Alexa ৪৫ টাকার পেঁয়াজ কিনতে মধ্যবিত্তদেরও লাইন

ঢাকা, শনিবার   ২৩ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৮ ১৪২৬,   ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

৪৫ টাকার পেঁয়াজ কিনতে মধ্যবিত্তদেরও লাইন

সোহেল রাহমান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩৯ ৭ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৬:৪১ ৭ নভেম্বর ২০১৯

সংগৃহীত

সংগৃহীত

ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার পর দেশে লাগামহীনভাবে বেড়েছে পণ্যটির দাম। আর সিন্ডিকেটের কারসাজিতে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পেঁয়াজের পাইকারি দাম রাখা হচ্ছে একশ’ থেকে ১২৫ টাকা। আর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। এদিকে পেঁয়াজের দাম বাড়ায় বিপাকে দরিদ্রদের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরা। টিসিবির ভর্তূকির পেঁয়াজ কিনতে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন তারাও।

জানা গেছে, ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিজেদের রফতানি নীতি সংশোধন করে পেঁয়াজকে রফতানি নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। অন্যদিকে দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক দফতর এক নির্দেশনায় জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ থাকবে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ রফতানিতে ন্যূনতম মূল্য টনপ্রতি ৮৫০ ডলার বেঁধে দেয় দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

টিসিবির ট্রাকে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে ৪৫ টাকা

ফলে পেঁয়াজের চাহিদা মেটাতে বিকল্প বাজার হিসেবে মিয়ানমার ও মিশরকে বেছে নেয় বাংলাদেশ। এসব দেশ থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের মূল্য পড়ে মান অনুযায়ী কেজিপ্রতি ৪৫ থেকে ৭০ টাকা। পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি একশ’ থেকে ১২০ টাকায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, একই বছর আমদানি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৯২ হাজার টন পেঁয়াজ। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী দেশে এবার পেঁয়াজের মোট সরবরাহ ৩৪ লাখ ৬৬ হাজার টন।

দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ টন। সেই হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ৬৬ হাজার টন। নতুন পেঁয়াজ ওঠা পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত পেঁয়াজ রয়েছে দেশে। এরপরেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে দাম কমছে না।

কারওরান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মীরাজ মৃধা জানান, দেশি পেঁয়াজ বিক্রি করছেন ১২০ টাকায়। মিশরের পেঁয়াজ ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। আর মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি করছেন ১০৬ থেকে ১১৫ টাকায়।

পেঁয়াজের পাইকারি দাম কেজিতে ৬০ থেকে ৮০ টাকার বেশি কি করে হলো? জানতে চাইলে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমদানিকারকরা সরাসরি বিক্রি করেন না। আমরা আমদানিকারকদের কাছ থেকে এনেছি। তারা যে হারে দাম রেখেছেন সেই হারেই বিক্রি করছি। তাছাড়া পরিবহন খরচ, রাস্তায় চাঁদা, আড়ত ও গুদাম খরচ তো রয়েছেই। সবচেয়ে বড় কথা, পেঁয়াজের দাম বাড়ার খবর শুনে সবাই আমাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন।’

আড়তদার মোস্তফা জানান, পেঁয়াজের মজুদ যথেষ্ট আছে, আমদানিও বেড়েছে। এছাড়া আশ্বিন মাসের প্রথম দিকে আগাম চাষ করা পেঁয়াজ অপরিপক্ক অবস্থায় তুলে স্থানীয় বাজারসহ ঢাকার বাজারে পাঠাচ্ছেন পাবনা, নাটোর, মানিকগঞ্জসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা। তবুও দাম কমছে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পেঁয়াজের দাম বাড়ার খবর শুনে গুদাম, পরিবহন, চাঁদা, মধ্যসত্ত্বভোগীসহ সর্বস্তরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় শুরু হয়েছে।

টিসিবির ট্রাক থেকে ৪৫ টাকা কেজির পেঁয়াজ কিনতে লম্বা লাইন

কারওয়ান বাজারে আসা ক্রেতা মনিরা জামান বলেন, খুব কষ্ট করে সংসার চালাতে হয়। মধ্যবিত্ত মানুষ আমরা, মাসের বেতন হিসাব করে খরচ করতে হয়। হঠাৎ কোনো পণ্যের দাম এতো বাড়া আমাদের জন্য সুখকর নয়। ৪০ টাকার পেঁয়াজ দাম বাড়িয়ে ১৫০ টাকা আদায় করা অমানবিক। তিনি আরো বলেন, আবার টিসিবির ন্যায্য মূল্যের দোকানেও যেতে পারি না। মানুষের ভিড়ে ঠেলাঠেলি করে লাইনে দাঁড়ানো সম্ভব হয় না। তবে পরিচিত অনেকেই গৃহকর্মী, বাসার দারোয়ান বা অফিসের পিয়নকে দিয়ে আনাচ্ছেন। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এ জন্য অনেকেই যান না। সব মিলিয়ে সমস্যা বেশি মধ্যবিত্তেরই।  

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম অনেক বেড়ে গেছে, সহসা কমার সম্ভাবনাও দেখছি না। এই অবস্থা কখনোই কাম্য না। এটা ব্যবসায়ীদের কারসাজি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’

তিনি আরো বলেন, প্রতি বছর এ সময় দেখা যায় দেশে পেঁয়াজ নিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। তাই সরকারের উচিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা। যাতে এ সময় দেশে পেঁয়াজ নিয়ে কোনো ধরনের সমস্যা না হয়।

এদিকে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীতে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এ বিষয়ে টিসিবির মুখপাত্র মো. হুমায়ুন কবির বলেন, পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে। প্রথমে পাঁচটি স্পটে বিক্রি কার্যক্রম শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে তা বাড়িয়ে ৩৫টি ট্রাকে চক্রাকারভাবে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, একজন ডিলার ৪৫ টাকা কেজি দরে প্রতিদিন এক হাজার কেজি (এক টন) পেঁয়াজ বিক্রি করবেন। যা পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত অব্যহত থাকবে।

টিসিবির ট্রাক থেকে ৪৫ টাকা কেজির পেঁয়াজ কিনতে লম্বা লাইন

রাজধানীর সচিবালয় এলাকা, খামারবাড়ী, টিসিবি ভবন, কচুক্ষেত, মিরপুর, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন টিসিবির বিক্রয় প্রক্রিয়ায় দেখা যায়, লাইনে দাঁড়িয়ে এক কেজি পেঁয়াজের জন্য অপেক্ষা করছেন মধ্যবিত্তরাও। ঘণ্টার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছে শত শত ক্রেতা। তারা জানান, দাম বাড়ার প্রথম দিকে কয়েকদিন জনপ্রতি ৫ কেজি করে পেঁয়াজ দেয়া হতো। এখন দাম বেশি বেড়ে যাওয়ায় ১ কেজির উপরে দিচ্ছে না টিসিবি।

এদিকে রেস্টুরেন্টগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, পেঁয়াজের দাম বাড়ায় খাবারের মানও কমিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, কিছু খাবারের স্বাদ ও মান রক্ষায় পেঁয়াজের বিকল্প নেই। তাই বাধ্য হচ্ছেন খাবারের মান কমাতে। কারণ খাবারের দাম বাড়ালে তো ভোক্তারা মানতে চান না।    

পেঁয়াজের দামের ব্যাপারে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, দ্রুতই পেঁয়াজের দাম ৭০ টাকার নিচে নামিয়ে আনা যাবে। তাছাড়া কারো বিরুদ্ধে কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করায় এই সমস্যা হয়েছে। ৫০ হাজার টন পেঁয়াজ আসছে। তাই দামও কমে যাবে। তাছাড়া ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের সমস্যায় পড়তে না হয় সে বিষয়েও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস.আর/এস