Alexa হয়নি প্রশ্নফাঁস, বদলেছে কৌশল

ঢাকা, শুক্রবার   ২৩ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৮ ১৪২৬,   ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

হয়নি প্রশ্নফাঁস, বদলেছে কৌশল

 প্রকাশিত: ১৫:২৮ ২৭ এপ্রিল ২০১৮   আপডেট: ০৯:৫১ ২৮ এপ্রিল ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

প্রশ্নফাঁস। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে চাকরির লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস যেন হয়ে পড়েছিল নিত্য মামুলি ব্যাপার। বছর ঘুরলেই অভিভাবকের চিন্তার ঝুলিতে যোগ হয়, প্রশ্নফাঁসে সন্তান না ছিটকে পড়ে মেধাতালিকার বাইরে? প্রতিযোগিতার নামে প্রতারকদের সৃষ্ট অন্ধকারে হাতড়ে না বেড়াতে হয় সন্তানের ভবিষ্যত?

দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম রক্ষায় প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর হন প্রধানমন্ত্রী। হাল টেনে ধরেন শিক্ষায় ঢুকে পড়া উইপোকাদের। তার নির্দেশে যে কোনো উপায়ে প্রশ্নফাঁস চক্র ধরতে মাঠে নামে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সফলও হয় তারা। অবশেষে অনেক দিনের আলোচনা-সমালোচনার কঠিন জবাব এল তাদের পদক্ষেপে। একের পর এক ধরা পড়লো প্রশ্নফাঁস চক্রের সদস্যরা। বেরিয়ে এল নতুন নতুন তথ্য। জানা গেলে, প্রশ্নফাঁস নয়, ফাঁসের নামে হয় প্রতারণা। তৈরি করা হয় ভূয়া প্রশ্ন। চড়া দামে বিক্রি করা হয় এসব ভূয়াপ্রশ্ন। সরবরাহ করা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রলোভিত করা হয় শিক্ষার্থীদের। সন্তানের জন্য পয়েন্টভারি সার্টিফিকেট পাওয়ার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ অভিভাবকরাও হন প্রতারিত ও দিশেহারা। এখানেই রেশ টেনে ধরে, এগিয়েছে এবারের এইচএসসি পরীক্ষা। কোনো ধরনের প্রশ্নফাঁস ছাড়াই শেষ হচ্ছে বড় এই পাবলিক পরীক্ষা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজদারি তছনছ করে দেয় প্রশ্নফাঁস চক্রের পেতে রাখা সব বেড়াজাল। কিন্তু তাতে কি পুরোপুরি দমেছে প্রতারক চক্র। না, তারা প্লাটিয়েছে অবৈধ অর্থ উপার্জনের ধরন। প্রতারণার অভিনব কৌশলে হাঁটছে তারা। এবার প্রশ্নফাঁসে সুবিধা করতে না পেরে, ফলাফল পাল্টে দেয়ার নতুন প্রলোভনের ফাঁদ পেতেছে চক্রটি।

প্রতি বছরই পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসিসহ পাবলিক পরীক্ষা আসলেই অভিভাবকদের উদ্বিগ্নতা দেখা গেছে প্রশ্নফাঁস নিয়ে। কোনো না কোনো পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের খবর পাওয়া গেছে গত বেশ ক’বছর ধরেই। বিভিন্ন সময় আটক করা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিজি প্রেসসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের বেসরকারি সহযোগী প্রতারকদের। তারপরও কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছিল না প্রশ্নফাঁস।

প্রশ্নফাঁস চক্র জঙ্গির মতই সন্ত্রাসী উল্লেখ করে র‌্যাব প্রধান বেনজীর আহমেদ তাদের জঙ্গির মতই উৎখাতের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, প্রশ্নফাঁস চক্র জাতির শত্রু। খুঁজে খুঁজে বের করে তাদের ধরা হবে। প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনার ঘোষণাও দেন তিনি। এরইমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এবার আটক হয়েছে ভূয়া প্রশ্নফাঁস ও ফলাফল পাল্টে দেয়ার প্রতারক চক্রের শতাধিক সদস্য। জিজ্ঞাসাবাদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়া প্রতারক চক্রের একটি অংশ স্বীকার করেছে নতুন কৌশলের কথা।

প্রযুক্তির সাহায্যে ফেসবকু, হোয়াটস অ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের প্রলোভন দেখায়। তবে প্রতারকদের সব আইডি-ই হয় ফেইক বা ভূয়া। তারপরও সরকারের কঠোর সিদ্ধান্ত আর আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সতর্ক অবস্থানে রেহাই পাচ্ছে না প্রতারক চক্র, ধরা পড়ছে প্রতিদিন।

প্রতারক চক্র নতুন কৌশলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভূয়া পরিচয়ে ভিন্ন ভিন্ন আইডিতে ফলাফল বদলে দেয়ার লোভনীয় প্রলোভন দেখাচ্ছে। এ ফাঁদে পাও দিচ্ছেন অনেক অভিভাবক বা শিক্ষার্থী। ডেইলি বাংলাদেশের অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে, বেশকিছু ফাঁদের সচিত্র। বেশকিছু ফেসবুকে স্ক্রিন শটে দেখা গেছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রভাবিত করতে বিশ্বসযোগ্য ওয়েব অ্যাড্রেস দেখিয়ে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন পোস্ট। শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটের হুবহু নকল (ক্লোন) ওয়েভসাইট লিঙ্ক দিচ্ছে প্রতারকরা। যার সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের আসল লিঙ্কের কোনো মিল নেই। আসল অ্যাড্রেসের সঙ্গে বাড়তি একটি শব্দ বা সংখ্যা যুক্ত করে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ডের নকল ওয়েবসাইট। কারণ একই ডোমেইন নেম দিয়ে অারেকটি ডোমেইন তৈরি করা যায় না। লিঙ্কগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতারকরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাক করে, ভেতরে একটি কাস্টমাইজ ফোল্ডার তৈরি করে রাখে। সেই ফোল্ডারেই শিক্ষার্থীর রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য দিয়ে ভূয়া ফলাফলের ফাইল তৈরি করে আপলোড দেয় প্রতারকরা। কেউ ফলাফল দেখতে চাইলে তাকে ওই ফাইল লিংক বা ইউআরএল দেয়া হয়। ওই লিঙ্কে ঢুকলে মনে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আসল সাইট ও ফলাফল শিট। কিন্তু তা নয়। একটু খতিয়ে দেখলেই বুঝা যাবে প্রতারকদের দেয়া ফলাফলের ফাইল ভিন্ন ভিন্ন তারিখে তৈরি করা। কিন্তু শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলের সব ফাইল একই দিনে অর্থাৎ একই তারিখে তৈরি করা হয়। শিক্ষার্থীরা সার্চ দিলে একসঙ্গে সব পরীক্ষার্থীর ডাটাবেজ পাওয়া যাবে। কারণ সব পরীক্ষার্থীর ডাটা একই ফোল্ডারে একই দিনে তৈরি করে শিক্ষাবোর্ডগুলো।

এ বিষয়ে র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্টে কর্নেল মাহবুব আলম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের সতর্ক অবস্থান রয়েছে। আপনারা জানেন, ডিজি মহোদয় বলেছেন- প্রশ্নফাঁস চক্রের বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স মেনে চলবো। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। কারো কাছে সঠিক বা মিথ্যা যে ধরনের প্রশ্নই পাওয়া যাক সঙ্গে সঙ্গে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত প্রশ্ন ফাঁস চক্রের ৯৫ জনকে সনাক্ত করে আটক করেছে র‌্যাব। এর মধ্যে ফলালফ বদলে দেয়ার প্রতারক চক্রের ৫ জন রয়েছে।

প্রশ্ন ফাঁস ও ফলাফল বদলে দেয়ার প্রলোভন দেখানো প্রতারক চক্রের বিষয়ে বুধবার কথা হয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রইমের সাইবার সিকিউরিটি এন্ড ক্রাইম বিভাগের ডিসি মো. আলিমুজ্জামান এর সঙ্গে। ডেইলি বাংলাদেশকে এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, প্রতারক চক্র ফেইক আইডি ব্যবহার করে বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন পাওয়া যাবে বা ফলাফর পাল্টে দেয়া যাবে বলে লোভনীয় পোস্ট দেয়। সাধারণত তারা কোনো লাইক বা কমেন্ট না করে ইনবক্সে যোগাযোগ করতে বলে। ইনবক্সে যোগাযোগ করাটা নিরাপদ, কারণ অন্যের ইনবক্স আপনি দেখতে পাবেন না। এসব প্রতারণার ফাঁদে অনেকেই পা দিচ্ছেন। আসলে এটা নীতি নৈতিকতার বিষয়। প্রশ্নপত্র কিনতে চাওয়াও একটি অপরাধ। কেউ প্রতারিত হলেও তা কাউকে বলতে পারে না, এসব কারণে। এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলার সময় এ ধরনের প্রতারক চক্রের ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে দু’জন ফলাফল বদলে দেয়ার প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বলে স্বীকার করেছে।

এসব থেকে পরিত্রাণের উপায় কি এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি আলিমুজ্জামান বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। শুধু তাতেই হবে না। নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করার সুযোগ নেই। তাই সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য বা হাইজেনিক খাবার যেমন খেতে চাই, তেমনি সাইবার দুনিয়ায় সাইবার হাইজেনিক বলে একটা কথা আছে। অর্থাৎ সব ইউজারকে অবশ্যই জেনে বুঝে যেকোন ওয়েব পেজে বা সাইটে যুক্ত হওয়া, কোনো পোস্ট বা তথ্য এই ভার্চুয়াল জগত থেকে নিলে, তা জেনে বুঝে করতে হবে, প্রতিটি ইউজারকে সাইবার হাইজেনিক হতে হবে। অবশ্যই দায়-দায়িত্ব আপনার। বিশাল এই ডিজিটাল দুনিয়ায় খারাপ বা হানিকর অনেক কিছুই আছে বা থাকবে, তা থেকে দূরে থাকতে হবে, না হয় ক্ষতি আপনার। ফলাফলের পেছনে না ছুটে মেধার জন্য ছুটতে হবে। এ জন্য পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা এবং মূল্যবোধের খুবই প্রয়োজন। শুধু সরকারের একার চেষ্টায় এই দুষ্ট চক্র নির্মূল করা যাবে না। শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, সচেতন হতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসবি/এলকে/এসআই

Best Electronics
Best Electronics