৭ মার্চের ভাষণ– পটভূমি, ইতিহাস ও শ্রেষ্ঠত্ব

ঢাকা, সোমবার   ১৭ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৩ ১৪২৬,   ১২ শাওয়াল ১৪৪০

৭ মার্চের ভাষণ– পটভূমি, ইতিহাস ও শ্রেষ্ঠত্ব

 প্রকাশিত: ১৬:৪০ ৭ মার্চ ২০১৯  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

৭ মার্চ ১৯৭১। রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবের ভাষণ শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। সেই ভাষণ শুনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রখ্যাত সুরকার আলতাফ মাহমুদ তার ৩৭০ মালিবাগ বাসায় সবে ফিরেছেন। মুখটা বেশ গম্ভীর। এসেই হাতমুখ ধুয়ে বসার ঘরে এসে বসলেন। অন্যান্য দিন বাসায় ফিরে প্রথমেই বেশ হৈ চৈ করে সারাদিনের গল্প বলেন আলতাফ।

আজ যে কী হল ! এসে শুধু এক কাপ চা চাইলেন স্ত্রী সারা আরা মাহমুদের কাছে। সারা আরা মাহমুদ ওরফে ঝিনু কিছুতেই বুঝতে পারছেন না যে আলতাফের কী হয়েছে ! চা নিয়ে ঝিনু এলেন বসার ঘরে। চা টেবিলে রেখে জিজ্ঞাসা করলেন – তুমি এত চুপচাপ কেন? রেসকোর্সে যাওনি শেখ সাহেবের ভাষণ শুনতে? আলতাফ উত্তর দিলেন – হ্যাঁ, গিয়েছিলাম তো। কিন্তু শেখ সাহেব স্বাধীনতার ঘোষণা সরাসরি দিলেন না। তিনি বললেন ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। ঝিনু জিজ্ঞাসা করলেন – আর কী বললেন?

তিনি বললেন - তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
- এটাই তো স্বাধীনতার ডাক। আর কি বললেন?

বললেন- সামরিক আইন মার্শাল-ল উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ঢুকতে হবে। যে ভাইদের হত্যা করা হয়েছে, তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখব আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারব কিনা। - তাহলে কি সরকার শেখ সাহেবের দাবি মেনে নেবেন?

- মনে হয় না। কারন তিনি বললেন- তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব। সৈন্যরা, তোমরা আমাদের ভাই। তোমরা ব্যারাকে থাকো, তোমাদের কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু আর তোমরা গুলি করবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।
- তাহলে...

- তাহলে আর কী? মানুষ মরবে। আন্দোলন তীব্রতর হবে। স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হবে। কিন্তু শেখ সাহেব যে কেন আজ স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না, বুঝতে পারলাম না।

-নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। অপেক্ষা করো। ঠিক সময়েই স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন উনি।

কথাগুলি আমি শুনেছিলাম শহিদ আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী সারা আরা মাহমুদের কাছ থেকে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরে সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। শেখ সাহেব স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন না কেন! ১৯৭০–এর ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৩টি মহিলা আসনসহ জাতীয় পরিষদে আসন সংখ্যা ছিল ৩১৩টি (৩০০+১৩= ৩১৩)। এর মধ্যে অবিভক্ত পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল– পূর্ব পাকিস্তানের আসন ছিল ১৬৯টি (১৬২+৭=১৬৯)। ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ আসনের মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পায় ১৬৭টি আসন। ওই নির্বাচনে বহু রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। সামরিক আইনের অধীনে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামীলীগ ১৬৭ টি আসন পাওয়ার পর বাকি ২টি আসন পায় পিডিপি। ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ’৭১ এর ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের পিপিপি নেতা জেড এ ভুট্টো এবং পাকিস্তান সামরিক চক্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে অর্থাৎ আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ষড়যন্ত্রকারীদের হাতের পুতুলে পরিণত হলেন সামরিক প্রেসিডেন্ট জে. ইয়াহিয়া খান। ’৭১ এর পহেলা মার্চ ১টা ৫ মিনিটে আকস্মিক এক বেতার ঘোষণায় ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত হওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গর্জে ওঠে বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান)।

৩ মার্চ পল্টনে ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগের সভায় প্রধান অতিথি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি থাকি আর না থাকি, বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন যেন থেমে না থাকে। বাঙালির রক্ত যেন বৃথা না যায়। আমি না থাকলে– আমার সহ–কর্মীরা নেতৃত্ব দিবেন। যেকোন মূল্যে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে– অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগেই ঘোষণা করেছিলেন, ৭ মার্চ রোববার রেসকোর্স ময়দানে তিনি পরবর্তীতে কর্মপন্থা ঘোষণা করবেন।

চিন্তিত পাকিস্তান সামরিক চক্র কৌশলের আশ্রয় নিল। ৭ মার্চের একদিন আগে অর্থাৎ ৬ মার্চ জে. ইয়াহিয়া খান টেলিফোনে কথা বলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, আওয়ামীলীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সরকারের তৎকালীন তথ্য কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিকের গ্রন্থে এসব তথ্য রয়েছে। ৬ মার্চ জে. ইয়াহিয়া তার দীর্ঘ টেলিফোন আলাপে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বলার চেষ্টা করেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) যেন এমন কোন কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করেন, যেখান থেকে ফিরে আসার উপায় আর না থাকে।’

৭ মার্চের পূর্ব রাতে জে. ইয়াহিয়াশেখ মুজিবুর রহমানকে অনুরোধ করেন, ‘অনুগ্রহ করে কোন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমি সহসাই ঢাকা আসছি এবং আপনার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করব। আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমি আপনার আকাঙক্ষা এবং জনগণের প্রতি দেয়া আপনার প্রতিশ্রুতির পুরোপুরি মর্যাদা দেব। আমার কাছে একটি পরিকল্পনা আছে– যা আপনাকে আপনার ছয়দফা থেকেও বেশি খুশি করবে। আমি সনির্বন্ধ অনুরোধ করছি, কোন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন না।’ ৬ মার্চ এও ঘোষণা করা হলো যে, ২৫ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।

পরিস্থিতির চাপে ভীতসন্ত্রস্ত পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সদর দপ্তর থেকে বিভিন্নভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ও আওয়ামীলীগকে এই মেসেজ দেয়া হয় যে, ৭ মার্চ যেন কোনভাবেই স্বাধীনতা ঘোষণা না করা হয়। ৭ মার্চ জনসভাকে কেন্দ্র করে কামান বসানো হয়। এমনকি আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়। মেজর সিদ্দিক সালিক তার গ্রন্থে লিখেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি ৭ মার্চের জনসভার প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ নেতাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে কোন কথা বলা হলে তা শক্তভাবে মোকাবেলা করা হবে। বিশ্বাসঘাতকদের (বাঙালি) হত্যার জন্য ট্যাংক, কামান, মেশিনগান সবই প্রস্তুত রাখা হবে। প্রয়োজন হলে ঢাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হবে। শাসন করার জন্য কেউ থাকবে না কিংবা শাসিত হওয়ার জন্যও কিছু থাকবে না।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সে সময় এমন ছিল যে, কোন কোন বিদেশি পত্রিকাও তখন জানিয়েছিল– ৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। ’৭১–এর ৫ মার্চ লন্ডনের গার্ডিয়ান, সানডে টাইমস, দি অবজারভার এবং ৬ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ৭ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বাভাস দেয়া হয়। ৬ মার্চ ’৭১ লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ছাপা হয় “ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল (৭ই মার্চ) পূর্ব পাকিস্তানের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন।”

৭ই মার্চ নির্ধারিত সময়ে বঙ্গবন্ধু বিক্ষোভে উত্তাল রেসকোর্সের লাখো জনতার সভামঞ্চে এসে উপস্থিত হন। তিনি তাঁর ১৮ মিনিটের সংক্ষিপ্ত অথচ জগৎবিখ্যাত ভাষণ রাখলেন। কিন্তু সেখানে সরাসরি স্বাধীনতার কথা বলা হল না। কিন্তু বকলমে যা বললেন সেটা স্বাধীনতারই ডাক। এই ভাষণ কালের বিচারে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা পেল। আমরা ৭ মার্চের যে ভাষণ আজ শুনতে পাই তার অভিও-ভিডিও রেকর্ড খুব একটা প্রস্তুতি নিয়ে করা যায় নি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ঢাকা বেতার থেকে সরাসরি প্রচার হওয়ার কথা থাকলেও পাকিস্তান সরকারের হস্তক্ষেপে তা সেদিন প্রচারিত হতে পারেনি। এর চিত্রায়ণও বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। এ ধরণের ভাষণ ধারণ করার মতো প্রযুক্তিও তখন তেমন বিশেষ ছিল না। যা ছিল তা বেশ ভারি ও আয়তনসমৃদ্ধ ছিল। তখন অবশ্য আজকের মতো ভিডিও ক্যামেরা তেমন ছিল না। ফটো সাংবাদিক এবং রিপোর্টাররা ছবি এবং সংবাদ সংগ্রহ করতেন। তবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম করপোরেশনের চেয়ারম্যান এ এইচ এম সালাহউদ্দিন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আবুল খায়ের এমএনএ। তারা আগেই সিদ্ধান্ত নেন, যেভাবেই হোক ভাষণের রেকর্ডিং করতে হবে। একই সঙ্গে দৃঢ় ছিলেন সরকারের ফিল্ম ডিভিশনের (ডিএফপি) কর্মকর্তা (পরে অভিনয়শিল্পী হিসেবে খ্যাত) মরহুম আবুল খায়ের। তিনি সচল ক্যামেরা বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল খায়ের ১৯৬৩ সাল থেকে ফিল্ম করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘জয় বাংলা‘ ফিচার ফিল্মের তিনি প্রযোজকও ছিলেন। তার সঙ্গে তখন অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান ছিলেন এনএইচ খন্দকার। সিদ্ধান্ত হয় যে আবুল খায়ের এমএনএ-র তত্ত্বাবধানে এনএইচ খন্দকার মঞ্চের নিচে তার যন্ত্রপাতি নিয়ে বক্তৃতা ধারণ করবেন। ডিএফপি কর্মকর্তা আবুল খায়ের মঞ্চের এক পাশে সচল ক্যামেরা নিয়ে চিত্র ধারণ করতে থাকেন। ক্যামেরার আকার বড় থাকায় খুব বেশি নাড়াচাড়া করতে তিনি পারছিলেন না। সে কারণে তিনি একটা দূরত্বে থেকে একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতার দৃশ্য যতটুকু পেয়েছেন ততটুকুই ধারণ করেছেন। ফলে দেখা যায় বক্তৃতার ভিডিও দৃশ্যটি ১০ মিনিটের। অন্যদিকে আবুল খায়ের এমএনএ-র তত্ত্বাবধানে মঞ্চের নিচে এ এইচ খন্দকার সম্পূর্ণ ভাষণের কথাই রেকর্ড করতে সক্ষম হলেন। বেতারের কর্মকর্তারাও ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করতে না পারলেও এটির পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড করাতে তাঁরা সক্ষম হন, যা পরদিন বেতারকর্মী এবং জনগণের দাবির কারণে বেতার থেকে প্রচারিত হয়। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শেষে ফিল্ম করপোরেশনের চেয়ারম্যান এইচএম সালাহউদ্দিন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভাষণটির একটি রেকর্ড প্রকাশের ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে আবুল খায়ের এমএনএ ভাষণের একটি রেকর্ড নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে হাজির হন। তিনি এর একটি কপি উপহার দিলে বঙ্গবন্ধু অভিভূত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই এত বড় কাজ কিভাবে করলি?’

এর পর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরু করলে করপোরেশনের চেয়ারম্যান এ এইচ এম সালাহউদ্দিন ভাষণের ৫০০টি রেকর্ড ৪৮, ইন্দিরা রোডস্থ অফিসের নিচে বস্তায় যত্ন সহকারে মাটিতে পুঁতে রাখার ব্যবস্থা করেন। কয়েকটি রেকর্ড কলকাতায় পাঠানোরও ব্যবস্থা করা হয়। হিজ মাস্টার্স ভয়েস (এইচএমভি) কোম্পানি রেকর্ডটি এপ্রিল মাসে পায়। তারা এর তিন হাজার কপি বিনামূল্যে বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রবাসী সরকারও বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি তখন বহির্বিশ্বে বিতরণের ব্যবস্থা করে। ঢাকা থেকে রেকর্ডটি ‘ঢাকা রেকর্ড’ নামে প্রকাশিত হয়। এই রেকর্ডে ভাষণটি যৎসামান্য সম্পাদনা করা হয়, যে সব বক্তব্য ভাষণে দুবার উচ্চারিত হয়েছিল, তা একবার রাখা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর মূল ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণার কথাটি দুবার উচ্চারিত হয়েছিল। ‘ঢাকা রেকর্ড’ তা একবার রেখেছিল। তবে ঢাকা বেতারের কপিটি নানা বাধা-নিষেধের কারণে বাইরে প্রচারে তেমন আসতে পারেনি। কিন্তু ঢাকা রেকর্ডটি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এবং স্বাধীনতার পর নানাভাবেই প্রচারিত হওয়ার সুযোগ পায়। এটি তাই সর্বাধিক প্রচারিত অভিও ভাষণ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি মাত্র দুটো প্রতিষ্ঠান রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছিল। অন্যদিকে এর সচল দৃশ্য ধারণ করেছিলেন মাত্র একজন, তিনি অভিনয়শিল্পী মরহুম আবুল খায়ের। দেশি-বিদেশি কোনো সাংবাদিক হয়তো ভাষণের খণ্ডিত কিছু অংশই ধারণ করেছিলেন। ফলে ভিডিওতে ভাষণের অতিরিক্ত দৃশ্য খুঁজে পাওয়া বেশ দুঃসাধ্যের ব্যাপার।

এই প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলে আমাদের আলোচনায় ইতি টানব। তা হল যদি প্রেক্ষিত বিচার করা হয় তাহলে ৭ মার্চের ভাষনের গুরুত্ব এবং শেখ মুজিবের শব্দচয়নের মুন্সীয়ানা বোঝা গিয়েছে ভাষণ প্রদানের অনেক পরে। এই ভাষণের রেকর্ড যদি না থাকত তা হলে অপপ্রচারের জোয়ারে ধামাচাপা পড়ে যেত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই ভাষণের ভূমিকা। যদিও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীমতাকামী মানুষ এই ভাষণের পরে কিছুটা হতাশ হলেও তারা পরে বুঝেছিল এই ভাষণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এমন কি তখনকার সংবাদপত্রগুলি এই ভাষণের গুরুত্ব অনুভব করতে ব্যর্থ হয়েছিল। পরদিন ৮ মার্চ ২৩ ফাল্গুন সোমবার তখনকার অন্যতম প্রধান দৈনিক ইত্তেফাক খবরটি ছাপে ৮ কলাম ব্যানারে। শিরোনাম ছিল, ‘পরিষদে যাওয়ার প্রশ্ন বিবেচনা করিতে পারি, যদি-’। যদি চারটি দাবি মেনে নেওয়া হয়। শিরোনামের নিচে উল্লেখ করা হয় সেই চার দাবি। ক. অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করা হয় খ. সমস্ত সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয় গ. নিরস্ত্র গণহত্যার তদন্ত করা হয় ঘ. নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। তখনকার দিনের আরেকটি প্রধান দৈনিক সংবাদ। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সংগত কারণে এ দৈনিকেও আট কলামজুড়ে ছাপা হয়। রিভার্স টাইপে শিরোনাম ছিল: ‘এবার স্বাধীনতার সংগ্রামঃ মুজিব’। খবরটিতে দুই লাইনের শোল্ডার ছিল: ‘সামরিক আইন প্রত্যাহার ও গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দিলেই পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিব কি না ঠিক করিব’। অথচ এই ভাষণের কতগুলি বিশেষ দিক আছে।

১) এই ভাষণ তীব্র উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। … রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ।’
২) এই ভাষণের আর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, নেতৃত্বের সর্বোচ্চ দেশাত্মবোধ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে স্থির এবং লক্ষ্য অর্জনে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
৩) এই ভাষণের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সময়ের পরিসীমায় গন্ডিবদ্ধ না থেকে তা হয় কালোত্তীর্ণ ও সব সময়ের জন্য প্রেরণাদায়ী- ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না’
৪) এই ভাষণের আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে এর কাব্যিকতা; শব্দশৈলী ও বাক্যবিন্যাসে তা হয়ে ওঠে গীতিময় ও শ্রবণে চতুর্দিকে অনুরণিত।
৫) এই ভাষণ ছিল তাৎক্ষণিক, স্বতঃস্ফূর্ত ও হৃদয় উৎসারিত। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চেরই কোনোরূপে লিখিত ছিল না।
৬) এই ভাষণ আকারে নাতিদীর্ঘ। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের সময় ১৮ মিনিট, শব্দ ১১০৫ (এক হাজার একশত পাঁচ)।
যে সব দিক বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এক অনন্য-অসাধারণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত তা হল –
১) জাতিসংঘের বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে (১০ই ডিসেম্বর ১৯৪৮) ঔপনিবেশবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ, জাতি-নিপীড়ন ইত্যাদি থেকে পৃথিবীর সর্বত্র জাতি-জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতি গৃহীত ও স্বীকৃত হয়। পাকিস্তানি অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও জাতি-নিপীড়নের নিগড় থেকে বাঙালির জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে নির্দেশিত বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম ছিল ওই নীতি-আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ।
২) একটি রাষ্ট্রের বন্ধন ছিন্ন করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ ছিল তৃতীয় বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম নজির সৃষ্টিকারী ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল এর সব প্রেরণার মূলে।
৩) ৭ই মার্চ বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জনতার উত্তাল মহাসমুদ্রে হাজির হন বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বাধীনতার স্বপ্নের বাস্তবায়ন তথা বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রামের উদাত্ত আহ্বান নিয়ে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আসন্ন যুদ্ধের, বিশেষ করে গেরিলা যুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণে বাঙালিদের দিকনির্দেশনা দান শেষে বঙ্গবন্ধুর আহ্বান ছিল, ‘… ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকা সত্ত্বেও তাঁরই নামে পরিচালিত নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় বাঙালির লালিত স্বপ্ন, মহান স্বাধীনতা।

৪) বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল বস্তুত বাংলাদেশের স্বাধীনতারই ঘোষণা। তবে বিদ্যমান বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তবতায় তিনি কৌশলের আশ্রয়ী হন, এই যা। ভাষণের শেষভাগে তিনি এমনভাবে ‘স্বাধীনতার’ কথা উচ্চারণ করেন, যাতে ঘোষণার কিছু বাকিও থাকে না, অপরদিকে তাঁর বিরুদ্ধে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার (UDI) অভিযোগ উত্থাপন করাও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে আদৌ সহজ ছিল না।
৫) বাঙালির জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় চূড়ান্ত পর্বে এসে একটি ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু যেভাবে দ্রুত তাঁর নিরস্ত্র জাতি-জনগোষ্ঠীকে তাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার স্বপ্ন অর্জনে সশস্ত্ররূপে আবিভর্তূ হতে উদ্বুদ্ধ করেন, সেটিও এক বিরল ঘটনা।

৫) এই ভাষণে ছিল একদিকে যেমন ছিল শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান, অপরদিকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বাঙালিদের অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টা।

৬) ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে পরিগণিত অধিকাংশ নেতৃত্বের বক্তব্য যেখানে লিখিত সেখানে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণটি ছিল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অলিখিত, স্বতঃস্ফূর্ত, যা এ ভাষণকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে।

পরিশেষে এককথায় বলা যায় যে একটি ভাষণ থেকে একটি স্বাধীনতা যুদ্ধের সূত্রপাত এমন কখনই হয় নি এ বিশ্বে। সে হিসেবে পৃথিবীর সকল স্বাধীনতা যুদ্ধের কবিতা বলা যেতে পারে এই ভাষণকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর