Alexa ‌কান নিয়েছে চিলে!

ঢাকা, সোমবার   ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯,   পৌষ ১ ১৪২৬,   ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১

‌কান নিয়েছে চিলে!

 প্রকাশিত: ১৪:৫৩ ২২ নভেম্বর ২০১৯  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

কবি শামসুর রাহমান তার পণ্ডশ্রম কবিতায় বলেছেন-এই নিয়েছে নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে/ চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।/ কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে/ আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে পেঁয়াজ, লবণ এবং সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়ন নিয়ে যেসব ঘটনার উদ্ভব হয়েছে, কিংবা অতীতেও জাতীয় যেসব ঘটনা ঘটে গেছে, তাতে শামসুর রাহমানের কবিতাংশ বারংবার মনে পড়া অস্বাভাবিক নয়। সত্যিই তো, কান নিয়েছে চিলে- শুনেই আমরা যেন চিলের পিছে দৌড়ে চলেছি। নিজের কানে কেউ হাত দিয়ে দেখছি না। প্রশ্ন হতে পারে- এই আচরণ কি অজ্ঞতাপ্রসূত? অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ কিংবা যে কোনো আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। যদিও তা দেখা কিংবা নিরসনের জন্য সরকার রয়েছে, রয়েছে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকগণ। কিন্তু ঘটনার গভীরে না গিয়ে, ন্যূনতম সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে, আগেই আমরা কেন হুমড়ি খেয়ে পড়ছি? বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

ধর্মীয় অবমাননা থেকে শুরু করে পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রের নানান ঘটনা নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ায় অতি সম্প্রতি আমাদের দেশে ঘটে গেছে নানান অপ্রীতিকর ঘটনা। এসব গুজব-এর ভিত্তি কী, তা যাচাইয়ের আগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ-রক্তপাত এমনকি সাম্প্রদায়িক হামলার মতো মর্মন্তুদ ঘটনাপ্রবাহই এর জলজ্যান্ত সাক্ষী। এটা ঠিক যে, দেশের বাজারে প্রায় পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি বহুল আলোচিত। এতে সরকারও বিব্রত। পেঁয়াজের রেশ কাটতে না কাটতেই লবণের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হয়েছে সম্প্রতি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় লবণ নিয়েও ঘটে গেছে তুলকালাম কাণ্ড। ঘটনায় সারা দেশে যেমন লবণ কেনার ধুম পড়ে তেমনি অনেক স্থানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েনের খবরও এসেছে গণমাধ্যমে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে সার্বিকভাবে বাংলাদেশ গুজবের কারখানায় পরিণত হয়েছে?

গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে লবণের দাম বৃদ্ধির গুজবে দোকানীরাও লবণের দাম বাড়িয়ে দেন। এতে একদিনেই ভোগ্যপণ্যের দোকান থেকে হাজার হাজার কেজি লবণ বিক্রি হয়ে যায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয় চাহিদার চেয়ে ছয়গুণ বেশি লবণ জমা আছে। এরপরও লবণ কেনার হিড়িক থামানো যায়নি। কোথাও কোথাও বেশি দামে লবণ বিক্রির অভিযোগে দোকানিকে জরিমানাও করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ধরনের গুজব কেন ছড়ানো হচ্ছে? সার্বিক বিবেচনায় মনে হওয়া অমূলক নয় যে, জনমনে আতঙ্ক এবং জনবিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্যই গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই গুজব কারা সৃষ্টি করছে। পিঁয়াজের পর পরই কেন লবন বেছে নেয় হলো? সাধারণ মানুষকে বিপর্যস্ত করতে? গুজব বলতে যা বোঝায়, তার সত্য তো এটা।

বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক নানান বাধা-বিপত্তি উড়িয়ে দেশের বৃহত্তম অবকাঠামো পদ্মা সেতু নির্মাণ করছে; তখন গুজব রটিয়ে দেয়া হলো- নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুতে নাকি শিশুদের তাজা মাথা লাগবে। কারও কারও থলিতে তাজা মাথা পাওয়া গেল। হিরিক পড়ে গেল ছেলে ধরার। কে কাকে ধরে ভয়ভীতি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েই চললো। গণমাধ্যমে সংক্রান্ত খবরও এলো। বিজ্ঞানের এই যুগে কীভাবে ব্রিজ তৈরি হয় এবং কীভাবে তা বসানো হয় সবই তো টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে পাচ্ছে দেশের সবাই। তাহলে, সেখানে কোথায় মাথা লাগে আর তাই নিয়ে বেশ কয়েকজনের প্রাণও গেল। কোন যুগে বাস করছি আমরা! একদিকে বলছি সবকিছু ডিজিটাল হবে। প্রযুক্তিভিত্তিক দেশ চলবে। অপরদিকে সেতু বিনির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে। মানুষ আর কত পিছিয়ে যেতে পারে! কুসংস্কার মানুষকে কোথায় নিয়ে যাবে তাহলে!

কক্সবাজারের রামু, যশোরের অভয়নগর, গাইবান্ধা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের পর ভোলার বোরহানউদ্দিনে ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননার পোস্ট নিয়ে ঘটে গেছে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাসে সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা। ছাড়াও লক্ষ্য করা গেছে একাদশ জাতীয় সংসদের আগে কয়েক হাজার বোরকা পড়া রমণীকে গ্রামে গ্রামে গিয়ে খুশিমতো শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বানোয়াট গল্প বানিয়ে গ্রামের মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করলো। তাকে যেন ভোট দেওয়া না হয়। শেখ হাসিনা ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, প্রত্যহ কোরআন তেলওয়াত করেন; এমনকি নফল রোজাও রাখেন, অথচ তার বংশ পরিচয় নিয়ে কতরকমের গল্প ছড়ানো হলো। গ্রামের নিরীহ মানুষকে বিভ্রান্তি করতেই যে এই অপপ্রচার। শেখ হাসিনার দল বিপুল ভোটে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় বোঝা গেল, সে গুজবে কাজ হয়নি। তাহলে কি ধরে নিতে হবে, সাম্প্রতিক ঘটনায় অতীতের গুজব পরিচালনাকারীদের যোগসাজশ আছে?

বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হ্রাস হলেগুজবছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে যেহেতু মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়নি বলে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে, সুতরাং গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে কোনো ধরনের নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা কেউ করছে কিনা; যদি তেমন আশঙ্কা থাকে, তাহলে অবশ্যই সেই ষড়যন্ত্রের বিচার হওয়া উচিত। এছাড়া যেহেতু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, সেহেতু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের নজরদারি আরও বাড়ানো জরুরি। মনে রাখা দরকার, গুজব ছড়িয়ে জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা এক ধরনের নীলনকশা; ফলে রাষ্ট্রেরই কর্তব্য হওয়া দরকার অতিদ্রæ তা খতিয়ে দেখে কার্যকর উদ্যোগ নিশ্চিত করা। গুজব ছড়ানো সব সময়ের জন্যই অশুভ ইঙ্গিতবাহী। শুভশক্তির কোনো ব্যক্তি বা পক্ষ কাজ করতে পারে না। সংগত কারণেই গুজব রটনাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরি। সহজেই গুজব রচনা রটনা করা যায়। ফলে ক্ষেত্রে সচেতনতা তৈরির বিকল্প থাকাও উচিত নয়। সরকারের পক্ষ থেকে গুজবে কান না দিতে দেশের মানুষকে অনুরোধ করা হয়েছে। অপরদিকে গুজব জাতীয় কোনো কিছু ফেসবুকে শেয়ার বা পোস্ট দেয়া হলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও ঘোষণা রয়েছে। এরপরও বলতে চাই, সরকার প্রশাসনের পাশাপাশি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রত্যেক নাগরিককে গুজব প্রতিরোধে এগিয়ে আসা দরকার। বড় কথা, কোনো খবর শোনামাত্রই যাচাই-বাছাই ছাড়া তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া সুবিবেচনার পরিচয় হতে পারে না। কান নিয়েছে চিলে- এমন কথায় বিশ্বাস না করে নিজের কানে হাত দিয়ে দেখা শ্রেয়। পাশাপাশি গুজব ছড়ানোর বিষয়টি অত্যন্ত গর্হিত এবং অপরাধ হিসেবে শনাক্ত করাই যুক্তিযুক্ত।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর