ঢাকা, শনিবার   ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ১০ ১৪২৫,   ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪০

দোয়া কবুলের কতিপয় আয়াত ও হাদিস

মুনিম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ

 প্রকাশিত: ১৮:৩৪ ১০ জুন ২০১৮  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মুসলিম সম্প্রদায়ের পবিত্রতম মাস রমজানের শেষ সময় প্রায় উপস্থিত। রমজান মাসকে বলা হয় রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়।

রমজান মাসে মহান আল্লাহ তার রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের দরজা খুলে দেন। তাই এই রমজান মাসে যত সম্ভব মহান আল্লাহর কাছে আমাদের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।

মহান আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি সাড়া দেবেন। আর এ বিষয়ে তিনি ওয়াদা করেছেন তার বান্দাদের কাছে।

মহান আল্লাহ তাআলা বলছেন-
হে নবী, “তারা যখন তোমাকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে (তাকে তুমি বলে দিয়ো), আমি তার একান্ত কাছেই আছি। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই যখন সে আমাকে ডাকে, তাই তাদেরও উচিত আমার আহবানে সাড়া দেয়া এবং (সম্পূর্ণভাবে) আমার ওপরই ঈমান আনা। আশা করা যায় এতে করে তারা সঠিক পথের সন্ধান পাবে”। (সুরা বাকারাঃ ১৮৬)

‌“তুমি কখনো আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কাউকে ডেকোনা, যে তোমার কোনো কল্যাণ (যেমন) করতে পারেনা, (তেমনি) তোমার কোনো অকল্যাণও সে করতে পারেনা। এ সত্বেও যদি তুমি অন্যথা করো, তাহলে অবশ্যই তুমি জালিমদের মধ্যে গণ্য হবে।" (সুরা ইউনুসঃ ১০৬)

“তাঁকে ডাকাই হলো সঠিক (পন্থা); যারা তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যদের ডাকে, তারা (জানে তাদের ডাকে এরা) কখনোই সাড়া দেবেনা। (এদের উদাহরণ হচ্ছে এমন) যেন একজন মানুষ (যে পিপাসায় কাতর হয়ে) নিজের উভয় হাত পানির দিকে প্রসারিত করে এ আশায় যে পানি (মুখে এসে পৌঁছুবে, অথচ তা কোনো অবস্থায়ই) তার কাছে পৌঁছাবার নয়। কাফেরদের দোয়া (এমনিভাবে) নিষ্ফল (ঘুরতে থাকে)।” (সুরা রাদঃ ১৪)

“আর যারা আল্লাহকে রেখে অন্যদের বন্ধু বা সাহায্যকারী হিসাবে গ্রহণ করে এবং বলে যে, আমরা তাদের ইবাদত করি শুধুমাত্র এ কারণে যে, তারা আমাদের আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে। তারা নিজেদের মধ্যে যে মতভেদ করেছে আল্লাহ তার ফায়সালা করে দেবেন। মিথ্যাবাদী আর কাফিরদের আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেননা”। (সুরা যুমারঃ ৩)

এখন বিষয় হল মহান আল্লাহর কাছে আমরা কিভাবে এবং কখন প্রার্থনা করবো? কিভাবে প্রার্থনা করলে দোয়া কবুল হবে?

‌হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে ইরশাদ হয়েছে-
হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেক দিন রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহতায়ালা সবচেয়ে নিচের আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকছো, আমি তোমার ডাকে সাড়া দেবো। কে আমার কাছে চাইছো, আমি তাকে তা দেবো। কে আছো আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। (মুসলিম)

‌হয়রত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, “হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া ফিরিয়ে দেয়া হয় না।” (তিরমিজি)

‌হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, “হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের একদিন শুক্রবার নিয়ে আলোচনা করলেন এবং বললেন, ‘জুমার দিনে একটি সময় আছে, যে সময়টা কোনো মুসলিম নামাজ আদায়রত অবস্থায় পায় এবং আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ অবশ্যই তার সে চাহিদা মেটাবেন এবং তিনি রাসূল (সা.) তার হাত দিয়ে ইশারা করে সে সময়টা সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন।” (বুখারি)

‌হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “জমজম পানি যে নিয়তে পান করা হবে, তা কবুল হবে।” (ইবনে মাজাহ)

‌হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যে সময়টাতে বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটতম অবস্থায় থাকে তা হলো সেজদার সময়। সুতরাং তোমরা সে সময় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি চাও।” (মুসলিম)

‌সাহাবি হযরত উবাদা বিন সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে কেউ রাতের বেলা ঘুম থেকে জাগে আর বলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির, আলহামদুলিল্লাহি ওয়া সুবহানাল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ এবং এরপর বলে, ‘আল্লাহুম্মাগফিরলি (আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন) অথবা আল্লাহর কাছে কোনো দোয়া করে, তাহলে তার দোয়া কবুল করা হবে এবং সে যদি অজু করে নামাজ আদায় করে, তাহলে তার নামাজ কবুল করা হবে।” (বুখারি)

‌সাহাবি হযরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! কোন সময়ের দোয়া দ্রুত কবুল হয়? তিনি বললেন, রাতের শেষ সময়ে এবং ফরজ নামাজের পরে।” (তিরমিজি)

‌হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “দুই সময়ের দোয়া ফেরানো হয় না। আজানের সময়ের দোয়া আর বৃষ্টি পড়ার সময়কার দোয়া।” (আবু দাউদ)

‌রাসূল (সা.) বলেছেন, “ইজাস সলাতু ফাসল্লিল্লাহ”, “যদি তোমার কোনো কিছু চাইতে হয় তুমি আল্লাহর কাছে চাও।” (সহিহ মুসলিম)।

‌হযরত আনাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, একবার রাসূল (সা.) মসজিদে প্রবেশ করেছেন। এমতাবস্থায় এক লোক নামাজ শেষে এ দোয়া করছিলেন, আল্লাহুম্মা লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা মান্নাম, বাদিয়ুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি ইয়া জাল জালালি ওয়াল ইকরাম। তখন রাসূল (সা.) তাকে বললেন, তুমি জানো, তুমি কি দিয়ে দোয়া করেছ? তুমি দোয়া করেছ ইসমে আজম দিয়ে, যা দ্বারা দোয়া করলে আল্লাহ কবুল করেন এবং তা দ্বারা কিছু চাইলে আল্লাহ তা প্রদান করেন। (সুনানে তিরমিজি : ৩৫৪৪)

‌হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন রাসূল (সা.) নামাজের পর দোয়ারত জায়েদ ইবনে সামেত (রা.) এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। দোয়াতে তিনি বলছিলেন, আল্লাহুম্মা ইন্নি আস-আলুকা বি-আন্না লাকাল হামদু লা-ইলা-হা ইল্লা-আনতা ওয়াহদাকা লা-শারিকা লাকাল মান্নান, ইয়া বাদিআস সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদ্বি, ইয়া জাল জালালি ওয়াল ইকরাম। ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম। তখন রাসূল (সা.) তাকে বললেন, তুমি আল্লাহর দরবারে ইসমে আজমের মাধ্যমে দোয়া করেছ, যার মাধ্যমে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা কবুল করেন এবং কিছু চাইলে তা দান করেন। (মুসনাদে আহমদ : ১২২০৫)

‌হযরত আসমা বিন ইয়াজিদ (রা.) সূত্রে বর্ণিত, “রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ইসমে আজম এই দুটি আয়াতের মধ্যে নিহিত। সুরা বাকারার ৩৬১ নম্বর আয়াত এবং সুরা আল ইমরানের ১ নম্বর আয়াত। (সুনানে আবু দাউদ : ১৪৯৬)

‌হযরত বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) দুইজন লোককে এটা বলতে শুনেছেন যে, আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকা, বিআন্নি আশহাদু আন্নাকা আনন্তাল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লা আন্তাল আহাদুস সামাদ, আল্লাজি লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ ওয়ালাম ইয়া কুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ। তখন রাসূল (সা.) বলেন, তোমরা আল্লাহর কাছে ইসমে আজমের মাধ্যমে চেয়েছ, যার মাধ্যমে চাইলে আল্লাহ দান করেন এবং দোয়া করলে আল্লাহ কবুল করেন। ( আবু দাউদ : ১৪৯৩)

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, ইসমে আজমের ব্যাপারে বর্ণিত হাদিসগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বিশুদ্ধ। (তুহফাতুজ জাকিরিন ১/৮২)

এছাড়া দোয়ার আগে ও পরে দরুদপাঠের প্রতিও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

‌হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) বলেন, নিশ্চয় বান্দার দোয়া-মোনাজাত আসমান ও জমিনের মাঝখানে ঝুলানো থাকে, তার কোনো কিছু আল্লাহপাকের নিকট পৌঁছে না যতক্ষণ না বান্দা তোমার নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করবে। (তিরমিজী শরিফ)।

তবে দোয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই কয়েকটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। পবিত্রতা অর্জন, দোয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করা, নম্রতা, মনোযোগিতা বজায় রাখা ও নিজ ইচ্ছাকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে