১০ হাজার সৈন্যের সঙ্গে লড়েও ২১ সেনার ঐতিহাসিক যুদ্ধ জয়!

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০১ অক্টোবর ২০২০,   আশ্বিন ১৭ ১৪২৭,   ১৪ সফর ১৪৪২

১০ হাজার সৈন্যের সঙ্গে লড়েও ২১ সেনার ঐতিহাসিক যুদ্ধ জয়!

মো. হাসানুজ্জামান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:২৩ ৮ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১২:৪৪ ৮ জুলাই ২০২০

ছবি: কেসরি ছবির পোস্টার

ছবি: কেসরি ছবির পোস্টার

সামরিক বাহিনী সর্বদা দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে যায়। তাদের সাহসিকতা ও বীরত্বের কথা তাইতো সবার মুখে মুখে থাকে। নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা দেশ ও জাতির কল্যাণে লড়াই করে যায়। যে কোনো যুদ্ধে পরাজিত নয় বরং নিজের দেশ ও জাতিকে জিতিয়ে তারা বীর হয়ে মৃত্যুবরণ করে। ঠিক তেমনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ২১ শিখ সেনা নিজের জীবন দিয়ে লড়েছিল ১০ হাজার সৈন্যের বিপক্ষে।

১৯ শতকের শেষার্ধের ঘটনা। তখন মধ্য এশিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য রাশিয়া এবং ব্রিটেনের মধ্যে টানটান উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ওই অঞ্চলের বিভিন্ন জাতি নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতের আফগানিস্তান সীমান্তে নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে থাকে। রুশ সেনাবাহিনী এবং আফগান উপজাতি উভয়ই তাদের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। 

উপনিবেশিক ভারত এবং আফগানিস্তানের মধ্যবর্তী সীমান্ত খুবই অশান্ত এক জায়গা ছিল। কোহাত থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে সারাগড়ি নামক স্থানে ভারত-আফগানিস্তান সীমান্তে ছিল ব্রিটিশ সেনা ফাঁড়ি। এই সেনা ফাঁড়ি খুবই ছোট এবং বিপজ্জনক ছিল। সে সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে শিখ সেনারা সাহসিকতার জন্য বেশ প্রশংসিত ছিল। বিপজ্জনক সারাগড়ির ব্রিটিশ সেনা ফাঁড়িতে শিখ সৈন্যরাই বেশিরভাগ পাহারায় থাকত। বর্তমানে স্থানটি পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে অবস্থিত। 

শিখ সেনা সদস্যরাসেসময় এটি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নামে পরিচিত ছিল। ১৮৯৭ সালে ১২ সেপ্টেম্বর সারাগড়ি ব্রিটিশ সেনা ফাঁড়িতে হামলা চালায় ১০ হাজার আফগান উপজাতির একটি বিশাল বিদ্রোহী বাহিনী। তাদের মোকাবিলা করেছিল ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীর মাত্র ২১ জন শিখ সেনা। আফগান উপজাতির বিশাল সৈন্য সংখ্যা দেখে তারা ভীত হয়নি কিংবা পিছিয়ে যায়নি। শিখ সেনারা অসীম সাহস দেখিয়ে বীরদর্পে লড়াই করে ১০ হাজার সৈন্যের সঙ্গে।

সারাগড়ির যুদ্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে সংঘটিত হয়। সে সময় মধ্য আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও এর আশেপাশের অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্রিটিশ ও রাশিয়া বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিল। রাশিয়া এবং ব্রিটেনের আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াই ইতিহাসে ‘গ্রেট গেম’ নামে অভিহিত করা হয়। রাশিয়া এবং ব্রিটেনের মধ্যে ১৮৮১ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কারণ এ সময়ের মধ্যে রাশিয়া তুর্কিস্তানের পূর্বাঞ্চল দখল করে নেয়। যা ব্রিটিশদের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। 

তবে দুই দেশই সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ১৮৮৫ সালে আফগানিস্তানের আমির আব্দুর রহমান খানের হস্তক্ষেপে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়। এই সমঝোতার পর ব্রিটিশ ভারতে বাউন্ডারি কমিশনের গঠন হয়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ভারতীয় অঞ্চল এবং আফগানিস্তানের সীমান্ত চিহ্নিত হয়, টানা হয় ডুরান্ড লাইন। 

ফাঁড়ি এলাকাএই ডুরান্ড লাইন আজো বিতর্কিত। বিবাদমান দুই আধিপত্য বিস্তারকারী দেশের মধ্যে সমাঝোতা অনুযায়ী সীমান্ত চিহ্নিত হলেও ব্রিটেন ভিন্ন পথে হাঁটে। তারা ‘ফরোয়ার্ড পলিসি’ বা আগ্রাসী নীতি অবলম্বন করে। নিজেদের প্রভাব প্রদর্শনের জন্য আফগানিস্থানের সীমান্ত অঞ্চলের বেশ কিছু অঞ্চল দখল করে। এই অঞ্চলে তখন পাঠানদের বসবাস ছিল।

সারাগড়িতে নতুন ব্রিটিশ সেনা ফাঁড়ি স্থাপন 

ব্রিটিশ সেনা বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্যার উইলিয়াম লকহার্ট ১৮৯১ সালে মিরানঝাই পদাতিক বাহিনী নিয়ে আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সমানায় দু’টি অভিযান পরিচালনা করেন। সমানা পার্বত্য অঞ্চল। এই অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার লক্ষ্য ছিল সামান পর্বতমালাতে বসবাসকারী উপজাতিদের উপর ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে মস্তান মালভূমি অঞ্চলে ব্রিটিশ দু্র্গ নির্মাণের লক্ষ্য ছিল।   

ব্রিটিশ সৈন্যরা পরিকল্পনা মতো লকহার্ট এবং গুলিস্তান নামে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ তৈরি করে। একই সঙ্গে সীমান্ত অঞ্চল সুরক্ষার জন্য ছোটো ছোটো সেনা ফাঁড়িও নির্মাণ করেছিল তারা। এসব ফাঁড়ির মধ্যে একটি স্থাপিত হয়েছিল সারাগড়ি গ্রামের পশ্চিমে পাশে। এই অঞ্চলটি সমতল থেকে বেশ উঁচু। সেসময় সামরিক দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল ওই অঞ্চলটি। 

সেনারাউল্লেখ্য ১৮৮৫ সালে টেলিগ্রাফ আবিষ্কৃত হওয়ার পর সামরিক ইউনিটগুলোও যোগাযোগের জন্যও ব্যবহৃত হতো। লকহার্ট এবং গুলিস্তান দুর্গ ও ছোট ছোট ফাঁড়িতেও এটি স্থাপন করা হয়েছিল। তবে স্থানীয়রা এর তার কেটে দিত। ফলে এই অঞ্চলে বার্তা প্রদানের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়। সারাগড়িসহ অন্যান্য ফাঁড়ি থেকে হেলিওগ্রাফ (আয়না এবং সূর্যের আলোর মাধ্যমে বার্তা প্রদানের কৌশল) ফ্ল্যাশিং লাইট ব্যবহার করে ‘মরস কোড’ পাঠাত। 

উপজাতি বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণের জন্য রেজিমেন্ট গঠন 

সীমান্তবর্তী সমানা অঞ্চলে ব্রিটিশ সরকার সেনাবাহিনীর একটি বেঙ্গল ইনফ্যান্ট্রির একটি রেজিমেন্ট পাঠায়। সেসময় ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল ইনফ্যান্ট্রির ৩৬ রেজিমেন্ট শিখ সেনাদের রেজিমেন্ট ছিল। ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল এবং উপজাতিদের বিদ্রোহ দমনের জন্য ১৮৮৭ সালের মার্চ মাসে এই রেজিমেন্ট গড়ে তোলা হয়। 

কর্নেল জিম কুক এবং ক্যাপ্টেন হেনরি হোমস এই রেজিমেন্ট গড়ে তুলতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। রেজিমেন্টের বেশিরভাগ সেনাই পাঞ্জাব থেকেই নিয়োগ করা হয়েছিল। এই রেজিমেন্টে আরো ২২৫ জন শিখ সেনাকে পাঞ্জাব সীমান্তে সুরক্ষা বাহিনী এবং বেঙ্গল আর্মির বিভিন্ন রেজিমেন্ট থেকে নিয়োগ দেয়া হয়। 

সীমান্তের নজরদারিতে শিখ সেনারা নিযুক্ত ছিল১৮৮৮ সালের জানুয়ারি মাসে ৩৬ শিখ রেজিমেন্ট মোতায়নের জন্য প্রস্তুত হয়। এর ৯১২ জন সেনা সদস্যকে ৮টি কোম্পানিতে ভাগ করা হয়। এই শিখ রেজিমেন্টেকে ভালোভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরপর ১৮৯৭ সালের জানুয়ারি মাসে কমান্ডার লেফট্যানেন্ট কর্ণেল জন হাটনের নেতৃত্বাধীন সমানা পোস্টটি দখলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় ৩৬ শিখ রেজিমেন্ট। শত্রুদের ওপর নজরদারি চালানোর জন্য একটি দলকে পাঠানো হয় সমানা সুক-এ (ওই পর্বতমালার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ)। 

তখন আরেক বিপদ সাধে, তাদের কার্যক্রম স্থানীয় উপজাতিরা ভালোভাবে নেয়নি। তারা সৈন্যদের প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৮৮৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সেনারা জানতে পারে, উপজাতিরা প্রতিরোধ করার জন্য জড়ো হচ্ছে। প্রথম দিন তারা খুব বেশি সংখ্যার উপজাতি সৈন্য জমায়েত লক্ষ্য করেনি। তবে ঠিক এর একদিন পর পঁচিশ হাজারেরও বেশি শত্রুসেনা একত্র হয়। ৩৬তম শিখ রেজিমেন্টের কমান্ডার লেফট্যানেন্ট কর্নেল জন হাটন বুঝতে পারেন পরিস্থিতি খুবই খারাপ। তিনি সেনা ফাঁড়ি এবং দুর্গগুলোতে অবস্থান জোরদার করেন।

১৬৮ জন সেনা লকহার্ট দুর্গে অবস্থান নেয়। গুলিস্তান দুর্গে ১৭৫জন সেনা অবস্থান নেয় মেজর চার্লস ভক্স এর নেতৃত্বে। এ সময় সারাগড়ি ফাঁড়িতে ২১ জন এবং এর পার্শ্ববর্তী সারতাপ ফাঁড়িতে ২১ জন শিখ সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। সারাগড়িতে সৈন্যদের সঙ্গে দাধ নামে এক ব্যক্তিও অবস্থান নিয়েছিল। সে শিখ রেজিমেন্টের রান্না এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করত। 

উপজাতিরা ফাঁড়ি ঘেরাও করেফাঁড়ি ঘেরাও

আফগান উপজাতিদের একটি বড় দল ১৮৯৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সারাগড়ি ব্রিটিশ পোস্ট ঘেরাও করে। এই দুর্গম অঞ্চলে পার্শ্ববর্তী সেনা পোস্ট থেকে সৈন্য আসাও প্রায় অসম্ভব ছিল। হাবিলদার ইশার সিং এবং একজন অভিজ্ঞ সার্জেন্টের নেতৃতে ২১ সেনাসহ মোট ২২ জন সারাগড়ি সেনা পোস্টে অবস্থান নেয়। 

তখন প্রায় ১০ হাজারের অধিক উপজাতি তাদের উপর আক্রমণের জন্য বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে ঘেরাও করেছে। সকাল ৯টার সময় সিগন্যালের দায়িত্বে থাকা গুরমুখ সিং ৩৬ শিখ রেজিমেন্টের কমান্ডার লেফট্যানেন্ট কর্ণেল হাটনকে হ্যালিওগ্রাফের মধ্যে বার্তা প্রেরণ করেছিল। তবে তার পক্ষে অল্প সময়ের মধ্যে এতো সংখ্যক শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব ছিল না। 

সারাগড়ির এই ২১ শিখ সেনার সামনে তখন আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তবে তারা সে পথ বেছে নেয়নি। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। শিখ সৈন্যদের পাল্টা আক্রমণে উপজাতিরা বিশাল সংখ্যায় থাকলেও অপ্রস্তুত হয়ে যায়। শুরুতেই শিখ সেনাদের গুলিতে ৬০ জন উপজাতি নিহত হয়। কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধ চলার পর শিখ সেনাদের গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে যায়। 

যুদ্ধবিধ্বস্ত ফাঁড়িএ সময়ের মধ্যে শত্রুপক্ষও নতুন করে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। সারাগড়ি সেনা ফাঁড়ির চারদিকে আগুন লাগিয়ে দেয়। শিখ সৈন্যরা অসুবিধায় পড়ে যায়। এসময় কয়েকজন উপজাতি সারাগড়ি ফাঁড়ির মধ্যে প্রবেশ করে।

তারা অন্য শত্রুসেনাদেরও ভিতরে প্রবেশের ব্যবস্থা করে। তুমুল লড়াই চলছে। এতো সংখ্যক উপজাতি সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করে একে একে শিখ সৈন্যরা নিহত হতে থাকে। ১৭ জন সৈন্য নিহত হওয়ার পরেও লড়াই চলতে থাকে।

সিগন্যালের দায়িত্বে থাকা গুরমুখ সিং অবশিষ্ট চারজন সৈন্য জীবিত থাকা অবস্থায় লড়াইয়ে যোগ দেয়ার জন্য নিজের অবস্থান ছাড়ার অনুমতি চেয়ে ৩টার দিকে কমান্ডারের নিকট বার্তা পাঠায়। অনুমতি পেয়ে সেও অন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিহত হয়।

প্রাণ দিয়ে তারা উপজাতিদের সঙ্গে লড়াই করেজানা যায়, গুরমুখ সিং এর বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। সে মৃত্যুর পূর্বে বিয়োনেট দিয়ে একাই ২০ জন শত্রুকে হত্যা করে। ২১ জন শিখ সৈন্য ১০ হাজারেরও অধিক আফগান উপজাতি সৈন্যদের সঙ্গে বীরদর্পে যুদ্ধ করে নিহত হয়। আর তাদের প্রতিপক্ষের প্রায় ১৮০ জন নিহত হয়।

২১ সৈন্যের বীরত্বের প্রশংসা এবং স্বীকৃতি

অসীম সাহসী এই ২১ শিখ সেনার বীরত্বের কথা সারা বিশ্বের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় সে সময়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে তাদের মরণোত্তর ‘ইন্ডিয়ান অর্ডার অব মেরিট’ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করা হয়।

ব্রিটিশ ভারতে এটি সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ছিল। শিখ রেজিমেন্ট ১২ সেপ্টেম্বর দিনটিতে এখনো সেই ২১ বীর শিখ যোদ্ধাকে স্মরণ করে। সম্প্রতি বছরগুলোতে এই বীর সেনাদের কাহিনী নিয়ে কয়েকটি সিনেমা নির্মিত হয়েছে।  

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস