১০০ বছর আগের স্প্যানিশ ফ্লু থেকে শিক্ষা নিলে করোনা মহামারি হত না!

ঢাকা, শুক্রবার   ২৭ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৪ ১৪২৭,   ১০ রবিউস সানি ১৪৪২

১০০ বছর আগের স্প্যানিশ ফ্লু থেকে শিক্ষা নিলে করোনা মহামারি হত না!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪৬ ২৪ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৪:১০ ২৪ মার্চ ২০২০

ছবি: করোনাভাইরাস ও স্প্যানিশ ফ্লু

ছবি: করোনাভাইরাস ও স্প্যানিশ ফ্লু

ঠিক ১০০ বছর আগে এ যাবতকালের সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারির সাক্ষী হয়েছিল বিশ্ব। তিন বছরে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল ছোঁয়াচে স্প্যানিশ ফ্লু। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল ওয়ান এ ওয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এই ফ্লুতে।

ভয়ঙ্কর এ মহামারি ছাড়াও বিশ্ব প্রতি ১০০ বছর পর পর আক্রান্ত হয়েছে ব্ল্যাক ডেথ, প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লুসহ আর এবার করোনাভাইরাসসহ নানা মহামারিতে। তবে আদৌ কি কোনো শিক্ষা দিতে পেরেছে এসব মহামারি। নাকি আমরাই নিতে পারিনি কোনো শিক্ষা। 

বর্তমানে করনাভাইরাসে আক্রান্ত সারাবিশ্ব। যাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। চীনের উহান থেকে বন্য সাপ ও বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে বিশ্বের ১৯৬ টি দেশে। যাতে প্রাণ হারিয়েছে ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে তিন লাখেরও বেশি। 

স্প্যানিশ ফ্লুর ব্যাপ্তিকাল ছিল ১৯১৮ জানুয়ারি থেকে ১৯২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। নাম স্প্যানিশ ফ্লু হলেও স্প্যানের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই ছিল না। তবে এর উৎপত্তি কোথা থেকে তা এখন পর্যন্ত অজানা। তবে ধারণা করা হয়, ফ্রান্সের ব্রিটিশ সেনা ঘাঁটি, নয় তো যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন সেনাদের দেহে প্রথম ধরা পরে এ ভাইরাসটি। এরপর চীনা শ্রমিকদের মাধ্যমে ইউরোপে এটি ছড়িয়ে থাকতে পারে। 

সেসময় অভিযোগ উঠেছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো অপপ্রচার চালাতে পারে তাই স্প্যানিশ ফ্লুর মহামারিতে সঠিক মৃতের সংখ্যা ও এর বিস্তৃতি নিয়ে সঠিক তথ্য দেয়নি কোনো দেশ। এছাড়াও এর নামকরণে করা হয় একেবারেই যোগসূত্রহীন স্পেনের নাম। ফলে এর উৎস এবং বিস্তৃতি নিয়ে জানা যায়নি কিছুই।  

প্রাণঘাতী এইডসে ২৪ বছরে যে পরিমাণ প্রানহানি ঘটেছে এক স্প্যানিশ ফ্লুতেই ২৪ সপ্তাহেই মারা গিয়েছিল তার চেয়ে বেশি মানুষ। পৃথিবীর এমন কোনো অঞ্চল ছিল না যেখানে এই ফ্লু ছড়ায়নি। ব্রিটিশ উপনেবেশিক আমলে ভারতে এ মহামারিতে প্রাণ যায় প্রায় এক কোটি মানুষের। যুক্তরাষ্ট্রে সেসময় হঠাৎ করেই কয়েক হাজার মানুষের অসুস্থতায় হতভম্ব হয়ে পড়ে প্রশাসন। তখন স্কুল, কলেজ, থিয়েটারসহ জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়। 

পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলে নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা হয়। এতে আবারো এর সংক্রমন বেড়ে যায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা ঠেকাতে সন্দেহভাজনদের পাঠানো হয় বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে। কঠোর পদক্ষেপের পর দীর্ঘ ছয়মাস পর স্প্যানিশ ফ্লু নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন। স্প্যানিশ ফ্লুর মহামারি আর এর শিক্ষা কাজে লাগালে কোভিড-১৯সহ নানা মহামারি রুখে দেয়া সম্ভব।       

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিবিসির তথ্যানুযায়ী, কোভিড-১৯ নিউমোনিয়া ধরনের ভাইরাস। যার প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। এতে বয়স্ক এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন নানা পরামর্শ। এর মধ্যে হাত জীবাণুমুক্ত রাখা, হাতের স্পর্শ থেকে চোখ, নাক, মুখ দূরে রাখা, জনসমাগম এড়িয়ে চলাসগ ঘরে থাকার ব্যাপারে সচেতন করছেন তারা। এছাড়াও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সবাইকে।    

চিকিত্সকরা স্প্যানিশ ফ্লুকে ‘ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মেডিকেল হলোকাস্ট’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তবে স্প্যানিশ ফ্লুর থেকে কোভিড-১৯ এর মৃত্যুর হার এখনো অনেক কম। বিশ্বের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্প্যানিশ ফ্লুর শিক্ষা আমাদের করোনার হাত থেকে রক্ষা করতে পারত।  ১০০ বছর আগের স্প্যানিশ ফ্লুর সময় স্কুল কলেজ, থিয়েটারসহ সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এতেই অনেকটা ঠেকানো গিয়েছিল স্প্যানিশ ফ্লু। এমনকি তখনই মাস্কের ব্যবহার শুরু হয়। 

স্প্যানিশ ফ্লু এমন সময় বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। যখন সবে মাত্র বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। তখন যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ হওয়ায় মানুষের মধ্যে এটি খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন অল্প সংখ্যক মানুষ ছাড়া বেশিরভাগই ছিল দরিদ্র শহরাঞ্চলের। যাদের মধ্যে ছিল পুষ্টি ও স্যানিটেশনের অভাব। এতে করে তারা দ্রুত ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছে আর মারা গিয়েছে। তবে এখনকার বিশ্বের অবস্থা অনেক উন্নত। তবুও সচেতনতা আর সঠিক সময়ে শিক্ষার ব্যবহার না করায় এর ফলাফল নিয়ে বিজ্ঞানীরা চিন্তিত।

কিন্তু কেন এতো দ্রুত ছড়াচ্ছে এই করোনাভাইরাস?

পৃথিবীতে এখন মানুষের সংখ্যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বিশ্ব জনসংখ্যা বর্তমানে ৭৭০ কোটি। এই সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি মানুষ এখন একজন আরেকজনের খুব কাছাকাছি বসবাস করছে। অল্প জায়গায় বেশি মানুষ বাস করার অর্থই হলো জীবাণুর সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া, যার ফলে বিভিন্ন ধরনের অসুখ বিসুখের সৃষ্টি হয়। 

ইবোলা ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দিয়েছিল ২০১৪ সালে আর সেবার এই ভাইরাসটি ছড়িয়েছিল রক্ত কিম্বা শরীর থেকে নির্গত অন্য কোন তরল পদার্থের মাধ্যমে। ফলে রক্ত দান ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমেই ভাইরাসটি ছড়িয়েছে। সব ভাইরাস কিন্তু মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। এমনকি জিকা ভাইরাসও, যা মানুষের শরীরে আসে মশা থেকে, সেটাও লোকজন ঘনিষ্ঠ বসবাস করলে ছড়াতে পারে। যেসব এলাকায় মানুষের ঘনবসতি, সেখানে জিকা ভাইরাসবাহী মশা মানুষের রক্ত খেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাদের জন্মের বিস্তার ঘটে আদ্র, স্যাঁতসেঁতে ও উষ্ণ পরিবেশে।

২০০৭ সালের পর থেকে শহরাঞ্চলে মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এরকম এলাকা পৃথিবীর মোট জমির মাত্র এক শতাংশ। কিন্তু এইটুকুন জায়গাতেই বাস করে ৪০০ কোটিরও বেশি মানুষ। শুধু তাই নয়, লোকজন এখন এমন শহরের দিকে ছুটে যাচ্ছে যেগুলো এখনও বসবাসের জন্যে প্রস্তুত নয়। ফলে অনেক মানুষের আশ্রয় হয় বস্তি এলাকায় যেখানে পরিষ্কার খাবার পানি নেই, পয়-নিষ্কাশন ব্যবস্থাও খুব খারাপ। ফলে এরকম পরিবেশে খুব দ্রুত রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

পরিবহনের মাধ্যমে বিশ্বে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে

এছাড়াও সংক্রামক ভাইরাস শহর থেকে শহরে, দেশ থেকে বিদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে পরিবহনের মাধ্যমে। বিমান, রেল, গাড়িতে করে এখন ভাইরাস পৃথিবীর অর্ধেক দূরত্ব পাড়ি দিতে পারে একদিনেরও কম সময়ে। করোনাভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এটি পাওয়া গেছে কমপক্ষে ১৬টি দেশে। গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে বিমানে চলাচল করেছে ৪৫০ কোটি যাত্রী। মাত্র ১০ বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল ২৪০ কোটি।

সূত্র: বিবিসি

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস