Alexa ১৯৩০ থেকে ২০১৯, ৯০-তে পেয়ারা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৬ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ২ ১৪২৬,   ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪০

১৯৩০ থেকে ২০১৯, ৯০-তে পেয়ারা

সোহেল রাহমান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:১১ ২০ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ০২:৪২ ২১ মার্চ ২০১৯

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ফাইল ছবি

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ফাইল ছবি

১৯৩০ সালের ফুটফুটে শিশু ২০১৯ সাল পর্যন্ত নানা সফলতার সঙ্গেই পা রাখলেন ৯০ বছর বয়সে। ২০ মার্চ, বৃহস্পতিবার কুড়িগ্রাম শহরের লাল দালান বাড়িতে জন্ম হওয়া শিশুটিকে আদর করে নাম রাখা হয়েছিল পেয়ারা। তবে আকিকার সময় তার বাবার দেন নাম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তথ্যটি তিনি তার নিজের ‘আমার কর্ম আমার জীবন’বইয়ে লিখেছেন। যদিও উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, তার জন্ম ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলায়। 

আজ ২০ মার্চ প্রতি বছরের মতো মহা-ধুমধামে পালিত হলো তার জন্মদিন। প্রতিবারের মতোই আয়োজিত অনুষ্ঠানের আনন্দ ছিলো সব অতিথির মুখেই। যাকে ঘিরে এতো আয়োজন মলিন ছিলো শুধু সেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মুখ খানাই। কারণ তিনি আজ জীবনের শেষ প্রান্তে! 

এরশাদ চলতে পারেন না হুইল চেয়ার ছাড়া। শক্ত পেশিবহুল দেহ আজ নুয়ে পড়েছে। মুখশ্রীও হারিয়েছে তার সৌন্দর্য। কথা বলতেও কষ্ট হয়, নিজ হাতে গড়া পার্টির নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে তাই ধীরে ধীরেই বললেন, আমি দেশকে ভালোবেসেছি। চেষ্টা করেছি উন্নত রাষ্ট্র গড়ার কিন্তু মনের মতো করে পারিনি। উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে সবাই আমার ওপরে নির্যাতন আর জুলুম করেছে। হয়তো এটাই আমার শেষ বক্তব্য। তাই তোমাদের বলবো, একাটা কথা সব সময় মনে রাখবা সেটা হলো ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। 

বাবা অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন ও মা মাজিদা বেগমের ঘরে জন্ম নেয়া সাবেক এই রাষ্ট্রপতি সোনার চামচ মুখে দিয়েই জন্মেছিলেন। কেননা তিনি যে ধনীর দুলাল। তার নানা ওমর আলীও ছিলেন তৎকালীন বিশিষ্ট আইনজীবী।

এরশাদ কুচবিহার, কুড়িগ্রাম শহর ও রংপুরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাগ্রহণের পর  ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৬০-৬২ সালে তিনি চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন। ১৯৬৬ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায় অবস্থিত স্টাফ কলেজে স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেন এরশাদ। ১৯৬৮ সালে শিয়ালকোটে ৫৪তম ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি লাভের পর ১৯৬৯-৭০ সালে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে এবং বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা কালেই ১৯৭১-৭২ সালের সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়কের দায়িত্ব পান তিনি। 

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে এরশাদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হন। তিনি ১৯৭৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কর্নেল পদে এবং ১৯৭৫ সালের জুন মাসে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। একই বছর তিনি ভারতের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রতিরক্ষা কোর্সে অংশ নেন। ওই বছরই আগস্ট মাসে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে তাকে সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান করা হয়। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদকে সেনাবাহিনী প্রধান পদে নিয়োগ দেয়া হয় এবং ১৯৭৯ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন পর থেকেই সংবাদপত্রে দেশের ক্রান্তিকালে রাজনীতিতে এরশাদের আগ্রহ প্রকাশ পেতে থাকে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারের ব্যর্থতার কারণে জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে দেশের হাল ধরেন। তিনি সাময়িক সময়ের জন্য দেশের সংবিধানকে রহিত করেন, জাতীয় সংসদ বাতিল করেন এবং সাত্তারের মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করেন।

তিনি নিজেকে দেশের সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করেন। এই সাংবিধানিক পদটি একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের প্রাপ্য। তৎকালীন প্রয়োজনে তিনি ঘোষণা করেন যে, ভবিষ্যতে সামরিক আইনের অধীনে জারিকৃত বিধিবিধান ও আদেশই হবে দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং এর সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সব আইন অকার্যকর হবে।

এরপর এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। কিন্তু বিচারপতি চৌধুরীর কোনো প্রকার কর্তৃত্ব ছিল না, কারণ ঘোষিত সামরিক আইনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা ছিল যে সিএমএলএ’র উপদেশ বা অনুমোদন ব্যতীত প্রেসিডেন্ট কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ বা কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবেন না। ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে দেশ শাসন করেন। এরপর বিশেষ প্রয়োজনে তিনি রাষ্ট্রপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে অপসারণ করে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

এরশাদ ১৯৮৪ সালে দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় উপজেলা পদ্ধতির প্রচলন করেন। ১৯৮৫ সালের মে মাসে উপজেলা পরিষদসমূহের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন বর্জনের মাধ্যমে ১৯৮৬ সালের অক্টোবর মাসে আয়োজিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরশাদ তার জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পাঁচ বছর মেয়াদকালের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৮৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। 

আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তবে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়ে এরশাদ ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর তৃতীয় জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন আহ্বান করেন। সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী আইন পাশ করে সেদিন জাতীয় সংসদ সংবিধান পুনর্বহাল করে। এর মাধ্যমে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতা দখলসহ সামরিক আইন ও বিধি-বিধান দ্বারা সম্পাদিত সব কাজ ও পদক্ষেপকে বৈধতা দেয়া হয়। তবে বিরোধী দলের প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদ তৃতীয় জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হন। প্রধান বিরোধী দলগুলো ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনও বর্জন করে। এরশাদ বিরোধী দলগুলোর অবিরাম আন্দোলন চলতে থাকে এবং প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন।

এরপর ১৯৯১ সালে জেনারেল এরশাদ গ্রেফতার হন এবং তাকে কারাবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলে অন্তরীণ থাকা এরশাদ রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। বিএনপি সরকার তার বিরুদ্ধে ৪০টির মতো মামলার মধ্যে কয়েকটিতে তিনি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। 

১৯৯৬-এর সাধারণ নির্বাচনেও এরশাদ সংসদে পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। ছয় বছর জেলে থাকার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্ত হন। তবে আদালতের রায়ে দণ্ডিত হওয়ার কারণে সংসদে তার আসন বাতিল হয়ে যায়। ২০০০ সালে জাতীয় পার্টি তিনটি উপদলে বিভক্ত হয়। বর্তমানে এরশাদ একটি অংশের সভাপতি।

২০০১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৪টি আসনে জয়ী হয়। এরপর তিনি ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে মহাজোট গঠন করেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল ২৭টি আসনে বিজয়ী হয়। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৭টি আসন পায় জাপা। ২০১৯ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ২৬টি আসন পায় দলটি।

শাসনকালীন সাফল্য ও দেশব্যাপী থানা পর্যায়ে, উপজেলা স্থানীয় সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনসহ সার্বিক উন্নয়নযাত্রায় এরশাদ আমল (১৯৮২-৯০) স্মরণীয় হয়ে আছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশি কেন্দ্র হিসেবে থানাগুলোকে সৃষ্টি করে। ইউনিয়ন পরিষদগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানের জন্য ১৯৫৯ সালে প্রথমবারের মতো থানা পর্যায়ে একটি স্থানীয় সরকার ইউনিট গঠন করা হয়। প্রেসিডেন্ট এরশাদ স্থানীয় তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের অনুকূলে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কার্যকরভাবে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে প্রশাসন ও পরিকল্পনায় তাদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে সেটাকে উপজেলা করেন। 

উপজেলাগুলোকে উন্নয়ন ও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উন্নীত করার মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণ ধারণার বাস্তব রূপ দেন। সেই উদ্দেশ্য সামনে রেখে একটি আইনি কাঠামো দাঁড় করাতে ১৯৮২ সালে স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ পুনর্গঠন) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এরপর ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০টি ধাপে ৪৬০টি থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। 

এই আইনের আওতায় উপজেলা পরিষদগুলোকে একটি কর্পোরেট সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়, যাতে প্রতিনিধিত্বমূলক সদস্য ছাড়াও পেশাজীবী ও প্রায়োগিক কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। চেয়ারম্যানরা ছিলেন পরিষদের প্রধান নির্বাহী এবং তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতেন। এর বাইরে উপজেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা। উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির সভাপতি, তিনজন নারী সদস্য, একজন মনোনীত সদস্য এবং সরকারি সদস্যরা। উপজেলা পরিষদগুলোর প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যানরা ১৯৮৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার শাসনকালে জেলা পরিষদসমূহ সক্রিয় ও কার্যকর করার জন্যও এরশাদকে সাধুবাদ দেয়া হয়।

এরশাদের আরেকটি বড় সাফল্য ছিল দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠনে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নেয়া। ভারতীয় উপমহাদেশের সাতটি রাষ্ট্র যার সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ১৯৭৯ সাল থেকে চার বছরের প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষে ১৯৮৩ সালের আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে এই লক্ষ্যে একটি সমন্বিত কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। এর দুই বছর পর ১৯৮৫ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমন্ত্রণে এ অঞ্চলের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা ঢাকায় একটি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। এই প্রথম শীর্ষ সম্মেলনেই দক্ষিণ এশিয়ার নেতারা সার্ক গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। যাতে অন্তর্ভুক্ত হয় ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। 

এরশাদ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পের বিরাষ্ট্রীয়করণ এবং দেশে ব্যক্তিখাতের বিকাশে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। এর অন্তর্ভুক্ত ছিল সরকারি মালিকানাধীন উত্তরা, পুবালী ও রূপালী ব্যাংকের বিরাষ্ট্রীয়করণ। এ সময়ে দেশে প্রথমবারের মতো বেশ কয়েকটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিকে কার্যক্রম শুরুর অনুমতি প্রদান করা হয়। দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন ও সংস্কারেও এরশাদ সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়। মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করার মাধ্যমে দেশে জেলার সংখ্যা ৬৪ করা হয়। এগুলোর অধীনে আবার ন্যস্ত করা হয় ৪৬০টি উপজেলাকে। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে ১৯৮২ সালের ২৮ এপ্রিল একটি প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও সংস্কার কমিশন গঠন করেন এরশাদ। যার সুপারিশ অনুযায়ী জনপ্রশাসনকে নতুন করে সাজানো হয়।

একটি সমন্বিত বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসকে প্রায়োগিক পার্থক্যের ভিত্তিতে এরশাদ সরকার ৩০টি ক্যাডারে বিভক্ত করে। সিভিল সার্ভিস ক্যাডারসমূহের গঠন ও দায়িত্ব অনুযায়ী তাদের আনুষ্ঠানিক আকার দেয়ার লক্ষ্যে ক্যাডার কম্পোজিশন ও নিয়োগ বিধি জারি করা হয়। পাশাপাশি এদের একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য প্রণীত হয় সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধি এবং শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি। নারী সমাজের আর্থ-সামাজিক স্বার্থ সমুন্নত রাখতে এরশাদ সরকার ১৯৮৪ সালে একটি পৃথক মহিলা বিষয়ক অধিদফতর স্থাপন করে। 

এরশাদের আমলের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল পুলিশসহ বিভিন্ন সিভিল পদ ও অধিকহারে সেনা কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ। তবে প্রশাসনের আকার কমাতে তিনি বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় দফতর বিলোপ করেন এবং অনেক দফতর একীভূত করেন। ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট বেঞ্চ বসিয়ে এরশাদ উচ্চতর আদালত বিকেন্দ্রীকরণেরও চেষ্টা চালান, কিন্তু বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে তা খারিজ হয়ে যায়। 

এরশাদ সরকার ভূমি সংস্কারেরও উদ্যোগ নিয়েছিল। এই লক্ষ্যে ১৯৮২ সালে একটি কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটি ১৯৮৩ সালের জানুয়ারিতে তার প্রতিবেদন পেশ করে এবং সরকার এই প্রতিবেদনের কয়েকটি সুপারিশ অনুমোদন করে। ১৯৮৩ সালের আগস্ট মাসে ভূমি সংস্কারের জন্য একটি জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে আলোচনা ও প্রদত্ত পরামর্শের ভিত্তিতে ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ ১৯৮৪, ভূমি সংস্কার বিধি ১৯৮৪ এবং কৃষি শ্রম (ন্যূনতম) মজুরি অধ্যাদেশ ১৯৮৪ জারি করা হয়। ভূমি সংস্কার সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে ১৯৮৭ সালের মার্চে একটি ক্যাম্পেইন হাতে নেয়া হয়। এর লক্ষ্য ছিল ভূমিহীন, প্রায়-ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষীদের মধ্যে খাস জমি বিতরণ; ‘অপারেশন ঠিকানা’ কর্মসূচির আওতায় সরকারি জমিতে ভূমিহীনদের জন্য গুচ্ছ-গ্রাম প্রতিষ্ঠা; বর্গাচাষীদের আইনগত অধিকার প্রদান; অধিকতর উৎপাদনের জন্য পাহাড়ি জমি, মৎস্য ও চিংড়ি চাষের জমির সর্বোত্তম ব্যবহার; পল্লি অঞ্চলের আয় বন্টনে অধিকতর সমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উচ্চতর কৃষি উৎপাদনে অবদান রাখা; গ্রামাঞ্চল থেকে শহরাঞ্চলে অভিবাসন হ্রাসে সহায়তা করা। তবে তার অন্য অনেক উদ্যোগের মতোই ভূমি সংস্কারের উদ্যোগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় মূলত আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে। 

১৯৮২ সালে ঘোষিত নতুন শিল্পনীতিকে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগের জন্য আরো উদার করে এরশাদ ১৯৮৬ সালে আরেকটি শিল্পনীতি ঘোষণা করেন। এরশাদের আমলে শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল অত্যন্ত লক্ষণীয়, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে। তার অর্থনৈতিক কর্মসূচির মূলভিত্তি ছিল সব ক্ষেত্রে ব্যক্তিখাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি অর্জন। 

ব্যক্তিখাতের শিল্প-বিনিয়োগে সহায়তা দিতে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দিতে এরশাদ ১৯৮৯ সালে একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে বিনিয়োগ বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন। 

দেশের রাষ্ট্রপতিকে বোর্ডের সভাপতি করা হয়, আর এর দৈনন্দিন কার্য-নির্বাহের জন্য গঠন করা হয় একটি নির্বাহী পরিষদ। জনগণের কাছ থেকে কর (সারচার্জ) আদায় করে আর বিশ্ব ব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ দাতাদের কাছ থেকে তহবিল জোগাড়ের জন্য যোগাযোগ স্থাপন করে এরশাদই প্রথম যমুনা সেতু নির্মাণের পদক্ষেপ নেন। তার অন্যান্য সৃজনশীল প্রয়াসের মধ্যে ছিল পথশিশুদের প্রয়োজন মেটাতে ‘পথকলি ট্রাস্ট’ গঠন এবং দেশের পরিবেশ বিষয়ক একটি সমন্বিত কর্ম-পরিকল্পনা প্রণয়ন। 

উন্নয়ন সফলতা এবং গ্রামীণ তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রের কেন্দ্র পর্যন্ত উন্নয়ন পরিকল্পনার কারণে দেশবাসী এরশাদকে ‘পল্লীবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত করেন। এমনকি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ১৯৮২ সাল থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতার সঙ্গেই রয়েছেন কৌশলী এই নেতা। ২০১৯ সালে ৯০ বছর বয়সে হুইল চেয়ারে বসেও তিনি জাতীয় সংসদের প্রধান বীরোধী দলীয় নেতা।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস.আর/এলকে/জেডআর/আরএ