.ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৫ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ১২ ১৪২৬,   ১৯ শা'বান ১৪৪০

হাইতির করুন ইতিহাস

 প্রকাশিত: ১৫:২২ ২২ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৫:২২ ২২ অক্টোবর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বিংশ শতাব্দীর গণহত্যা বলতে দুটি মহাযুদ্ধের বীভৎসতার কথা সকলেরই স্মরণে আসে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বর্তমান তুরস্কে ঘটা আর্মেনিয়ান গণহত্যা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে চীনের নানকিং-এর গণধর্ষণ ও জার্মানির ক্রিস্টাল নাখট এর কথাও আসে ঘুরে ফিরে। কিন্তু আটলান্টিক মহাসাগর ও ক্যারিবিয়ান উপসাগরের মাঝে অবস্থিত একটি দ্বীপে ঘটা জাতিগত দমনের কথা ক'জন মনে রেখেছে?

এই গণহত্যার বীজ রোপিত হয় সেই ১৪৯২ সালে, যখন কলম্বাস ক্যারিবিয়ান উপসাগরের তীরে হিস্পানিওলায় ঘাটি গাড়লেন। হিস্পানিওলা নামটি কলম্বাসেরই দেয়া, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মতো কলম্বাসের হাত ধরে সেখানেও ইউরোপী উপনিবেশবাদ প্রবেশ করলো। ইউরোপীয়দের নিপীড়ন ও নানা রোগব্যাধির প্রকোপে সেই দ্বীপে বসবাসকারী স্থানীয় তাইনো উপজাতিরা ক্রমশ বিলুপ্ত হতে লাগলো। হিস্পানিওলা ছিল আখ চাষের জন্য অতি উর্বর। তাই ইউরোপীয় কোম্পানি প্রচুর আফ্রিকান দাস সেখানে নিয়ে আসতে থাকলো আখ উৎপাদন ও চিনির কারখানায় শ্রমিক হিসেবে।

১৭৭৭ সাল নাগাদ দ্বীপটি রাজনৈতিক ভাগে ভাগ হয়ে গেল। এর পশ্চিম প্রান্ত ছিল ফ্রান্সের দখলে এবং পূর্বপ্রান্ত নিয়ন্ত্রণ করত স্প্যানিশরা। ফ্রান্সের অংশে ছিল আফ্রিকান কালো আদমিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ১৮০৪ সালে খুব বড়সড় এক দাস বিদ্রোহ হিস্পানিওলাকে ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা এনে দিল, নতুন দেশটির নাম দেয়া হয় হাইতি। এটিই ছিল পৃথিবীর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু উন্নত বিশ্বের অন্যায় রোষ এর কারণ হল দেশটি। সদ্যোজাত দ্বীপ দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করে রাখল তার পূর্ববর্তী পশ্চিমা শাসক দেশগুলো, সঙ্গে চাপিয়ে দিল বিপুল ঋণের বোঝা।

হিস্পানিওলার পশ্চিম অংশ তো ফ্রান্সের থেকে স্বাধীনতা পেয়ে হাইতি নাম নিলো, এদিকে পূর্ব অংশও তাদের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্প্যানিশ ও মার্কিন উপনিবেশবাদের অভিশাপ ঝেড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। নতুন দেশটির নাম হল ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র। উল্লেখ্য, ডোমিনিকার অধিকাংশ মানুষ ছিলেন ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত। হাইতি ও ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র বহু বছর ধরে তাদের সংগ্রামের ইতিহাস ভাগাভাগি করে এসেছিল। কিন্তু একটা সময় এসে ডোমিনিকার অনেক অভিজাত ব্যক্তিবর্গ হাইতির সঙ্গে সুসম্পর্ককে একটি বর্ণবাদগত হুমকি হিসেবে দেখতে লাগলেন। তারা মনে করলেন হাইতির সঙ্গে সুসম্পর্কের ফরে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কোন্নয়ন বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির দুই অংশেই সেনা মোতায়েন করল। উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম উপকূলে মার্কিনবান্ধব সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য স্থানীয় বিরোধী শক্তিদের নিধন করা জরুরি হয়ে পড়লো। মার্কিন সৈন্যদের বর্ণবাদী নিপীড়ন এতটাই প্রভাববিস্তার করল যে, তারা বিদায় নেয়ার পরও ওই ভূখণ্ডে বর্ণবাদ স্থায়ী আসন গেড়ে বসল। ১৯৩০ সালে ডোমিনিকার স্বকীয়তাকামী রাষ্ট্রপতি হোরাসিও ভাসকেস তার সেনাবাহিনী প্রধান রাফায়েল ত্রোহিও কর্তৃক অপসারিত হলেন। ত্রোহিও ছিলেন হাইতিয়ান বংশোদ্ভূত, তবু তিনি হাইতি ও ডোমিনিকার সীমান্তে দুই দেশের সাংস্কৃতিক সহাবস্থানকে একেবারেই গ্রাহ্য করলেন না। তিনি এটিকে তার ক্ষমতার জন্য হুমকি মনে করলেন। ভাবলেন, এই সহাবস্থান বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপ্লবের কারণ হতে পারে।

১৯৩৭ সালের ২ অক্টোবর জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক উত্তেজক বক্তব্যে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করলেন। সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে সীমান্তে তিনশ হাইতিয়ানকে হত্যার ঘোষণা দিলেন। কারণ হিসেবে বললেন, ডোমিনিকান কৃষকদের বহিরাগত হাইতিয়ানদের চুরি ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করার কথা, যা ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এই দমন পরবর্তীতে অব্যাহত থাকবে বলে তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন। ত্রোহিওর নির্দেশে ডোমিনিকান সেনাবাহিনী পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে কয়েক হাজার হাইতিয়ান পুরুষ ও নারীকে হত্যা করল। এমনকি তাদের কারো সন্তান যদি ডোমিনিকায় জন্ম নিয়েও থাকে, সেই শিশুদেরও ছাড় দেয়া হল না। শান্তিপ্রিয় হাইতিয়ানদের চোর ডাকাত আখ্যা দিয়ে এক গণহত্যা চালানো হলো।

ডোমিনিকানদের মধ্যে অনেক কৃষ্ণাঙ্গ ছিল। তাদের মধ্য থেকে হাইতিয়ানদের আলাদা করার জন্য নেয়া হতো বিশেষ ব্যবস্থা। জানা যায়, ডোমিনিকান সৈন্যরা কৃষ্ণাঙ্গদের ধরে ধরে 'পার্সলি-(এক বিশেষ ধরনের উদ্ভিদ) এর স্প্যানিশ নাম জানতে চাইত। স্প্যানিশে পার্সলিকে বলা হত ‘পেরেহিল’। যেখানে ইংরেজি আর বর্ণের উচ্চারণ খুব জোরের সঙ্গে করা হয়। কিন্তু হাইতিয়ানদের ক্রেওল ভাষায় 'আর' এর কোন উচ্চারণ নেই। তাই যারাই পেরেহিল উচ্চারণ করতে ব্যর্থ হত, তাদেরকেই হাইতিয়ান হিসেবে অভিযুক্ত করে হত্যা করা হতো। এরকম পরীক্ষার কোনো ভিত্তি ছিল না, কারণ সীমান্তে বসবাসকারী অনেকেই দুইটি ভাষাতেই কথা বলত। ডোমিনিকান সরকার এ গণহত্যার খবর চাপা দেয়ার জন্য হাইতিয়ানদের মৃতদেহ গণকবর দিয়ে, নদীতে ফেলে আবার কখনো পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিত। এ কারণেই সে নির্বিচারে গণহত্যায় ঠিক কত লোকের প্রাণহানি হয়েছিল এ ব্যাপারে সঠিক কোনো তথ্য নেই। তবে তা ১৫ হাজারেরও বেশি হবে বলে ধারণা করা হয়।

এ মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য ডোমিনিকান প্রেসিডেন্ট রাফায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে অভিযুক্ত করে মাত্র সোয়া পাঁচ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়। হাইতিয়ান সরকারের দুর্নীতিতে, ন্যূনতম সে সাহায্যটুকুও ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে পৌঁছায়নি। পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণ্য এই গণহত্যার জন্য কখনোই রাফায়েল ও তার অনুচরদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। সেই ভয়ঙ্কর গণহত্যার ক্ষত পূরণে আজও হাইতি ও ডোমিনিকার কিছু স্বেচ্ছাসেবী কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু ডোমিনিকা প্রশাসন কখনোই তাদের কুকর্মের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। ক্ষমতালোভী একজন মানুষ ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য কতটা হিংস্র হতে পারে, হাইতির গণহত্যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড