ক্রীম ।। হারুকি মুরাকামি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৭,   ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

অনুবাদ সাহিত্য

ক্রীম ।। হারুকি মুরাকামি

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

 প্রকাশিত: ১৫:৪৭ ২৯ মে ২০২০   আপডেট: ১৫:৪৯ ২৯ মে ২০২০

ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে

ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে

আমার জীবনের একটা অদ্ভুত ঘটনা সম্পর্কে এক কনিষ্ঠ বন্ধুকে বলছিলাম। ঘটনাটি ঘটেছিল আমার ১৮ বছর বয়সে। কী কারণে ঘটনাটি আমি নিজের ভেতরে লালন করেছিলাম, তা আমি নিজেই জানতাম না। সেদিন বন্ধুর সঙ্গে গল্প করার সময়ে কাকতলীয়ভাবে ঘটনাটি প্রসঙ্গক্রমে উত্থাপিত হয়েছিল। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, ঘটনাটি সম্পর্কে আমি কখনোই কোনো উপসংহারে উপনীত হতে সমর্থ হইনি।

‘আমি তখন হাইস্কুল থেকে পাশ করে বের হয়েছি, কিন্তু কলেজে ভর্তি হইনি,’ আমি তাকে বললাম।’ আমি আসলে সেই সব ছাত্রদের একজন ছিলাম, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রতিবছর অকৃতকার্য হত এবং পরবর্তী বছরে পুনরায় পরীক্ষা দেয়ার জন্য অপেক্ষা করত। বিষয়টা আমাকে খুব বেশি বিব্রত করত না। কারণ, আমি জানতাম যে, আমি চাইলেই মোটামুটি ভদ্রগোছের একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারি। কিন্তু আমার বাবা-মা চাইতেন যে, আমি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্যে চেষ্টা করি। সুতরাং আমি বারংবার পরীক্ষা দিতাম। নিশ্চিত জেনেই যে আমি অকৃতকার্য হব। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় সেই সময়ে গণিত বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু ক্যালকুলাস বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। সুতরাং, বিভিন্ন কোচিং স্কুল বা সেন্টারে পড়ার কথা বলে পরবর্তী পুরো বছর আমি স্থানীয় লাইব্রেরিগুলোতে সময়ক্ষেপণ করতাম এবং মোটা মোটা উপন্যাসের পাতায় পাতায় বিচরণ করতাম। আমার বাবা-মা ধরে নিত যে, আমি পরের বছরের পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু বাস্তবে তা সেরকম ছিল না। আমার কাছে ক্যালকুলাসের ফরমুলার ভেতরে ডুবে যাওয়ার চেয়ে ব্যালজাকের বইতেই আনন্দ বেশি ছিল।’

সে বছর অক্টোবর মাসে আমি একটা মেয়ের কাছ থেকে তার পিয়ানো বাজানোর অনুষ্ঠানে যাবার আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। মেয়েটি স্কুলে আমার এক ক্লাস নিচে পড়ত। আমরা দুজনেই একই পিয়ানো শিক্ষকের কাছে পিয়ানো বাজানো শিখতাম। একবার আমি আর সেই মেয়েটি মিলে মোজার্টের একটা শর্ট-হ্যান্ডও বাজিয়েছিলাম। তবে ষোল বছর বয়সে আমি পিয়ানো বাজানো শেখা বন্ধ করে দেই এবং তারপর মেয়েটির সঙ্গে আমার আর সাক্ষাৎ হয়নি। সুতরাং আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কি কারণে সে আমাকে আমন্ত্রণ পাঠিয়েছিল। সে কি আমার সম্পর্কে আগ্রহী ছিল? আমার ধারণামতে তা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। কারণ, মেয়েটি ছিল খুবই আকর্ষণীয় চেহারার। অবশ্য যে ধরনের চেহারা আমার পছন্দের, তার চেহারা সেরকম ছিল না। মেয়েটি ফ্যাশনেবল পোশাক পরত এবং একটা ব্যয়বহুল প্রাইভেট স্কুলে পড়ত। এবং কোনভাবেই আমার মত জীবন-যুদ্ধ থেকে পালিয়ে বেড়ানো সৈনিক ধরনের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার মতো মেয়ে সে ছিল না।

আমার মনে আছে পিয়ানো স্কুলে দুজনে মিলে একত্রে বাজানোর সময়ে যখনই আমি কোনো ভুল নোটে আঘাত করতাম, তখনই সে আমার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকাত। আমার থেকে সে অনেক ভালো পিয়ানো বাদক ছিল। ফলে দুজনে পাশাপাশি বসে বাজানোর সময়ে পিয়ানোর নোটগুলো গুলিয়ে ফেলার কারণে আমি মাত্রারিক্তভাবে অস্থির বোধ করতাম এবং এই সময়ে বারংবার আমার কনুই তার শরীরের সঙ্গে লেগে যেত। পিয়ানোর যে খণ্ডটি আমরা বাজাতাম, তা খুব একটা কঠিন ছিল না এবং আমকে বরাবরই অধিকতর সহজ অংশটা দেয়া হতো। তারপরেও প্রতিবারই আমি ভুল করতাম এবং মেয়েটি আহত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে জিহ্বায় কামড় দিয়ে বিড়বিড় করে বিরক্তি প্রকাশ করত। যদিও তার বিড়বিড় করা ছিল খুবই মৃদু স্বরে, তারপরেও আমি সেগুলো বুঝতে পারতাম। আমি এখনো তার সেই বিড়বিড় করা শব্দগুলো স্পষ্ট শুনতে পাই। এই শব্দগুলোর কারণেই সম্ভবত আমি পরবর্তীতে পিয়ানো বাজানো চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

মোট কথা, কোনোভাবেই তার ও আমার মধ্যকার সম্পর্ক পিয়ানো স্কুলের দুইজন সতীর্থের উর্ধ্বে ছিল না। দেখা হলে আমরা পরস্পরের সঙ্গে অভিবাদন বিনিময় করলেও তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি শেয়ার করার কোনো স্মৃতি নেই। সুতরাং আমি তার পিয়ানো বাজানোর অনুষ্ঠান (সেটা তার কোনো একক অনুষ্ঠান ছিল না, বরং সেটা ছিল একটা দলগত অনুষ্ঠান, যেখানে তার আরো তিনজন পিয়ানো বাদক ছিল।) উপভোগ করার জন্য আমন্ত্রণ পেয়ে আমি যারপরনাই আশ্চর্য হয়েছিলাম। এটা আমাকে হতবুদ্ধিও করে দিয়েছিল। কিন্তু সেই বছরে যেহেতু আমার হাতে প্রচুর সময় ছিল, সেহেতু আমি তার পোস্টকার্ডের মাধ্যমে প্রেরণ করা আমন্ত্রণের প্রতিউত্তর দিয়েছিলাম এবং জানিয়েছিলাম যে, তার অনুষ্ঠানে আমি যাব। এর পেছনে আরো একটা কারণ ছিল। আমি খুবই উৎসুক ছিলাম আমাকে আমন্ত্রণ করার পিছনে তার কোনো উদ্দেশ্য ছিল কিনা তা যাচাই করে দেখা। কেন সে এত বছর পরে আমাকে এ ধরনের একটা অপ্রত্যাশিত আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছিল? হতে পারে যে, সে একজন দক্ষ পিয়ানোবাদক হয়েছিল, যা সে আমাকে দেখাতে চেয়েছিল। অথবা সম্ভবত তার কিছু একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় সে আমাকে জানাতে চেয়েছিল। অন্য কথায়, আমি আমার কৌতূহলের বোধটাকে ঝালিয়ে নিতে এবং এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমার মস্তিষ্কের চর্চাটাও করতে চাচ্ছিলাম।

অনুষ্ঠান হলটা ছিল ‘কোবে’র একটা উঁচু পর্বতের শীর্ষে। আমি হ্যানকু ট্রেনলাইন অনুসরণ করে পর্বতের কাছে গিয়েছিলাম এবং সেখান থেকে একটা বাসে উঠে বসেছিলাম। আঁকাবাঁকা খাঁড়া পথ দিয়ে উপরে যাবার জন্যে। শৃঙ্গ থেকে একটু দূরের একটা বাসস্টপে নামার পর কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমি মাঝারী আকারের একটা কনসার্ট হলে পৌঁছেছিলাম। হলটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় ছিল একটা বিশাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আমি জানতামই না যে, পর্বতের শীর্ষে এই ধরনের নির্জন ও অসুবিধাজনক স্থানে এবং বিত্তশালী আবাসিক এলাকায় একটা কনসার্ট হল আছে। আসলে আমাদের ধারণাই নেই যে, জানার বাইরেও পৃথিবীতে কতকিছু আছে।

আমার মনে হয়েছিল যে, মেয়েটির জন্যে কিছু নিয়ে যাওয়া উচিত। সুতরাং পর্বতের পাদদেশের রেলস্টেশনের কাছের একটা ফুলের দোকান থেকে এক গুচ্ছ ফুল কিনেছিলাম এবং সেগুলো দিয়ে একটা ফুলের তোড়া তৈরি করে নিয়েছিলাম। এটাকেই আমার নিকটে এই অনুষ্ঠানের জন্যে উপযুক্ত বলে মনে হয়েছিল। এই সময়েই বাসটা এসে পড়েছিল এবং আমি তাতে উঠে বসেছিলাম। সেটা ছিল একটা শীতল রবিবারের বিকেল। আকাশ ঘন বাদামি মেঘে আবৃত ছিল এবং মনে হচ্ছিল যে, কোন সময়েই বৃষ্টি নামতে পারে। যদিও বায়ুপ্রবাহ ছিল না, তবু আমি একটা ধূসর রঙের হেরিংবোন জ্যাকেটের নিচে পাতলা নীলাভ সোয়েটার পরেছিলাম এবং আমার কাঁধে ঝুলছিল একটা ক্যানভাস ব্যাগ। জ্যাকেটটা নতুন হলেও ব্যাগটা ছিল খুবই পুরাতন ও ছেঁড়া। আমার হাতে ছিল স্যালোফেন কাগজে মোড়ানো জমকালো লাল রঙের সেই ফুলের তোড়া। আমি যখন বাসে উঠছিলাম, তখন অন্যান্য যাত্রীরা আমার দিকে তাকাচ্ছিল। অথবা আমার নিকটে মনে হচ্ছিল যে তারা তাকাচ্ছে। এর পরই আমি অনুভব করেছিলাম যে, আমার গাল লাল হয়ে যাচ্ছে। আসলে সেটা ছিল আমার জীবনের এমন সময় যখন আমি সামান্যতম প্ররোচনাতেই লজ্জায় আরক্তিম হয়ে যেতাম। এবং এই লালভাব সরতে প্রায় অনন্তকাল সময় লেগে যেত।

‘আমি এখানে কেন?’ বাসের সিটে আমার লাজ-রাঙা গালকে আমার হাতের তালু দিয়ে ঠান্ডা করতে করতে নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে আমি কখনই মেয়েটিকে দেখতে বা তার পিয়ানো বাজানো শুনতে চাইনি। তাহলে কেন আমি ফুলের তোড়ার জন্যে আমার টাকা খরচ করেছিলাম এবং নভেম্বর মাসের বিষণ্ণ বিকেলে পর্বতের চূড়ায় এসেছিলাম? নিশ্চয়ই আমন্ত্রণের পোস্টকার্ডটার প্রতিউত্তর হিসেবে মেইলবাক্সে পোস্টকার্ড ফেলার পর থেকেই আমার কিছু একটা হয়েছিল, যেটার আমার কাছে ছিল না।

আমরা যতই পর্বতের উপর দিকে উঠছিলাম, ততই বাসের ভেতরে যাত্রী সংখ্যা কমে যাচ্ছিল। যখন আমি আমার জন্যে নির্ধারিত বাসস্টপে পৌঁছেছিলাম, তখন আমি আর বাসের চালক ছাড়া আর কেউই অবশিষ্ট ছিল না। বাস থেকে নেমে মৃদু ঢালু রাস্তা দিয়ে আমন্ত্রণস্থলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম। যতবারই আমি কোনো কোণাপথ অতিক্রম করছিলাম, ততবারই দূরের একটা পোতাশ্রয় খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যে আমার দৃষ্টির ভেতরে এসে পুনরায় হারিয়ে যাচ্ছিল। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের রঙটি ছিল নিস্তেজ ও বিষণ্ণ। মনে হচ্ছিল আকাশটাকে সিসার কম্বল দিয়ে মুড়ি দিয়ে রাখা হয়েছে। পোতাশ্রয়ের ভেতরে কয়েকটা বিশাল আকারের ক্রেন আকাশের ভেতরে ঝুলে ছিল। সেগুলোকে মনে হচ্ছিল সাগরের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা কুৎসিত কদাকার প্রাণীর শিং।

পর্বতের শৃঙ্গের কাছে ঢালুতে অবস্থিত বাসস্থানগুলো ছিল বড়ো আকৃতির এবং বিলাসবহুল। প্রত্যেকটারই বিশাল পাথরের দেয়াল এবং মনোহর প্রবেশদ্বার ছিল। সামনের এযালিয়ার হেজগুলোও খুব সুন্দর করে ছাঁটা ছিল। কোথাও একটা বিকট কুকুর ঘেউ ঘেউ চিৎকার করে উঠেছিল বলে আমি শুনেছিলাম। পর পর তিনবার চিৎকার করার পর কুকুরটি হঠাৎ করে নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল। আমার কাছে মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাকে কঠোরভাবে তিরস্কার করেছে। তারপর চারপাশটা নীরব হয়ে গিয়েছিল।

আমি যখন আমন্ত্রণ পত্রে দেয়া ম্যাপ অনুসরণ করে এগুচ্ছিলাম, সেই সময়েই আমি একটা অস্পষ্ট তালগোল পাকানো পূর্বাশঙ্কা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছিল কিছু একটা ঠিক নাই। রাস্তায় লোকজন খুবই কম ছিল। বাস থেকে নামার পর কোন পথচারীকেই দেখতে পাইনি। শুধুমাত্র দুটো কার আমাকে অতিক্রম করে গিয়েছিল আমাকে। কিন্তু সেগুলো ঢালু দিয়ে নিচে নেমে গিয়েছিল। উপরের দিকে নয়। যদি পিয়ানো বাজানোর অনুষ্ঠান এখানেই হতো, তাহলে এখানে আরও লোকজনের থাকার কথা ছিল। কিন্তু পুরো এলাকাই স্থির ও নিশ্চুপ হয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল উপরের ঘন মেঘেরা নিচের সকল শব্দকে গ্রাস করে নিয়েছে।

আমি কি তাহলে ভুল বুঝেছিলাম? আমি আমন্ত্রণপত্রটা জ্যাকেটের পকেট থেকে বের করেছিলাম। সেটাতে দেয়া তথ্যগুলো পুনঃপরীক্ষার জন্যে। হতে পারে যে আমি ভুল পড়েছিলাম। সুতরাং আমি সতর্কতার সঙ্গে সেটা পুনরায় পড়েছিলাম। কিন্তু কোনো ভুলই খুঁজে পাইনি। কারণ আমি সঠিক রাস্তা অনুসরণ করেই সেখানে পৌঁছেছিলাম। বাসস্টপ, অনুষ্ঠানের দিন ও সময়– সকল কিছুই ঠিক ছিল। আমি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস গ্রহণ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে পুনরায় যাত্রা শুরু করেছিলাম। আমার একমাত্র পরবর্তী করণীয় ছিল কনসার্ট হলে পৌঁছা এবং সেটাকে দেখা।

অবশেষে আমি কনসার্ট হলটিতে এসে পৌঁছলাম। দেখতে পেলাম যে, ওটার বিশাল লোহার তৈরি প্রবেশ দরজা শক্ত করে তালাবদ্ধ। একটা মোটা চেইন প্রবেশ দরজার চারদিক ঘিরে রাখা ছিল। সেটাকে একটা ভারী তালা দিয়ে বেঁধে স্বস্থানে বেঁধে রাখা হয়েছিল। দরজার একটা সরু ছিদ্র দিয়ে আমি ভেতরে তাকালাম। ভেতরে একটা মোটামুটি বড়ো আকারের পার্কিং প্লেস ছিল, কিন্তু তাতে একটা গাড়িও পার্ক করা ছিল না। শান পাথরের মধ্য দিয়ে আগাছা গজিয়েছিল এবং পার্কিং এর জায়গাটাকে দেখে মনে হচ্ছিল সেটা বহুদিন ব্যবহৃত হয়নি। এরপরেও প্রবেশপথে লাগানো বিশাল নামফলক থেকে আমি বুঝতে পারলাম যে, এটাই হলো সেই স্থান, যা আমি খুঁজছিলাম।

প্রবেশপথের পাশেই স্থাপিত ইন্টারকমের বোতাম টিপলাম। কিন্তু কেউই সাড়া দিল না। একটু অপেক্ষা করে পুনরায় বোতাম টিপলাম। তারপরেও কোনো উত্তর এল না। আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। পিয়ানো বাজানোর অনুষ্ঠানটা আর মাত্র পনের মিনিট পরেই শুরু হবার কথা। কিন্তু প্রবেশ দরজা খোলার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না। দরজার নিচে স্থানে স্থানে রঙ গলে পড়ে জমে ছিল এবং সেগুলোতে মরিচা ধরছিল। আমি আর কিছু করার চিন্তা করতে না পেরে পুনরায় ইন্টারকমের বোতাম চাপলাম। কিন্তু ফলাফল ছিল ঠিক পূর্বের মত। গভীর নিস্তব্ধতা।
কী করা যেতে পারে, বুঝতে না পেরে আমি প্রবেশ দরজায় হেলান দিয়ে কয়েক মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলাম। একটা ক্ষীণ আশা ছিল যে, হয়তোবা কিছুক্ষণের মধ্যেই কেউ এসে পড়বে। কিন্তু কেউ এল না। প্রবেশদ্বারের ভেতরে বা বাইরে কোনো চলাচল দেখা গেল না। কোনো পাখির ডাক বা কুকুরের ঘেউ ঘেউ ধ্বনিও শোনা গেল না। শুধু পূর্বের মত মাথার উপরে একটা অবিচ্ছিন্ন ধূসর রঙের মেঘের কম্বল আকাশকে ঢেকে রাখল।

শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিলাম। আমার আর কিই বা করার ছিল? এবং ধীর পদক্ষেপে বাসস্টপের দিকে এগুতে থাকলাম। কিছুই বুঝতে না পেরে। সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে আন্দাজ করতে পারছিলাম যে, এখানে পিয়ানো বাজানোর বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান হবার সম্ভাবনা নেই। এবং, হাতে লাল ফুলের তোড়া নিয়ে বাড়ি ফেরা ছাড়া আমার আর কিছুই করার নেই। এটা নিয়ে বাসায় গেলে আমার মা আমাকে দেখে সন্দেহ করবে ও জিজ্ঞেস করবে, ‘এই ফুলগুলো কার জন্যে?’ তাকে একটা বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। সুতরাং আমি ফুলগুলোকে স্টেশনের ময়লার বাক্সে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইলাম। কিন্তু ফেলতে পারলাম না। কারণ সেগুলো যথেষ্টই দামি ছিল ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার জন্যে।

পাহাড়ের পাদদেশে একটু দূরেই একটা মনোরম ছোট্ট পার্ক দেখতে পেলাম। বাসস্থানের সমান আয়তনের। পার্কটির দূরবর্তী প্রান্তে, রাস্তা থেকে দূরে কোণাকুণিভাবে একটা প্রাকৃতিক পাথরের দেয়াল ছিল। পার্কটি ছিল নামমাত্র। এতে কোনো ঝর্ণা বা খেলাধুলার যন্ত্রপাতি ছিল না। শুধুমাত্র পার্কের ঠিক মধ্যখানে একটা ছোট দোলনা ছিল। দোলনাটি গুল্মলতা দিয়ে আবৃত ছিল। এর চারপাশে ছিল ঝোপ এবং পাশেই ছিল একটা সমতল চতুষ্কোণ পাথর। পার্কটা কী উদ্দেশ্যে স্থাপন করা হয়েছিল তা বলা মুশকিল হলেও কেউ একজন নিয়মিতভাবে যে পার্কটির যত্ন নেয়, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। গাছ ও ঝোপগুলোকে নিয়মিতভাবে ছেঁটে রাখা হয়েছিল, এবং সেখানে কোনো ময়লা বা আবর্জনা ছিল না। পর্বতের উপরে উঠার সময়ে আমি এর পাশ দিয়েই অতিক্রম করেছিলাম, কিন্তু তখন এটার উপস্থিতি লক্ষ্য করিনি।

আমার চিন্তাগুলোকে বিন্যস্ত করার জন্যে আমি পার্কটার ভেতরে প্রবেশ করলাম এবং দোলনার পাশের একটা বেঞ্চে বসলাম। আমার মনে হলো যে, এখানে কিছুক্ষণ বসলে হয়তোবা আমি দেখতে পাব অনুষ্ঠানের জন্যে সত্যিই কেউ আসছে কিনা। বসার পরই আমি টের পেলাম যে আমি ভীষণ ক্লান্ত। এটা ছিল একটা অদ্ভুত ধরনের ক্লান্তি। যেন অনেক পূর্ব হতেই আমি পরিশ্রান্ত ছিলাম, কিন্তু সেইমাত্র বুঝতে পেরেছিলাম। দোলনার কাছ থেকে পোতাশ্রয়ের প্যানোরমিক দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। অনেকগুলো কন্টেইনার জাহাজ জেটিতে নোঙর করা ছিল। পর্বতের উপর থেকে এদের উপরে সাজিয়ে রাখা মেটাল কন্টেইনারগুলোকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টিনের পট বলে মনে হচ্ছিল। যেগুলোকে আমরা কয়েন অথবা পেপার ক্লিপ রাখার জন্যে ডেস্কের উপরে রেখে দেই।

অনেকক্ষণ পর দূরে আমি একটা মানুষের কণ্ঠস্বর শুনলাম। প্রাকৃতিক কণ্ঠস্বর নয়। লাউডস্পিকার দিয়ে উচ্চকিত করা। আমি বুঝতে পারছিলাম না কি বলা হচ্ছিল। কিন্তু প্রতিটা বাক্যের পরই একটা সুস্পষ্ট বিরতি দেয়া হচ্ছিল। এবং কণ্ঠস্বরটি কোনোধরনের আবেগ ছাড়াই প্রতিটি বাক্য উচ্চারণ করছিল। ভাবখানা এমন যে, সে খুবই গুরুত্বপুর্ণ কিছু একটা বলছিল যতটা সম্ভব নৈর্ব্যক্তিকতার সঙ্গে। আমার মনে হলো যে, এটা একটা ব্যক্তিগত বার্তা যার লক্ষ্যবস্তু শুধুমাত্র আমি নিজে। যেন কেউ একজন আমাকে বলছিল আমার কী ভুল হয়েছে এবং কী কী বিষয় আমি খেয়াল করিনি। এটা আমার স্বাভাবিক ভাবনা ছিল না, কিন্তু কোনো কারণে আমার কাছে স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল। আমি সতর্কভাবে পুনরায় শুনলাম। কণ্ঠস্বরটা ক্রমাগতভাবে উচ্চকিত ও সহজবোধ্য হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল শব্দটা ভেসে আসছিল কোনো কারের ছাঁদ থেকে যে কারটি আঁকাবাঁকা পথে ঢালু দিয়ে উপরে উঠছিল ধীরে ধীরে। কোনোরকমের ব্যস্ততা ছাড়াই। শেষপর্যন্ত আমি বুঝতে সক্ষম হলাম যে, কারটি থেকে যিশু খ্রিষ্টের বাণী প্রচার করা হচ্ছিল।

‘প্রত্যেকেই একদিন মৃত্যুবরণ করবে,’ কণ্ঠস্বরটি শান্ত একঘেয়ে সুরে বলে যাচ্ছিল। ‘প্রত্যেক মানুষকেই শেষ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে প্রস্থান করতে হবে। কেউই মৃত্যু অথবা শেষ বিচারের দিন থেকে পলায়ন করতে সক্ষম হবে না। এবং মৃত্যুর পরে প্রত্যেককেই পাপের জন্যে কঠিন বিচারের সম্মুখীন করা হবে।’

আমি বেঞ্চের উপরে বসে বাণীগুলো শুনছিলাম। আমার কাছে খুবই অদ্ভুত লাগছিল যে, পর্বতের উপরের এই জনশূন্য আবাসিক এলাকায় কেউ এভাবে ধর্মপ্রচার করতে পারে। এখানে যারা বসবাস করে তারা সবাই ধনী এবং সবারই একাধিক যানবাহন আছে। আমার মনে হলো যে, খ্রীষ্টান মিশনারিরা নয়, তারা নিজেরাই পাপ থেকে পরিত্রাণ চাচ্ছে। মানুষের উপার্জন এবং সামাজিক পদমর্যাদার সাথে পাপ ও মুক্তি কি আসলেই সম্পর্কিত?

‘কিন্তু যারা যীশুর কাছে মুক্তি প্রার্থনা করে এবং তাদের পাপ নিয়ে অনুতপ্ত হয়, ঈশ্বর তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। তারা নরকের আগুন থেকে পলায়ন করবে। ঈশ্বরে বিশ্বাস করুন, কারণ শুধুমাত্র যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করবে, তারাই মৃত্যুর পর মুক্তিপ্রাপ্ত হবে এবং চিরন্তন জীবন লাভ করবে।’

আমি অপেক্ষা করছিলাম খ্রীষ্টান মিশনের কারটি আমার সামনের পথে আবির্ভূত হবে এবং মৃত্যুর পরের বিচার সম্পর্কে আরো অনেক কথা বলবে। আমার মনে হলো আমি অপেক্ষা করছিলাম তাদের অটল কণ্ঠস্বর হতে আশ্বাসে ভরা কথা শোনার, তা যে ধরনের কথাই হোক না কেন। কিন্তু কারটাকে আর কখনই দেখা গেল না। এবং একটা নির্দিষ্ট সময় পর কণ্ঠস্বরটি শান্ত হতে হতে ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে গেল। এক সময়ে আমি আর কিছুই শুনতে পারছিলাম না। কারটা সম্ভবত অন্যদিকে চলে গেছে। আমি যেখানে ছিলাম তার থেকে বিপরীত দিকে। কারটা অদৃশ্য হয়ে যাবার পর আমার মনে হলো যে, পৃথিবী আমাকে পরিত্যাগ করেছে।

হঠাৎ একটা ভাবনা মাথায় এল আমার। হতে পারে যে, পুরো জিনিসটাই মেয়েটার সাজানো একটা ধাপ্পাবাজি। ভাবনাটা – বলতে গেলে শূন্য থেকে আমার মাথার ভেতরে জুড়ে বসল। কিন্তু কোনোভাবেই আমার বোধগম্য হলো না, কী কারণে একজন পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে এক রবিবার বিকেলে এই দূরবর্তী পর্বতের শৃঙ্গে আমাকে টেনে আনতে পারে। হয়তোবা আমি আমি এমন কিছু করেছিলাম, যার কারণে সে আমার উপরে ক্ষিপ্ত হয়েছে। অথবা হতে পারে কোনো কারণ ছাড়াই আমি তার নিকটে এতই বিরক্তকর ছিলাম যে, সে আমাকে সহ্য করতে পারছিল না। এবং সে কারণেই আমাকে একটা অস্তিত্বহীন পিয়ানো আবৃত্তির অনুষ্ঠানে আসার জন্যে আমন্ত্রণ করেছে। হয়তোবা সে এই মুহূর্তে আনন্দে হাসতে হাসতে মরে যাচ্ছে। আমাকে বোকা বানাতে পেরে এবং আমার বেদনাতুর অথচ হাস্যকর মুখ দেখে বা কল্পনা করে।

ঠিক আছে, তবে একজন মানুষ কি আসলেই নিজের বিদ্বেষের কারণে কাউকে জব্দ করার জন্যে এমন একটা জটিল পরিকল্পনা করতে পারে? পোস্টকার্ডটি প্রিন্ট করতেও তো তার কিছু প্রচেষ্টা প্রয়োজন হয়েছে। কেউ কি এতটাই নীচ হতে পারে? আমি এমন কোনো কাজ করেছি বলে মনে করতে পারলাম না, যার কারণে সে আমাকে এতটা ঘৃণা করতে পারে। এটা ঠিক যে, অনেক সময়ে আমরা না বুঝেই অন্যদের অনুভূতি বা অহংকারকে আঘাত করে বসি, এবং তাদেরকে মনঃকষ্টের ভেতরে ফেলে দিই। আমি এই ধরনের কোনো অচিন্তনীয় ঘৃণা বা ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও চিন্তা করলাম। কিন্তু কিছুই পেলাম না যা যৌক্তিক মনে হতে পারে। এবং আমি বৃথাই আবেগের গোলকধাঁধার ভেতরে চক্কর মারতে এবং পথ হারাতে থাকলাম। এটা বুঝতে পারার পূর্বেই আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হলো।

এই শ্বাসকষ্টটা আমার বছরে এক দু’বার হতো। আমার ধারণা মানসিক চাপ থেকে আমার এটা হতো। এই সময়ে আমি খুবই গোলমেলে অনুভব করতাম, আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসত এবং আমি ফুসফুসের ভেতরে যথেষ্ট বাতাস নিতে পারতাম না। ফলে আমি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যেতাম, যেন আমি একটা প্রবল স্রোতের টানে জলের নিচে ডুবে যাচ্ছি এবং আমার শরীর ক্রমশ জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে। সেই সময়গুলোতে আমি যা করতে সক্ষম ছিলাম তা হলো মাটিতে শুয়ে পড়ে চোখ বন্ধ করে থাকা এবং অপেক্ষা করতে থাকা যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার শরীর স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার এই লক্ষণগুলো কমে গিয়েছিল (এবং কিছু কিছু সময়ে আমার লজ্জায় আরক্তিম হয়ে যাওয়াও কমে গিয়েছিল)। কিন্তু আমার কৈশোরকালে এই সমস্যা আমাকে সত্যিই ভোগাত।

দোলনার বেঞ্চে বসে আমি শক্তভাবে আমার চোখ বন্ধ করলাম। নিচু হয়ে থাকলাম এবং অপেক্ষা করতে থাকলাম যতক্ষণ পর্যন্ত না এই সমস্যা আমাকে ছেড়ে যায়। এই সময়কাল পাঁচ মিনিট অথবা পনের মিনিট দুটোই হতে পারে, আমি জানি না কত দীর্ঘ ছিল তা। পুরো সময়েই অদ্ভুত অনুভূতিটি কয়েকবার এল এবং অন্ধকারের ভেতরে হারিয়ে গেল। আমার নিঃশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে করতে আমি অনুভূতিটির সংখ্যা গুনতে গুনতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার চেষ্টা করতে লাগলাম। পাঁজরের ভেতরে আমার হৃদয় অস্থিরভাবে কাঁপতে লাগল, যেমন করে আতঙ্কগ্রস্ত ইঁদুরেরা খাঁচার ভেতরে ছোটাছুটি করে থাকে।

গণনা নিয়ে এতটাই নিবিষ্ট ছিলাম যে, আমি কিছুক্ষণ বুঝতেই পারিনি যে কেউ একজন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি অনুভব করলাম যেন কেউ একজন আমার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে আমাকে পর্যবেক্ষণ করছে। খুবই ধীরে ধীরে ও সতর্কতার সাথে আমি আমার চোখ খুললাম এবং মাথাকে এক ডিগ্রি উপরে তুললাম। আমার হৃদযন্ত্র তখনও অস্বাভাবিকভাবে ধড়ফড় করছিল।

আমার বিপরীতদিকে একজন বৃদ্ধ লোক বেঞ্চের উপরে বসেছিলেন এবং সোজা আমার চোখের ভেতরে তাকিয়ে ছিলেন। আমার ধারণা একজন যুবক মানুষের পক্ষে বৃদ্ধদের বয়স অনুমান করতে পারা সহজ নয়। আমার কাছে সকল বৃদ্ধ লোকদেরকেই শুধুমাত্র বয়স্ক বলেই মনে হয়। ষাট বা সত্তুরের ভেতরে কি আদৌ কোনো পার্থক্য আছে? তাদের কেউই এখন আর যুবক নন, এটাই সত্য। লোকটির পরনে ছিল ধূসর নীলাভ রঙের উল কার্ডিগান, বাদামি রঙের প্যান্ট এবং নেভি-ব্লু রঙের স্নিকার। দেখে মনে হচ্ছিল সবগুলো জামাই বেশ পুরোনো। তার মাথার চুলগুলোর রঙও ছিল ধূসর এবং অনমনীয়। চুলের গোছাগুলো স্নানরত পাখির পাখার মতো কানের উপরে এসে পড়ছিল। লোকটি কোনো চশমা পরে ছিলেন না। আমি জানি না কতক্ষণ পূর্বে তিনি এখানে এসেছিলেন, তবে আমার মনে হচ্ছিল যে তিনি অনেকক্ষণ যাবতই আমাকে দেখছিলেন।

আমি নিশ্চিত যে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন, ‘তুমি কি ঠিক আছ?’ অথবা এই ধরনের কিছু। কারণ আমার চেহারা দেখে তিনি নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন যে আমার সমস্যা হয়েছে (এবং আসলেই আমার সমস্যা হয়েছিল)। কিন্তু তিনি আমাকে কিছুই বললেন না, এমনকি আমাকে কিছু জিজ্ঞেসও করলেন না। শুধুমাত্র একটা ভাঁজকরা কাল রঙের ছাতার এক প্রান্তকে শক্ত করে লাঠির মতো ধরে থাকলেন। ছাতাটির হাতলটি ছিল কাঠের তৈরি এবং অম্বর রঙের। ওটাকে প্রয়োজনে অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারত। আমি ধারণা করলাম যে, তিনি এই এলাকাতেই বাস করেন। কারণ তার হাতে আর কিছুই ছিল না। আমি বসে বসে আমার নিঃশ্বাসকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম, এবং বৃদ্ধ লোকটি নীরবে আমাকে দেখছিলেন। মূহূর্তের জন্যেও তার চোখের পলক পড়ছিল না। এটা আমার ভেতরে অস্বস্তির সৃষ্টি করল – যেন আমি কারও বাড়ির পেছনের উঠোনে অনুমতি ছাড়াই ঢুকে পড়েছি। আমি বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ে বাসস্টপের দিকে যাত্রা শুরু করতে চাইলাম। যত দ্রুত সম্ভব। কিন্তু অজ্ঞাত কোনো কারণে আমি আমার পা তুলতে পারলাম না। কিছুক্ষণ অতিবাহিত হবার পর, হঠাৎ করে লোকটি কথা বলে উঠলেন।

‘এক বৃত্তের অনেকগুলো কেন্দ্র।’

আমি তার পানে তাকালাম। পরস্পরের চোখের দিকে। তার কপালটি ছিল খুবই প্রশস্ত, নাক টিকালো। পাখির ঠোঁটের মতো ধারালো। আমি একটা কথাও বলতে পারলাম না। সুতরাং বৃদ্ধ লোকটি পুনরায় শান্তভাবে তার কথার পুনরাবৃত্তি করলেনঃ ‘এক বৃত্তের অনেকগুলো কেন্দ্র।’

স্বাভাবিকভাবেই আমার ধারণাই ছিল না তিনি কী বলার চেষ্টা করছিলেন। শুধু আমার মাথার ভেতরে একটা চিন্তা এসেছিল যে, এই লোকটাই খ্রিস্টান মিশনারিদের লাউডস্পিকারওয়ালা কারটির চালাচ্ছিলেন। হতে পারে যে, তিনি নিকটেই কোথাও কারটি পার্ক করে এখানে একটা বিরতি নিচ্ছিলেন। না, এটাও ঠিক নয়। এই লোকের কণ্ঠস্বর আমি যে কণ্ঠস্বর শুনেছিলাম, তার থেকে ভিন্ন। লাউডস্পিকারের কণ্ঠস্বরটি ছিল এর চেয়ে অনেক কম বয়সী মানুষের। অথবা এমনও হতে পারে যে, এই লোকটি তা রেকর্ড করছিলেন।

‘আপনি কি বৃত্তের কথা বললেন?’ আমি অনিচ্ছা সহকারে তাকে জিজ্ঞেস করলাম। যেহেতু তিনি আমার চেয়ে বেশি বয়সের ছিলেন, আমার ভদ্রতাই আমাকে সাড়া দিতে বাধ্য করল।

‘অনেক সময়ে কয়েকটা কেন্দ্র থাকে – না, কিছু কিছু সময়ে সীমাহীন সংখ্যক কেন্দ্র থাকে – এবং সেটা হলো পরিধি ছাড়াই কোনো বৃত্ত।’ বৃদ্ধ লোকটি রাগতভাবে কথাগুলো বলছিলেন এবং তার কপালের ভাঁজগুলো গভীরতর হচ্ছিল। ‘তুমি কি ধারণা করতে সক্ষম?’

আমার হৃদয় তখনও কর্মক্ষম হয়নি। তথাপি আমি চিন্তা করার চেষ্টা করলাম। একটা বৃত্ত যার কয়েকটা কেন্দ্র আছে এবং কোনো পরিধি নেই। কিন্তু যেভাবেই আমি চিন্তা করে থাকি না কেন, আমি বিষয়টাকে অনুধাবন করতে পারলাম না।

‘আমি বুঝিনি,’ আমি বললাম। বৃদ্ধ লোকটি আমার দিকে নীরব দৃষ্টিতে তাকালেন। মনে হচ্ছিল তিনি আমার নিকট থেকে অধিকতর ভালো কোনো উত্তর আশা করছেন।

‘আমি মনে করি না স্কুলে আমাদের গণিতক্লাসে এমন ধরনের কোনো বৃত্ত সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল।’

তিনি মাথা নাড়লেন, ‘ অবশ্যই না। এটা আশাও করা হয় না। কারণ স্কুলে এই ধরনের বিষয় কখনই শিক্ষা দেয়া হয় না। তুমিও তা খুব ভালোভাবেই জান।’

আমিও তা খুব ভালোভাবেই জানি? বৃদ্ধ লোকটির এটা মনে করার কারণ কি?

‘এই ধরনের বৃত্ত কি বাস্তবেই আছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘অবশ্যই আছে,’ বৃদ্ধ লোকটি কয়েকবার মাথা নেড়ে বললেন। ‘সত্যিকারভাবেই এই বৃত্ত আছে। কিন্তু সবাই তা দেখতে পায় না, তুমি জান।’

‘আপনি কি দেখতে পান?’

বৃদ্ধ লোকটি কোনো উত্তর করলেন না। আমার প্রশ্নটি শূন্যের ভেতরে কিছুক্ষণ ঝুলে থাকল এবং অবশেষে অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে গেল।

বৃদ্ধ লোকটি আবার বলে উঠলেন, ‘শোন, তোমার নিজের শক্তি দিয়ে তোমাকে চিন্তা করে নিতে হবে। তোমার সমস্ত অভিজ্ঞানকে ব্যবহার কর, দেখতে পাবে। একটা বৃত্ত যার অনেকগুলো কেন্দ্র আছে, কিন্তু পরিধি নেই। তুমি যদি এমন চেষ্টা করতে পার যে, তোমার ঘাম দিয়ে রক্ত বের হবে – তাহলে ক্রমশ এক সময়ে তুমি বুঝতে পারবে বৃত্তটি কী।’

‘কঠিন মনে হচ্ছে,’ আমি বললাম।

‘অবশ্যই এটা কঠিন,’ লোকটি বললেন , যেন তিনি শক্ত কোনোকিছুকে পিটাচ্ছেন। ‘পৃথিবীতে যা কিছুই তুমি সহজে অর্জন করতে সক্ষম, তা মূল্যবান নয়। ‘অতঃপর নতুন একটা অনুচ্ছেদ শুরু করার মতো করে তিনি তার গলা খাঁকারি দিলেন তা পরিষ্কার করার জন্যে। ‘কিন্তু তুমি যখন তোমার প্রচুর সময় ও প্রচেষ্টা ব্যয় করবে, তখন তুমি কঠিন জিনিসও অর্জন করতে সক্ষম হবে এবং সেটাই হবে তোমার জীবনের ক্রীম।’

‘ক্রীম?’

‘ফরাসী ভাষায় crème de la crème বলে একটা এক্সপ্রেশন আছে। তুমি কি জানো?’

‘জি না, আমি ফরাসি ভাষাই জানি না,’ আমি বললাম।

‘ক্রীমের ভেতরে ক্রীম। অর্থ হলো শ্রেষ্ঠদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এটা দিয়ে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ নির্যাস বা সারাংশকে বোঝানো হয়ে থাকে। বুঝতে পেরেছ তুমি? এটা ছাড়া জীবনের অন্য সকল কিছুই ক্লান্তিকর ও মূল্যহীন।’

আমি সত্যিই বুঝতে পারছিলাম না বৃদ্ধ লোকটি আমাকে কোনো পয়েন্টের দিকে নিতে চাচ্ছিলেন। Crème de la crème?

‘বিষয়টা নিয়ে চিন্তা কর’, তিনি আমাকে বললেন। ‘তোমার চোখ দুটোকে আবার বন্ধ কর, এবং একটা বৃত্তের কথা চিন্তা কর, যার অনেকগুলো কেন্দ্র আছে, কিন্তু পরিধি নেই। তোমার মস্তিষ্ককে তৈরিই করা হয়েছে কঠিন বিষয় নিয়ে ভাবার জন্যে এবং তোমাকে কোনো গন্তব্যে নিয়ে যেতে সাহায্য করার জন্যে, যেখানে পৌঁছার পর তুমি বিষয়টা বুঝতে পারবে, যা তুমি প্রথমে বুঝতে পারনি। তবে এই বিষয়ে তোমার অলস হওয়া ও তাচ্ছিল্য করা চলবে না। শুরুর সময়টাই হলো তোমার জন্যে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ। কারণ এই সময়েই মস্তিষ্ক ও হৃদয় রুপ পরিগ্রহ এবং ভাবনাকে ঘনীভূত করে।’

আমি আমার চোখ পুনরায় বন্ধ করলাম এবং বৃত্তের চিত্রটাকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করলাম। অলস হতে বা উপেক্ষা করতেও আমি চাইলাম না। কিন্তু, লোকটি যা বলছিল তার অর্থ আমার সকল চেষ্টা স্বত্বেও বুঝতে সক্ষম হলাম না। প্রতিটা বৃত্তেরই একটা কেন্দ্র আছে এবং একটা পরিধি আছে যার উপরের প্রতিটা বিন্দুই কেন্দ্র থেকে সমান দূরত্বে অবস্থিত। এই খুব সহজেই কম্পাস দিয়ে এঁকে ফেলা যায়। আমার কাছে মনে হলো লোকটি কি এমন কিছুর কথাই বলছেন না, যা বৃত্তের সম্পূর্ণ বিপরীত?

তবে আমি লোকটিকে মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ বলে ভাবতে পারলাম না। এমনকি এটাও ভাবতে পারলাম না যে, তিনি আমকে উত্যক্ত করার জন্যে প্রশ্নটা করেছেন। তিনি নিশ্চয়ই আমাকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা জানাতে চাইছেন। সুতরাং আমি পুনরায় চেষ্টা করলাম বুঝতে। কিন্তু আমার চিন্তাশক্তি একটা জায়গাতেই ঘুরপাক খাচ্ছিল এবং সামনে এগুতে পারছিলাম না। কীভাবে একটা বৃত্ত একাধিক বা অসংখ্য কেন্দ্র থাকার পরেও তা বৃত্ত হিসেবেই থাকতে পারে? এটা কি কোনো পোস্টমডার্ন দার্শনিক রুপক? শেষ পর্যন্ত আমি চেষ্টা পরিত্যাগ করলাম এবং আমার চোখ খুললাম। চিন্তা করার জন্যে আমার আরও সুত্র প্রয়োজন।

কিন্তু চোখ খুলে আমি লোকটিকে দেখতে পেলাম না। আমি চারদিকে তাকালাম, কিন্তু পার্কের ভেতরে আমি ছাড়া আর কেউই ছিল না। মনে হচ্ছিল তিনি কখনই অস্তিত্বশীল ছিলেন না। আমি কি এতক্ষণ কল্পনা করছিলাম, তাহলে? অবশ্যই না। এটা কখনই আমার উদ্ভট কল্পনা হতে পারে না। তিনি এই একটু পূর্বেই আমার সামনে ছিলেন, তার ছাতাটিকে আঙুল দিয়ে শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন, শান্তভাবে কথা বলছিলেন, অদ্ভুত প্রশ্ন করছিলেন আমাকে, এবং তারপর চলে গেছেন।

আমি অনুভব করলাম আমার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক ও স্থির হয়ে এসেছে। আমার ভেতরের অস্থিরতার স্রোত অন্তর্হিত। আকাশের ফাঁকে ফাঁকে এখানে-সেখানে মেঘের ঘন স্তরগুলো পুনরায় দৃশ্যমান হচ্ছে। পোতাশ্রয়ের উপরেও। একটা আলোকরশ্মি প্রতিসরিত হয়ে ক্রেনের উপরিভাগের এলুমিনিয়ামের ঢাকনাকে আলোকিত করেছিল। মনে হচ্ছিল সকল আলোকরস্মিই এক স্থানে গিয়ে মিলেছে। আমি অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলাম। যেন একটা পৌরাণিক দৃশ্য আমার দৃষ্টিকে অসাড় করে দিয়েছে।

স্যালোফোন কাগজ দিয়ে মোড়া লাল ফুলের তোড়াটিও আমার পাশেই ছিল। অদ্ভুত যা কিছু আমাকে কেন্দ্র করে ঘটে গেল তার সাক্ষী হিসেবে। আমি ফুলের তোড়াটি নিয়ে কী করা যেতে পারে তা নিয়ে পুনরায় ভাবলাম এবং শেষ পর্যন্ত সেটিকে দোলনাটির উপরে রেখে দিলাম। আমার নিকটে এটাই সবচেয়ে যৌক্তিক বলে মনে হলো। তারপর আমি দাঁড়ালাম এবং বাসস্টপের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। যেখানে আমি পূর্বে বাস থেকে নেমেছিলাম। বাতাস বইতে শুরু করল এবং মাথার উপরের স্থির মেঘগুলো ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে গেল।

আমার গল্প বলা শেষ হবার পর একটু বিরতি দিয়ে আমার সেই কনিষ্ঠ বন্ধু আমাকে বলল, ‘আমি আসলেই কিছু বুঝলাম না। তার পরে কি হয়েছিল? কোনো তত্ত্ব বা উদ্দেশ্য কি তুমি এই ঘটনা থেকে খুঁজে পেয়েছিলে?’

আমন্ত্রণ পত্রের নির্দেশিকা অনুসরণ করে শরৎকালের রোববারের সেই বিকেলে কোবে পর্বতের শীর্ষে আমি গিয়েছিলাম। সেখানে একটা পিয়ানো বাজানোর অনুষ্ঠান হবার কথা ছিল, কিন্তু পৌঁছার পর আমি আবিষ্কার করেছিলাম যে, হলো ঘরটিতে কেউই ছিল না। এই ধরনের একটা ঘটনার অর্থ কি হতে পারে? কেনই তা ঘটেছিল? এই প্রশ্নগুলোই আমার বন্ধু আমার নিকট থেকে জানতে চাচ্ছিল। খুবই স্বাভাবিক ছিল তার প্রশ্নগুলো। কারণ যে গল্পটা আমি তাকে বলছিলাম তা আসলেই কোনো উপসংহারে পৌঁছেনি।

‘আমি নিজেও বুঝি নাই, এমনকি এখনও,’ আমি স্বীকার করলাম।

ওটা ছিল প্রাচীন কোনো ধাঁধার মতোই অমীমাংসিত। সেদিন যা ঘটেছিল তা ছিল আমার ধারণাশক্তির অতীত ও দুর্বোধ্য। আমার আঠারো বছর বয়সে ঘটনাটি আমাকে হতবিহবল এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছিল। এতটাই যে, এক মূহূর্তের জন্যে হলেও আমি আমার পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম।

‘কিন্তু আমার মনে হয় তত্ত্ব বা উদ্দেশ্য এখানে সত্যিকারের বিষয় ছিল না।’

আমার বন্ধুকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল। ‘তুমি কি বলতে চাচ্ছ যে, বিষয়টি কি ছিল তা জানারই প্রয়োজন নেই?’ সে প্রশ্ন করল।

আমি মাথা নাড়ালাম।

‘কিন্তু আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম,’ সে বলল,’ বিষয়টা নিয়ে আমার চিন্তার অন্ত থাকত না। আসল সত্য কি ছিল এবং কেন তা ঘটেছিল তা আমি অবশ্যই জানতে চাইতাম।’

‘অবশ্যই। সেই সময়ে আমাকেও সেটা চিন্তিত করত। খুবই। এবং আমি মনে মনে কষ্টও পেতাম। কিন্তু সময় অতিক্রান্ত হবার পর দূর থেকে বিষয়টিকে নিয়ে চিন্তা করা আমার নিকটে গুরুত্বহীন বলেই মনে হত। মনে হতো যে, এ ধরনের বিষয় নিয়ে মন খারাপ করে থাকার কোন মানে হয় না। এমনকি এটাও মনে হয়েছিল যে, জীবনের সারাংশ বা ক্রীমের সাথে আদৌ এর কোনো সম্পর্ক বা সংযোগ নেই।’

‘ক্রীম অফ লাইফ,’ সে পুনরাবৃত্তি করল।

‘এই ধরনের ঘটনা জীবনে কখনও কখনও ঘটেই থাকে,’ আমি তাকে বললাম। ‘এই ধরনের অনেক ব্যাখ্যাতীত, অযৌক্তিক ঘটনাবলী আমাদের মানসিক শান্তিকে ভীষণভাবে নষ্ট করে থাকে। আমি মনে করি এগুলো নিয়ে আমাদের চিন্তা করা উচিৎ নয়। বরং উচিৎ চোখ বন্ধ করে এগুলোকে অতিক্রম করে চলে যাওয়া। যেন আমরা একটা বিশাল ঢেঊয়ের নিচ দিয়ে অতিক্রম করছি।’

আমার কনিষ্ঠ বন্ধু বিশাল সেই ঢেউয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। সে ছিল একজন অভিজ্ঞ সার্ফার (surfer)। ঢেঊকে অতিক্রম করার সময়ে তাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নিতে হতো। অবশেষে সে নিস্তব্ধতা ভেঙে বলল,’ কিন্তু কোনকিছু সম্পর্কে চিন্তা না করাও যথেষ্ট কঠিন কাজ।’

‘তুমি ঠিক বলেছ। এটা আসলেই খুব কঠিন কাজ।’

কিন্তু কোনো মূল্যবান জিনিসই সহজে পাওয়া যায় না, বৃদ্ধ লোকটি বলেছিল অটল বিশ্বাস নিয়ে। এমন করে যেন পিথাগোরাস তার উপপাদ্যগুলোকে ব্যাখ্যা করছিলেন।

‘সেই বৃত্ত যার অনেক কেন্দ্র, কিন্তু কোনো পরিধি নেই, সে সম্পর্কে তুমি কি কোনো উত্তর পেয়েছিলে?’

‘ভাল প্রশ্ন,’ আমি বললাম। আমি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লাম। আমি কি পেয়েছিলাম?

আমার জীবনে যখনই ব্যাখ্যাতীত, অযৌক্তিক এবং মানসিকভাবে বিভ্রান্তিকর কোনো ঘটনা ঘটে (আমি বলছি না যে, সেটা প্রায়ই ঘটে থাকে, তবে কয়েকবার তো ঘটেছেই), আমি সেই বৃত্তের কাছে ফিরে আসি – পরিধিহীন, কিন্তু অনেকগুলো কেন্দ্র সম্পন্ন বৃত্ত। যেমন করে আমার আঠারো বছর বয়সে করেছিলাম – দোলনার উপরে বসে। আমি আমার চোখদ্বয় বন্ধ করি এবং হৃদয়ের কম্পন শুনতে থাকি।

কোনো কোনো সময়ে আমার মনে হয় সেই বৃত্তকে আমি অনুভব করতে সক্ষম, কিন্তু গভীরতর কোনো বোধ আমাকে পুনরায় বিভ্রান্ত করে। এই বৃত্তটা খুব সম্ভবত নির্দিষ্ট আকৃতির কোনো বৃত্ত নয়। ওটার কোনো নির্দিষ্ট অবয়বও নেই। শুধুই তা আমাদের মনের ভেতরে অস্তিত্বশীল থাকে। আমরা যখন কাউকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসি, অথবা তার জন্যে গভীর সহমর্মিতা অনুভব করি, অথবা বিশ্বাসকে (অথবা বিশ্বাসের কাছাকাছি কোনোকিছুকে) আবিষ্কার করি – সেটাই হলো সেই মহার্ঘ সময় যখন আমরা বৃত্তটিকে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে সেভাবে বুঝতে সক্ষম হই এবং আমাদের হৃদয়ও তা মেনে নেয়। আমি স্বীকার করছি যে, এর চেয়ে অধিকতর স্পষ্ট ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই।

তোমার মস্তিষ্ক কঠিন বিষয় চিন্তা করতে সক্ষম। চিন্তা তোমাকে সেই বিন্দুতে নিয়ে যাবে, যেখানে পৌঁছার পর তুমি বুঝতে পারবে, যা তুমি প্রথমে বুঝতে পার নাই। এবং সেটাই তোমার জীবনের ক্রীম। এটা ছাড়া অন্য সকল কিছুই ক্লান্তিকর ও মূল্যহীন। ধূসর চুলের সেই বৃদ্ধ আমাকে সেই কথাই বলেছিল, যখন একটা মেঘাচ্ছন্ন রবিবার বিকেলে কোবের পর্বতের চূড়ায় আমি যখন এক গুচ্ছ লাল ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে ছিলাম। এমনকি এখনও যখন কোনো বিভ্রান্তিকর কোনো কিছু আমার জীবনে ঘটে, আমি সেই বিশেষ বৃত্ত নিয়ে চিন্তা করি। ভাবি যে, ওটা ছাড়া অন্য সকল কিছুই ক্লান্তিকর ও মূল্যহীন। এই অনুপম ক্রীমকে আমাদের অন্তরের গভীরে অবশ্যই লালন করতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর