Alexa ২৯ বছর পালিয়ে থেকেও আত্মসমর্পণ করলেন তিনি! 

ঢাকা, শনিবার   ১৭ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৩ ১৪২৬,   ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

২৯ বছর পালিয়ে থেকেও আত্মসমর্পণ করলেন তিনি! 

মেহেদী হাসান শান্ত  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:১৫ ১৫ আগস্ট ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

রাজকীয় জাপানি সেনাবাহিনীর পদাতিক বাহিনীতে যোগ দেয়ার পরই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়! ১৮ বছরের এই যুবকের জীবনটা ছিল বেশ সাদামাটা। সামরিক বিদ্যালয় নাকানো স্কুলের কমান্ডো ক্লাস ‘ফুতামাতা’তে তিনি ইন্টেলিজেন্স অফিসার হওয়ার প্রশিক্ষণ নেন। সেই স্কুলে ওনোদা গেরিলা যুদ্ধের নিয়ম-কানুন ও ইন্টেলিজেন্স অ্যাফেয়ার্স সম্পর্কে শিক্ষা নেন। তার নাম হিরু ওনোদা। জন্ম ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীর ইতিহাসে নানা ঘটন-অঘটনের জন্ম দিয়েছে। একদিকে পাশবিক ও নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, অন্যদিকে মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। সব যেন এসে মিশেছিল এক বিন্দুতে। তাই প্রত্যাশিতভাবেই বিশাল এই যুদ্ধের ময়দানে ঘটে গেছে কিছু আশ্চর্য হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। একইসঙ্গে মানবতার সবচেয়ে খারাপ ও সবচেয়ে ভালো; দুটো দিকই ফুটিয়ে তোলে বিশ্বযুদ্ধের বিভিন্ন কাহিনী। অনেক বিশেষ ঘটনার পাশাপাশি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বেশ কিছু ‘বিশেষ’ চরিত্রের সঙ্গেও। জাপানি সৈনিক হিরু ওনোদাও তাদের মধ্যে অন্যতম। 

মাঝখানে স্যালুটরত হিরু ওনোদা ১৯৪৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর হিরু ওনোদাকে ফিলিপাইনের লুবাং দ্বীপে নিয়োগ দেয়া হয়। অনেকেরই জানা, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপান ও ইতালি হিটলারের জার্মানির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করেছিল। তাদের প্রতিপক্ষ ছিল মিত্রশক্তি। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের সম্মিলিত জোট। লুবাং দ্বীপে তখন মিত্রশক্তির সৈন্যরা বেশ প্রভাব বিস্তার করে যুদ্ধ করছিল। তাই ওনোদাদের ওপর নির্দেশ ছিল, যেকোনো মূল্যে প্রতিপক্ষের যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজগুলো ধ্বংস করে দিতে হবে। 

হিরু ওনোদার রেজিমেন্টের কমান্ডো অফিসার ছিলেন মেজর ইয়োশিমি তানিগুচি। ওনোদার হাতে লুবাং দ্বীপ জয়ের দায়িত্ব দিয়ে মেজর ইয়োশিমি বলেন, ‘শত্রুদের দমন করতে তিন বছর লাগতে পারে। কে জানে হয়তো পাঁচ বছরও লেগে যাবে। কিন্তু যাই ঘটুক না কেন, আমরা তোমাদের জন্য ফিরে আসবো। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার একজন সৈন্যও জীবিত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার দায়িত্ব হলো তাদের নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়া।’

জাপানি সেনাবাহিনীর পোশাকে হিরু ওনোদাকমান্ডারের কাছ থেকে এই তেজদীপ্ত নির্দেশনা পেয়ে ওনোদা লুবাং দ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। অন্য একটি মিশন শেষ করে আসা কিছু জাপানি সৈন্য সেখানে তার জন্য আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। তবে লুবাং দ্বীপে ওনোদা পৌঁছানোর পরই ঘটল বিপত্তি। সেখানে থাকা জাপানি সৈন্যরা কিছুতেই তার অধীনে যুদ্ধ করতে চাইলো না। কারণ তাদের মধ্যে অনেকে র‌্যাঙ্কের হিসেবে হিরু ওনোদার চেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল। ওই সিনিয়র অফিসাররা ওনোদাকে অপারেশন পরিচালনা করতে দেয়নি। 

জাপানি সৈন্যদের এই অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে মার্কিন ও ফিলিপাইন কমনওয়েলথ ফোর্সের সেনারা সহজেই লুবাং দ্বীপের দখল নেয়। ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে লুবাং দ্বীপ মিত্রশক্তির আওতায় আসে। তবে রহস্যের তখন সবেমাত্র শুরু! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন শেষ হওয়ার পথে। হিটলার-মুসোলিনির বাহিনীকে পরাজিত করে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে তখন মিত্রশক্তি। লুবাং দ্বীপেও পরাজিত হয়েছে জাপানি সেনাবহুল অক্ষশক্তি। 

যুদ্ধরত অবস্থায় হিরু ওনোদাহিরু ওনোদা ও তার অনুগত তিন সেনা ছাড়া জাপানি বাহিনীর সবাই হয়তো মিত্রশক্তির সেনাদের হাতে প্রাণ হারায়। আর নয়তো আত্মসমর্পণ করে। তবে ওনোদা তার কমান্ডারের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখনও বেঁচে থাকা সেই ছোট চারজনের জাপানি সেনাবাহিনীর গ্রুপটিতে ওনোদাই ছিলেন সবচেয়ে বড় র‌্যাঙ্কধারী কর্মকর্তা। তার অনুসারী তিনজনকে পাহাড়ের গায়ে লুকিয়ে থাকার নির্দেশ দিলেন তিনি।     

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর শুরু হলো ওনোদার মিশন! 

জাপানি সেনারা যুদ্ধে পরাজিত হলেও ওনোদা ও তার লোকেরা লুবাং দ্বীপের পাহাড়ে লুকিয়ে থেকে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে গেল। স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে তারা বেশ কয়েকবার গুলি বিনিময় করল। ১৯৪৫ সালের অক্টোবরে ওনোদা ও তার অনুসারীরা একটি লিফলেট দেখতে পেলো। সেখানে যুদ্ধ শেষ হওয়ার ও জাপানের আত্মসমর্পণের খবর লেখা ছিল। পরবর্তীতে একদিন তারা খাদ্য সংস্থানের জন্য উপত্যকায় নেমে একটি গরু হত্যা করলো। সেদিনও ওনোদার দল দেখতে পেলো তাদের উদ্দেশ্য করে দ্বীপবাসীরা লিফলেট রেখে গিয়েছে। তাতে লেখা - ‘যুদ্ধ ১৫ আগস্ট শেষ হয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে এসো!’ তবে ওনোদা কোনো লিফলেটের লেখাই বিশ্বাস করতে রাজি হলো না! 

জাপানের এক গর্বিত সেনা হিরু ওনোদাহিরু ওনোদা ও তার ছোট্ট দলটি মনে করল, লিফলেটের লেখাগুলো মিত্রশক্তির কোনো প্রোপাগান্ডা। এসব লিফলেট দিয়ে বোকা বানিয়ে তাদের আত্মসমর্পণ করাতে চাইছে প্রতিপক্ষ। তাছাড়া স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় নিজেদের গুলি বিনিময়কেও তারা যুদ্ধের আলামত হিসেবে ভাবে। ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে ওনোদাদের ভুল ভাঙাতে আকাশ থেকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে লুবাং দ্বীপে অজস্র লিফলেট বর্ষণ করা হলো। সেগুলোতে চতুর্দশ এরিয়া আর্মির জেনারেল তমোয়ুকি ইয়ামাশিতার স্বাক্ষরিত আত্মসমর্পণপত্র প্রিন্ট করা ছিল। 

ইতোমধ্যেই চারজনের ওই দলটি পাহাড়ের গায়ে লুকিয়ে দীর্ঘ এক বছর কাটিয়ে দেয়। কিন্তু তারপরও আকাশ থেকে আসা লিফলেটগুলোকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেও তারা বিশ্বাস করল না। তারা আত্মসমর্পণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। মাতৃভূমি জাপানের শক্তির ওপর এই চার সৈনিকের বিশ্বাস ছিল অগাধ। তারা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায়নি, মহাপরাক্রমশালী জাপানি বাহিনী যুদ্ধে হেরে যেতে পারে! তবে তাদের দোষ দিয়েও লাভ নেই। অনেক আগেই যে পারমাণবিক বোমার আঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বড় দু’টি শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকিকে ধ্বংস করে দিয়েছে, সেই খবর যে তাদের কাছে পৌঁছায়নি! তাই তারা ধরেই নিয়েছিল, আর যাই হোক জাপান কোনদিন আত্মসমর্পণ করতে পারে না। 

পরের পর্বটি পড়ার জন্য ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গেই থাকুন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস

Best Electronics
Best Electronics