Alexa ৮০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্নপূরণ জাফরের

ঢাকা, শুক্রবার   ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০,   ফাল্গুন ১৫ ১৪২৬,   ০৪ রজব ১৪৪১

Akash

৮০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্নপূরণ জাফরের

ইবি প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৬ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৬:২৩ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবিঃ ডেইলি বাংলাদেশ

ছবিঃ ডেইলি বাংলাদেশ

জাফরের ৮০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি নেই। এজন্য তাকে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। তাই বলে থেমে যাননি। বড়বোনের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। শতবাধা পেরিয়ে স্বপ্নপূরণ করেছেন। তার সম্পর্কে আরো জানাচ্ছেন হুমায়ূন কবীর জীবন। 

এইচএসসিতে পড়া অবস্থায় দৃষ্টিশক্তি প্রায় ৮০শতাংশ হারিয়ে যায় তার। তখন থেকেই ‘ভিডিও ম্যাগনিফায়ার’ ডিভাইস দিয়ে লেখা জুম করে পড়াশোনা করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় এসে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। প্রথমে পরীক্ষা কেন্দ্রে ব্যবহারের কোনো অনুমতি মেলেনি। এজন্য তাকে দৌঁড়াতে হয়েছিলো এ দরজা থেকে ও দরজায়। এমনকি পরীক্ষার হলে বার বার হল পরিদর্শকদের প্রশ্নের সম্মুখিনসহ অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এতে করে পরীক্ষায় মনোযোগ অনেক সময় হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু তাকে দেয়া হয়নি কোনো অতিরিক্ত সময়। গতবছরের ৫ নভেম্বর ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের ‘বি’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। ভর্তি হয়েছেন আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগে। ভর্তি হয়ে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সবাইকে।

আবু জাফরের বাড়ি দেশের সর্বোত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায়। বাবা কৃষক। মা গৃহিনী। দুই ভাই এক বোন আর বাবা-মাকে নিয়ে সংসার। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষা সমাপনী দেয় দেবীগঞ্জের খেলারাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। পরে ভর্তি হয় দেবীগঞ্জের মাড়েয়াসি রোড দাখিল মাদরাসায়। সেখান থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে দাখিল পাস করেন ২০১৫ সালে। 

এরপর ভালোই চলছিল। তবে বিপত্তিটা বাধে দাখিল পরীক্ষার পর। সবাই যখন কলেজে ভর্তির জন্য ছোটাছুটি করছিল। তখন তিনি দৌড়াচ্ছিলেন ডাক্তারের দ্বারে দ্বারে। এতে তার শিক্ষা জীবন থেকে এক বছর হারিয়ে যায়। পরে একাদ্বশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় বোদা উপজেলার সাকোয়া জামিলাতুন্নেছা ফাজিল মাদরাসায়। অনেক চিকিৎসার পরেও চোখের কোনো রকম উন্নতি না হওয়ায় ‘ভিডিও ম্যাগনিফায়ার’ ডিভাইস ব্যবহারের পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। ঠিক তখন থেকেই ডিভাইস ব্যবহার করে পড়াশোনা চালিয়ে যান জাফর।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় অনেক শিক্ষকরা তাকে সহযোগিতা না করলেও বোদা উপজেলার ইউএনও’র সহযোগিতায় প্রথমবারের মত ‘ভিডিও ম্যাগনিফায়ার’ ডিভাইস ব্যবহার করে ২০১৮ সালের আলিম পরীক্ষায় অংশ নেন। সেখান থেকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নেমে পড়েন ভর্তিযুদ্ধে। 

আর আট-দশটা ছেলের মত অংশ নেয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়। প্রথমবার কোথাও চান্স না পেয়েও হাল ছাড়েননি। আবার দ্বিতীয়বারের মত অংশ নেয় ভর্তিযুদ্ধে। দ্বিতীয়বারে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বশেমুরবিপ্রবি) ভর্তি পরীক্ষা দেয়। ইবিতে আইন ও ভূমি ব্যবস্থপনা বিভাগে ও বশেমুরবিপ্র্রবতে বাণিজ্য অনুষদে চান্স হয় তার। অবশেষে তার পছন্দ অনুযায়ী ভর্তি হয় ইবির আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, বড়বোনের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি। তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। এরপর বিয়ে দেয়া হয়। পরিবারের সবার ইচ্ছে ছিলো বোন পড়াশোনা করবে। কিন্তু সমাজের মানুষদের জন্য সেটা আর হয়ে উঠেনি। তিনি দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন। তাই সামাজিকভাবে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে তাকে নিয়ে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতেই তাকে বিয়ে দেয়া হয়। এরপর থেকে বড়বোন স্বপ্ন দেখাতেন আর বলতেন, ‘তুই একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবি’। যখন থেকে শুনি বিশ্ববিদালয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য চান্স পাওয়ার বিশেষ সুবিধা রয়েছে। তখন থেকে বিশ্ববিদালয়ে পড়ালেখা করার জোড়ালো স্বপ্ন মনের ভেতর তৈরি হয়।

ভবিষ্যতে ইচ্ছে সম্পর্কে জানতে চাইলে আবু জাফর বলেন, সৎ ও যোগ্য মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে সমাজের অবহেলিত ও অবাঞ্ছিত মানুষের সেবা করতে চাই। এমন কিছু হতে চাই যাতে আমার পরিবার নয় সারাদেশ আমাকে নিয়ে গর্ব করে। সরকারের কাছে আবেদন, যেনো দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য পরীক্ষায় ভিডিও ম্যাগনিফায়ার ব্যবহারের স্বীকৃতি দেয়া হয়। এছাড়াও সমাজের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের হীনমন্যতায় না ভুগে স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রতি আহবান জানায় সে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম