হ্যালুসিনেশন ও মাদকাসক্তি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২১ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪২৬,   ১৫ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

হ্যালুসিনেশন ও মাদকাসক্তি

 প্রকাশিত: ১৫:০৪ ৭ জুন ২০১৮  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

হ্যালুসিনেশন কি?
হ্যালুসিনেশন হচ্ছে এমন কিছু যা আপনি দেখতে পান, শুনতে পান, অনুভব করেন, গন্ধ পান করেন অথবা স্বাদ পান যার কোনো বাস্তবিকতা নেই। হ্যালুসিনেশন গুলো পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়ে ঘটতে পারে, তবে সর্বাধিক ঘটে থাকে এমনভাবে যা দৃশ্যমান এবং শ্রবণযোগ্য ভ্রান্তি হয়ে থাকে।

অবিকল সত্য কিন্তু সেখানে বাস্তব সত্য কোনো স্টিমুলেশন অথবা বাস্তব কোনো কিছুর অবস্থান থাকে না। হ্যালুসিনেশন কোনো স্বপ্ন নয়। ইচ্ছা করলেই কেউ হ্যালুসিনেশনের অনুভূতি গুলোকে অনুভব করতে পারবে না। এমনকি হ্যালুসিনেশন হলে ইচ্ছা করলেই কেউ আবার এই অনুভূতি গুলোকে বাদ দিতে পারবে না। সম্পূর্ণ ঘটনাটিতে হ্যালুসিনেশনে আক্রান্ত ব্যাক্তির কোনো ধরনের ইচ্ছা, নিয়ন্ত্রন থাকে না। এখানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল যে হ্যালুসিনেশনে আক্রান্ত ব্যাক্তিটি এই ধরনের অবাস্তব অনুভূতি গুলোকে একেবারে সত্য মনে করে।

হ্যালুসিনেশন মাদকের প্রভাবের জন্য হতে পারে, বিশেষ করে হেলুসিনোজেনিক বা সাইকেডেলিক ড্রাগ, যেমন এলএসডি বা জাদু মাশরুম।

এছাড়াও এটি মনস্তাত্ত্বিক রোগের একটি উপসর্গ হতে পারে। এটি অন্তর্ভুক্ত হয় মানসিক অসুস্থতার গুরুতর উপসর্গের একটি গ্রুপ, যেমন সিজোফ্রেনিয়া বা দ্বিপক্ষীয় ব্যাধি হিসাবে।

এছাড়াও, অতিরিক্ত মাত্রায় শারীরিক ও মানসিক চাপের কারনেও হ্যালুসিনেশন হতে পারে। একজন মানুষ যখন খুব বেশি নিদ্রাহীনতায় ভোগে তখন ও সে হ্যালুসিনেশন এর স্বীকার হতে পারে।



ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন:
ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশনে আপনার চারপাশে যা দেখতে পাওয়া যায় তার হালকা বিকৃতি রূপ। হেলুসিনোজেনিক মাদক ব্যবহার করে যারা তারা প্রায়ই এই হালকা বিকৃতিকে খুবই আনন্দের সহিত উপভোগ করে বর্ণনা করে।
এই ধরনের অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে:

- প্রাণবন্ত রঙের উপস্থিতি।

-বস্তুর চারপাশে বিভিন্ন চক্র দেখতে পাওয়া।

-আরো স্পষ্টভাবে ভিজ্যুয়াল ভ্রান্ত অভিজ্ঞতা।

-আপনার পেরিফেরাল দৃষ্টির মধ্যে ভিন্নভাবে জিনিস দেখতে পাওয়া।

- প্লাস্টিকের, কাদামাটি, অথবা অন্য কোনো পদার্থের মতো দেখতে জিনিসে কোনো চেহারা দেখতে পাওয়া।

-দেয়ালে দেখে মনে হওয়া যে সেটি প্রানবন্ত অথবা শ্বাস নিচ্ছে এমন।

-আগে দেখা কোন প্যাটার্ন যা স্পষ্ট ছিল না কিন্তু এমতাবস্থায় স্পষ্টভাবে খেয়াল করা। যেমন একটি পাতার নেভিগেশন শিরা, বা বস্তু যা সম্মুখের দিকে অঙ্কিত।

- এমন সব ব্যক্তি বা বস্তু দেখা যার কোনো অস্তিত্বই ছিল না সে জায়গায়। এমন ক্ষেত্রে ব্যক্তি শতাধিক নিশ্চিত থাকে যে সে সেটি দেখেছিলই।

ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন্স হেলুসিনোজেনিক ড্রাগস, যেমন এলএসডি, এর একটি স্বতন্ত্র প্রভাব। এই মাদকদ্রব্য কার মস্তিষ্কে কতটুক প্রভাব ফেলবে তা ব্যক্তিভেদে নির্ভর করে।

কিছু লোক মাদকের কম ডোজে নিয়মিতভাবে এই "ভিজ্যুয়াল" দেখতে পায়, অন্যরা উচ্চমাত্রায় ডোজ নিলেও শুধুমাত্র সামান্য একটি উদ্দীপক এর প্রভাব অনুভব করে।

এই একই ড্রাগ সেবনে অভিজ্ঞতার মধ্যে দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে পারে। এমন মানুষ যাদের আগে কখনো হ্যালুসিনেশন হয়নি হঠাৎ নিজেদেরকে এলিয়েম হিসাবে ভাবতে পারেন মনে হয় বিশ্বজুড়ে বিশ্বাস করে বসে তারা।

ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন সুন্দর বা অপ্রীতিকরও হতে পারে। তারা দ্রুত এক থেকে অন্য থেকে স্থানান্তর করতে পারেন, মেজাজ দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার ফলে।


 
অডিটরি হ্যালুসিনেশন:
কানে গায়েবি আওয়াজ আসাকে বলা হয় অডিটরি হ্যালুসিনেশন বা শোনার হ্যালুসিনেশন। বেশির ভাগ মানসিক রোগের ক্ষেত্রেই এটি ঘটে থাকে। রোগী কানে কথা শুনতে পায়। রোগ নির্ণয়ে কেবল এতটুকু তথ্য জানলেই যথেষ্ট নয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞগণ এ ক্ষেত্রে কানের গায়েবি আওয়াজের খুঁটিনাটি জিজ্ঞাসা করে থাকেন। কারণ কেবল হ্যালুসিনেশন হতে রোগ নিরূপণ করা যায় না। যেই-সকল ব্যক্তির সিজোফ্রেনিয়া আছে তারা সবচেয়ে বেশি অডিটরি হ্যালুসিনেশনে ভোগে। আওয়াজের ভ্রান্তি বা শ্রবণের অভিজ্ঞতায় তীব্রতা যেমন হঠাৎ কোনো গান শুনতে পাওয়া হ্যালুসিনেজিক ড্রাগস গুলো নেওয়ার ফলে হয়ে থাকে।

ফাংশনাল হ্যালুসিনেশন এটি আরেক ধরনের মজার শ্রবণেন্দ্রিয় হ্যালুসিনেশন। কেউ হয়তোবা বাথরুমে গিয়ে পানির ট্যাপ ছাড়ল আর সাথে সাথে কানে গায়েবি আওয়াজ আসতে শুরু করে দিল। মজার ব্যাপার হলো যখনই পানির ট্যাপ বন্ধ করে দেয়া হয় তখন সাথে সাথেই কানের শ্রবণেন্দ্রিয় হ্যালুসিনেশন বন্ধ হয়ে যায়।



ত্বকের হ্যালুসিনেশন:
ত্বকের হ্যালুসিনেশনে রোগীর মনে হয় তার ত্বকে কিছু ঘটছে। এটি হয়ে থাকে সাইকোএক্টিভ ড্রাগ গুলো সেবনের ফলে। কোকেইন সেবনকারীদের অনেক সময় মনে হয় তাদের চামড়ার নিচে কীট হাঁটছে। একে বলে ফরমফিকেশন। আরেক ধরনের রোগী পাওয়া যায় যারা আসলে ডিলুসনাল ডিসঅর্ডারের রোগী, তারাও তাদের চামড়ার নিচে পোকার হাঁটাচলা টের পায়। পোকাগুলো তাদের চামড়া ছিদ্র করে বাইরে চলে আসে বলে অনুভব করে এবং তারা সেসব কাল্পনিক পোকা ধরে ধরে কৌটার মধ্যে ভরে দেখানোর জন্য চেম্বারেও নিয়ে আসে।
অপর একদল বলে থাকে কেউ যেন প্রতিদিন তার সঙ্গে সঙ্গম করে যাচ্ছে। তার শরীরের মাঝে কেউ যেন ইলেকট্রিক শক দিচ্ছে। এগুলো ত্বকের হ্যালুসিনেশন।

জিহবা ও নাসিকার হ্যালুসিনেশন:
জিহ্বা আর নাসিকার হ্যালুসিনেশন মনোরোগ গবেষকরা এ দুটোকে এক সাথে উল্লেখ করে থাকেন। কারণ এ দুটো নাকি এক সাথে ঘটে থাকে। জিহ্বার হ্যালুসিনেশনে রোগী কোনো এক অজানা জায়গা হতে খাবারের স্বাদ পেয়ে থাকে। নাসিকার হ্যালুসিনেশনে আশপাশের কেউ কোনো গন্ধ শুঁকছে না অথচ রোগী প্রতিনিয়ত বলে যাচ্ছে তার নাকে যেন কোথা হতে এক উৎকট গন্ধ আসছে। নাসিকার হ্যালুসিনেশন খুব কমই পাওয়া যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে এ ধরনের হ্যালুসিনেশন হয়। গন্ধের হ্যালুসিনেশন সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় মৃগী রোগে। মৃগী রোগীরা খিঁচুনি আসার আগ মুহূর্তে নাকে রাবার পোড়া গন্ধের মতো বিশ্রী গন্ধ পায়। ভাইরাস সংক্রমণ, ব্রেন টিউমার, ব্রেনে আঘাত লাগা বা ব্রেন অপারেশনের ফলে ঘ্রাণের হ্যালুসিনেশন হতে পারে। কোনো কোনো ওষুধ বা রাসায়নিক দ্রব্য ঘ্রাণের হ্যালুসিনেশন সৃষ্টি করতে পারে।



প্রভাব:
মাদক গ্রহণের ফলে হ্যালুসিনেশন হয় ও প্যারানয়া হয়। প্যারানয়াতে ভুগলে রোগী ভাবে, অনেকেই তার সঙ্গে শত্রুতা করছে। তারা অনেক সময় মারামারি ও সন্ত্রাস করতে পছন্দ করে। কারো কারো শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, খিঁচুনি হয়। খিটখিটে ভাব, অহেতুক রাগারাগি, ভাঙচুর, নার্ভাসনেসে ভুগতে থাকে মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা। স্মরণশক্তি কমে যায়, সিদ্ধান্তহীনতা শুরু হয় এবং কারো কারো সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। অনেকে পাগল হয়ে যায়। লেখাপড়ায় খারাপ হয়ে একসময় ডিপ্রেশন বা হতাশাজনিত নানা রকম অপরাধ প্রবণতা, এমনকি আত্মহত্যাও করে থাকে। হার্টের ভেতরে ইনফেকশন হয়ে বা মস্তিষ্কের রক্তনালি ছিঁড়ে অনেকে মারা যায়। অনেকে মরে রাস্তায় দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে। কেউ কেউ টানা সাত থেকে ১০ দিন জেগে থাকে, তারপর ড্রাগ ওভার ডোজে সাধারণত মারা যায়।



গণসচেতনতাই এই সমস্যা উত্তরণের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পথ। মাদক বিরোধী সকল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু আমাদের দায়িত্বও কোনো অংশে কম নয়। কেননা এই মাদকাসক্ত ব্যক্তি আমি, আপনি অথবা আমাদেরই সন্তান। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি একদিকে যেমন অনুউৎপাদনশীল অর্থাৎ তিনি কোনো উৎপাদনে অংশ নিচ্ছেন না, তেমনি নানা ভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

Best Electronics