ঢাকা, শনিবার   ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ১০ ১৪২৫,   ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪০

জোড়াতালি দিয়ে চলছে ট্রেন

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট

 প্রকাশিত: ২০:৫৪ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮   আপডেট: ২০:৫৪ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

নিয়মিত ৬২টি ট্রেন চলাচল করার কথা থাকলেও লালমনিরহাট রেল বিভাগের ছয় সেকশনে ২৩টি ট্রেন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইঞ্জিন ও চালক সংকটের কারণে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এছাড়া বাকি ৩৯টি ট্রেন জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। ওই ৩৯টি ট্রেন চালানোর জন্য কমপক্ষে ৩২টি ইঞ্জিনের দরকার হলেও সেগুলো চলছে মাত্র ১৭টি ইঞ্জিন দিয়ে। এই ইঞ্জিন গুলোর মধ্যে একটি ছাড়া অন্য ১৬টি ইঞ্জিনেরই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে ২৫৪টি পদের বিপরীতে চালক রয়েছে ১৩১ জন। বাকি ১২৩টি পদ শূন্য। সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত যাত্রী কোচ না থা থাকায় ট্রেন গুলি অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে।

এ কারণে বর্তমানে চলাচলকারী ট্রেনগুলো যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। সমস্যা সমাধানের জন্য চিঠি দেয়া হলেও সে ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ বা পদক্ষেপ নিচ্ছে না রেল মন্ত্রণালয়।

লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিমাঞ্চলীয় রেলওয়ের লালমনিরহাট ডিভিশনে ছয়টি সেকশনে ১২টি রেল রুট রয়েছে। এগুলো হলো -লালমনিরহাট-বুড়িমারী, লালমনিরহাট-তিস্তা-রমনা বাজার, লালমনিরহাট-পার্বতীপুর, লালমনিরহাট-সান্তাহার, পার্বতীপুর-বিরল এবং কাঞ্চন-পঞ্চগড়। সময়সূচি অনুযায়ী এসব রুটে প্রতিদিন ২৪টি মেইল এক্সপ্রেস, ২৬টি লোকাল-মিক্সড এবং ১২টি আন্তঃনগর এক্সপ্রেস চলাচল করার কথা। কিন্তু চালক ও ইঞ্জিনের অভাবে এরইমধ্যে ওই ট্রেনগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, লালমনিরহাট রেল বিভাগের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রতিদিন ৬২টি ইঞ্জিন প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৩২টি। এর মধ্যে মেরামতের অযোগ্য হওয়ায় ছয়টি ইঞ্জিন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আটটি ইঞ্জিন ট্রেন পরিচালনায় ‘অক্ষম’হওয়ায় সেগুলো স্টেশনে শুধু শান্টিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাকি ১৭টি ইঞ্জিন দিয়ে কোনো রকমে ৩৯টি ট্রেন চালানো হচ্ছে।

লালমনিরহাট-ঢাকা রুটের লালমনি এক্সপ্রেসের নিয়মিত যাত্রী শহিদুল ইসলাম ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, আমরা লালমনিরহাট জেলাবাসী বরাবরেই বৈসম্যের শিকার হয়ে আসছি। বর্তমান সরকার রেলের উন্নয়নের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালালেও। সেই উন্নয়ন শুধুমাত্র ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমাদের উত্তরাঞ্চলের রেল রুটের নয়। সম্প্রতি ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মেয়াদোত্তীর্ণ কিছু যাত্রী কোচ লালমনি এক্সপ্রেসের জন্য দেয়া হলে সেই যাত্রী কোচের ট্রেনটি মাত্র একদিন চলাচলের পর পরই বিকল হয়ে যায়। আজ অবদি সেই ট্রেন সচল করতে পারেনি রেল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে আগের সেই পুরনো কোচ গুলো জোড়াতালি দিয়ে লালমনির এক্সপ্রেস ট্রেনটি চালানো হচ্ছে। তাই তিনি লালমনিরহাট রেল বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত  নতুন ইঞ্জিন ও যাত্রীকোচের দাবী জানান।

এ ব্যাপারে লালমনিরহাট বিভাগীয় সহকারী পার্সোনেল অফিসার ও জনসংযোগ কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, লালমনিরহাট রেল বিভাগের কাছে পরিত্যক্ত, অক্ষম ও সচল মিলিয়ে ৩২টি ইঞ্জিন রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৬১ সালে আমেরিকা থেকে আনা হয়েছে ১১টি, কানাডা থেকে ১৯৬৯ সালে আটটি ও ১৯৭৮ সালে ৯টি, ১৯৮১ সালে হাঙ্গেরি থেকে তিনটি এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য আনা একটি ইঞ্জিন পশ্চিমাঞ্চলীয় রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগকে দেওয়া হয়েছে। সাধারণত প্রতিটি ইঞ্জিনের ‘ইকোনমিক আয়ুষ্কাল’ ধরা হয় ২০ বছর। অথচ ১১টির বর্তমান বয়স ৫৪ বছর, আটটির ৪৬ বছর, ৯টির ৩৭ বছর, তিনটির ৩৪ বছর এবং সর্বশেষ পাওয়া ইঞ্জিনটির বয়স এক বছর।

লালমনিরহাট বিভাগীয় চিফ পাওয়ার (লোকোমোটিভ) কন্ট্রোলার আদম আলী ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, এ বিভাগের কাছে থাকা আমেরিকার ১১টি ও হাঙ্গেরির তিনটি ইঞ্জিন ট্রেন পরিচালনার জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কেবল কানাডার ১৭টি ও দক্ষিণ কোরিয়ার একটি দিয়ে কোনো রকমে ট্রেন চলছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান করা না হলে যেকোনো সময় ট্রেন গুলো চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

লালমনিরহাট বিভাগীয় ট্রাফিক সুপারিনটেনডেন্ট (ডিপিএস) মো. শওকত জামিল মোহসী ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, পর্যাপ্ত লোকবল ও ইঞ্জিন না থাকায় নিয়মিত চলাচলকারী ট্রেন গুলো সঠিক সময়ে চলাচলে বিঘœ ঘটছে। যদিও ইতিমধ্যে আমরা কিছু যাত্রীকোচ বরাদ্দ পেয়েছি। কিন্তু ইঞ্জিন না থাকলে সিডিউল মোতাবেক ট্রেন গেরিলা চলবে কি করে। গত কয়েক বছরে লালমনিরহাট রেল বিভাগের মোট ছয়টি সেকশনে চলাচলকারী ২৩টি ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওইসব সেকশনে পুনরায় ট্রেন চলাচলের জন্য তিনি জেলার জনপ্রতিনিধির হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোস্তাফিজার রহমান ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, লোকোমোটিভের জরুরি প্রয়োজন। বিষয়টি জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত চিঠিও দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের হাতে থাকায় কোন রকম সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তিনি জেলার মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর