নাইট মার্চ

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৭ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১২ ১৪২৭,   ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

নাইট মার্চ

 প্রকাশিত: ১৮:৩৩ ২৩ মে ২০২০   আপডেট: ২০:৫৪ ২৪ জুন ২০২০

১২তম লং কোর্সের পাসিং আউট প্যারেড পরবর্তী গ্রুপ ছবি

১২তম লং কোর্সের পাসিং আউট প্যারেড পরবর্তী গ্রুপ ছবি

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ। ১৯৬৫ সালে জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশুনা করেছেন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রয়াল রোডস ইউনিভার্সিটি (বিসি), ক্যানাডা এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে। অধ্যয়ন বিভিন্ন বিষয়ে। সামরিক বাহিনীতে চাকরি করে মেজর পদবীতে অবসর গ্রহণ করেন। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘অন্য জীবন’ এবং অনুবাদ গ্রন্থ ‘মুরাকামির ছোটগল্প সংকলন।

(১৮ মে ১৯৮৫ তারিখ ছিল বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমী (বিএমএ) হতে আমার কোর্স অর্থাৎ ১২তম দীর্ঘ মেয়াদী কোর্সের পাসিং আউট প্যারেডের দিন। প্রতি বছর আমরা এই দিনটি সাড়ম্বর সহকারে উদযাপন করে থাকি। কিন্তু এ বছর কোভিড-১৯ এর কারণে এটা পালন করা সম্ভব হয়নি। এই স্মৃতিচারণা এই দিনকে উপলক্ষ্য করেই।)

“শেষ রোদ এখন মাঠের পরে খেলা করে, নেভে।
ঝাউফল ঝরে ঘাসে...
সেইসব বাসনার দিনগুলো, ঘাস রোদ শিশিরের কণা..
নক্ষত্ররা চুরি করে নিয়ে গেছে, ফিরিয়ে দেবে না তাকে আর।”- জীবনানন্দ দাশ

সেনাবাহিনীতে ম্যাপ রিডিং ও নাইট মার্চ– এই শব্দ দুটো খুবই পরিচিত। দুটোই অপারেশন সহায়ক হিসেবে অতি প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। কারণ সেনাবাহিনীর অধিকাংশ অপারেশনই ম্যাপের সহায়তা নিয়ে এবং রাত্রিকালে পরিচালনা করা হয়ে থাকে। নাইট মার্চকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পরিভাষায় রাত্রিকালীন পদযাত্রা বলে। আমি কৌতুক করে বলতাম রাত্রিকালীন ভ্রমণ। অপরদিকে কম্পাস ও ম্যাপ রিডিং এর জ্ঞান না থাকলে অজানা স্থানে গমনাগমন বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল খুবই দূরুহ হয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, সামরিক ড্রিল ও শারীরিক দক্ষতা (Physical Efficiency) অর্জনের সমান্তরালে ন্যূনতম এই দুটো বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে কাউকেই এই বাহিনীর কার্যকরী সদস্য বলে গণ্য করা হয় না। এটা শুধুমাত্র বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্যে নয়, পৃথিবীর তাবৎ সেনাবাহিনীর জন্যেই সত্য।

ম্যাপ রিডিং বিষয়টি যে খুব কঠিন, তা কিন্তু নয়। তবে মিলিটারি একাডেমীতে আমাদেরকে এই শিক্ষাটি দেয়া হত কঠিনভাবে। হাতেকলমে। এর ব্যবহারিক ক্লাস অনুষ্ঠিত হত বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমীর (বিএমএ) পশ্চাতে অবস্থিত পাহাড়ের চূড়ায়, যেখানে হলিউডের মত বিশাল অক্ষরে লেখা আছে ‘চির উন্নত মম শির’। ওটাই বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমী বা সংক্ষেপে বিএমএ’র প্রশিক্ষণের মূলমন্ত্র। এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে আমরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গর্বিত অফিসার হব। কিন্তু ‘চির উন্নত মমশির’ পর্যন্ত পৌঁছা সহজ ব্যাপার ছিল না। প্রায় ৩০০ ফুট উচ্চতায় খাঁড়া পাহাড়ের ঢালু বেয়ে আমাদেরকে উঠতে হত। প্রতি দুইজন ক্যাডেটকে ১২০ কেজি ওজনের কাঠের লগ নিয়ে অথবা ন্যূনতম ৩০ কেজি ওজনের পাথর বা সিমেন্টের তৈরী ‘শেল’ (দেখতে অবিকল আর্টিলারি শেলের মত) নিয়ে উঠতে হত সেখানে। পথিমধ্যে কেউ ভুল করলে গ্রুপ পানিশমেন্ট চলতে থাকত। পরিশেষে পাহাড়ের চূড়ায় উঠার পর গরম, ক্লান্তি ও অবসাদের কারণে আমাদের সবার মাথা শূন্য হয়ে যেত।

পাহাড়ের চূড়া থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পশ্চিমে ভাটিয়ারী সমুদ্র সৈকত। সৈকত আর একাডেমীর মধ্য দিয়ে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইন পরস্পরের সমান্তরালে বয়ে গেছে। একদিকে সারি সারি পাহাড়। ঢেউয়ের মত বিস্তৃত হয়ে হতে হাটহাজারি আর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের দিকে চলে গেছে। এই পাহাড়ের ভেতরে আমাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের মাঠ ও ফায়ারিং রেঞ্জ। আমাদের জন্যে আরেকটি নরকসম জায়গা। বিএমএ’র পশ্চিম বিশাল বঙ্গোপসাগর। সৈকতে অনেকগুলো পুরনো জাহাজ। শুধুমাত্র কাঠামো নিয়ে জলের উপরে ভাসছে ভেঙে ফেলার অপেক্ষায়। এটাই সীতাকুন্ড শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ডের উপকূলীয় অঞ্চলে গড়ে উঠা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পুরাতন জাহাজ ভাঙ্গা এলাকা। এটা চট্টগ্রাম শহরের ২০ কি. মি. উত্তর-পশ্চিমে সীতাকুন্ড উপকূলে ফৌজদার হাটের ১৮ কি.মি. এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। ১০০শ’টির অধিক ইয়ার্ড, দুই লক্ষেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থান এবং দেশের মোট ইস্পাতের অর্ধেকের যোগান দেওয়ায় এটা পৃথিবীর বৃহত্তম জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। জানা যায়, ১৯৬০ সালের প্রলয়ংকারি জলোচ্ছ্বাসে গ্রীক জাহাজ এম ভি অলপাইন আটকে পড়ে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড সমুদ্র উপকূলের ফৌজদারহাট এলাকায়। দীর্ঘ কয়েক বছর আটকে থাকার পর ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রাম স্টিল মিলের কর্মীরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় জাহাজটি ভাঙ্গা শুরু করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি জাহাজ আল আব্বাস বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চট্টগ্রামে আটকা পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মরত একদল রাশিয়ান জাহাজটিকে ফৌজদার হাট উপকূলে নিয়ে আসে। এরপর ১৯৭৪ সালে কর্ণফুলী মেটাল ওয়ার্কশপ লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি জাহাজটি স্ক্র্যাপ হিসেবে কিনে নিয়ে ভাঙ্গা আরম্ভ করলে স্বাধীন বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের গোড়াপত্তন হয়।

যাই হোক, ‘চির উন্নত মম শির’ থেকে আমরা জাহাজের কঙ্কালগুলোর মত শূন্য মস্তিষ্কে নির্নিমেষ নয়নে সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এক সময়ে প্লাটুন কমান্ডারের উচ্চকিত ডাকে সম্বিত ফিরে পেয়ে ম্যাপ ও বাস্তব পৃথিবীতে ফিরে আসতাম। তিনি আমাদেরকে ম্যাপ ও কম্পাসের সাহায্য নিয়ে সামরিক ম্যাপের উপরে নিজেদের অবস্থান বের করতে বলতেন। ম্যাপের উপর থেকে অন্য দুই তিনটি জানা বস্তুর গ্রিড রেফারেন্সের সাহায্য নিয়ে কম্পাস দিয়ে কৌণিক দূরত্ব বের এবং ‘ইন্টারসেকশন’ নামক পদ্ধতি ব্যবহার করে। কিন্তু আমাদের অধিকাংশেরই সেই মুহূর্তে মস্তিষ্কের নিউরনগুলো একেবারেই কাজ করত না। ক্লান্তি ও ফ্যাটিগের কারণে। ফলে ম্যাপ রিডিং এর মত একটা সহজ বিষয়ে পাশ করা আমাদের অনেকের জন্যেই কষ্টসাধ্য হয়ে যেত। কারও কারও বিএমএ ট্রেনিং এর দুই বছরই লেগে যেত। তারপরেও কেউ কেউ পাশ করতে পারত না। তাকে পাসিং আউট প্যারেড করতে দেয়া হলেও তার গমনাদেশে সে যে অফিসার্স স্ট্যান্ডার্ড ম্যাপ রিডিং-এ পাশ করেননি তা স্পষ্ট করে লিখে দেয়া হত। ফলে ইউনিটে যোগদানের পর তাকে পুনরায় এরিয়া সদর দপ্তরের অধীনে স্টেশন স্কুলের আওতায় তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে হত। নতুবা লেফটেন্যান্ট পদে তার পদায়ন হত না।

আমি পরবর্তীতে চিন্তা করে দেখেছি যে, চরম উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে ঘর্মাক্ত কলেবরে পরিশ্রান্ত অবস্থায় পরীক্ষা দেয়ার কারণই অকৃতকার্য হবার প্রধানতম কারণ ছিল। এবং এ কারণেই মিলিটারি একাডেমীতে আমাদের সাথে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা ইএমই ও ইঞ্জিনিয়ার কোরের অধিকতর শিক্ষিত বুয়েট বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করা মেধাবী অফিসার ক্যাডেটরাও এই পরীক্ষায় অধিকতর হারে অকৃতকার্য হতেন। আমরা লং কোর্সের ক্যাডেটরা কিছুটা তরুণ হবার কারণে আমাদের ব্রেইন হয়ত তবুও কিছুটা কাজ করত। কিন্তু বুয়েট, মেডিক্যাল থেকে সদ্য পাশ করে আসা ইঞ্জিনিয়ারদের মাথা বয়সের কারণে একেবারেই কাজ করত না। অবশ্য এই বাইরেও অভিযোজনের একটি ব্যাপার ছিল যাতে আমরা কম বয়সী হবার কারণে তাদের থেকে এগিয়ে থাকতাম এ কারণেই বলা হয়ে থাকে “যখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।” এছাড়াও অনেকেই হয়ত যুক্তি দিতে পারেন যে, এই ব্যবহারিক জ্ঞানগুলো কি শান্ত পরিস্থিতিতে শিক্ষা দেয়া সম্ভব হত না? হয়তবা অবশ্যই হত। কিন্তু পৃথিবীর সকল সেনাবাহিনীতেই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ব্যবহার্য শিক্ষাগুলো যুদ্ধ পরিস্থিতির অনুরূপ পরিবেশেই শিক্ষা দেয়া হয়ে থাকে। এবং সেটাই যৌক্তিক। কারণ এই শিক্ষাগুলো এমন যে, যুদ্ধের বিপর্যয়ের মধ্যে আপনার অজান্তেই আপনাকে দিয়ে সঠিক কাজটি করতে সহায়তা করবে। শিক্ষা অন্তর্গত হয়ে যাবার কারণে। যেমনভাবে, নামাজের ভেতরে আমরা পরম্পরা ঠিক রেখে প্রতিটি কাজ যেমন রুকু, সেজদা ইত্যাদি সম্পাদন করে থাকি। কখনই ভুল হয় না।

যাই হোক, মিলিটারি একাডেমীতে আরও তিনটা স্থান ছিল খুবই কঠিন ধরনের। পিটি বা ফিজিক্যাল ট্রেনিং গ্রাউন্ড, প্যারেড গ্রাউন্ড বা ড্রিল গ্রাউন্ড এবং অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রাউন্ড। আমার গল্পে আমি শুধু প্যারেড গ্রাউন্ডের কথা বলব। মিলিটারি একাডেমীর প্যারেড বা ড্রিল গ্রাউন্ডটি ট্রেনে করে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাবার পথে দেখা যায়। আয়তক্ষেত্রাকৃতি একটা বিশাল মাঠ। কংক্রিটের তৈরী। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে মিলিটারি একাডেমী অতিক্রম করার সময়ে ট্রেনের জানালা দিয়ে আপনি এই গ্রাউন্ডের একটা মনোরম দৃশ্য অবলোকন করবেন। প্যারেড গ্রাউন্ডের ভেতরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে ক্যাডেটরা প্যারেড করছে। ব্যান্ডের তালে তালে। তাদের লংবুটের আঘাতে কেঁপে উঠছে কঠিন শিলাময় মাঠ। এডজুটেন্ট ঘোড়ায় আরোহণ করে তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দূর থেকে মনে হবে পুরো মাঠটা আনন্দে মুখরিত। কিন্তু আপনি জানেন না যে, এই ড্রিলের প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত আছেন সুবেদার মুজিব। আমরা সকলেই ডাকি ‘গাপ্পা’ বলে। এই ডাকের অর্থ কি এবং কে প্রথম তাকে এই নামে ডেকেছিল তার কিছুই আমরা জানি না। তবে তার গগনবিদারী চিৎকারে প্যারেড গ্রাউন্ডে অবস্থানকারী সকল ক্যাডেটরা শংকিত ও সন্ত্রস্ত। প্যারেড গ্রাউন্ডের চারপাশে লাল রঙের ইটের মাঠ। ইটগুলোর ফাঁক দিয়ে লাল মাটি দৃশ্যমান। কিন্তু এই মাঠে কখনই সবুজ ঘাস জন্মায় না। কারণ সুবেদার মুজিব যখন কারও দোষ ধরেন, তখন তার আর প্যারেড গ্রাউন্ডে থাকার অধিকার থাকে না। তাৎক্ষণিকভাবে সে চলে যায় এই লাল গ্রাউন্ডে। (আমার এক কোর্সমেট রাজিউর রহমান বিশ্বাস ট্রেনিং এর দুই বছরকালের অধিকাংশ সময়ই এই মাঠে কাটিয়েছিল।) অতঃপর নায়েক (কর্পোরাল) মান্নান নামের এক ড্রিল স্টাফ তাকে ড্রিল পিরিয়ডের অবশিষ্ট সময় ধরে তাকে শাস্তি প্রদান করেন। ডিগবাজি, সাইডরোল, ফ্রগজাম্প, ক্রলিং কোনকিছুই বাদ যায় না। নায়েক মান্নানের উত্তাপ গাপ্পার চেয়েও কয়েকগুণ বেশী। ঠিক যেমন সূর্যের চেয়ে বালির উত্তাপ বেশী থাকে! মিলিটারি একাডেমীর লাল গ্রাউন্ডে অবস্থান করেছে, অথচ নায়েক মান্নানকে ভুলে গেছে এমন ক্যাডেট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে বলে আমি মনে করি না।

আমার গল্পের নায়ক নায়েক মান্নান। কাহিনী তার ম্যাপ রিডিং ও নাইট মার্চ পরীক্ষা নিয়ে। মিলিটারি একাডেমীতে নয়। চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে উত্তরে হাটহাজারী এলাকায়। ১৯৮৫ সনের শেষের দিকের কাহিনী। ১৯ মে ১৯৮৫ সালে তারিখে পাসিং আউটের পর আমার তখন বদলী হয়েছে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে। সিগন্যাল ইউনিটে। সামরিক জীবনের প্রথম পোস্টিং আমার। প্রথমেই একটা কথা বলে রাখা ভাল যে, এটা সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ। নৈর্ব্যক্তিক ধরণের। এখানে কোন ব্যক্তিবিশেষকে বড় বা ছোট করার কোন প্রয়াসই আমার নেই। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমীতে নায়েক মান্নান আমার প্লাটুন স্টাফ ছিলেন না কখনই। সুতরাং আমার সাথে তার প্রত্যক্ষ ইন্টারেকশন কখনই হয়নি। আমি শুধু ড্রিল গ্রাউন্ডে তার চিৎকার-চেঁচামেচি এবং লাল গ্রাউন্ড থেকে ফিরে আসা ক্যাডেটদের কষ্টের গল্প শুনেছি।

আমাদের প্লাটুনের ড্রিল স্টাফ ছিলেন নায়েক জুলহাস। ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্য। সম্ভবত টেকনিক্যাল আর্মসের সদস্য হবার কারণে আমাদের সাথে তার ডিলিংস কিছুটা ভিন্নতর ছিল। শস্তি প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে তিনি আমাদেরকে মোটিভেশনের মাধ্যমে (!) ড্রিল শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করতেন। এই যেমন তিনি বলতেন, “আপনারা যদি আগামী ১৫ মিনিট মন দিয়ে ড্রিল করেন, তবে আমি আপনাদেরকে পাঁচ মিনিটের বিরতি দেব। যেখানে আপনারা ‘ইউজ রুমাল’ করতে পারবেন।” বি এম এ’র ড্রিল গ্রাউন্ডে একাধারে পাঁচ মিনিট বিরতি করতে পারা এবং সেই সাথে পকেট থেকে সাদা রুমাল (১ফুট বাই ১ফুট সাইজের) বের করে নিজের ঘাম মুছতে পারা একটা বিশাল আনন্দের ব্যাপার ছিল আমাদের কাছে। বিশেষ করে যখন অন্য প্লাটুনের সতীর্থরা নারকীয় অত্যাচার ভোগ করছিল। জীবনে এই প্রথম বারের মত আমি বুঝতে শিখেছিলাম যে, সুযোগ সুবিধা কমিয়ে দিতে দিতে মানুষকে এমন পর্যায়েও নিয়ে আসা সম্ভব, যখন তার কাছে সামান্যতম সময়ের জন্যে ‘আরামে দাঁড়াও’ পজিশনে অবসর পাওয়াও বিশাল উপভোগ্য বিষয় বলে মনে হতে পারে। ঠিক যেন মাসলোর হিয়ারারকি অফ নীড (Maslow's hierarchy of needs ) এর সর্বনিম্ন স্তরের মত। যেখানে আপনার মৌলিক শরীরবৃত্তিক চাহিদা যেমন, খাওয়া-দাওয়া, পরিচ্ছদ, সামান্যতম আরাম আয়েশ ইত্যাদিই আপনাকে সন্তুষ্ট রাখবে। আর কিছুরই প্রয়োজন হবে না। অবশ্য এই স্তর অতিক্রম করলেই আপনার চাহিদা পুনরায় বেড়ে যাবে। তখন আপনি ক্রমান্বয়ে আরও উচ্চমার্গের চাহিদা যেমন নিরাপত্তা, ভালবাসা, সম্মান ইত্যাদি অর্জনের দিকে ধাবিত হবেন। আমাদের ড্রিল গ্রাউন্ডে অবশ্য উপরের স্তরের চাহিদার দিকে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তারপরেও আমাদের এক প্লাটুনমেট জাকারিয়া এই পাঁচ মিনিট সময়ের মধ্যেই লুকিয়ে লুকিয়ে মুড়ি অথবা বিস্কুট খাওয়ার চেষ্টা করত। ইউজ রুমালের সমান্তরালে। জুলহাস স্টাফের ভাল ব্যবহারের বিনিময়ও আমরা দিয়েছিলাম। প্রথম টার্মের ৪টি প্লাটুনের মধ্যে আমাদের প্লাটুন ড্রিল প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে একটা কৌতুক গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। শেষ বিচারেরর দিন (হাশর) আল্লাহ এক ব্যক্তিকে তার আমলের উপরে ভিত্তি করে অপশন দিয়েছেন সাতটা দোযখের (জাহান্নাম, হাবিয়া, সাকার, হুতামাহ, সাঈর, জাহীম ও লাযা) যেকোন একটা নিজের জন্যে নির্বাচন করে নেয়ার জন্যে। সেই ব্যক্তি আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করল একটা গাইড দেয়ার জন্যে। সে স্বচক্ষে দোযখ সমূহ দেখবে এবং নিজের জন্যে তুলনামূলক কম কষ্টের দোযখ নির্বাচন করবে। একজন ফেরেশতাকে দেয়া হল তার গাইড হিসেবে। সকল নরকেই খুব কষ্টের অবস্থা। দেখার পর সেই ব্যক্তি প্রবল হতাশার ভেতরে সর্বশেষ দোযখের পাশে দেখতে পেল একদল লোক মহা আনন্দের সাথে দোযখের বেলাভূমিতে বসে খাওয়া-দাওয়া করছে। লোক মহাখুশী। সে বলল, “আমি এই দোযখেই যেতে চাই।“ সুতরাং তার ইচ্ছানুযায়ী সেই দোযখেই তাকে স্থান দেয়া হল। কিন্তু সেখানে পৌঁছার পর সে দেখল এই দোযখ অন্য দোযখগুলোর চেয়েও অনেক বেশী ভয়ংকর। সে ফেরেশতাকে বলল, “আমি তো কিছুক্ষণ পূর্বেই দেখে গেলাম এরা খাওয়া-দাওয়া করছে। তাহলে এখন এমন কেন?” ফেরেশতা তাকে বলল, “এটা সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্যে নির্ধারিত দোযখ। এর সদস্যরা প্রতি এক মিলিয়ন বছর পর পর দশ মিনিটের জন্যে একটা ‘টিব্রেক’ বিরতি পায়। সেই সময়ে তারা সিঙ্গারা খায় ও চা পান করে। তুমি তাদেরকে সেই বিরতির সময়েই দেখেছ।”

দুই বছর কঠোর প্রশিক্ষণের পর ১৯৮৫ সালের ১৯ মে তারিখে আমরা বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমীর প্যারেড গ্রাউন্ডে অসাধারণ ড্রিল শৈলী প্রদর্শন করে আমরা ‘বিদায়ী কুজকাওয়াজ’ সম্পন্ন করলাম। আমার বদলী হল একাডেমী থেকে মাত্র কয়েকটা পাহাড় ডিঙিয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে। সিগন্যাল ব্যাটালিয়নে। বিশাল একটা পাহাড়ের পাদদেশে আমাদের ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর। রাতের অন্ধকারে বন্য শূকরের পাল পাহাড় থেকে নেমে আসে। আমাদের লাগানো গাছের চারা উপড়ে ফেলে। ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের পূর্ব পাশ দিয়ে চট্টগ্রাম – খাগড়াছড়ি মহাসড়ক বয়ে গেছে। চট্টগ্রাম শহরের ‘ষোল শহর’ এলাকা থেকে একটা রেললাইন মহাসড়কের সমান্তরালে আমাদের ইউনিটের পাশ দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয়ের দিকে চলে গেছে। সকালের ট্রেনিং পিরিয়ডের সময়ে ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে ইউনিটের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে সৈনিকদের সাথে পারস্পারিক ভাব বিনিময় করে। যার মূল কথা হল – “নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস। নদীর ওপার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে; কহে, যাহা কিছু সুখ সকলি ওপারে।”(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

১২তম লং কোর্সের টার্ম কমান্ডার ও কয়েকজন প্লাটুন কমান্ডার প্রশিক্ষক

ইউনিটের সৈনিকরাই পাহাড়ের পূর্বপাশের পাথরের মত শক্ত এঁটেল মাটি কোদাল দিয়ে কেটে বিশাল এক ফুটবল মাঠ তৈরী করছে। এই মাঠ তৈরী সম্পন্ন হবার পর তারা এই মাঠে ফুটবল খেলবে। এটা ইউনিটের প্রশিক্ষণ মাঠও। কয়েকটা এসবস্টসের টিনের দোচালা ছাঁদ দিয়ে তৈরী ট্রেনিং শেড আছে এখানে। ইউনিটে আসার পর আমার প্রাত্যহিক অবস্থান মূলত এটাই। সকালে এই মাঠেই আমরা পিটি (ফিজিক্যাল ট্রেনিং) করি। প্রথমে ইউনিট অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নূর মোহাম্মদের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের একাংশকে বৃত্তাকারে ঘুরে আসা রাস্তায় প্রায় চার মাইল পথ দৌড়ে নিত্যকার দিন শুরু করি। পুরো ইউনিট। অধিনায়কের বাসস্থানের নাম ‘বাঁশখালী হাউজ’ (বর্তমানে এখানে ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউজ বা জিওসির বাসস্থান)। বৃত্তাকার রাস্তার ঠিক অর্ধেক দূরত্ব অর্থাৎ ইউনিট থেকে দুই মাইল দূরে। উনি নিজের বাসস্থানের কাছে এসে আমাদেরকে উৎসাহ দিয়ে চলে যান। আমরা আরও দুই মাইল দৌড়ে অতিক্রম করার পর ইউনিটে পৌছাই এবং কয়েক মিনিট পিটি করি। তারপর সাইকেল চালিয়ে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার অফিসার্স মেসের বিওকিউ বা ‘ব্যাচেলর অফিসার্স কোয়ার্টারে’ ফিরে আসি। ব্যাটম্যান মেস থেকে আমাদের নাস্তা এনে রাখে। দ্রুত নাস্তা করে পুনরায় সাইকেল চালিয়ে ইউনিটে ফিরে যাই। শুরু হয় প্রশিক্ষণের সময়। দুপুর ১টা পর্যন্ত। আমি এখানে ট্রেনিং অফিসার। যেহেতু আমার বেসিক কোর্স তখনও করা হয়নি, সেহেতু আমাকে ম্যাপ রিডিং এবং নাইট মার্চ সম্পর্কিত তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাসগুলো নিতে ও পরিচালনা করতে হয়।

পুরো বিকেল সময়ে সৈনিকরা পাহাড়ের মাটি কাটে। ফলে ক্লান্তির কারণে তারা সকলেই সন্ধ্যার পর পরই ঘুমিয়ে পড়ে অথবা ঘুমিয়ে পড়তে বাধ্য হয়। মাটি কাটা নিয়ে তাদের কিছু অভিযোগও আছে অধিনায়কের বিরুদ্ধে। একবার জিওসির বরাবরে প্রেরণ করা তাদের একটা বেনামী চিঠি আমার হস্তগত হয়েছিল। তাতে লেখা ছিল, “স্যার, সালাম নেবেন। ইউনিটের বড় হুজুরের জ্বালায় আমরা আর সন্ধ্যার পর জেগে থাকতে পারি না।” কিন্তু জিওসি অধিনায়ককে খুব ভাল বাসেন। ফলে সৈনিকেরা দিনের পর দিন মাটি কেটেই চলে। মাঠটি উঁচুনিচু একটা প্রস্তরময় ফুটবল মাঠে রুপান্তরিত হতে আরও প্রায় এক বছর সময়কাল লাগবে।

ইউনিটের প্রশিক্ষণের সাথে সম্পর্কিত থাকার পাশাপাশি আমাকে আরেকটা দায়িত্ব পালন করতে হত। সেটা ডিভিশন সদর দপ্তরের ‘ডিউটি অফিসার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। আনুমানিক প্রায় এক পক্ষকাল পর পর আমাকে এই ডিউটি করতে হত। খুব কঠিন দায়িত্ব নয়। অফিস শেষ করে ডিভিশন সদর দপ্তরের একটা কক্ষে দুপুর দুইটা হতে পরের দিন সকাল সাতটা পর্যন্ত অবস্থান করা এবং এই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পাঠানো বিভিন্ন অপারেশনাল খবর একত্রিত করে ডিভিশনের গ্রেড থ্রি স্টাফকে জানানো। এই কক্ষে একটা এন ডব্লিউ ডি (নেশন ওয়াইড ডায়ালিং) টেলিফোন ছিল। এই টেলিফোনের বৃত্তাকার ডায়াল ছিল যা সর্বদাই ছোট্ট একটা সোনালী রঙের তালা দিয়ে বন্ধ করা থাকতো। এই টেলিফোনের মালিক বা দায়িত্বে ছিলেন ডিভিশনের জি এস ও- ২ এডুকেশন। নাম মেজর জহুর। বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে তার সাবজেক্ট ছিল পদার্থবিদ্যা। কিন্তু সেনাবাহিনীতে আসার পর তাকে ম্যাপ রিডিং শিখাতে হয়। সকল স্তরের সৈনিকদের। অবশ্য তার ব্যক্তিগত আগ্রহ সাহিত্যেই বেশী ছিল। ডিউটি অফিসার হবার সূত্রে তার সাথে আমার নিবিড় পরিচিয়। খুবই পাগলাটে ধরণের জ্যেষ্ঠ অফিসার। অনেকে পেছনে তাকে ঐ নামেই ডাকে। তিনি ভাবতেন যে জুনিয়র অফিসার যারা এখানে ডিউটি করতে আসে তারা রাতের বেলায় ডিউটি কক্ষের এন ডব্লিউ ডি টেলিফোন ব্যবহার করে প্রেম করে। তাই তিনি ডায়ালটিকে তালাবদ্ধ করে রাখতেন। আমি যেদিন প্রথম দিন তার অফিসে ডিউটি অফিসারের দায়িত্ব সম্পর্কে ব্রিফিং নিতে গেলাম, সেদিন তিনি আমাকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি প্রেম কর?” আমি না সূচক উত্তর দিতেই তিনি প্রচন্ড ক্ষেপে গেলেন। বললেন, “তাহলে এই এন ডব্লিউ ডি’ টেলিফোনে এত বিল আসে কেন? বাধ্য হয়ে গত মাসে আমি এতে তালা লাগিয়েছি।” আমি নিরুত্তর। তবে আমি জানি যে, তিনি টেলিফোনে তালা লাগানোর পরেও এখান থেকে এন ডব্লিউ কল করা বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে আমাদের ইউনিটের আমার চেয়ে জ্যেষ্ঠ লেফটেন্যান্ট ও ক্যাপ্টেনদের। সিগন্যাল ইউনিটের হবার কারণে ডিউটির দিন তারা ইউনিটের টি এম শপ (টেকনিক্যাল মেইন্টেনেন্স শপ) থেকে মেরামতাধীন কোন টেলিফোন সেটের বৃত্তাকার ডায়ালটি খুলে নিয়ে যান। অতঃপর ডিভিশন সদর দপ্তরের টেলিফোনের ডায়ালটি স্ক্রু ডাইভার দিয়ে খুলে ফেলে ইউনিট থেকে আনা ডায়াল লাগিয়ে সারারাত কথা বলেন এবং কর্তব্য শেষে মেজর জহুরের তালাসহ ডায়ালটিকে পুনরায় সেখানে স্থাপন করে যান। পার্থিব কারও পক্ষে ঘুণাক্ষুরেও আবিষ্কার করা সম্ভব নয় যে, এই তালাবদ্ধ টেলিফোন থেকে বিগত রাতে পারস্পারিক ভাব বিনিময় করেছে কোন যুবক ও যুবতী।

মেজর জহুরের সাহিত্য প্রীতির কথা আপনাদেরকে আমি বলেছি। বিখ্যাত ভারতীয় লেখক বুদ্ধদেব গুহের ‘মাধুকরী’ নামক উপন্যাস তখন সদ্য প্রকাশিত হয়েছে। বইটিতে বন, অরণ্য ও প্রকৃতি নিয়ে অসাধারণ বর্ণনা দেয়া আছে। কাকতালীয়ভাবে বইটা প্রকাশের পরই আমি পড়েছি। মেজর জহুরের অফিসের টেবিলের উপরে বইটা রাখা ছিল। সম্ভবত স্টেশন লাইব্রেরীর জন্যে বইটা কেনা হয়েছে। একদিনের ডিউটি শেষে তাকে প্রতিবেদন দেয়ার জন্যে তার অফিসে ঢুকে আমি বইটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বইটা পড়েছ?” আমি ‘হ্যাঁ’ বলতেই তিনি ভীষণ অবাক। সেনাবাহিনীর একজন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট বইটা পড়েছে তা তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, মনে হয়। আমাকে তিনি পৃথু ঘোষ, ঠুঠা বাইগা, রুষা – এই চরিত্রগুলোর কথা জিজ্ঞেস করলেন। এক এক করে। তারপর বললেন, “তুমি কি জান, আমার মেয়ের নাম কি রেখেছি? পৃথু!” এরপর থেকে মেজর জহুরের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

একদিন বিকেলে গেইমস পিরিয়ডের পর দেখি মেজর জহুর ‘ইবিআরসি অফিসার্স মেস’ এর বিওকিউতে আমার কক্ষে। বললেন বেড়াতে বেড়াতে চলে এসেছেন। লেফটেন্যান্ট মোরশেদ স্যার আমার ইউনিটের অফিসার। আমার ইউনিটের কোয়ার্টার মাস্টার। আমার সাথে তিনিও ভীষণ অবাক। এরপর থেকে স্টেশন স্কুলের যে কোন ম্যাপ রিডিং পরীক্ষা অথবা নাইট মার্চের সময়ে আমাদের ইউনিট থেকে আমাকে প্রেরণ করা হত পরীক্ষা পরিচালনার জন্যে। হয়ত মেজর জহুর ইউনিটিকে বলতেন আমাকে প্রেরণ করার জন্যে। অথবা মোরশেদ স্যারের প্ররোচনায় শুধুমাত্র আমারই নাম পাঠানো হত। উল্লেখ্য, মেজর জহুরের অধীনে শুধুমাত্র একজন জেসিও প্রশিক্ষক এবং দুই তিনজন এনসিও প্রশিক্ষক ছিল। কোন অফিসার প্রশিক্ষক না থাকার কারণে প্রতিটা পরীক্ষা পরিচালনার সময়েই ডিভিশনের বিভিন্ন ইউনিট থেকে কনিষ্ঠ অফিসারদেরকে নিজের অধীনে সংযুক্ত করতেন।

এভাবেই শুরু হল ম্যাপ রিডিং ও নাইট মার্চ প্রশিক্ষক হিসেবে চট্টগ্রামের বনে বাদাড়ে, পথে প্রান্তরে এবং পাহাড়ের ভেতরে আমার রাত্রিকালীন পদযাত্রা বা নৈশ ভ্রমণ! চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পূর্বপ্রান্তে আমার ইউনিট। ৫ সিগন্যাল ব্যাটালিয়ন। ইউনিটের প্রবেশদ্বার থেকে ১৫০ গজ পূর্বদিকে হেঁটে গেলেই চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক। জায়গাটার নাম বালুচরা বাজার। মহাসড়ক দিয়ে কিছুদূর উত্তরে গেলে একটা পার্শ্বরাস্তা মহাসড়ক থেকে বের হয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের উত্তর দিয়ে সেনানিবাসকে আড়াআড়িভাবে অতিক্রম করার পর প্রথমে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে তারপর পশ্চিম দিকে বঙ্গোপসাগরের পানে চলে গেছে। উঁচুনিচু বন্ধুর এই রাস্তা। পাহাড়ে ঊঠার আগে এই রাস্তা থেকে দক্ষিণে একটা সরু মেঠো পথ দিয়ে একটা খাঁড়া পাহাড়ী ছরা বা খাল পার হয়ে আপনি একটা ক্ষুদ্র জনপদে প্রবেশ করতে পারবেন। জনপদটির নাম বরিশাল পাড়া। বরিশাল থেকে আসা শ্রমিকদের পরিবার এখানে বসবাস করে। প্রথমবার এখানে আসার পর আমার যমুনা তীরের নব্বইচরের কথা মনে হয়েছিল, যেখানে পুলিশরাও দিনে দুপুরে প্রবেশ করার সাহস পেত না। আমার ধারণা আমি ছাড়া চট্টগ্রাম সেনানিবাসের খুব কম মানুষই এই পাড়ায় বেড়াতে এসেছে। স্থলের ভেতরে একটা ক্ষুদ্র দ্বীপের মত এই বসতি। এর অধিবাসীরা চট্টগ্রাম- ভাটিয়ারী রাস্তার উত্তর পাশে গড়ে উঠা ইটের ভাঁটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। খাল বা ছরাটির উপরে ভাঙা কাঠ ও গাছগাছালির কাণ্ড দিয়ে তৈরী একটা সাঁকো আছে। খুব সতর্কতার সাথে এর উপর দিয়ে পা না ফেললে নীচে পড়ে যাবার ১০০% সম্ভাবনা। বাইরের পৃথিবীর সাথে এই সাঁকোই এই জনপদের একমাত্র সংযোগ। এই ছরার জলে আমি একবার নেমেছিলাম। গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহের সময়েও এর জল ভীষণ রকমের শীতল থাকে।

মূল রাস্তাটি একপাশে ভাটিয়ারী গলফ এন্ড কান্ট্রি ক্লাব এবং অন্য পাশে ভাটিয়ারী লেইককে রেখে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমীর পাশ দিয়ে সাগরের থেকে একটু দূরে চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের সাথে মিলিত হয়েছে। গলফ গ্রাউন্ডের উপরের ‘পিক পয়েন্ট’ থেকে বঙ্গোপসাগর ও সূর্যাস্ত অবলোকন করা যায়। অসাধারণ নয়নাভিরাম দৃশ্য। আমরা প্রতি মাসে একবার পিক পয়েন্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে হাঁটতে হাঁটতে আসি। ‘রুট মার্চ’ করার জন্যে। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমী হতে চটতগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক দিয়ে আরও কয়েক কিলোমিটার উত্তরে গেলেই চন্দ্রনাথ পাহাড়। এই পাহাড়ের চূড়ায় চন্দ্রনাথ মন্দির। এ ছাড়াও সেখানে আছে একটা ইকো পার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন। চন্দ্রনাথ পাহাড় থেকে কয়েকটা ঝর্না বা ছরা গাঢ় সবুজের মধ্য দিয়ে সমুদ্র ও পূর্বের হালদা নদীর দিকে প্রবাহিত হয়েছে। বর্ষা ঋতুতে এগুলোতে প্রবল স্রোত থাকে এবং কয়েক মাইল দূর থেকে জলপ্রবাহের শব্দ শোনা যায়।

চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কটি চট্টগ্রাম সেনানিবাসকে অতিক্রম করার পর ফতেয়াবাদ, চট্টগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয় এবং হাট-হাজারী এলাকা হয়ে খাগড়াছড়ির দিকে চলে গেছে। মহাসড়ক থেকে বেশ কিছুটা দূরত্বে পূর্ব দিকে একটা সর্পিলাকার নদী। চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের মোটামুটি সমান্তরালে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। এই নদীটার নামই হালদা নদী। উৎপত্তিস্থল খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার হালদাছড়া নামের একটা পাহাড়ি ঝর্ণা। এখান থেকে উৎসারিত হবার পর নদীটি ফটিকছড়ি উপজেলার উত্তর-পূর্ব কোণ দিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় প্রবেশ করেছে। অতঃপর ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান, চট্টগ্রাম সদরের কোতোয়ালী থানা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কালুরঘাট এলাকায় পূর্বদিক থেকে বয়ে আসা কর্ণফুলী নদীর সাথে মিলেছে। মোট দৈর্ঘ্য ৮৮ কিলোমিটার। ছোট বড় অসংখ্য পাহাড়ী ছরা বা ঝর্ণা হালদা নদীর মূল স্রোতে এসে মিশেছে। এছাড়াও কর্ণফুলীর সাথে মিলিত কারণে এই নদী এবং এর উপনদী বা খালগুলোতে প্রতিনিয়ত জোয়ার-ভাটা হয়। প্রকৃতির বিস্ময়কর সৃষ্টি হালদা নদী। এটা এশিয়ার প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র, যেখান থেকে সরাসরি রুই জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়।

উপরের বর্ণিত এলাকা সমূহই আমাদের সৈনিকদের জন্যে নির্ধারিত প্রশিক্ষণ এলাকা। এই এলাকার মধ্যেই আমি ইউনিটের সৈনিকদের নিয়ে অথবা স্টেশন সেন্ট্রাল স্কুলের ম্যাপ রিডিং বা নাইট মার্চ দলকে অনুশীলন করানোর জন্যে রাতবিরেতে ঘুরে বেড়াই। অসাধারণ অভিজ্ঞতাময় আমার এই ভ্রমণ। কখনও কখনও রাতে প্রবল জ্যোৎস্না থাকে। কখনও বা গভীর অন্ধকার। চাঁদের আলোতে হালদা নদীর জলের উপরটা অপরূপ উজ্জ্বল হয়ে থাকে। মনে হয় পৃথিবীর নয়, অন্য কোন জগতের এই নদী। কখনও কখনও নদীটিকে মনে হয় আমার নিজের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝাড়কাটা নদী বা যমুনার কোন শাখা। অন্ধকার রাতে যখন কোন ল্যান্ডমার্ক দৃশ্যমান থাকে না, তখন উত্তর আকাশের পোল স্টার বা ধ্রুব নক্ষত্র থেকে আমরা চলার পথের বিয়ারিং (কৌণিক দূরত্ব) নিয়ে প্রগাঢ় অন্ধকারের ভেতরে পথ চলতে থাকি। খোলা প্রান্তরের ভেতর দিয়ে। আমাদের পাশ দিয়ে শিয়ালেরা প্রবল বিক্রমে পথ চলাচল করে। বাগডাশেরা ডাকাডাকি করতে থাকে। রাত ক্রমশ গভীর হলে বিভিন্ন প্রহরে ভিন্ন ভিন্ন পোকাদের ডাক শোনা যায়। কখন বা দূরের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ভেতর থেকে হরিণের চিৎকার ভেসে আসে। এই পুরো এলাকাগুলোতে অনেকগুলো মন্দির আছে। এদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময়ে ফুলের গন্ধ মৌ মৌ করতে থাকে। মন্দিরগুলো থেকে ভজন কির্তনের সুর ভেসে আসে। মাইকে সারারাত ধরে বাজতে থাকে মাইজ ভাণ্ডারীর গান। পৃথিবীকে তখন আমার এক অতিপ্রাকৃত জগত বলে মনে হয়। মনে হয় দিনের বেলার পৃথিবী থেকে রাতের পৃথিবী কতই না ভিন্নতর!

১৯৮৫ সনের ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি বা শেষ সময়। ইউনিটে আমার চাকুরীর সময়কাল প্রায় ছয় মাস। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ডিভিশন সদর দপ্তর থেকে পুনরায় আমার ডাক পড়ল। জানুয়ারী মাসে আমি বেসিক কোর্স করার জন্যে যশোর সেনানিবাসে চলে যাব। মেজর জহুর আমার ইউনিটকে বলে দিয়েছেন আমাকে যেন স্টেশন স্কুলের নাইট মার্চ পরীক্ষা পরিচালনার জন্যে প্রেরণ করা হয়। মজার ব্যাপার হল তিনি আমাকে দিয়ে কখনওই খুব বেশী কিছু করান না। কিছুদিন পূর্বে ক্যাপ্টেন মুশফিক (পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও রাজউক কলেজ, উত্তরার অধ্যক্ষ হয়েছিলেন) এসেছেন ডিভিশনের জিএসও–৩ (এডুকেশন) হিসেবে। সমস্ত কিছু এখন মুশফিক স্যারই দেখাশুনা করে থাকেন। এমনকি নাইট মার্চের পরিকল্পনাও। আমি জহুর স্যারের সাথে বসে গল্প করি। অথবা তার কাছ থেকে তার দুঃখের কথা শুনি। প্রতিটা মানুষেরই কিছু কিছু দুঃখ থাকে যেগুলোকে সে সকলের সাথে শেয়ার করতে পারে না।

চট্টগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয় ও হালদা নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় চট্টগ্রাম সেনানিবাস স্টেশন স্কুলের ছাত্রদের নাইট মার্চ পরীক্ষার অনুশীলন বা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ছাত্রদের দলনেতা নায়েক মান্নান। তিনি মিলিটারি একাডেমির প্রশিক্ষক ছিলেন বিধায় মেজর জহুর তাকে দলনেতা হিসেবে নির্বাচন করেছেন। আমাকে দেখে তিনি কিছুটা বিব্রত। কারণ কিছুদিন পূর্বেও আমি তার ছাত্র ছিলাম। আজ উল্টো তিনিই আমার ছাত্র। আমিও কিছুটা লজ্জা পাচ্ছিলাম তার সাথে কথা বলতে। আমার চোখে তখনও ভাসছিল মিলিটারি একাডেমীর ড্রিল গ্রাউণ্ড এবং নায়েক মান্নানের সুতীব্র চিৎকার। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমী থেকে পাশ করে আসা সকল অফিসাররাই একাডেমীর ড্রিল স্টাফদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। এই ড্রিল স্টাফগণই আমাদেরকে হাতেকলমে সম্পূর্ণ সিভিলিয়ান অবস্থা থেকে রুপান্তর করে আমাদের ভেতরে সামরিক বিয়ারিং (চাল চলন) ঢুকিয়ে দিয়েছেন। কাফকার মেটামরফসিসের চেয়েও এই রুপান্তর কম অবাক করা নয়। আমি বিনীতভাবে মান্নান স্টাফকে কুশল জিজ্ঞাসা করলাম। মিলিটারি একাডেমী থেকে তার পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন পদাতিক ব্যাটালিয়নে বদলী হয়েছে। ম্যাপ রিডিং ও নাইট মার্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে তার হাবিলদার (সার্জেন্ট) পদে পদোন্নতি হবে না। তা তিনি ইতিহাসের যত বিখ্যাত ড্রিল প্রশিক্ষকই হোন না কেন।

সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে আসার পর অনুশীলন শুরু হল। পরীক্ষার্থীদেরকে সর্বমোট পাঁচটি বাউন্ড (ম্যাপ থেকে নির্ধারিত স্থান যেখানে প্রতিটি দলকে আমাদের নিকটে রিপোর্ট করতে হবে)-এ এসে প্রশিক্ষকদের কাছে রিপোর্ট করতে হবে। সবার মধ্যে আমিই কনিষ্ঠ। সুতরাং আমাকে রাখা হয়েছে শেষ বাউন্ডে। আমার কাছে এসে নায়েক মান্নানের দল রিপোর্ট করতে পারলেই অনুশীলন শেষ। অন্যরা তাদের বাউন্ডের কাজ শেষ হলে গাড়িতে করে সেনানিবাসে চলে যাবেন। আমি অনুশীলন শেষ হবার পর প্রশিক্ষনার্থীদেরকে নিয়ে গাড়িতে করে সেনানিবাসে ফেরত আসব এবং টেলিফোনে মেজর জহুরকে সমাপ্তি প্রতিবেদন দিয়ে ইবিআরসি মেসে ফিরে যাব। তা সে যত রাতই হোক না কেন। এটা নিয়ে আমার ভেতরে কোন দুঃখবোধ নেই। কারণ রাতের বেলায় পথ, প্রান্তর বা পাহাড়ের ভেতরে আমার ঘুরতে ভালোই লাগে। তাছাড়া পরের দিন শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সকালে পিটিতে যাবার ঝামেলাই নেই।

রাত দেড়টা। প্রবল শীত আর কুয়াশা। আকাশের চাঁদ ডুবে গেছে। আমি উইন্টার কোট পরে শেষ বাউন্ডে খোলা আকাশের নীচে বসে আছি। স্টুল ক্যাম্পের (Stool Camp) উপরে। আকাশে ধ্রুবতারা ছাড়া আর কোন নক্ষত্র বা গ্রহই দৃশ্যমান নয়। কুয়াশার কারণে ১০ ফুট দূরত্বেও কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধু পাশের একটা জঙ্গলের ভেতর থেকে শিয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। অনেকগুলো শিয়াল। মনে মনে হয়ত আমাকেই লক্ষ্যবস্তু স্থির করে বসে আছে। ছেলেবেলায় খুব ভয় পেতাম। এখন আর ভয় পাই না। আমার থেকে প্রায় আধা মাইল দূরে হালদা নদী। এখান থেকে দেখা যায় না। নদীর জলও খুব শান্ত। কোন শব্দই শোনা যাচ্ছে না। প্রশিক্ষনার্থীদেরকে আমার বাউন্ডে উপস্থিত হতে হলে এই নদী পেরিয়ে আসতে হবে। শীতের এই সময়ে নদীতে জল নেই বললেই চলে। মেজর জহুর সম্ভবত ইচ্ছে করেই এই বাউন্ডটা রেখেছেন, যাতে প্রশিক্ষনার্থীরা শুষ্ক দেহে শেষ বাউন্ডে পৌঁছুতে না পারে। তবে নায়েক মান্নান তার দল নিয়ে অন্য সকল বাউন্ডগুলো যথাসময়ে অতিক্রম করতে পারলে শুধুমাত্র হাঁটুজল পেরিয়েই এখানে পৌঁছুতে সক্ষম হবেন বলে আমার ধারণা। আমি ভেবেছিলাম তিনি রাত বারটার ভেতরেই দলবল সহ আমার বাঊন্ডে এসে পৌঁছুবেন। কিন্তু রাত দুইটা অতিক্রান্ত হবার পরেও তার টিকিটিও দেখা গেল না। আমি কিছুটা চিন্তিত। অন্যদের অনুপস্থিতিতে প্রশিক্ষনার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন আমার উপরে। সময় অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে মনে হল নদীতে জোয়ারের জল বাড়ছে। আমাদের দেশে বানের জল বাড়ার মত। রাতের নিস্তব্ধতার ভেতরে আর কোন শব্দ না থাকায় জলের প্রবাহের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু নায়েক মান্নানের দলের কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।

অবশেষে রাত তিনটে অথবা চারটার দিকে নায়েক মান্নানের কন্ঠে ‘স্যার’ ডাক শোনা গেল। মনে হচ্ছিল মিলিটারি একাডেমির ড্রিল গ্রাউন্ড থেকে এই দূরাগত শব্দ ভেসে আসছে। খুবই অস্পষ্ট ও ম্রিয়মাণ। আমি বললাম, “আপনি কোথায়? এত দেরী কেন আপনাদের?” কিন্তু দূর থেকেই নায়েক মান্নান উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি কাছে আসতে বললেও আসছিলেন না। অবশেষে বাধ্য হয়ে আমি তাদের দিকে এগিয়ে যেতেই তিনি আরও পিছনে চলে গেলেন এবং বললেন, “ স্যার, পথ ভুল করার কারণে শেষ বাঊন্ডের কাছে আমাদের আসতে একটু দেরী হয়ে গিয়েছিল। নদীর পাড়ে এসেই দেখি জোয়ারের পানিতে ভরে আছে। বাধ্য হয়ে আমরা আমাদের জামা কাপড়, ম্যাপ, কম্পাস ইউনিফর্মের ভেতরে বেঁধে একহাতে হাতে নিয়ে সাঁতরে নদী পার হচ্ছিলাম। এমন সময়ে ভাঁটার টান। প্রবল স্রোতে আমরা প্রায় এক মাইল নদীর ভাঁটির দিকে চলে গেলাম। এ কারণেই আসতে একটু দেরী হয়ে গেল। “আমি বললাম, “ঠিক আছে, আপনি এখন আমাকে সঠিকতা প্রতিবেদন দিয়ে আপনার দলকে নিয়ে গাড়িতে উঠুন। আমরা ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেব।”

তারপরেও নায়েক মান্নান ইতস্তত করতে থাকায় আমি আরেকটু তার নিকটে গেলাম এবং অবাক বিস্ময়ে খেয়াল করলাম যে, নায়েক মান্নান এবং তার দলের কারও শরীরেই কোন পোশাক নেই। সবার পরনে শুধু সম্ভবত একটা করে খাকী হাফ প্যান্ট। অথবা এমনও হতে পারে যে, তাদের পরনে কিছুই নেই। কিন্তু প্রগাঢ় অন্ধকার ও কুয়াশার কারণে বোঝা যাচ্ছে না। অন্ধকারের ভেতরে তাদের সবাইকে বনমানুষের মত মনে হচ্ছিল। প্রাগৈতিহাসিক বন মানুষ। শিকারের পর গুহায় ফিরছে! প্রবল দুঃখিতভাবে নায়েক মান্নান আমাকে জানালেন যে, ভাঁটার টানের প্রবল জলের তোড়ে তাদের সকলের হাতের ইউনিফর্ম, কম্পাস, ম্যাপ সবকিছুই জলে ভেসে গেছে। সে কারণেই তিনি তার দল নিয়ে আমার সামনে আসতে পারছেন না। আমি হতবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়!

সেদিন রাত ৪টায় আমি সেভাবেই নায়েক মান্নান সহ তার দলকে সেনানিবাসে পৌঁছে দিয়েছিলাম। মেজর জহুরকেও কোন প্রতিবেদন দেইনি। নায়েক মান্নানকে বলেছিলাম তিনি যেন পরের দিন সকালে তার দল নিয়ে পুনরায় এই নদীর পারে আসেন এবং তাদের কম্পাস ও ম্যাপগুলো অন্তত উদ্ধার করে নিয়ে যান। নতুবা পরীক্ষায় পাশ করা তো দূরের কথা, তাদের কারুরই চাকুরী থাকবে না।

পরের দিন বিকেলে সামরিক টেলিফোনে নায়েক মান্নান আমাকে জানিয়েছিলেন যে, হালদা নদীর যে স্থান দিয়ে তারা অতিক্রম করার চেষ্টা করেছিলেন সেখান থেকে আরও দুই মাইল ভাঁটিতে কাদার ভেতরে নিজেদের ইউনিফর্ম, কম্পাস ও ম্যাপ তারা খুঁজে পেয়েছেন এবং কম্পাস ও ম্যাপগুলো নিজ ইউনিটে জমা করেছেন।

নায়েক মান্নানের সাথে আমার আর কখনই দেখা হয়নি।
 

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই/