.ঢাকা, শুক্রবার   ১৯ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৫ ১৪২৬,   ১৩ শা'বান ১৪৪০

নির্বাচন নিয়ে এরশাদের সংশয়, নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত

 প্রকাশিত: ২০:৩৭ ২০ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ২৩:১২ ২০ অক্টোবর ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সময় মতো একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সম্মিলিত জাতীয় জোট প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পাশাপাশি সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ নিয়ে তার সংশয় রয়েছে। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় স্বার্থে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।

শনিবার দুপুরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মিলিত জাতীয় জোট আয়োজিত মহাসমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এসব বিষয় তুলে ধরেন।

এ সময় এরশাদ বলেন, নির্বাচন নিয়ে জনমতে এখনো শঙ্কা রয়েছে। নির্বাচন হবে কি হবে না, জানি না। একটি দল সাত দফা দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী তা মানা সম্ভব নয়। আমরা দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। তবে এর জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। সংসদের সব দল নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে।

তিনি বলেন, আমি দেশবাসীর উদ্দেশে কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। একটি দল সাত দফা দিয়েছে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, তা মানা সম্ভব নয়। এই অবস্থায় আগামী দিনগুলো নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের শঙ্কা রয়েছে।

জাপা চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আমি নতুন করে ১৮ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। আমরা নির্বাচনের পদ্ধতি পরিবর্তন করতে চাই। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চাই। শিক্ষা পদ্ধতি সংস্কার চাই। স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ চাই। শান্তির রাজনীতি চাই। সড়ক নিরাপত্তা চাই।

এর আগে এই সমাবেশ থেকে এরশাদ গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবেন বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। আর সে বার্তা ভাইরাল হয়ে যাবে বলেও দাবি করেছিলেন দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার।

এদিকে নির্বাচনে অনিশ্চয়তার কথা বললেও ভোটের জন্য প্রস্তুত থাকার কথাও জানান এরশাদ। তিনি বলেন, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দলকে নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ করতে হবে। আমরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত, এই নির্বাচনে আমরা জোটগত এবং একক দুইভাবেই প্রস্তুত আছি।

এ সময় তিনশ’ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে এরশাদ বলেন, আমরা তিনশ’ আসনে প্রার্থী প্রস্তুত রেখেছি। সেইসঙ্গে আমরা জোটগতভাবে নির্বাচন করতে চাই। সেভাবে মানসিকভাবে প্রস্তুতি আছে। তবে পরিস্থিতির আলোকে সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে। এ জন্য তিনশ আসনেই নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

এদিকে সুষ্ঠু নির্বাচন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, আমরা জাতীয় পার্টি সব সময় নির্বাচন করেছি। আজো আমরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। তবে আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। অবাধ নির্বাচন চাই, নিশ্চয়তা চাই। আমরা যারা সংসদে আছি সবার সমন্বয়ে নির্বাচনকালীর সরকার গঠন করতে হবে। একটি আবাধ সুষ্ঠু নিররপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

আজকের সমাবেশ থেকেই ‘নির্বাচনের যাত্রা শুরু হোক’ জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন যারা করতে চাও, এগিয়ে আসো। এ মাসের মধ্যেই পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠন করা হবে। তৃণমূলের সমর্থনে মনোনয়ন দেয়া হবে।

জনগণ জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় দেখতে চায় দাবি করে সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতীয় পার্টির সামনে সুদিন। আমরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হতে পারে। পরিস্থিতির আলোকে জাতীয় পার্টি নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

মহাসমাবেশে এরশাদ সাধারণ জনগণের উন্নয়নের জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তা-ই করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় গেলে প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা প্রণয়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র্য দূরীকরণ করবে বলেও অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, ছাত্ররা আন্দোলনের সময় (নিরাপদ সড়কের দাবিতে) বলেছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের মেরামত প্রয়োজন। আমরাও তাই চাই।

এ সময় দেশের মানুষ জাতীয় পার্টিকে চায় উল্লেখ করে সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার ২৭ বছরে নানা নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে নির্যাতিত রাজনীতিবিদ আমি, কোনো নেতা আমার মতো নির্যাতন সহ্য করেনি। ৯০ সালের পরে একটি রাতও আতঙ্কের কারণে ঘুমাতে পারিনি। আতঙ্ক ছিলো কখন আবার জেলে যেতে হয়।

১৮ দফা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, আমি নতুন ভাবে কর্মসূচি প্রণয়ন করেছি। এটাই হবে মুক্তির পথ। এটাই হবে আমাদের ইশতেহার, প্রদেশিক সরকার গঠন করবো, নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তন করবো, পূর্ণাঙ্গ উপজেলা প্রতিষ্ঠা করবো, সংখ্যালঘুদের জন্য আসন সংরক্ষণ হরবো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবো, ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা করবো, কৃষকের কল্যাণ সাধনে কাজ করবো, সন্ত্রাস দমনে কঠোর ব্যবস্থা করবো, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্যকর ব্যবস্থা নেবো, ফসলি জমি নষ্ট না হয় সে ব্যবস্থা করবো, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো, শিক্ষা পদ্ধতির সংশোধন করবো, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করবো, শান্তি ও সহাবস্থানের রাজনীতি প্রবর্তন করবো, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো, গুচ্ছগ্রাম পথকলি ট্রাস্ট পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবো, পল্লী রেশনিং চালু করবো, শিল্প ও অর্থনীতির অগ্রগতি সাধন করবো।

প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা কায়েম করার কথা জানিয়ে এরশাদ বলেন, নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন করতে চাই। উপজেলা পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ রূপ বাস্তবায়ন করবো। সংখ্যালঘুদের সংসদে কোটা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চাই। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা জাতিকে অন্ধকারে নিয়ে যাচ্ছে।

এরশাদ বলেন, এ মাসের মধ্যে আমরা পার্লামেন্ট বোর্ড গঠন করবো। আমরা জোটগতভাবে তিনশ আসনেই নির্বাচন করবো। হয়ত তা পরিবর্তন হতে পারে। সে জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। সামনে আমাদের সুযোগ। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টি জয়ী হবে। সে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দেশবাসীর দোয়াও চান সাবেক এ রাষ্ট্রপতি।

এদিকে মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টির মহাসমাবেশে জাপা নেতাদের শোডাউন ছিলো চেখে পড়ার মতো। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে পার্টির সংসদ সদস্য ও সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যাক নেতাকর্মী নিয়ে মহাসমাবেশস্থলে আসেন। তবে, সমাবেশে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা ও পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের শোডাউন ছিলো চোখে পড়ার মত। জাপার এ মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে রাজধানীতে সৃষ্টি তীব্র যানজট। বন্ধ করে দেয়া হয় পল্টন প্রেসক্লাব মৎসভবন ও শাহবাগ সড়ক।

সমাবেশে বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে মিছিলের চাপ। নান রঙের ব্যানার, ফেস্টুন, আর নানা সাইজের লাঙল নিয়ে মাঠে প্রবেশ করে পার্টির উজ্জীবিত নেতা-কর্মীরা। বাদ্যের তালে তালে তালে নেচে-গেয়ে তরুনরা উৎসব মূখর করে তোলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যত মানুষ ছিলো তার’চে বেশি ছিলো মঞ্চের পেছনে এবং মৎস্য ভবন থেকে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত।

মহাসমাবেশে আরো বক্তৃতা করেন জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদ, কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, ইসলামি ফ্রন্টের এমএ মান্নান, খেলাফত মজলিসের মাওলানা মাহফুজুল হক, প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, অ্যাডভোকেট. সালমা ইসলাম এমপি, এসএম ফয়সল চিশতী, ইসলামী ফ্রন্টের আল্লামা আবু সুফিয়ান, বিএনএ’র সেকান্দার আলী মনি, প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম এমপি, বিরোধী দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম ওমর এমপি, রংপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, রুস্তুম আলী ফরাজী এমপি, জাতীয় ইসলামী মহাজোটের আলহাজ আবু নাছের ওহেদ ফারুক।

সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এমএ সাত্তার, কাজী ফিরোজ রশীদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, মোঃ আবুল কাশেম, অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, আলহাজ্ব গোলাম কিবরিয়া টিপু, সাহিদুর রহমান টেপা, অ্যাডভোকেট শেখ মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, নুর-ই-হাসনা লিলি চৌধুরী, সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান, মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা, সুনীল শুভরায়, মীর আবদুস সবুর আসুদ, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, মোঃ আজম খান, এটিইউ তাজ রহমান, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা, সোলায়মান আলম শেঠ, আতিকুর রহমান আতিক, নাসরিন জাহান রতনা, আব্দুর রশীদ সরকার, মেজর অবসরপ্রাপ্ত খালেদ আখতার, মজিবুর রহমান সেন্টু, ব্যারিস্টার দিলারা খন্দকার, আলহাজ্ব শফিকুল ইসলাম সেন্টু, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, ইসলামী মহাজাটের কো-চেয়ারম্যান আবু হানিফ হৃদয়, বাংলাদেশ জাতীয় জোট বিএনএ’র মহাসচিব অ্যাডভোকেট মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন, ইসলামী ফ্রন্টের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা স.উ.ম আব্দুস সামাদ, যুগ্ম-মহাসচিব এমএ মোমেন, মাসউদ হোসাইন আল ক্বাদেরী।

এছাড়া আরো উপস্থিত ছিলেন চেয়ারম্যানের উপদেস্টা মন্ডলীর সদস্য অধ্যাক্ষা রওশন আরা মান্নান, রিন্টু আনোয়ার, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ক্বারী হাবিবুল্লাহ বেলালী, মেরিনা রহমান, সৈয়দ দিদার বখত, এ.কে.এম মোস্তাফিজুর রহমান, অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভুইয়া, সেলিম উদ্দিন, অ্যাডভোকেট হাসান সিরাজু সুজা, মোঃ নোমান, কাজী মামুনুর রশীদ, সোমনাথ দে, জাফরইকবাল সিদ্দিকী, নাজমা আকতার, এমএম নিয়াজ উদ্দিন, আশরাফ উদ দৌলা, এমএ কুদ্দুস খান, পীরজাদা শফিউল্লাহ আল মুনির, ডাঃ আজাহার শামীম।

ডেইলি বাংলাদেশ/ডিএম/এএএম/ এলকে /জেডআর