৩০ বছর ধরে স্বামীদের অজান্তেই আর্তের সেবায় নিয়োজিত নয় বান্ধবী!

ঢাকা, বুধবার   ১৫ জুলাই ২০২০,   শ্রাবণ ১ ১৪২৭,   ২৪ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

৩০ বছর ধরে স্বামীদের অজান্তেই আর্তের সেবায় নিয়োজিত নয় বান্ধবী!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪৯ ২৮ মে ২০২০  

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

স্কুলের বন্ধুদেরকে জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু বলা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের সবচেয়ে ভালো বন্ধুটি হয় স্কুল থেকে। আপনারও নিশ্চয় এমন বন্ধু বা বান্ধবী রয়েছে। শৈশবে কতোই না স্বপ্ন দেখতেন একসঙ্গে কলেজে পড়বেন, চাকরি এমনকি বিয়ের পর একই শহরে থাকবে! তবে সবার ভাগ্যে এমনটা হয় না। কিছু কিছু সৌভাগ্যবানদের বেলায় মিলেও যায় পরিকল্পনা। 

আমেরিকার পশ্চিম টেনেসি এলাকায় শৈশব থেকেই একসঙ্গে আছেন ঘনিষ্ট নয় বান্ধবী। এক স্কুলে পড়া থেকে শুরু করে একই শহরে বিয়ে, একই জায়গায় বাড়ি কেনা। আজো তারা রয়েছেন একসঙ্গে। কথায় আছে আট বছরের বেশি বন্ধুত্ব নাকি ভাই-বোনে পরিণত হয়। তেমনি তারাও একে অপরকে বোন বলেই ডাকেন। 

তবে এই নয় বান্ধবী গত ৩৫ বছর ধরে সবার অগোচরে এক গুপ্তকর্ম করে আসছেন। আজ থেকে ৩৫ বছর আগের কথা। এক দুপুরে তাস খেলছিলেন বান্ধবীরা মিলে। তখনই তারা ঠিক করলেন অসহায়দের পাশে দাঁড়াবেন। তবে তা কাউকে না জানিয়ে। খেলার ছলেই সেদিনই তৈরি হয়েছিল তাদের এক গুপ্ত সংগঠন, নাম দেয়া হয় দ্য নাইন নানাস।  

তাস খেলার সময় তাদের মাথায় এই বুদ্ধিটি আসেঅসহায় মানুষের সেবা করতে গেলে প্রয়োজন অর্থের। সেই অর্থ তারা কোথায় পাবেন। তাই তারা ঠিক করলেন নিজেরাই নিজেদের পরিবারের সব কাপড় কাচবেন। লন্ড্রিতে পাঠাবেন না। লন্ড্রির পয়সা জমিয়ে দুঃস্থদের সেবা করবেন। শুরুর দিকে মাসে প্রায় ৪০০ ডলার করে জমিয়ে ফেলতে শুরু করলেন। সেসময় প্রত্যেকের বয়স ছিল ৩০ এর কোঠায়। স্বামীরা অফিসে যাওয়ার পর শুরু হতো তাদের কাপড় কাচাকাচি। ফলে স্বামীরা এর কিছুই জানতে পারতেন না।

তহবিল তৈরি হওয়ার পর তারা নেমে পড়েন আর্তের সেবায়। স্বামীরা অফিসে বা ব্যবসার কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর গাড়ি নিয়ে তারাও বেড়িয়ে পড়তেন। বুঝতে চেষ্টা করতেন, কারা অসহায়, কাদের সাহায্য প্রয়োজন। খুবই কঠিন কাজ। কারণ অনেকেই ইচ্ছা করে অসহায়ের অভিনয় করেন। তাই শোনা কথার চেয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা রেখেছিলেন তারা। নিজেরা যাকে মনে করবেন, একমাত্র তাকেই সাহায্য করবেন। এভাবে দিনের পর দিন ঘুরে, গাড়ির প্রচুর তেল পুড়িয়ে, খুঁজে পেয়েছিলেন এক ভবঘুরে মানুষকে।

১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর মাস। টেনেসিতে সে বছর জাঁকিয়ে শীত পড়েছিল। ২৫ ডিসেম্বর ভোর রাতে গাড়িতে করে বেড়িয়ে পড়েন নয় বান্ধবী। তাদের দলনেত্রী মিসেস মেরি অ্যালেন। একটি ব্রিজের নিচে দেখতে পেয়েছিলেন মানুষটিকে। প্রবল ঠাণ্ডার মধ্যেই গুটিশুটি মেরে একটি প্যাকিংবাক্সের মধ্যে অসহায় ওই ব্যক্তি শুয়ে ছিলেন। মিসেস অ্যালেন মানুষটির ঘুম না ভাঙিয়ে, পাশে রেখে দিয়েছিলেন একটি ভারী প্যাকেট।

প্রকৃত অসহায় ব্যক্তিদের খুঁজে সাহায্য করতেন তারাঘুম ভাঙার পর, ২৫ ডিসেম্বর সকালে মানুষটি বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন তার পাশে রাখা আছে একটি প্যাকেট। তার ওপর সেলোটেপ দিয়ে মারা আছে একটি চিরকুট। তাতে লেখা কেউ একজন, যে তোমায় ভালোবাসে। প্যাকেট খুলে গৃহহীন মানুষটি পান, এক পাউন্ড কেক, প্রচুর কমলা লেবু, শীতের জ্যাকেট, কম্বল ও কিছু টাকা। বড়দিনে প্রভু যিশুর দেয়া উপহার পেয়ে ফুটপাথে মাথা ঠেকিয়েছিলেন কয়েকদিন ধরে অভুক্ত থাকা মানুষটি। 

গত তিন দশক ধরে চলেছে নয় বান্ধবীর এই অভিযান। টের পায়নি কাক পক্ষীও। সেই ১৯৮৫ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সবার অজান্তে চলছিল নয়জন বান্ধবীর গোপন অভিযান। এই ৩০ বছর ধরে প্রতিদিন ভোর চারটার সময় তারা চলে আসতেন এক বান্ধবীর স্বামীর রেস্টুরেন্টের কিচেনে। কেউ মাখতেন ময়দা, কেউ ফেটাতেন ডিম, কেউ ছড়াতেন বাদাম, কেউ আবার ওভেনে বেকিং করতেন। সূর্য ওঠার অনেক আগেই শেষ করতেন কেক। 

রেস্টুরেন্টের কর্মীরা আসার আগে রেস্টুরেন্টের কিচেন ঝকঝকে করে দিয়ে বেড়িয়ে পড়তেন অপারেশনে। তাদের স্বামীরা তখন বাড়ির বিছানায় গভীর ঘুমে অচেতন। তাদের ঘুম ভাঙ্গার আগেই বাড়ি ফিরে আসতেন তারা।৫০-৬০ টি কেক নিয়ে বেড়িয়ে পড়তেন বান্ধবীরা। গাড়িতে যেতে যেতেই তৈরি হত প্যাকেট। প্রয়োজন মতো প্যাকেটে ঢুকত, জামাকাপড়, ফল, মাছ, মাংস, সবজি ও বেবিফুড। 

নিজেরাই অসহায়দের জন্য কেক তৈরি করতেননয় জোড়া চোখ বাজপাখির দৃষ্টি নিয়ে খুঁজে বেড়াতো আর্ত অসহায়দের। দেখা পাওয়া মাত্রই অসহায় মানুষটিকে না জানিয়ে, তার পাশে প্যাকেটটা নামিয়ে দিয়েই গাড়ি চালিয়ে একটু দূরে চলে যেতেন। প্যাকেটটি পাওয়ার পর দুঃস্থ মানুষগুলোর মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠতো। সেটা দেখার জন্যেই অপেক্ষা করতেন বান্ধবীরা। তারপর নিজেদের চোখ মুছে খুঁজতেন পরের টার্গেট।  

এরপর তাদের অপারেশন শুরু হয়েছিল টেনেসির বস্তি এলাকায়। গাড়িতে বসে চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে তারা সেই সমস্ত বাড়িগুলোকে চিহ্নিত করতে শুরু করেছিলেন যেগুলোর জানালায় ফ্যান লাগানো ছিল। এটা থেকে বান্ধবীরা বুঝতে পারতেন, এসব বাড়িতে এয়ার কন্ডিশন মেশিন লাগাবার অর্থ নেই। এছাড়াও তাদের কেউ কেউ রাতে বের হয়ে লক্ষ্য করতেন, কোন বাড়িতে আলো জ্বলছে না বা খুবই কম পাওয়ারের আলো জ্বলছে। 

সেই মতো বাড়িগুলোর কারেন্টের বিল নাম্বার গোপনভাবে জেনে নিয়ে বিল মিটিয়ে দিতেন দ্য নাইন নানাস। মুদি খানার দোকানে অথবা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কোনো দুঃস্থ পুরুষ বা নারীকে সংকুচিত হয়ে ঢুকতে দেখলে পিছু নিতেন দ্য নাইন নানাস। দল বেঁধে নয়, দুইজন বা তিনজন। তারা লক্ষ্য করতেন, দুঃস্থ মানুষটি হয়ত কোনো পণ্য খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছেন, তবে দামটা দেখার পর মানুষটির মুখ ম্লান হয়ে উঠত। সে পণ্যটি যথাস্থানে রেখে দিতেন। 

খুবিই গোপনীয়ভাবে তারা আর্তদের সেবা করতেনওই ব্যক্তি সামান্য এগিয়ে গেলে, এক বান্ধবী সেই পণ্যটি আবার তাক থেকে তুলে নিতেন। কাউন্টারে গিয়ে পণ্যটির দাম মেটাতেন। তারপর বিল সমেত পণ্যটি ফেলে দিতেন মানুষটি সঙ্গে থাকা ট্রলিতে। পণ্যের সঙ্গে বিলটি দিয়ে দিতেন, যাতে মানুষটিকে দোকানের কর্মীরা চোর না ভাবেন। 

এভাবেই বিগত ৩০ বছরে শত শত অসহায় বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত মায়েদের পাশে দাঁড়িয়েছেন দ্য নাইন নানাস। লুকিয়ে মিটিয়েছেন বিভিন্ন বিলের টাকা। তবে বান্ধবীদের বেশিরভাগের বয়স এখন ৬০ এর উপরে। যুবতি থেকে আজ তারা হয়ে গিয়েছেন দাদী। তাই ছয় বছর আগে তারা দলে নিয়োগ দেন এক যুবতীকে। তার কাজ ছিল অসহায়দের চিহ্নিত করে সাহায্য পৌঁছে দেয়া।

মেয়েটির নাম দেয়া হয় সানি। তাদের মিশনে সানিকে নেয়ার আগে, মিশনটি গোপন রাখার বিষয়ে তাকে শপথ করানো হয়। সানির বাড়িতে জানত সে মার্কেটিংয়ের কাজ করে। দ্য নাইন নানাস এর হয়ে সানি গাড়ি নিয়ে ঘুরতেন, বন্ধুর মতো কথা বলতেন দুঃস্থ ও অসহায়দের সঙ্গে। এভাবেই তাদের নাম ঠিকানা জোগাড় করে নিতেন। সবার অলক্ষ্যে অসহায়দের দরজায় পৌঁছে যেত নয় বান্ধবীর সাহায্য।

এখনো তারা ত্রানকার্য চালিয়ে যাচ্ছেনপাঁচ বছর আগের কথা। ৭৬ বছরের অ্যালেনের সন্দেহ হয় তার জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে জমা টাকাটা বেশ কমছে। অন্যদিকে তার ৬০ বছরের স্ত্রীর গাড়ির মাইলোমিটারের রিডিং ছিল অনেক বেশি। বন্ধু স্মিথকে সে ঘটনাটি জানায়। তারও তো একই সমস্যা। স্মিথ হেসে অ্যালেনকে বলেছিলেন, বুড়ো বয়েসে বউরা আবার কচি ছেলের প্রেমে পড়ল কিনা! তবে এ সন্দেহ শুধু তাদের দুইজনেরই না। প্রায় সব বান্ধবীর স্বামীরা একই সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন পরস্পরকে। 

চিন্তিত মিস্টার অ্যালেন এক শনিবার তার বাড়ির ড্রইংরুমে ডেকেছিলেন মিটিং। সেদিন তার স্ত্রীর মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল ৩০ বছরের এই গোপন মিশনের কথা। ‘দ্য নাইন নানাস’ এর তরফ থেকে মুখ খুলেছিলেন একমাত্র মেরি অ্যালেন। তিনি বলেছিলেন, তোমাদের অ্যাকাউন্ট থেকে বেশি টাকা নিইনি আমরা। 

লন্ড্রির পয়সা বাঁচিয়ে, আমাদের বাড়ির অব্যবহৃত জিনিসপত্র বেঁচে টাকা জমাতাম। নিজেদের পরিবারের জন্য কেনাকাটা করে পাওয়া ফ্রি কুপনগুলো জমাতাম। প্রতি বুধবার গোল্ডস্মিথের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বিশাল ছাড় দেয়। বুধবারের সেল থেকে ৭০০ ডলারের জিনিস কিনতাম মাত্র ১০০ ডলারে। আমাদের জন্য নয়। কিছু অসহায় মানুষের জন্য। যাদের পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই। সব বান্ধবীর স্বামীদের চোখ নেমে যাচ্ছিল মাটির দিকে। 

এখন তাদের স্বামীরাও তাদের সঙ্গে রয়েছেনমেরি অ্যালেন বলেছিলেন, তোমরা নয়জন মানুষ কখনো ভেবেছ, সারাজীবনের উপার্জিত এত অর্থ কীভাবে খরচ করবে! ঘুরে বেড়িয়ে আর অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে খরচ করবে। আমরা কিন্তু ভেবেছিলাম, অসহায়দের জীবনযন্ত্রণা অন্তত কিছুক্ষণের জন্য কমিয়ে দেব। তোমাদের থেকে সামান্য টাকা আমরা নিয়েছি বলে, আজ আমাদের চোর অপবাদ দিয়ে মিটিং ডেকেছ!  

সবাই সেদিন ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন। স্ত্রীদের জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। হলঘর মুখরিত হয়েছিল স্বামীদের হাততালিতে। কোনো কথা না বলে চোখ মুছতে মুছতে স্ত্রীদের হাত শক্ত করে চেপে ধরেছিলেন। অভিযোগের সুরেই বলেছিলেন কেন তাদের জানায়নি তারা। এরপর তারাও যোগ দিয়েছিলেন দ্য নাইন নানাসে। গোপন সেই অপারেশন ধীরে ধীরে আন্দোলনের রুপ নিতে চলেছে টেনেসিতে।

তবে এই ৩০ বছরে দুঃস্থ ও অসহায়দের সেবায় নয় বান্ধবী প্রায় দশ কোটি টাকা খরচ করে ফেলেন। এর সিংহভাগ টাকাই এসেছিল তাদের স্বামীদের অ্যাকাউন্ট থেকে। মেরি বলেন, ঢাকঢোল পিটিয়ে দান করলে অসহায়দের ছোট করা হয়। আমরা সমাজের চোখে, অসহায়দের চোখে বড় হতে চাইনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস