Alexa মহানায়ক নাকি হত্যাকারী?

ঢাকা, রোববার   ১৮ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৩ ১৪২৬,   ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

ভ্লাদিমির লেনিন

মহানায়ক নাকি হত্যাকারী?

 প্রকাশিত: ১৫:২২ ১১ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৫:২২ ১১ অক্টোবর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

`সমাজতন্ত্র’ শব্দটির সঙ্গে একটি দেশের নাম অতোপ্রোতভাবে জড়িত তা হল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত, তেমনি সমাজতন্ত্রও সোভিয়েত ইউনিয়নেই প্রথম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পৃথিবীর সকল শাসন ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে কেনোই বা সমাজতন্ত্র? এবং কে ই বা ছিলেন এই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পিছনে? কারণ একমাত্র সমাজতন্ত্রই তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন এর খেটে খাওয়া মানুষদেরকে জার নিকোলাস (দ্বিতীয়) এর সকল অত্যাচার ও অবিচার থেকে মুক্তি দিতে পারত। কিন্তু ভ্লাদিমির লেনিন এর প্রতিষ্ঠিত সমাজতন্ত্র কি আসলেই মানুষকে মুক্তি দিতে পেরেছিল? নাকি লেনিন ও জার এর মত একজন নৃশংস হত্যাকারী ছিলেন?


 
ভ্লাদিমির লেনিন পুরো নাম, ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ। জন্ম ১৮৭০ সালের ২২শে এপ্রিল রাশিয়ার সিমবির্স্ক শহরে। ভল্গা নদীর তীরবর্তী সিমবির্স্ক নামক ছোট শহরটি রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে পনেরোশো মাইল দুরে অবস্থিত। ভ্লাদিমির ইলিচ-এর পিতা ইলিয়া নিকোলায়েভিচ্ উলায়ানভ ছিলেন বিদ্যালয় শিক্ষক এবং গণতন্ত্রবাদ-এর কট্টর সমর্থক। তার মা মারিয়া আলেক্সান্দ্রোভনা উলায়ানোভা এক প্রথিতযশা চিকিত্সকের বিদুষী কন্যা এবং শিক্ষিকা। মা-বাবার বিচার বিবেচনা, লেনিন এবং তার ভাইবোনদের মধ্যে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে। তার ভাই আলেক্সান্ডারকে জার হত্যার ষড়যন্ত্রের অপরাধে ফাঁসি দেয়া হয়। শুধু লেনিনের ভাই নয় আরো হাজার হাজার রাশিয়ানদের নির্বিচারে হত্যা করে জার সরকার।

জারের এই হত্যা ও অত্যাচার লেনিনের মনে গভীর দাগ কাটে। যার প্রতিচ্ছবি তার পরবর্তী জীবনে প্রকাশ পায়। কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ার সময় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ লেনিনকে বহিস্কার করে। ১৮৯১ সালে তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস করে, সামারাতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। এরপর সেন্ট পিটার্সবার্গ চলে আসেন এবং শিগগিরই মার্কসবাদীদের অবিসংবাদী নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ১৮৯৫ সালের ডিসেম্বরে লেনিন সমেত পার্টির বৃহৎ অংশই গ্রেফতার হয়। কারাগারে নির্বাসিত অবস্থায় ও তিনি বিপ্লবী কার্যকালাপ চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯০৫ সালে লেনিন মুক্তিলাভ করেন এবং দেশ ত্যাগ করেন।

১৯১৭ এর ফেব্রুয়ারীতে চাপের মুখে জার নিকোলাস ক্ষমতা ত্যাগ করলে রাশিয়ায় ত্বত্তাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। এই সরকারের প্রধান ছিলেন আলেকজান্ডার কারেন্সকি। তখন লেনিন সুইজারল্যান্ডে পলাতক ছিলেন। কিন্তু আলেকজান্ডার সরকার বিশ্বযুদ্ধে আরো সৈন্য প্রেরণ করেন যখন রাশিয়ার অর্থনীতি ভগ্ন ছিল এবং বেশিরভাগ মানুষই যুদ্ধ সমাপ্তির দাবি জানান। তাছাড়াও এ সরকার দূর্নীতিগ্রস্থ ছিল। সরকার সব ব্যর্থতার জন্য বলসেভিক পার্টি এবং লেনিনকে দোষারোপ করতে শুরু করেন।

আলেকজান্ডার বলসেভিক পার্টির নেতাকর্মীদের একে একে গ্রেফতার করতে থাকেন। লেনিন জুলাই এ রাশিয়া ফিরলেও একারণে তাকে আবার পালাতক জীবন পার করতে হয়। কিন্তু অক্টোবরে সৈন্যরা বিদ্রোহ করলে আলেকজান্ডার বলসেভিকদের কাছে সাহায্য চান। লেনিন এই সুযোগে কোনো রক্তপাত ছাড়াই রাশিয়ার ক্ষমতায় আহোরণ করেন এবং সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু লেনিনের সরকার কি রাশিয়ায় স্থিরতা এনেছিল?

ক্ষমতা লাভের পর বলসেভিকরা তখন কোনো বিচার ছাড়াই হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুদন্ড দেন। লেনিন জার নিকোলাসের পুরো পরিবারকে হত্যা করেন। কিন্তু জার এর শিশুদের হত্যার প্রয়োজন ছিল কি? তখন রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের বিরোধী দেশগুলো আক্রমণ করে এবং বলসেভিকরা মনে করে যদি রাশিয়া হেরে যায় তাহলে বিদেশী সরকার ক্ষমতায় এসে জার এর বংশধরদেরই ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। তাই ক্ষমতা ঠিক রাখার জন্য তারা জার এর পরিবারের শিশুদেরও হত্যা করেন।

এছাড়াও লেনিন সরকার অন্যান্য রাজনীতিক দলের নেতা যারা কি-না লাল বিপ্লবের সময়ে বলসেভিকদের সঙ্গে কাজ করছিল তাদেরও নৃশংসভাবে হত্যা করতে থাকেন। লেনিন বলসেভিকদের ক্ষমতা ঠিক রাখার জন্য বিদ্রোহ করা গণতন্ত্র পক্ষের শ্রমিকদেরও নির্মম ভাবে হত্যা করেন। যে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই কি-না সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়েছিল লেনিন দলের ক্ষমতা রক্ষার জন্য তাদের ও ছাড় দেয়নি। এভাবেই লেনিন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বিচারে হত্যা করেছিল। কিন্তু এত রক্তের উপর প্রতিষ্ঠিত সমাজতন্ত্র কি রাশিয়াতে শান্তি বয়ে এনেছিল?

সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরও রাশিয়ায় দূর্ভীক্ষ ও নিপীড়ন চলছিল। লেনিন এর উত্তরসূরি স্টালিন ক্ষমতায় এসে রাশিয়াকে নৃসংস একনায়কতন্ত্রে পরিণত করে এবং লাখ লাখ নিষ্পাপ রুশ হত্যা এবং শ্রমিক ক্যাম্পে প্রেরণ করেন। কিন্তু লেনিন স্টালিন এর মত ছিলেন না। লেনিনের শত্রুরাও বিশ্বাস করত, তিনি স্বার্থের জন্য কিছুই করেননি। এছাড়াও ছাত্রজীবন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার নীতিতে অটল ছিলেন। স্টালিনের ক্ষমতা লোভী দৃষ্টিভঙ্গী লক্ষ্য করে পার্টিকে সতর্ক করতে চেয়েছিলেন লেনিন। কিন্তু কিছু করার পূর্বেই তার অকাল মৃত্যু হয়। এভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়নে স্টালিন এর নিপীড়ন এর শাসন শুরু হয়।

লেনিনকে কেবল হত্যাকারী বললে তা হয়তো ভুলই হবে। কারণ লেনিনই রাশিয়াকে একটি ব্যর্থ রাজতন্ত্র থেকে আধুনিক পরাশক্তিতে রুপান্তরিত করেন। লেনিনের কল্যাণেই সোভিয়েত ইউনিওয়ন প্রযুক্তি, শিক্ষা, শিল্প এবং নারীদের উন্নয়ন হয়। যা পরবর্তীতে আধুনিক রাশিয়ায় পরিণত হয়। লেনিনের শাসনকালে রুশদের জীবন বিলাসবহুল না হলেও সবার জন্য বাসস্থান এবং খাবার নিশ্চিত করেন যা কি-না সে সময়ে খুব কম দেশই অর্জন করেছিলো। লেনিনকে হয়তো তার নীতির জন্য নিষ্ঠুরতার পথ বেছে নিতে হয়েছিল কিন্তু সমাজতন্ত্রের এই মহানায়কই রাশিয়াকে চিরতরে বদলে দিয়েছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড

Best Electronics
Best Electronics