.ঢাকা, শনিবার   ২০ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৭ ১৪২৬,   ১৪ শা'বান ১৪৪০

‘প্রতিটা ইঞ্চি ডিজিটাল কানেক্টিভিটির মধ্যে আনবো’

সাইফুল ইসলাম শান্ত

 প্রকাশিত: ১৬:০৩ ২৪ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৬:৫৬ ৩১ জানুয়ারি ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

জুনাইদ আহমেদ পলক। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটোরের সিংড়া উপজেলা থেকে বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ এমপি হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে সরকারের ডাক এবং টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে টানা ৭ বছর ছুটে চলেছেন তিনি। সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করায় আবারো একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন একই আসন থেকে নির্বাচিত এ এমপি। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে এরইমধ্যে নিজ মন্ত্রণালয়ের কর্ম পরিকল্পনা ঠিক করেছেন তিনি। তার এই পরিকল্পনার কথা জানাতে ডেইলি বাংলাদেশের মুখোমুখি হয়েছেন তরুণ এই রাজনীতিবিদ।

প্রশ্ন- বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কে অবস্থিত বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম ডাটা সেন্টার নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কি?

উত্তর- এক সময় ডাটা সংরক্ষণের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিয়েছি। এখন নিচ্ছি না। আমরা বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কে আমরা বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম ডাটা সেন্টার বসিয়েছি। আমরা বেসরকারি সেক্টরে এই ডাটা সেন্টার ভাড়াও দিচ্ছি। সেখান বছরে অন্তত ৫০০ কোটি টাকা সরকার আয় করতে পারবে। তাছাড়া আমাদের ডাটা সংরক্ষণ ও ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের যে চারটা অনুষঙ্গ যার একটা হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়ন, দ্বিতীয় সবার জন্য ইন্টারনেট, তৃতীয় ই-গভর্নেন্স এবং চতুর্থ আইসিটি ইন্ডাস্ট্রিজ। এরমধ্যে অন্যতম একটা ছিল ই-গভর্নেন্স। এখন আমরা ২০০টি সার্ভিস ডিজিটাল প্লাটফর্মে মধ্যে আনতে পেরেছি। ২০২১ সালের মধ্যে আরো ১৬শ' সার্ভিস ই-গভর্নেন্সের মধ্যে আনতে পারব। তখন সরকারের প্রায় পাঁচ পেটাবাইট ডাটা সংরক্ষণ করতে হবে। এই মুহূর্তে আমাদের দুই পেটাবাইট ডাটা সংরক্ষণ করতে হয়। আগামী দুই বছরের মধ্যে এটা পাঁচ পেটাবাইট হয়ে যাবে। এই সব ডাটা নিজেদের ডাটা সেন্টারে সংরক্ষণ করতে পারবো। এর ফলে ডেটা সিকিউরিটি এবং ই-গভর্নেন্স সার্ভিস নিশ্চিত করতে পারবো।

প্রশ্ন- ডাটা সিকিউরিটি নিশ্চিতের ব্যাপারে কি ধরণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে?

উত্তর- একটি কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম তৈরি করা হয়েছে। সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট আমরা তৈরি করছি। ২২টি ক্রিটিক্যাল ইনফর্মেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার আইডেন্টিফাই করেছি; যেখানে সেন্সর বসিয়ে মনিটরিং করা হচ্ছে। আগে আমাদের সাইবার সিকিউরিটির জন্য বিদেশি এক্সপার্ট এবং কনসালটেন্টের উপর নির্ভর করতে হতো। এখন আইসিটি ডিভিশন পুলিশ, সিআইডি, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে।  আমরা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর আওতায় চারটা প্রতিষ্ঠান করছি- একটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ডিজিটাল সিকিউরিটি কাউন্সিল, দ্বিতীয় কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম, তৃতীয় সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি এবং চতুর্থটি ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব। এই চারটা প্রতিষ্ঠান যেমন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তৈরি হবে, পাশাপাশি এই চারটা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হিউম্যান রিসোর্স তৈরি হবে। এসবের মাধ্যমে আমাদের সাইবার সিকিউরিটির সক্ষমতা তৈরি হবে।

প্রশ্ন- ডিজিটাল সিকিউরিটি কাউন্সিল বিষয়ে অগ্রগতি কতটুকু?

উত্তর- আইনে পর এবার বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। আর সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি গঠনের জন্য এরইমধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এটা আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

প্রশ্ন- নিজস্ব ডাটা সেন্টার থেকে সরকারের কতগুলো প্রতিষ্ঠান সেবা নিচ্ছে?

উত্তর- ৫৩টি মন্ত্রণালয়ের ২২২টি সংস্থা সার্ভিস নিচ্ছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ন্যাশনাল আইডি, পাসপোর্ট এবং এনবিআর। সেবাও দেয়া হচ্ছে কিছু মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে। এরফলে এখন আর বিদেশ থেকে এই সেবা নিতে হচ্ছে না। প্রতিবছর ৫০০ কোটি টাকা মূল্যমানের সার্ভিস এই ডাটা সেন্টার থেকে দিচ্ছি।
এই ডাটা সেন্টারগুলোর একহাজার জিবিপিএস ডাটা ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ৪০ জিবিপিএস সরকার ব্যবহার করছে। আশা করছি ২০২৩ সালের মধ্যে এ ডাটা সেন্টার থেকে ১০০ জিবিপিএস ডাটা সরকারেরই প্রয়োজন হবে। এই টিআর ফোর সার্টিফাইড ডাটা সেন্টার কাজে লাগিয়ে দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিরাট ভূমিকা রাখবে।

প্রশ্ন- ব্যান্ডউইথ রফতানির অগ্রগতি কতটুকু?

উত্তর- বাংলাদেশের পার্ট-এর কাজ শেষ। যতোটুকু জানি ভুটান, নেপাল এবং ভারতের অনেক অংশের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন ভারতের করিডরের কিছু অংশের কানেক্টিভিটির কাজ বাকি আছে। আশা করছি ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি দ্রুত হয়ে যাবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে ৬২টি দেশের সঙ্গে এশিয়ান সুপার হাইওয়ে কানেক্টিভিটির একটা বিষয় আছে সেখানে ফাইবার অপটিক এর মাধ্যমে ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির বিষয়টিও আমরা প্রস্তাবনায় এনেছি। আমাদের ব্যান্ডউইথের সক্ষমতা আছে প্রায় ২ হাজার জিবিপিএস; এরমধ্যে একহাজার জিবিপিএস ব্যবহার করছি আমরা। বাড়তি যেটা থাকবে সেখান থেকে কিছু রফতানি করা হবে। বর্তমানে পাশের দেশ ভারতের আসামে ১০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ রফতানি করা হচ্ছে। থাইল্যান্ডও আমাদের কাছে ব্যান্ডউইথ নিতে চায়। এখন ইনফরমেশনের এতো বেশি ব্যবহার, ইন্টারনেট ছাড়া কেউ কিছু কল্পনাও করতে পারছেনা।

প্রশ্ন- সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পেজে ইন্টারনেট দাম কমার ব্যাপারে সুখবরের আভাস দিয়েছিলেন বিষয়টি একটু বিস্তারিত বলুন।

উত্তর- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পার এমবিপিএস ৭৮ হাজার টাকা থেকে ছয় দফা ইন্টারনেটের দাম কমিয়েছেন। এটা সপ্তম দফায় আরো কিছু দাম কমবে। যখন আমরা ব্যান্ডউইথ এর উপর থেকে দাম কমিয়ে দেই তখন গ্রাহক পর্যায়ে এর কিছুটা প্রভাব পরে। ইন্টারনাল যে ক্যারিয়ারগুলো আছে তাদের উপর থেকে ভ্যাট ১৫ থেকে ৫ শতাংশ কমিয়ে আনা হবে। এনবিআরের অনুমোদন হয়ে গেছে। এখন আইনমন্ত্রীর স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আছে, এটা হয়ে গেলেই গ্রাহক পর্যায়ে মূল্য কমে আসবে।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে সরকার প্রতিনিয়ত এই সেক্টরে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। আমরা ইনফো সরকার-৩ এর মাধ্যমে ২৬শ'  ইউনিয়নে যাচ্ছি। আমাদের নিজস্ব ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করে অপারেশনটা দিচ্ছি প্রাইভেট সেক্টরে। ফলে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের ভিত্তিতে এসব বিষয়ে আমরা আগামী তিন মাস ইন্টারনেট ফ্রি দেব। এর ফলে গ্রাম পর্যায়ের মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারে আরো বেশি উৎসাহিত হবেন। উপজেলা পর্যায়ে একহাজার টাকায় দুই এমবিপিএস অথবা ৫০০ টাকায় এক এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট পাবেন গ্রাহকরা। যেটা ১০ বছর আগে এক লাখ টাকায়ও পাওয়া যেতো না। এভাবে আমরা ইন্টারনেটকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারবো।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী ইশতেহারে গ্রামে শহরের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার যে অঙ্গীকার করেছেন তা বাস্তবায়ন করতে গেলে আমাদের পাঁচটি বিষয়কে নজর দিতে হবে। 
এক- গ্রামের সব সন্তান যেন শিক্ষা পায়; দ্বিতীয়ত- বিদ্যুতের আলো যাতে সবার ঘরে পৌঁছে; তৃতীয়ত- আধুনিক পাকা রাস্তা; চতুর্থ- ইন্টারনেট সংযোগ আর পাঁচ হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। এই পাঁচটি বিষয় যদি গ্রামের মানুষকে নিশ্চিত করা যায় তাহলে গ্রাম শহরে পরিণত হবে। সুতরাং এই কারণেই আমরা আইসিটি মন্ত্রণালয় থেকে ইন্টারনেটের উপর অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য সরকারের এই মেয়াদের মধ্যেই শতভাগ মানুষকে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেয়া।

আমরা জরিপ করে দেখেছি দেশের ৭৭২টা ইউনিয়ন দুর্গম এলাকার মধ্যে পড়েছে এসব এলাকার মধ্যে খুব বেশি হলে ১০০ ইউনিয়ন যেমন সন্দীপ, পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী, হাতিয়া, কুতুবদিয়া-মহেশখালী অনেক বেশি দুর্গম। এই সব উপজেলায় আমরা রেডিও লিংক ব্যবহার করে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেব। অথবা সমুদ্রের নিচ দিয়ে ক্যাবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট পৌঁছে দেব। এছাড়া কিছু উপজেলায় আমরা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা দেব। আমরা ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি চুক্তিও করেছি, যার মাধ্যমে আমরা বিদ্যুতের পোল বা খুঁটি ব্যবহার করে ইন্টারনেট সেবা গ্রামে নিয়ে যাচ্ছি। এছাড়া সার্ক স্যাটেলাইট এবং বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমরা ব্যান্ডউইথ দুর্গম এলাকায় পৌঁছে দেব। এর ফলে আমাদের দেশের প্রত্যেকটা ইঞ্চি ডিজিটাল কানেক্টিভিটির মধ্যে চলে আসবে।

প্রশ্ন- আগামী পাঁচ বছরে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের প্রধান লক্ষ্য কি কি?

উত্তর- আমাদের আগামী পাঁচ বছরে প্রধান টার্গেট হলো হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপ করা। কারণ আমাদের হাইটেক পার্ক হয়ে গেছে, আমাদের কানেক্টিভিটি সব জায়গায় চলে গেছে। এখন আমাদের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো হিউম্যান ব্রেইন তৈরি করা। কারণ আমাদের লোহা-লক্কর, ইট-কাঠ-পাথরের দরকার নেই, আমাদের মূল যেটা চালিকাশক্তি সেটা হচ্ছে ব্রেন। এ কারণে আমরা প্রতিটি স্কুল পর্যায়ে ল্যাবগুলোকে অ্যাক্টিভ করবো। আমাদের ৯ হাজার শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব আছে। ২০২৩ এর মধ্যে আমরা আরো ২৫ হাজার ৫শ' ডিজিটাল ল্যাব করবো। এখন আমাদের প্রধান টার্গেট প্রতিটি ল্যাবকে অ্যাক্টিভ করা আর আমাদের শিক্ষার্থীদের ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে যোগ্য করা। আমাদের এখন টার্গেট এটাই দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা।

বর্তমানে আমাদের যে হাইটেক পার্কগুলো আছে এখানে আগামী পাঁচ বছরে তিন লাখ জনশক্তির প্রয়োজন হবে। এখন আমাদের এই বিষয়গুলোর সঙ্গে মাথায় রেখে আমরা শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব, শেখ কামাল আইটি পার্ক এগুলোকে আরো এক্টিভেট করতে চাই। সরকারের সমস্ত সার্ভিস আমরা ডিজিটাল মাধ্যমে দিতে চাই। এর ফলে যেমন কমবে দুর্নীতি, তেমনি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। যেমন আমাদের কাস্টমসে ডিজিটালাইজড করার কারণে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আয় বেড়েছে। 
দ্বিতীয় বিষয় হলো আমাদের ই-গভর্নেন্সকে অ্যাক্টিভ করা। আর তৃতীয় কম মূল্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেয়া। এই তিনটা বিষয়কে নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস/এসআর