাশ্চাত্য দর্শন আর সাহিত্যের যে বলয় তৈরি হয়েছিল তা রয়ে গেছে অটুট। শিক্ষক হিসেবে মধুসূদন পেয়েছিলেন লেসটার রিচার্ডসনকে। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যক্ষ। এই মানুষটির কারনেই রোম্যান্টিক পোয়েট্রির সাথে পরিচিত হন আর পরবর্তীতে বায়রন, মিল্টন, হোমার এদের নেশাতেই বুঁদ হয়ে রইলেন কবি। বলা হয়ে থাকে যে বায়রন ছিলেন মধুসূদনের স্বপ্নের কবি।

এছাড়াও কলেজের প্রত্যেক শ্রেণিতেই অসামান্য ফলাফলের অধিকারী মধুসূদন সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে কলেজের সর্বোচ্চ শ্রেণিতে পা রাখেন। কলেজে থাকাকালীন সময়েই ‘বহুগ্রন্থপাঠী’ হিসেবে তার নাম প্রচলিত ছিল একই সঙ্গে উৎকৃষ্ট ইংরেজি লেখিয়ে ছাত্র এবং কবি হিসেবেও সমান পরিচিত ছিলেন। আর এসবের পেছনে ছিল মধুসূদনের একাগ্র প্রেম- কবিতার প্রতি, কবি হওয়ার প্রতি। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি ইংল্যান্ডের প্রসিদ্ধ ‘ব্ল্যাকউড’স ম্যাগজিন’-এ কিছু কবিতা পাঠান এবং  কবিতাগুলো উৎসর্গ করেন আরেক মহানকবি ওয়ার্ডস ওয়ার্থকে। সে কবিতা আদৌ প্রকাশিত হয়েছিল কিনা সে সম্পর্কে কিছু না জানা গেলেও এটুকু অনুমান করা যায় যে, কবিতার প্রতি কিরুপ উচ্চাভিলাষ থাকলে মাত্র আঠারো বছর বয়সের এক বালকের পক্ষে সে সময়ে এ কাজ করা সম্ভব! প্রাপ্ত বয়সে এসে মিল্টনকেই তার আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করলেও টমাস মুর রচিত বায়রনের জীবন চরিত ছিল ছাত্রাবস্থায় মধুসূদনের প্রিয় গ্রন্থ। কবিতায়ও তিনি অনুসরন করতেন বায়রনকেই। তাই হয়তো দুজনের জীবনে কিছু বিষয়ে মিলে যায়।

প্রেমের নামে অকাতরে বিলিয়েছেন কিন্তু পরিতৃপ্তি পান নি। এই দুই লেখকের লেখায়ই ফুটে উঠেছে অতৃপ্ত হৃদয়ের আর্তনাদ। সতের বছর বয়সে মধুসূদনের লেখা কবিতা যেনো কবির নিজে জীবনেরই প্রতিফলন। ‘I’ve naught but grief for me/ My life a wilderness appear/ Overgrown with misery’ (খিদিরপুর, ২৮শে মার্চ, ১৮৪১)। মধুসূদন সবসময় মনে করতেন ইংল্যান্ড হচ্ছে কবি প্রসবিনী এবং এই মনে হওয়ার পেছনের কারণ ছিল তার প্রিয় শেক্সপিয়র, মিল্টন এবং বায়রনের জন্মভূমি ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের প্রতি তাই তার অনুরাগও ছিল প্রবল এবং এই অনুরাগের পেছনে সমস্ত আবেগ মূলত কবিতাকেই কেন্দ্র করে। বড় কবির দেশেই কেবল আরকেজন বড় কবি হতে পারে এই সূত্রেই ইংল্যান্ড ছিল কবির কাছে তীর্থভূমি যার জন্য উন্মুখ ছিলেন মধুসূদন। তাই বলে নিজের জন্মভুমির প্রতি বীতরাগ ছিলেন না কখনোই। তবে হিন্দু ধর্মের কিছু রীতিনীতি মধুসূদনের অপছন্দের ছিলো। যেমন, নাবালিকা বিয়ের রীতি তাই পিতা রাজনারায়ণ দত্ত যখন পুত্রকে ঘরে টানার জন্য ‘বিয়ে’ নামক অস্ত্রের প্রয়োগের চেষ্টা করেন কবি এতে করে আরও দূরে সরে যেতে থাকেন- নিজের পরিবার, বন্ধু, ধর্ম, দেশ সকলের কাছ থেকেই। পরিবার, ধর্ম, দেশ থেকে মধুসূদনের দূরে সরে যাওয়াটা সকলেই দেখছে কিন্ত শুধুমাত্র কবি হওয়ার জন্য মধুসূদনের যে ত্যাগ, কষ্ট এবং বিদ্রোহ তা উপলব্ধি করেছে গুটিকয়েক ব্যক্তি। তন্মধ্যে এই অসম্ভব প্রতিভাবান ব্যক্তিটির বিশেষ গুণগ্রাহী ছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যিনি বিলেতে মধুসূদনের ব্যরিস্টারি পড়ার সময়ে চরম দুর্দশায় বারবার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।  এখানে একটা বিষয় উল্লেখ্য যে মধুসূদন দত্ত যদিও কবি হিসেবে পরিচিত তথাপি তিনি যে তৎকালীন বঙ্গসমাজের একজন উৎকৃষ্টমানের বহুভাষাবিদ ছিলেন তা অনেকেরই অজানা। বাংলা তো বটেই ইংরেজিও তার কাছে ছিল মাতৃভাষার মতন; পাশাপাশি ল্যাটিন, গ্রিক, ফ্রেঞ্চ, জার্মান এবং ইটালিয় ভাষায়ও তিনি সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন। ফ্রেঞ্চ এবং ইটালিয়ান ভাষায় তার কিছু কাব্যচর্চারও নিদর্শন পাওয়া যায়। এছাড়া সংস্কৃতি, পার্সি, হিব্রু, তেলেগু, তামিল এবং হিন্দি ভাষাতেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। বাস্তবিকই একজন ব্যক্তির মাঝে সাহিত্য এবং ভাষাশিক্ষার এরুপ অসাধারণ শক্তি দুর্লভ। 

স্বভাবত দুর্বোধ্য অথচ একাধারে যেমন প্রেমপ্রবণ তেমনি স্নেহার্দ্র হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন যা সহজে দৃষ্টিগোচর হয় না। তারই এক সহপাঠী ‘Travels of Hindu’ নামক গ্রন্থের রচয়িতা বাবু ভোলানাথ চন্দ্র তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন- ‘Modhu fully justified his name-he was all মধু- all that endeared one to another’ কারণ বহুদিন দেখা গেছে, পথের পাশে কোনো শিশুকে, দারিদ্র্যপীড়িত কোন ব্যাক্তি অথবা সহপাঠীদের মধ্যে কারো আর্থিক অবস্থা খারাপ, এসকল ক্ষেত্রেই মধুসূদন তৎপর ছিলেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন সর্বদা। তার এক সহপাঠী ভুদেব মুখোপাধ্যায় যখন টাকার অভাবে কলেজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছিলেন তখন মধুসূদন বন্ধুর কলেজ-শিক্ষার সকল ব্যয় বহন করে চলেছিলেন। একই কাজ করেছেন বিলেত থেকে ফিরে এসে ওকালতির পেশায়ও। মধু শুধু খরচে নয় দানেও ছিলেন অকাতর। 

আগাগোড়া রহস্যয় মোড়ানো এই মানুষটা কখনোই নিজেকে কারো কাছে প্রকাশ করেননি, শুধুমাত্র কবিতার কাছেই সঁপেছিলেন নিজেকে। ফলত তার অন্যান্য কাজের মতন খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ারও কোনো  অভ্রান্ত উত্তর কারো কাছে নেই আর কবি নিজেও কখনো এ সম্পর্কে কোন কারণ ব্যাখ্যা করেননি। তাই নিজেদের কল্পনার উপর নির্ভর করে অনেকের তৈরি করা গল্পগুলো মধুসূদনের সঙ্গে কখনোই মেলে না। যদিও ধর্মীয় পরিচয়ের এ পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে কবির যাত্রাটা কখনোই মসৃণ ছিলো না বরং হয়ে উঠেছিল আরও কণ্টকময় তা কেবলি সমকালীন সমাজ এবং ব্যক্তি চিন্তার সংকীর্ণতার কারনেই। আমৃত্যু এমনকি মৃত্যুর পরও সেইসকল সংকীর্ণতার ভেতর দিয়েই মধুসূদনের পরিচয়কে বহন করে আসতে হয়েছে। তবে ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুরাগে যে মধুসূদন খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন নি তা বোঝা যায় যখন খরচ বহন না করতে পেরে মধুসূদন কলেজ ছেড়ে দেন। কারণ ভবিষ্যতে চার্চের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করবে এমন চুক্তি হলে বিশপ কলেজের খরচ মউকুফ করে দেয়া হতো কিন্তু মধুসদন তো সেই পথের পথিক নয়। কবি হওয়ার সংগ্রাম যার রক্তে খেলা করে সে কি করে এই চুক্তিতে আবদ্ধ হবে! যদিও খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণের ফলে এরইমধ্যে তাকে ছেড়ে দিতে হয়েছে হিন্দু কলেজ। তার এই কোমল অথচ প্রবল বিদ্রোহী মনকে মাতা জাহ্নবী দেবী ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারেনি সেজন্য স্ত্রীর অনুরোধে বেশকিছুদিন রাজনারায়ণ দত্ত ছেলের খরচ বহন করলেও ছেলের ফিরে আসার কোনো লক্ষণ না দেখে পরবর্তীতে খরচ পাঠানো বন্ধ করে দেন। তবু মধুসূদন নিজের সংগ্রামে অটুট থেকেছেন। এবার বিশপ কলেজ ছেড়ে দিয়ে রোজগারের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান মাদ্রাজ। মাদ্রাজের অরফ্যান এস্যাইলাম স্কুলে শুরু করলেন শিক্ষকতা পাশাপাশি মাদ্রাজের প্রধান সংবাদপত্রগুলিতে নিয়মিত প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন পরবর্তীতে ইংরেজি এবং ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়েও। মাদ্রাজে অল্প দিনেই ছড়িয়ে পরল তার লেখনীর সুখ্যাতি এবং এসময়েই তিনি রচনা করেন ক্যাপটিভ লেডি। মাদ্রাজে ক্যাপটিভ লেডি প্রশংসা কুড়ালেও কলকাতায় এবং নিজ ভাষাভাষীর কাছে কুড়ালো উপেক্ষা। এ সম্পর্কে বেঙ্গল হরকরা পত্রিকা আর বেথুন সাহেবের অভিমতে মধুসূদন কষ্ট পেলেও পরবর্তীতে ফায়দাটা হয়েছে বাংলা সাহিত্যেরই।

মাদ্রাজে থাকাকালীন সময়েই মধুসূদন মায়ের মৃত্যু সংবাদ পান, যেহেতু মা নেই তাই পরিবারের আর কারো সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় নেই হয়ে আসছিলো। পিতার মৃত্যু সংবাদ মধুসূদন পান পিতা মারা যাওয়ারও দীর্ঘদিন পর। এছাড়াও ধর্মান্তরিত এবং দেশান্তরিত পুত্র হবার কারনে আত্মীয় স্বজনের মধ্যে সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার নেবার একটা লড়াই চলেই আসছিলো। এসবের মাঝেই মধুসূদন প্রত্যাগমন করেন মাদ্রাজ থেকে। ফিরে এসে দেখলেন কেবল মধুসূদনই এতদিনেও বদলাননি এতটুকুও অথচ বদলে গেছে নিজ দেশের সবই। বিজাতীয় বলে মধুসূদনকে কেউই আর স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করছেনা গোটা দুয়েক বন্ধু ছাড়া। তবু অল্প বেতনে জুডিশিয়াল ক্লার্কের চাকরি জোটালেন কলকাতার পুলিশ কোর্টে, পাশাপাশি জারি রাখেন নিজের একাগ্র সাহিত্য সাধনার। এরই মাঝে বেলগাছিয়া নাট্যশালায় তৎকালীন খ্যাতিমান নাট্যকার রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘রত্নাবলী’ নাটকটি মঞ্চস্থ হবার সকল আয়োজন যখন সম্পন্ন তখন মহারাজ যতীন্দ্র মোহন ঠাকুরের ইংরেজ, পার্সি এবং ইহুদী অতিথিদের জন্য নাটকের ইংরেজি অনুবাদ ছিল আবশ্যক আর একাজের জন্য মধুসূদন ছাড়া আর কেই বা উপযুক্ত হতে পারে! অনুবাদের জন্য মধুসূদন পারিশ্রমিক পেলেন পাঁচশ টাকা একই সাথে অনুবাদ না যতটা প্রশংসিত হলো নিজের পাণ্ডিত্য এবং সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসার জন্য অর্জন করলেন রাজার অপত্য স্নেহ। রত্নাবলী নাটকের পুনঃ পুনঃ মঞ্চায়নে তার মনে হল অকিঞ্চিৎকর নাটকের পেছনে বিপুল খরচ হচ্ছে তথাপি ভালো নাটকের আবির্ভাবের যেন কোন লক্ষণই নেই এবং সেই প্রথম মধুসূদন দেখতে পেলেন বাংলা নাটকের দৈন্য দশা। জানলেন নাটকের অভিনয় কুশলীদেরও মনোভাব- ‘ভালো নাটক আর কোথায়’! ‘ভালো নাটক? আচ্ছা আমি রচনা করিব’ বলে রচনা করলেন “শর্মিষ্ঠা” নাটকটি। দর্শক মোহিত হলো আর মধুসূদন পেলেন ভূয়সী প্রশংসা। এরপর রচনা করেন ‘পদ্মাবতী’, বাংলা সাহিত্যে যোগ করেন  প্রহসন- ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’। একদিন মহারাজ যতীন্দ্র মোহন ঠাকুরের মুখে বাংলাভাষায় অমিত্রছন্দ কোনমতেই প্রবর্তিত হওয়া সম্ভব নয় শুনে প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ মধুসূদন অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচনা করলেন ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ এবং মহারাজ নিজ খরচে সে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলেন। মধুসূদন এই গ্রন্থ মহারাজকেই উৎসর্গ করেন। এসময়টাতেই মধুসূদন তার সাহিত্য সাধনার চূড়ায় অবস্থান করছিলেন কারণ এর পরপরই  রচিত হতে থাকে মেঘনাদ বধ, কৃষ্ণকুমারী, ব্রজাঙ্গনা এবং বীরঙ্গনা কাব্য। বিপুল সমাদরে ‘মেঘনাদ বধ’ স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয় বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে এবং বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে যায় অনন্য মাত্রায়। তৎকালীন অনেকের মতে মেঘনাদ বধ হচ্ছে ‘বঙ্গের শ্যামল তৃণাচ্ছাদিত সমতল ক্ষেত্রে অকস্মাৎ কোন পর্বত শৃঙ্গের অভুত্থ্যান’।

কালীপ্রসন্ন সিংহ মেঘনাদ বধের প্রশংসা করে কবিকে অভিনন্দন জানান। তার ব্রজাঙ্গনা এবং বীরঙ্গনা কাব্যও প্রশংসিত হয়। মধুসূদন ইতোমধ্যে হয়ে উঠেছেন একজন নিয়মিত লেখক তবু সেই যে ছেলেবেলা থেকে জগতের বড় কবি হবার যে স্বপ্ন তা তো পূরণ হয়নি তখনো আর নিয়মিত অর্থাভাব তো ছিলই। ইংল্যান্ড যেয়ে ব্যারিস্টারি পড়ে আসলে অর্থাভাব দূর হবে ভেবে ১৮৬২ সালের মাঝামাঝি দিকে পাড়ি জমালেন ইংল্যান্ড। আঠারো বছর বয়স থেকে যে স্বপ্ন লালন করে এসেছেন তা পূরণ হল অবশেষে। শেক্সপিয়র, মিল্টন আর বায়রনের জন্মভূমি। যদিও তাঁর প্রবাস জীবন ছিলো অর্থাভাব এবং বৈষয়িক সমস্যায় ভরপুর তথাপি ব্যরিস্টারি শেষ করেন। নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি তার ভাগ্যে কখনোই জোটেনি। যাদেরকে ভরসা করে মধুসূদন তার বৈষয়িক কাজকর্মের ভার অর্পন করে যান তারাই মধুসূদনের স্বদেশ ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই আপন রূপ দেখাতে বিন্দুমাত্র দেরি করেনি। পরিবারসহ নিদারুন অর্থকষ্টের সেসময়টায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পাশে ছিলেন। এরইমধ্যে ফ্রান্সে থাকাকালীন সময়ে রচনা করেন চতুর্দশপদী রচনাবলী। চুরানব্বইটা কবিতার  সমন্বয়ে রচিত হয় তার এই কাব্যগ্রন্থ। ১৮৬৭ সালে ব্যারিস্টারি শেষ করে দেশে ফিরে আসেন মধুসূদন এবং কলিকাতা হাইকোর্টে কাজ শুরু করেন কিন্তু ততদিনে শরীর ভেঙে পড়েছে কবির, সঙ্গে অর্থকষ্ট এবং বড় কবি হবার বাসনা সব মিলিয়ে পেশাগত জীবনে সাফল্যর মুখ আর দেখতে পাচ্ছিলেন না। এরমাঝেও জারি ছিল কাব্যসাধনা, ১৮৭০ সালে প্রকাশিত হয় কবির হেক্টর বধ কাব্য। অর্থাভাব আর শারীরিক অসুস্থতা কবি এবং কবিপত্নিকে আরও জীর্ণ করে তুলেছিল। যদিও মাদ্রাজে থাকাকালীন সময়েই মধুসূদন বিয়ে করেন রেবেকা ম্যাকটাভিস নামের এক নারীকে কিন্তু যে অনুরাগের বশবর্তী হয়ে মধুসূদন বিয়ে করেছিলেন সে অনুরাগ কবির হৃদয়ে স্থায়ী হয়নি। মূলত কবি যে সুখের সন্ধান করেছিলেন সে সুখ তার ভাগ্যে জোটেনি উপরন্তু নিদারুন যন্ত্রণাতেই যে জীবন অতিবাহিত হয়েছে তার সাক্ষী তৎকালীন ‘আত্ম-বিলাপ’ কবিতাটি স্বয়ং। রোম্যান্টিক পোয়েট্রির অনুরক্ত এই কবি যে প্রেমের খোঁজে নিজেকে উজাড় করে চলেছিলেন সেই প্রেম তার ভাগ্যে জোটেনি তাই হয়তো দ্বিতীয়বার তিনি প্রেমে পরেন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজের এক শিক্ষকের মেয়ে হেনরিয়েটার। তবু মাদ্রাজ থেকে কবি একাই ফিরে আসেন কলকাতায়। ফিরে আসার পর আর যোগাযোগ রাখেননি রেবেকার সঙ্গে।

কলকাতায় ফেরার বেশ কিছুদিন পর একদিন হেনরিয়েটা কবির খোঁজে চলে আসেন কলকাতায় আর কখনোই ফিরে যাননি বরং আমৃত্যু ছিলেন মধুসূদনের পাশে। প্রচণ্ড দারিদ্যের মধ্যে, পীড়ার মধ্যেও ছেড়ে যাননি মধুসূদনকে। যদিও রেবেকার সঙ্গে কবির আইনিভাবে কোনো বিচ্ছেদ হয়নি তবু হেনরিয়েটাকেও তিনি ফিরিয়ে দিতে পারেননি, দুজনের প্রেম ছিল এতই গাঢ়। এই দম্পতির ছিল দুই সন্তান। জীবনের শেষ সময়টায় কবি এতটাই অসুস্থ ছিলেন যে পত্নী হেনরিয়েটার শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকার মতন শারীরিক সামর্থ্য ছিল না তবু দাতব্য চিকিৎসালয়ের বিছানায় শুয়ে শুয়ে মৃদুকণ্ঠে আওড়াচ্ছিলেন লেডি ম্যকব্যথের মৃত্যুর সংবাদে ম্যাকব্যাথের পঙক্তি  সঙ্গে গুনছিলেন নিজের মৃত্যুর প্রহর কারণ হেনরিয়েটার সাথেই একত্রে সমাধিস্থ হওয়ার ইচ্ছে ছিল তাঁর। হেনরিয়েটার মৃত্যুর ঠিক তিনদিন পর ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন পৃথিবী থেকে বিদায় নেন বঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবি, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। প্রিয়তমা হেনরিয়েটার পাশেই সমাধিস্থ করা হয় কবিকে। 

জীবনের প্রায় সকলক্ষেত্রেই মধুসূদন ছিলেন এক অটল পর্বতের মতন, স্বপ্ন থেকে কখনোই পিছপা হননি বরং পাড়ি দিয়েছেন জীবনের দুর্গম পথ। স্বপ্ন ছিল একটাই- বড় কবি হওয়া। এই একটা লক্ষ্যে মধুসূদন ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন স্থির। তাঁর কবিত্বের গৌরবে তিনি সকলকে বিস্মিত করতে চেয়েছেন। অন্তরের মর্মভেদী যন্ত্রণা নিয়ে এক অশান্তির জীবন যাপন করে গেছেন তবুও ছাড়েননি কবিতার সাধনা। আমৃত্যু কবি হতে চাওয়া কপোতাক্ষ তীরের ছেলেটিই পরবর্তীতে হয়েছেন বাংলা সাহিত্যের মহাকবি। শুধুমাত্র কবি হওয়ার জন্য এত ত্যাগ আর কার আছে? কবিতার টানে, কবি হওয়ার টানে আর কে সমাজ, ধর্ম, দেশ আর ঘর ছেড়েছেন? ৪৯ বছরের সেই জীবনে মাইকেল মধুসূদন দত্তের উপাস্য একটাই ছিল, ধর্মও একটাই ছিল- কবি হওয়া। সত্যিই, মধুসূদন এমন এক সুধার নাম যা অসীম। এ সুধাসমুদ্রে অবগাহন তো করা যায় তবু তল পাওয়া দুষ্কর।  

তথ্যঋণঃ যোগীন্দ্রনাথ বসু প্রণীত মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন চরিত

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর