.ঢাকা, শনিবার   ২৩ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ৯ ১৪২৫,   ১৬ রজব ১৪৪০

‘এমন শিক্ষক চাই’

সৈয়েদা সাদিয়া

 প্রকাশিত: ১৬:৪৭ ১২ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৬:৪৭ ১২ জানুয়ারি ২০১৯

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

‘ডেড পয়েটস সোসাইটি’। একটি অসাধারণ ছবি। আমরা জীবনে অসংখ্য সিনেমা দেখেছি কিন্তু মনে রেখেছি কয়টি? তবে কিছু কিছু সিনেমা মনে গেঁথে থাকে যুগ যুগ ধরে। যা দেখবার সময় মনে হয় খুব সহজ কিন্তু বহুদিন ধরে ভাবায়। এমনই একটি সিনেমা এটি।

‘ডেড পয়েটস সোসাইটি’ মুক্তি পায় বহু আগে। তবে দর্শক হয়ে দেখেছি কিছুদিন আগে। কিন্তু, প্রথমবার দেখার পরেই মনে হয়েছে এই ধরণের সিনেমা যদি প্রত্যেক ছাত্র ও শিক্ষককে দেখাতে পারতাম! কারণ এই ছবিটিতে একজন শিক্ষক ও ছাত্রের শেখার অনেক কিছু রয়েছে।

ছবির গল্পটিতে দেখানো হয়েছে, যুগের পর যুগ একটা স্কুলে একই রকম শিক্ষাব্যবস্থা চলে আসছে। আর ঘরে বসে স্কুলে পাঠিয়ে বাবা মায়েরাও বেশ নিশ্চিন্ত। এরকমই একগুঁয়ে পরিবেশ সর্বদা দেখা যায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়। কোনো পরিবর্তন নেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ছেলেরা বইয়ের লেখাগুলো পড়ছে, জানছে, পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু, তারা কতটা সত্যিকার অর্থে জ্ঞান অর্জন করছে? 

যে কবিতাগুলো নিতান্তই বিরক্ত হয়ে মুখস্থ করছে ছেলেরা, সেগুলোর প্রত্যেকটা লাইনের অন্তর্নিহিত মজাটুকু কয়জন নিতে পারছে?

তবে এই ছবিটাতে দেখানো হয়েছে একজন শিক্ষকের গল্প। যিনি কিনা একটি স্কুলের সঙ্গে নতুন যুক্ত হন। তার নাম জন কিটিং। যিনি পড়ালেখার স্টাইলটাই চেঞ্জ করে দিলেন। শুধু ক্লাসে না, শেখানোর প্রয়োজনে তিনি ছাত্রদের বাইরে নিয়ে যান। পড়ানোর বাইরে তাদের মানসিকতাকে বিকশিত করতে অনেক গল্পও বলেন। 

খুব অবচেতনভাবে তিনি ছাত্রদের মধ্যে একটা রোগও ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। তা হলো, জানার আগ্রহ, স্বপ্ন দেখার আগ্রহ, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখার কৌশল। তিনি ছাত্রদের বলতেন, বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলতে। ওসব বইয়ে শুধু কবিতাই লেখা থাকে। কবিতা বোঝার ভাষা শেখানো হয় না তাতে। কবিতার ভেতরের রসটুকু তিনি ছাত্রদের বোঝাতেন। 

আর ছাত্রদের বলতেন, তাকে ক্যাপ্টেন বলে ডাকতে। মোটামুটি তাকে বলা যায় এক প্রথাবিরোধী শিক্ষক। তিনি ছাত্রদের কাছে শোনালেন, ডেড পয়েটস সোসাইটির কথা। কী হয় সেখানে?।

আর এই সিনেমার অন্যতম এক চরিত্র নীল। যা এক কিশোরের প্রতিচ্ছবি। ভিন্ন কিছু করার তাড়না থাকলেও একটু অনুপ্রেরণার অভাবে তা আর প্রকাশিত হয় না। জন কিটিংস নীলের মধ্যে সেই ভিন্ন কিছু করবার তাড়না দিয়ে দেন। এরপর নীল খুঁজে পেয়েছিল তার জীবনের আনন্দের জায়গাটুকু, যা সে হাতড়ে বেড়ায়।

যেই কাজটা একজন ছাত্র তুমুল আনন্দ নিয়ে করতে চান, সেটি তিনি করতে দেন। নীলও ছিল এমন। সে অভিনয় শিল্পী হতে চান, তবে তার বাবা সেটি পছন্দ করতেন না। যা হবার তাই হলো। নীলের পিতা জেনে গেলেন, ছেলে আজকাল বড্ড সাহসী হয়ে উঠেছে। পড়ালেখার বাইরের জগতে তার পা পড়েছে। 

আর স্কুল প্রশাসন দেখলো, নতুন এই শিক্ষক সমস্ত প্রথাবিরোধী কাজ করে বেড়াচ্ছে। ফলে প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিল, তারা জন কিটিংসকে বরখাস্ত করবে। যেদিন তিনি বিদায় নেন, সেই শেষ ক্লাসের দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে। কি দারুণ এক দৃশ্য!

এই কারণে জীবানানন্দ ঠিক বলেছিলেন, যে জীবন দোয়েলের ফড়িঙের, মানুষের সঙ্গে তার হয় নাকো দেখা।

জন কিটিংস ছাত্রদের সে জগতের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কতটা পেরেছেন, তা জানতে হলে সিনেমাটা দেখতে হবে। এমনিতেও আপনি যদি জিরো এক্সপেকটেশন নিয়েও এই সিনেমা দেখতে বসে যান, আপনি সিনেমা শেষে ভীষণ প্রভাবিত হবেন।

এই সিনেমার স্টোরিটেলিং, সিনেমার ডায়ালগ, নীল চরিত্রের স্বপ্নালু অভিনয় আপনাকে খুব ভাবাবে। আপনি দেখবেন একজন শিক্ষকের ক্ষমতা কতখানি! চাইলে একটা মানুষের গোটা দৃষ্টিভঙ্গি তিনি পরিবর্তন করে দিতে পারেন।

আমাদের সমাজেও এই মুহুর্তে ডেড পয়েটস সোসাইটির সেই জন কিটিংসের মতো কিছু শিক্ষক দরকার। যারা শুধু পড়ান বলে শিক্ষক হবেন না, তার চেয়ে বেশি তিনি জানাবেন। পৃথিবীর যত বড় বড় মানুষ, বিখ্যাত ব্যক্তি, তাদের জীবনী পড়লে জানা যায় মানুষগুলোর চিন্তার জগত বদলে দেয়ার পেছনে কোনো না কোনো শিক্ষকের অবদান রয়েছে।

ডেড পয়েটস সোসাইটি সিনেমায় সেটিই দেখানো হয়েছে। রবিন উইলিয়ামস এই সিনেমায় এতটাই অসাধারণ ছিলেন যে, চিরকালের জন্য তিনি আমার প্রিয় অভিনেতা নন, প্রিয় মানুষের তালিকায় থাকবেন। 

এই ছবির পর থেকে তাকে এতটাই আপন লেগেছে যে, আমার তখন থেকেই মনে হতে থাকে এমন একজন মানুষ যদি আমার মেন্টর হিসেবে থাকতেন!

তার প্রিয় উক্তি-

“When you read, don’t just consider what the author thinks, consider what you think.”

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই