Exim Bank Ltd.
ঢাকা, সোমবার ১০ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

‘খোলাফায়ে রাশেদীন’ (পর্ব-৪)

মেহেদি হাসান অপুডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
‘খোলাফায়ে রাশেদীন’ (পর্ব-৪)
ফাইল ছবি

ইসলামের খোলাফায়ে রাশেদীন (পর্ব -৩) এ মুসলিম জাহানের তৃতীয় খলীফা হজরত ওসমান রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুর জীবনচরিত ও তার খেলাফত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আজকের এই চতুর্থ পর্বে মুসলিম জাহানের চতুর্থ খলীফা ‘আসাদুল্লাহ’ ও ‘হায়দার’ নামে যিনি গোটা মুসলিম বিশ্বে পরিচিত হজরত আলী (রা.) এর জীবনচরিত ও তার খেলাফত নিয়ে আলোচনা করা হবে।

পরিচিতি:

হজরত আলী ইবনে আবু তালিব علي بن أبي طالب ইসলামের চতুর্থ ও খোলাফায়ে রাশেদীন এর শেষ খলিফা। তিনি ছিলেন মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.) এর আদরের কন্যা হজরত ফাতেমা (রা.) এর স্বামী ও মহানবীর জামাতা। হজরত আলী (রা.) বিভিন্ন নাম ও উপাধি ছিল যেমন: আলী, লকব আসাদুল্লাহ, হায়দার, কুনিয়াত আবুল হাসান, মুরতাজা ও আবু তুরাব।

হজরত আলীর (রা.) এর পিতার নাম ছিল আবু তালিব। তিনি ছিলেন আব্দুল মুত্তালিব ইবন হাশিমের পুত্র। তার মাতার নাম ছিল ফাতিমা বিনতে আসাদ। তারা উভয়েই কুরাইশ বংশের হাশেমি গোত্রের ছিলেন। হজরত আলি (রা.) কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন অকুতোভয় যোদ্ধা ছিলেন। হজরত আলী (রা.) এর বদর যুদ্ধে বীরত্বের জন্য হজরত মুহম্মদ (সা.) তাকে ‘জুলফিকার’ নামক একটি তরবারি উপহার দিয়েছিলেন এবং খাইবারের কা'মূস দূর্গ জয় করার জন্য পেয়েছিলেন ‘আসাদুল্লাহ’ বা আল্লাহর সিংহ উপাধি।

হজরত আলী (রা.) এর ইসলাম গ্রহণ ও ধর্মযুদ্ধ:

হজরত আলী ছিলেন মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.) এর আপন চাচাতো ভাই। ছোটবেলা থেকেই হজরত আলী (রা.) ইসলামের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে লালিত-পালিত হন। হজরত মুহম্মদ (সা.) যখন নবুয়ত লাভ করেন তখন হজরত আলী (রা.) এর বয়স মাত্র ১০ বছর। বালকদের মধ্যে তিনিই সর্ব প্রথম নবুয়তের ডাকে সাড়া দেন এবং মাত্র ১০ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। এছাড়াও পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম তিনিই নবী মুহাম্মদ(সা.) এর সঙ্গে নামাজ আদায় করেন।

হজরত আলী (রা.) এর ইসলাম গ্রহণ করা নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে ইতিহাসে আর তা হলো–

ছোটোবেলায় হজরত আলী একদিন ঘরের মধ্যে দেখলেন, রাসূলে কারীম (সা.) ও উম্মুল মুমিনীন হজরত খাদীজা (রা.) সিজদা করে আছেন। হজরত আলী (রা.) অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ কি করছো? একটু পরে তিনি উত্তর পেলেন যে, ‘এক আল্লাহর ইবাদাত করছি এবং তোমাকেও এর দাওয়াত দিচ্ছি। হজরত আলী (রা.) তার মুরুব্বির দাওয়াত বিনা দ্বিধায় কবুল করে নিলেন। কুফর, শিরক ও জাহিলিয়্যাতের কোনো অপকর্ম হজরত আলী (রা.)-কে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি।

হজরত আলী (রা.) উহুদ, বদর, খন্দক (পরিখা)-এর যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে যোগদান করেন এবং তাবূক ছাড়া বাকী সকল অভিযানে নবীজী (সা.) এর সঙ্গে গমন করেন। তাবূক অভিযানে যেতে না পারার কারণ ছিল সে সময় নবীজী (সা.) এর অনুপস্থিতিতে তাঁর পরিবারবর্গের তত্ত্বাবধান এবং মদিনার শাসনভার তার ওপর ন্যস্ত ছিল। খায়বারের দূর্জয় কা’মূস দূর্গের পতন ঘটে তার প্রচণ্ড আক্রমণে। ওই সময় তার বিরত্ব দেখে মহানবী (সা.) তার উপাধি দেন ‘আসাদুল্লাহ’।

এছাড়াও নবীজী (সা.) এর ওপর নবম সূরা (আল বারা’আ: বা আত-তাওবা) অবতীর্ন হওয়ার পরে মিনা প্রান্তরে হজের সময় প্রথম তেরটি আয়াত সর্বসমক্ষে ঘোষণা করার জন্য নবীজী (সা.) তাকে প্রেরণ করেন। দশম হিজরিতে হজরত আলী (রা.) ইয়ামানে ইসলামের প্রচার ও প্রসার এর উদ্দেশ্যে গমন করেন।

খোলাফায়ে রাশেদীনের চতুর্থ খলীফা নির্বাচন:

হজরত মুহম্মদ (সা.) এর মৃত্যুর পর হজরত আবু বকর (রা.) খলীফা নিযুক্ত হয়। হজরত আবু বকর (রা.) মৃত্যুর পর হজরত ওমর (রা.) এবং হজরত ওমরের মুত্যুর পর হজরত আলী (রা.) এবং হজরত ওসমান (রা.) খেলাফতের জন্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। হজরত ওসমান (রা.) ৭ সদস্যের পরিষদের ভোটে খলীফা হিসেবে নিযুক্ত হন। ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে হজরত ওসমানের (রা.) শহীদ হওয়ার পর মদিনাতে একটি সর্বব্যাপী বিশৃংখলা এবং নৈরাজ্য বিরাজ করছিল। হজরত ওসমান (রা.) এর মৃত্যুর পাঁচ দিন পরে, হজরত আলী (রা.) মুসলিম জাহানের চতুর্থ খলীফা নির্বাচিত হন এবং জনগণসহ বিশিষ্টজনেরা তার হাতে একে একে বায়'আত গ্রহণ করেন।

হজরত আলী (রা.) এর খেলাফতকাল:

চতুর্থ রাশীদুন (সঠিক পথপ্রদর্শক) হিসেবে নির্বাচিত হয়েও, তাকে প্রচুর বিরোধীতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। প্রথম ফিতনা আর হজরত আলী (রা.) এর খেলাফত সমসাময়িক ছিল। খলীফা হওয়ার পর হজরত আলী (রা.) সর্বপ্রথম হজরত ওসমান (রা.) এর হত্যাকারীদের খোঁজ করেন কিন্তু তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না।

কিন্তু একদিকে হজরত আয়শা (রা.), আল-যুবায়ের এবং তালহা মক্কাতে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে অপরদিকে মুয়াবিয়া, যে ছিল পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের উমাইয়া শাসক, হজরত আলী (রা.)-কে খলিফা হিসেবে মেনে নিতে অসম্মতি জানায়। যার ফলস্বরূপ হজরত আলী (রা.) এর খেলাফত লাভের পর একটি সামরিক যুদ্ধ সংগঠিত হয়।

যার ফলশ্রুতিতে ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত উষ্ট্রের যুদ্ধে হজরত মুহম্মদ (সা.) এর সহধর্মিনী হজরত বিবি আয়েশা (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবাদের বিরুদ্ধে হজরত আলী (রা.) অস্ত্র ধরতে বাধ্য হন এবং সেই যুদ্ধে জয়লাভও করেন এবং ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে হজরত আলী (রা.) সিফফিনের যুদ্ধে মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে অবর্তীণ হন। মুয়াবিয়ার সঙ্গে হজরত আলী (রা.) একটি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান হয় যেটি মুয়াবিয়ার চুক্তি নামে পরবর্তীতে পরিগণিত হয়। সিফ্ফিনের যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর ‘দুমাতুল জানদালে’ ইসলামী খেলাফতের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণের বৈঠককালে প্রায় ১২ হাজার সৈন্য সংবলিত একটি শক্তিশালী বাহিনী খলিফার পক্ষ ত্যাগ করে তার বিরোধীতা শুরু করে। এই বাহিনী থেকেই পরবর্তীতে ইসলামে 'খারেজি' নামে উগ্রপন্থী সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে।

খারেজীরা সিফফিনের যুদ্ধে মুয়াবিয়ার সঙ্গে স্বাক্ষরিত যে চুক্তি হয়েছিল তার বিরোধিতা করতে থাকে। এবং জনসম্মুখে সবাইকে হুমকি দিতে থাকে যে যারা তাদের সঙ্গে যোগদান করবে না তারা তাদের সবাইকে হত্যা করবে। হজরত আলী (রা.) তাদেরকে নাহরাওয়ান যুদ্ধে পরাজিত করেন। খারেজীদের এই হত্যাকান্ড ছিল খেলাফতের সবচেয়ে সমস্যাপূর্ণ ঘটনা।

হজরত আলী (রা.) এর মৃত্যু:

নাহরাওয়ানের যুদ্ধে পরাজয় এবং তাদের সঙ্গীদের মৃত্যুতে খারেজীরা ক্ষোভে ফেটে পরে। খারেজী সম্প্রদায়ের তিন ব্যক্তি যারা ছিলেন আবদুর রহামান মুলজিম, আল-বারাক ইবন আবদিল্লাহ ও আমর ইবন বকর আত-তামীমী নাহরাওয়ানের যুদ্ধে পরাজয়ের পর একটি গোপন বৈঠকে মিলিত হয়। এবং দীর্ঘ সেই আলোচনায় তারা এ সিদ্ধান্ত নেই যে, হজরত আলী (রা.), মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আসকে হত্যা করবে। তাদের এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক আল-বারাক ও আমর দায়িত্ব নিল যথাক্রমে মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.) এর এবং মুলজিম দায়িত্ব নিল আলীর (রা.) এর। এবং তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো যে, মারবে নয় তো মরবে।

হজরত আলী (রা.) ওই সময় মিশরে অবস্থানরত ছিলেন। সময়টি ছিল হিজরী ৪০ সনের ১৭ রমজান ফজরের নামাজের সময় ঘাতক মুলজিম খলিফা হজরত আলী (রা.)-কে নির্মমভাবে হত্যা করে। হিজরী ৪০ সনের ১৬ রমজান দিবাগত রাতে ঘাতক নিজ স্থানে ওৎ পেতে ছিল।

ফজরের নামাজের সময় যখন হজরত আলী (রা.) আস-সালাত বলে মানুষকে নামাজের জন্য ডাকতে ডাকতে মসজিদের দিকে যাচ্ছিলেন, ঘাতক পাপিষ্ঠ ইবন মুলজিম শাণিত তরবারি নিয়ে হজরত আলী (রা.) এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে খলিফাকে আহত করে এবং বিষযুক্ত তরবারি দিয়ে মাথায় আঘাত করে। সেই সময়ই মুসলিম জাহানের চতুর্থ খলিফা চার বছর নয় মাস খিলাফত পরিচালনার পর ১৭ রমজান ৪০ হিজরী শনিবার কুফায় শাহাদত বরণ করলেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কোলে যিনি লালিত-পালিত হয়েছিলেন, শেষনবীর মুখে যিনি পবিত্র কোরআন শ্রবণ ও শিক্ষা লাভ করেছেন এবং বুঝেছেন, তার জ্ঞানের সঙ্গে আর কারো জ্ঞানের তুলনা করা হয় না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি জ্ঞানের শহর এবং আলী তার দরজা।’ এই কারণে সাহাবীগণের মধ্যে হজরত আলী (রা.) ছিলেন অন্যান্য জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন ও অধিক সম্মানিত।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

আরোও পড়ুন
সর্বাধিক পঠিত
ফাইভ জি চালু হতেই মরল কয়েকশ পাখি!
ফাইভ জি চালু হতেই মরল কয়েকশ পাখি!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেয়াই মারা গেছেন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেয়াই মারা গেছেন
ফখরুলের গাড়িবহরে হামলা
ফখরুলের গাড়িবহরে হামলা
‘বিশ্ব সুন্দরী’র মুকুট পড়া হলো না ঐশীর
‘বিশ্ব সুন্দরী’র মুকুট পড়া হলো না ঐশীর
দেশের মাটিতে মাশরাফির শেষ ম্যাচ
দেশের মাটিতে মাশরাফির শেষ ম্যাচ
মৃত সাফায়েত উদ্ধার, বাবা আটক; সুরায়েত জীবিত
মৃত সাফায়েত উদ্ধার, বাবা আটক; সুরায়েত জীবিত
৭ দিনের নিচে কোন ইন্টারনেট প্যাকেজ নয়
৭ দিনের নিচে কোন ইন্টারনেট প্যাকেজ নয়
ভাইরাল জন-মিথিলা, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়!
ভাইরাল জন-মিথিলা, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়!
সিলেটি যুবককে বিয়ের জন্য ক্যাথলিক মেয়ের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ
সিলেটি যুবককে বিয়ের জন্য ক্যাথলিক মেয়ের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ
এমিরেটসের হীরায় মোড়ানো বিমান
এমিরেটসের হীরায় মোড়ানো বিমান
সোমবার রাতের মধ্যেই ঢাকা ছাড়ছেন এরশাদ
সোমবার রাতের মধ্যেই ঢাকা ছাড়ছেন এরশাদ
‘যৌন মিলন দেখিয়ে আনন্দ পাই’
‘যৌন মিলন দেখিয়ে আনন্দ পাই’
বাংলাদেশি অভিনেত্রী হিসেবে পরীই প্রথম
বাংলাদেশি অভিনেত্রী হিসেবে পরীই প্রথম
পাপ যেন পিছু ছাড়ছে না নিকের!
পাপ যেন পিছু ছাড়ছে না নিকের!
বিশ্বের আদর্শ ফিগারের নারী কেলি ব্রুক
বিশ্বের আদর্শ ফিগারের নারী কেলি ব্রুক
বিএনপির হয়ে লড়বেন পার্থ
বিএনপির হয়ে লড়বেন পার্থ
প্রভার নাচে জিতবে ঢাকা!
প্রভার নাচে জিতবে ঢাকা!
বাবার ইচ্ছাপূরণে হেলিকপ্টারে বউ তুলে আনল ছেলে
বাবার ইচ্ছাপূরণে হেলিকপ্টারে বউ তুলে আনল ছেলে
স্বামীকে আটকে স্ত্রীকে গণধর্ষণ, আটক ৬
স্বামীকে আটকে স্ত্রীকে গণধর্ষণ, আটক ৬
মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা হতে পারে: ইসি সচিব
মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা হতে পারে: ইসি সচিব
শিরোনাম :
কিছুক্ষণের মধ্যে ঢাকা ছাড়ছেন এরশাদ কিছুক্ষণের মধ্যে ঢাকা ছাড়ছেন এরশাদ খুলে দেয়া হয়েছে বন্ধ করা ৫৮ ওয়েবসাইট খুলে দেয়া হয়েছে বন্ধ করা ৫৮ ওয়েবসাইট ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২৪টি আসনে নির্বাচন করবে জামায়াতে ইসলামী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২৪টি আসনে নির্বাচন করবে জামায়াতে ইসলামী ১২ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়া থেকে নির্বাচনী প্রচারণায় নামছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়া থেকে নির্বাচনী প্রচারণায় নামছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা