ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ৭ ১৪২৫,   ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪০

সুপার কম্পিউটারে মহাজাগতিক সুর

সৌরভ আল হাসান

 প্রকাশিত: ২০:৩৮ ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮   আপডেট: ২০:৩৮ ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

সুপার কম্পিউটারের ক্ষমতা কতটা হতে পারে সে বিষয়ে সবারই কম বেশি ধারণা আছে। তাই একটি সুপার কম্পিউটার নিয়ে ডেইলি বাংলাদেশের আজকের এই আয়োজন। এর নাম “সুগার” (SUGAR – Syracuse University Gravitational and Relativity Cluster)। 

নিউ ইয়র্কের সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটির (এসইউ) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ নির্মিত এই সুপার কম্পিউটারের কনফিগারেশনটা এরকম: ৩২০টি সিপিইউ, ৪৬০ গিগিবাইট র‌্যাম এবং হার্ডডিস্কের জায়গা ৯৬ টেরাবাইট। এই কম্পিউটারের মাধ্যমে কৃষ্ণ গহ্বর থেকে নিঃসৃত শব্দ চিহ্নিত করা যাবে। কৃষ্ণ গহ্বর সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য সংগ্রহ করবে সুগার। আর তথ্যের এই স্থানান্তর ঘটবে অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে।

তারা এর মাধ্যমে ঠিক কি চিহ্নিত করতে চাচ্ছেন তা বলা যাক এবার। মহাবিশ্বে কিছু কিছু ঘটনা রহস্যজনক মহাকর্ষীয় তরঙ্গের জন্ম দেয়। এ ধরণের ঘটনার মধ্যে রয়েছে দুই বা ততোধিক কৃষ্ণ গহ্বরের বিস্ফোরণ বা অতি বৃহৎ অতি নবতারার বিস্ফোরণ। কিন্তু এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত করা যায় না। 

আইনস্টাইন ১৯১৬ সালেই তার আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে এ ধরণের মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্বের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। কিন্তু তা প্রমাণিত হয়েছে অনেক পরে। যুগে যুগে আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী তত্ত্বের যে প্রমাণগুলো আমরা পাচ্ছি তার সাথে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হল এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। 

কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের সঙ্গে হয়তো এই তত্ত্বের বিরোধ রয়েছে কিন্তু নিজ ক্ষেত্রে সবসময়ই সফল হয়ে এসেছে। তাই কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের সাথে এর একীকরণের প্রচেষ্টার পাশাপাশি সাধারণ আপেক্ষিকতা নিয়ে আরও বিস্তর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে সুগার কম্পিউটার এক বিপ্লব সাধন করবে সন্দেহ নেই। উত্তরাধুনিক বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের একটি উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে এটি।

কেবল একটি কাজই বাকি। তা হলো ক্যালটেকের সাথে সিরাকিউজের সংযোগ স্থাপন। এ জন্য আবার পুরো আমেরিকা পাড়ি দিতে হবে। কারণ সিরাকিউজ হল নিউ ইয়র্কে তথা আটলান্টিকের তীরে, অন্যদিকে ক্যালটেক ক্যালিফোর্নিয়াতে, প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে। অচিরেই তথ্য বহনকারী অপটিক্যাল ফাইবার এই কাজ করে ফেলবে। এ উদ্দেশ্যে সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটি “নিসারনেট” (NYSERNet – New York State Education and Research Network)-এর সাথে একটি চুক্তি করেছে। সে হিসেবে এক গিগাবাইট গতিতে তথ্য সঞ্চালনে সক্ষম অপটিক্যাল ফাইবার যাত্রা শুরু করবে। 

গতিপথটা হবে এমন: পদার্থবিজ্ঞান ভবন -> ইউনিভার্সিটির মেশিনারি হল -> ডাউনটাউন সিরাকিউজের একটি ফ্যাসিলিটি -> নিসারনেটের ফাইবার অপটিক সংযোগ -> নিউ ইয়র্ক সিটি -> ইন্টারনেট টু হাই হাই স্পিড নেটওয়ার্ক -> ক্যালটেকের কম্পিউটার রুম। বুঝতেই পারছেন সিরাকিউজ তাদের ৯৬ টেরাবাইট জায়গা ভরেই ছাড়বে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য মতে এই ফেব্রুয়ারির মধ্যেই অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ শেষ হয়ে যাবে। এরপর কেবল তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ আর যাচাই। সফল হলে মানুষ শুনতে পাবে কৃষ্ণ বিবরের শব্দ। 

যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের “ইনস্টিটিউট ফর কম্পিউটেশনাল কসমোলজি” (আইসিসি) কম্পিউটারকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্ব গবেষণায় পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে মহাবিশ্বের কৃষ্ণ পদার্থ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা ১১ দিন ধরে তাদের সুপার-কম্পিউটারে একটি সিম্যুলেশন পরিচালনা করেছেন। এই সুপার-কম্পিউটারটির নাম কসমোলজি মেশিন বা কসমা। অবশেষে ২০০৮ সালের ১১ই জানুয়ারিতে রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির মাসিক বিজ্ঞপ্তিতে তারা এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। 

তথ্যটি এ রকম:

মহা বিস্ফোরণ ঘটার কয়েক শত হাজার বছর পর বিকিরিত বিশেষ শব্দ তরঙ্গের কারণে বর্তমানে মহাবিশ্বের উপাদান পদার্থসমূহের মধ্যে মৃদু হল্লোল লক্ষ্য করা গেছে। মহা বিস্ফোরণের পর যে ১৩ বিলিয়ন বছর পার হয়েছে ততদিনে এই শব্দ তরঙ্গগুলোর অনেকাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু সিম্যুলশনে দেখা গেছে কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে তরঙ্গগুলো টিকে থাকে এবং সে কারণেই কিছু তরঙ্গ টিকে রয়েছে। সিম্যুলেশনের মধ্যে মহাবিশ্বের অদৃশ্য শক্তির পরিমাণ বাড়িয়ে কমিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন এর সাথে সাথে হিল্লোলের দৈর্ঘ্যও পরিবর্তিত হয়। এ কারণে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন এই হিল্লোল হতে পারে কৃষ্ণ শক্তি এবং কৃষ্ণ পদার্থ পরিমাপের একটি আদর্শ মাপকাঠি।

আইসিসি’র পরিচালক অধ্যাপক কার্লোস ফ্রেংক তো বলেই বসেছেন, হিল্লোলগুলো হচ্ছে সোনালী আদর্শ। পরিমাপকৃত হিল্লোলের সাথে এই সোনালী আদর্শের তুলনা করার মাধ্যমে জানা যাবে মহাবিশ্ব কিভাবে প্রসারিত হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বের করা যাবে কৃষ্ণ শক্তির ধর্মসমূহ।

এদিকে ইতালির বোলগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা “স্পেস” (স্পেকট্রোস্কোপিক অল-স্কাই কসমিক এক্সপ্লোরার) নামে একটি কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক মহাশূন্য অভিযানের প্রস্তাব করেছেন এসা’র (ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি) কাছে। ২০১৭ সালে এর যাত্রা শুরু হওয়ার কথা। ডারহামের এই আবিষ্কার স্পেস অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করতে পারে। উল্লেখ্য স্পেস অভিযানের লক্ষ্যই হচ্ছে কৃষ্ণ শক্তি ও পদার্থের ধর্ম অনুসন্ধান করে মহাবিশ্বের পরিণতি বিষয়ে তথ্য বের করে আনা।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ