.ঢাকা, শুক্রবার   ১৯ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৫ ১৪২৬,   ১৩ শা'বান ১৪৪০

লেনদেন সংক্রান্ত সমকালীন ৭টি মাসআলা

 প্রকাশিত: ১৮:৩৩ ১৬ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৮:৩৩ ১৬ অক্টোবর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

একজন মুসলিমের জীবনাচারে প্রতিটি লেনদেনই হবে স্বচ্ছ, পরিস্কার ও হালাল হারাম যাচাই বাছাই করে

হারাম উপার্জন কিংবা অবৈধ সম্পদ মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালার কাছে গ্রহণীয় নয়। এর জন্য পরকালের রয়েছে কঠোর শাস্তি ও আজাব। 

পবিত্র কোরআনে রয়েছে, ‘অথচ আল্লাহ বেচা-কেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতএব, যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হল, যা গত হয়েছে তা তার জন্যই ইচ্ছাধীন। আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর হাওলায়। আর যারা ফিরে গেল, তারা আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৫)

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ এমন ব্যক্তির প্রতি রহমত বর্ষণ করেন যে নম্রতার সঙ্গে ক্রয়-বিক্রয় করে ও পাওনা ফিরিয়ে চায়। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং-২০৭৬) পবিত্র কোরআন হাদীসের আলোকে লেনদেন সংক্রান্ত দশটি সমকালীন ও আধুনিক মাসআলা তুলে ধরা হলো, 

(১) সুদি ঋণ নিয়ে বিল্ডিং তৈরি করা যাবে?

প্রশ্ন : ব্যাংক থেকে সুদের ওপর লোন বা ঋণ নেয়া হারাম এটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। এখন কেউ যদি অজ্ঞতা বশত ঋণ নিয়ে ফেলে এবং সেই ঋণের টাকা দিয়ে ৫তলা বাড়ি বানিয়ে ফেলে, তারপর মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে খাস নিয়তে তওবা করে অনুতপ্ত হয়, তাহলে কি বাড়িটি হারাম হবে? যদি হারাম হয় তাইলে হালাল করার উপায় কি? নাকি বাড়িটি ভেঙে ফেলতে হবে? আর বাড়ি যদি ভাঙা সম্ভব না হয় তাহলে কি করতে হবে? আর যদি পুরো টাকা সুদের না হয়ে কিছু টাকা সুদের হয় তাহলেও করণীয় কী?

উত্তর : যেহেতু সুদি ভিত্তিতে ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে, সুদ গ্রহণ করেনি তাই আল্লাহর কাছে সঠিক নিয়তে তওবা করলে আশা করা যায় মহামহীম আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করবেন। ভবিষ্যতে সুদ থেকে মুক্ত থাকার দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে।

عبد الله بن مسعود عن أبيه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال لعن الله آكل الربا وموكله وشاهديه وكاتبه

হজরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) এর পিতা থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে সুদ খায়, যে সুদ খাওয়ায়, তার সাক্ষী যে হয়, আর দলিল যে লিখে তাদের সকলেরই ওপর আল্লাহ তায়ালা অভিশাপ করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং-৩৮০৯, মুসনাদে আবি ইয়ালা, হাদিস নং-৪৯৮১)

পবিত্র কোরআনে রয়েছে, ‘অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন, যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে; এরাই হলো সেসব লোক যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, রহস্যবিদ। আর এমন লোকদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, এমন কি যখন তাদের কারো মাথার ওপর মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকে, আমি এখন তওবা করছি। আর তওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি। (সূরা নিসা-১৭-১৮)

ভুলের তওবাকারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, 

وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِّمَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَىٰ 

‘আর যে তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎপথে অটল থাকে, আমি তার প্রতি অবশ্যই ক্ষমাশীল।’ (সূরা ত্বহা-৮২)

হজরত উবাদা বিন আব্দুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ، كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ

‘গোনাহ থেকে তওবাকারী এমন, যেন সে গোনাহ করেইনি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৪২৫০)

(২) খরচ কম করে বেশি খরচের ভাউচার দিয়ে টাকা গ্রহণের হুকুম কী?

প্রশ্ন:  সরকারি চাকুরীজীবীরা কখনো কখনো সরকারি কাজে সফর করেন অথবা পরিদর্শনে বের হন। এবং এতে কিছু যাতায়াত খরচ হয়। তারা এ খরচগুলো ভাউচারের মাধ্যমে সরকার থেকে উসুল করে নেন। এবং এক্ষেত্রে সাধারণত চাকুরির পদ অনুযায়ী খুব সহজেই বিল পাশ হয়ে যায় এবং চাকুরীজীবীরাও পদ অনুযায়ী ভাউচার তৈরি করে সরকারকে দেয়। সাধারণত কেউ নিজের পদ থেকে উন্নতমানের অথবা নিম্নমানের যাতায়াত খরচের ভাউচার সরকারকে দেয় না।
অতএব জানার বিষয় হলো, কোনো চাকুরীজীবী যদি সরকারি সফরে (কিছু টাকা-পয়সার আশায় একটু কষ্ট সহ্য করে) নিজের পদ থেকে নিম্নমানের যাতায়াত করে কিন্তু ভাউচার  তৈরি করার ক্ষেত্রে নিজ পদমর্যাদা সমমানের খরচ ভাউচারে  লিখে বিল পাশ করায়। তাহলে তার এ কাজটা শরীয়তের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধ? এবং আসল যাতায়াত খরচ থেকে পদমর্যাদা সমমান পর্যন্ত বাড়তি টাকা গ্রহণ করা জায়েয হবে কি না?

উত্তর : এর পদ্ধতি দু’টি। যথা: (ক) যদি কর্তৃপক্ষ যাতায়াতের টাকা দায়িত্বশীলকে মালিক বানিয়ে প্রদান করে থাকে। যাতায়াত খরচ কম হোক বা বেশি হোক, এর যিম্মাদার কর্তৃপক্ষ নয় বরং কাজটি সম্পন্ন করা দায়িত্বশীলের দায়িত্ব। আর এজন্য যাতায়াত ভাড়া নামে টাকা বরাদ্দ করা হয়।

(খ) কর্তৃপক্ষ যাতায়াত খরচ হিসেবেই টাকাটি প্রদান করে থাকে। অর্থাৎ কোনো কারণে খরচ বেশি হলে কর্তৃপক্ষ এর যিম্মাদার হয়।

উপরোক্ত দুই পদ্ধতির মাঝে প্রথম পদ্ধতিতে কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীলকে যাতায়াত খরচ হিসেবে যে টাকা প্রদান করে থাকে, সেটির মালিক বানিয়ে দিয়ে থাকে। খরচের কমবেশির যিম্মাদার কর্তৃপক্ষ হয় না। তাই এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ব্যক্তি খরচ কমিয়ে বাকি টাকা রেখে দেয়া তার জন্য বৈধ হবে।

আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে যেহেতু যাতায়াত খরচ হিসেবে টাকাটি প্রদান করে থাকে। বেশি খরচ হলে কর্তৃপক্ষ যিম্মাদার হয়। তাহলে বুঝা যাবে যে, টাকাটি শুধু যাতায়াত ভাড়া হিসেবেই প্রদান করা হয়েছে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে এর মালিক বানিয়ে দেয়া হয়নি। শুধু কাজটি সম্পন্ন করতে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু খরচের অধিকার প্রদান করা হয়েছে। তাই এক্ষেত্রে খরচ কমিয়ে টাকা বেঁচে গেলে তা কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত দিতে হবে।

উপরোক্ত দু’টি পদ্ধতি বুঝে কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিজেরই বুঝে নিতে পারবেন তার ক্ষেত্রে করণীয় কি। 
যেহেতু প্রশ্নোক্ত পদ্ধতিতে প্রথমে খরচ করতে বলা হয়, তারপর ভাউচার করতে বলা হয়, এর দ্বারা বুঝা যায় যে, কর্তৃপক্ষ টাকা শুধু যাতায়াত খরচ হিসেবে প্রদান করে। টাকাটির মূল্য মালিকানা প্রদান করে না। শুধু প্রয়োজনীয় খরচের মালিকানা প্রদান করে থাকে। তাই উপরোক্ত পদ্ধতিতে যাতায়াত খরচের চেয়ে বেশি টাকার ভাউচার করে টাকা গ্রহণ করা বৈধ হবে না।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভূক্ত নয়। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-২৩১৪৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৪, সুনানে দারেমী, হাদীস নং-২৫৮৩, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-২২২৫, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৪৯০৫)

(৩) ঋণের টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা প্রদান:

প্রশ্ন : আমার কিছুদিন আগে টাকার প্রয়োজন হয়েছিল। তো একব্যক্তি থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেই এবং আমরা এ মর্মে সিদ্ধান্ত করেছিলাম যে, শতকরা ২০ টাকা তাকে মাসিক দেব। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঁচমাস পর ৫০ হাজার টাকার সঙ্গে ওই টাকাও দিই। আমার জন্য অতিরিক্ত টাকা দেওয়া জায়েয হয়েছে কি?

উত্তর : না, ঋণ অতিরিক্ত টাকা দেয়া নেয়া উভয়টি সুদ ও হারাম হয়েছে। (সূরা বাকারা-৭৯, সফওয়াতুত তাফাসীর, ১/১৫৮, রুহুল মাআনী ৩/৮৬)

(৪) বাকিতে মোবাইল ক্রয় করে ফের বিক্রি করার বিধান: 

প্রশ্ন : আমি মামাত ভাই থেকে ১২০০ টাকার মোবাইল ক্রয় করি। শর্ত করি ৩ মাস পর টাকা পরিশোধ করব। পরে ৫ দিন পরে তার মোবাইলটির খুব প্রয়োজন পড়ে। তাই আমার মামাত ভাই ৫০০ টাকা দিয়ে মোবাইলটি ক্রয় করে। এই বিক্রি কি সহিহ হয়েছে?

উত্তর : না, প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে আপনার বিক্রি সহিহ হয়নি। (সুনানে বায়হাকি ৮/২৩১ হাদিস নং-১৯৫০, হেদায়া ৩/৫৭, আদ দুররুল মুখতার ৮/৫৪১)

প্রশ্ন : আমি অনেক সময় ফরজ গোসলে নাকে মুখে পানি দিতে ভুলে যাই। ফলে কখনো কখনো গোসলে মাঝে নাকে মুকে পানি দিই কখনো আবার গোসলের শেষে লুঙ্গি পরিবর্তন করার আগে দিই। এ কারণে গোসলে কোনো সমস্যা হবে কি না?

উত্তর : না, কোনো সমস্যা হবে না। আপনার গোসল হয়ে যাবে। তবে ফরজ গোসলে ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিৎ। সকল গোসলেই প্রথম ওজু করে নিবে এরপর গোসল করবে। (আবু দাউদ ১/২৬৯ হাদিস নং ২৪৭, হাশিয়াতুত ত্বহাবি-১০২, উমদাতুল ফিকহ ১/১৬৪)

(৫) নির্ধারিত সময়ের আগে মূল্য পরিশোধে কম দেওয়ার বিধান:

প্রশ্ন : আমি একটি দোকান থেকে একটি পণ্য ক্রয় করি। এবং দোকানদারকে বলি ৩ মাস পর টাকা পরিশোধ করব। এক সপ্তাহ পর সে বলে আমাকে আজ টাকা দিলে নির্ধারিত মূল্য থেকে পাঁচশত টাকা কম দিলেই চলবে। পরে আমি তাকে ৫০০ টাকা কম দিই। আমার জন্য এমন করা জায়েয হয়েছে কি?

উত্তর : বাকিতে পরিশোধ্য টাকা আগেই নির্ধারিত মূল্য কমিয়ে পরিশোধ করা জায়েয নেই। তবে পূর্বে কোনো প্রকার চুক্তি ছাড়া দেয়ার সময় প্রাপক কিছু কম নিলে তা নাজায়েয হবে না। (সুনানে বায়হাকি ৮/৩৫১ হাদিস নং ১১৩১৬, বুহুস ফি কাযায়া মু’আছারাহ ১/২৬, ই’লাউস সুনান ১৪/৫২৭)

(৬) সুদি কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করা:

প্রশ্ন : সুদি কারবারের সঙ্গে জড়িত কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করা জায়েয আছে কি?

উত্তর : না, সুদি কারবারের সঙ্গে জড়িত কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করা জায়েয নেই। (সুরা বাকারা-২৭৫, ফেকহি মাকালাত-১৪৪, জাদিদ মুআমালাতকে শরয়ি আহকাম ১/১০৬)

(৭) অগ্রীম কম মূল্যে ইট ক্রয় করে কয়েক মাস পর সেই ইট বুঝে নেবার চুক্তি করার হুকুম কী?

প্রশ্ন : কোনো এক এলাকার নিয়ম অনুযায়ী ইট ভাটার মালিককে প্রতি এক হাজার ইটের দাম ৫৫০০.০০/=  বর্তমানে অগ্রীম প্রদান করলে শীতের সময় যখন নতুন ইট আসে তখন ইটের দাম (যেমন- ৪০০০.০০, ৭৫০০.০০,  ৮০০০.০০/=) যাই হোক না কেন ইট ভাটার মালিক টাকা অগ্রীম প্রদানকারীকে প্রতি এক হাজার ইটের দাম ৫৫০০.০০/- হারে ইট প্রদান করে। এখন প্রশ্ন হলো, এভাবে লেনদেন করাটা জায়েজ রয়েছে?

উত্তর : হ্যাঁ!  এ পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয় জায়েজ আছে। (সূত্র: আল জাওয়াহের : খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১০৮ ও তাবীনুল হাকায়েক: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৩৬) 

তথ্যসূত্র: আরমোগান ও আহনাফ মিডিয়া সার্ভিস

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে