২৫ বছর ধরে দৃষ্টিহীন হিন্দু বন্ধুকে পথ দেখাচ্ছেন মুসলমান বন্ধু

ঢাকা, রোববার   ১৬ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ২ ১৪২৬,   ১১ শাওয়াল ১৪৪০

২৫ বছর ধরে দৃষ্টিহীন হিন্দু বন্ধুকে পথ দেখাচ্ছেন মুসলমান বন্ধু

নিউজ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৪:৪৯ ৭ জুন ২০১৯   আপডেট: ০৭:১১ ৭ জুন ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বন্ধুত্ব মানে না কোনো জাত ধর্ম। এমনটাই প্রমাণ করলেন ৬২ বছরের দুই বন্ধু। প্রত্যেক দিন বিকেল হতেই পোশাক বদলে মহম্মদ আনওয়ার মীরের অপেক্ষায় দরজার দিকে চোখ রাখেন ৬২ বছরের দৃষ্টিহীন বৃদ্ধ চমন লাল।

দীর্ঘ ২৫ বছরে এক দিনের জন্যেও এ কাশ্মীরি পণ্ডিত চমন লালের অপেক্ষা ব্যর্থ হতে দেননি তার সে ভিন্নধর্মী বন্ধু।

চমন লালের বাড়ি দক্ষিণ কাশ্মীরের শোপিয়ানের জায়নাপোরায়। বছর সত্তরের মীর থাকেন সেখান থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে বাবাপোরায়। রোজ ওই পথ পেরিয়ে দৃষ্টিহীন চমন লালকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে বেরোন মীর।

সড়কে পথচলতি মানুষের সঙ্গে টুকটাক কথাবার্তা, গল্পগুজবে মেতে উঠা। এভাবে পেরিয়ে যায় ঘণ্টা দু’য়েক। সফর শেষে বন্ধুকে ফের বাড়ি পৌঁছে নিজের বাড়ির পথ ধরেন মীর।

পঁচিশ বছর আগে হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি হারান চমন লাল। তার ভাইয়েরা কাজের খোঁজে একে একে ঘর ছাড়ার পরে জায়নাপোরার বাড়িতে একাই থেকে গিয়েছিলেন ওই বৃদ্ধ। দৃষ্টিশক্তি নেই, ফলে চার দেয়ালের বাইরে পা রাখার ক্ষমতাও হারিয়েছিলেন তিনি।

সে সময়ে ভরসা হয়ে পাশে এসে দাঁড়ান তার ছোটবেলার বন্ধু মীর। চমন লালের কথায়, ‘মীরের কাঁধে হাত রাখতেই আমার মধ্যে সিংহের আত্মবিশ্বাস জেগে উঠে!’ মীর কখন আসবেন বোঝেন কী করে? ‘দেখতে পাই না ঠিকই। কিন্তু তার আসার সময় হলে ঠিক বুঝতে পারি। তার ঘরে ঢোকার আওয়াজ পেতেই মনটা ভালো হয়ে যায়।

স্থানীয়দের কাছে ‘দুনিয়ার অষ্টম আশ্চর্য’ নামেই পরিচিত মহম্মদ আনওয়ার মীর এবং চমন লালের এ বন্ধুত্ব। জ়ায়ানপোরায় যে এলাকায় লালের ছোট এক তলা বাড়ি সেখানে হিন্দুরা এখন সংখ্যালঘু। চমন লাল ছাড়া বাস পাঁচটি পণ্ডিত পরিবারের। তবে সবাই মিলেমিশে থাকেন।

ধর্মের ভিন্নতা সেখানে প্রভাব ফেলতে পারেনি। ঠিক যেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি, মীর এবং চমন লালের এ সৌহার্দ্যের সম্পর্কেও। শুধু শুক্রবার নামাজ পড়তে অনেকটা সময় কেটে যায় বলে বন্ধুর কাছে আসতে পারেন না মীর। তা ছাড়া ঝড়-জল-বৃষ্টি বা অসুস্থতা, এত বছর কোনো কিছুই চমন লালের বাড়ি আসা থেকে আটকাতে পারেনি মীরকে।

প্রতিবেশী মহম্মদ ইসমাইল মালিকের কথায়, ‘মীরকে বার বার বলি, আবহাওয়া বা শরীর খারাপ থাকলে বেরোতে হবে না। কিন্তু তিনি শুনলে তো! তার মুখে ওই এক কথা, চমন লাল অপেক্ষা করে রয়েছে। তাকে নিয়ে হাঁটতে যেতে হবে…’

শুধু হাঁটতেই নয়, বিয়েবাড়ি, হাসপাতাল বা অন্য যে কোনো জায়গায় যেতে হলে চমন লালই মীরের একমাত্র ভরসা। এ বয়সেও বন্ধুর জন্য এতটা করার শক্তি পান কোথা থেকে? জবাব দিতে গিয়ে মীরের পাল্টা প্রশ্ন, ‘হজরত মহম্মদই আমার আদর্শ। তিনি যখন সবার জন্য এতটা ভাবতে, করতে পারতেন তবে আমি কেন চেষ্টা করব না?’

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ