হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালার মাধ্যমেই সর্বনাশা প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ে!

ঢাকা, বুধবার   ২৭ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪২৭,   ০৩ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালার মাধ্যমেই সর্বনাশা প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ে!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৫৮ ২ মে ২০২০   আপডেট: ১৩:০১ ২ মে ২০২০

ছবি:  হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালার মাধ্যমেই  ছড়িয়ে পড়ে সর্বনাশা প্লেগ রোগ

ছবি: হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালার মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ে সর্বনাশা প্লেগ রোগ

শিশুকে খাওয়াতে বা ঘুম পাড়াতে মায়েরা রূপকথার গল্পের ঝুড়ি খুলে দেন। আপনিও নিশ্চয় কল্পনার জগতে সাক্ষী আছেন এমন অনেক রাজকন্যা হারিয়ে যাওয়ার বা খুঁজে পাওয়ার কাহিনীতে। রূপকথার গল্পগুলোর মধ্যে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার বেশ জনপ্রিয়। মনে আছে নিশ্চয় সেই বাঁশিওয়ালার কথা। যে প্রতিশোধ নিতে শহরের সব শিশুদের তার সঙ্গে নিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন। এখনো মনে হয়, যে শিশুগুলোর কি হলো? কোথায় গেল ওদের নিয়ে?    

পৃথিবী বিখ্যাত এ গল্পের পটভূমি আজ থেকে প্রায় ৭০০ বছরের বেশি আগে। ঘটনাটি ছিল জার্মানির ছোট্ট শহর হ্যামিলিনে। ৭০০ বছর আগের জার্মানি আজকের মতো আধুনিক ছিল না। অন্য শহরগুলোর মতোই এলোমেলো ছিল জার্মানির এই ছোট্ট শহরটি। হ্যামিলিন ছিল জার্মানির হানোভারের ৩৩ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত একটি ছোট্ট শহর। শহরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একাদশ শতাব্দীতে। 

১২৪৮ সালের দিকে গোটা শহরের মানুষ ইঁদুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ইঁদুরবাহিত রোগ যেমন মহামারির আকার ধারণ করে, ঠিক তেমনি ইঁদুরের অত্যাচার দিন দিন বেড়েই চলছিল। কোনো উপায়ন্তর না দেখে হ্যামলিন শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচার জন্য পৌরসভায় মিটিংয়ে বসলেন। মেয়রের নেতৃত্বে সবাই মিলে একজোট হয়ে ঠিক করলেন, শহরকে ইঁদুরের হাত থেকে যে বাঁচাতে পারবে তাকে মোটা অঙ্কের পুরস্কার দেয়া হবে। সেই ঘোষণায় সাড়া দিয়ে শহরে এসে হাজির হলো রহস্যময় এক বাঁশিওয়ালা। সে জানায় তার বাঁশির সুরে শহরকে ইঁদুরমুক্ত করা সম্ভব। শুনে সবাই অবাক; কিন্তু নিরুপায় হ্যামলিনবাসীর কিছুই করার ছিল না। বাঁশিওয়ালাকে মোটা অঙ্কের পুরস্কারের বিনিময়ে শহরকে ইঁদুরমুক্ত করার আদেশ দিলেন মেয়র। 

এরপর বাঁশি বাজাতে শুরু করলেন বাঁশিওয়ালা। বড় অদ্ভুত সেই সুর। তার বাঁশির শব্দ শুনে গর্ত থেকে বেরিয়ে এলো সব ইঁদুর। যেখানে যেরকম ইঁদুর ছিল সবই বেরিয়ে এলো বাঁশিওয়ালার মায়াবী সুরের টানে। একসময় ইঁদুরগুলোকে নিয়ে গিয়ে ওয়েজার নদীতে ফেলে দিল বাঁশিওয়ালা। এরপর পারিশ্রমিক চাইতে গেলে মুখ ফিরিয়ে নিল শহরের মেয়র ও গণ্যমান্য মানুষরা। রেগে গিয়ে তখনকার মতো শহর ছেড়ে চলে গেল সেই বাঁশিওয়ালা। কিছুদিন পর আবার ফিরে এলো বাঁশিওয়ালা। সময়টা ছিল জুলাই মাস। এক ধর্মীয় উৎসবের দিনে শহরের বড়রা যখন গির্জায় জমায়েত হয়। এবার তার বাঁশির সুরে বেরিয়ে এলো শহরের ছোট ছোট শিশুরা। তাদের সঙ্গে নিয়ে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল সেই বাঁশিওয়ালা। একটি মত অনুসারে ১৩০ জন শিশু ছিল দলটিতে। 

শিশুদের মধ্যে তিনজন দল থেকে পিছিয়ে পড়েছিল। তারাই নাকি ফিরে এসে এসব কথা জানাল শহরবাসীকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনজনের একজন ছিল খুবই দুষ্টু। যে কিছুদূর গিয়ে অন্যদিকে খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই তারা কোনদিকে গেছে তা দেখে নি। আর বাকি দুইজনের  একজন মূক ও অন্যজন দৃষ্টিহীন হওয়ায় বাঁশিওয়ালার গন্তব্য সম্বন্ধে সঠিক তথ্য আর জানা যায়নি। কেউ বলেন, শহরের বাইরে কোপেলবার্গ পাহাড়ের মাথার গুহায় ঢুকে গিয়েছিল সে। কেউ বলেন, ইঁদুরের মতো শিশুদেরও সলিলসমাধি দেয় সেই বাঁশিওয়ালা। সাধাসিধেভাবে বললে মূল গল্পটি এমনই। তবে এ নিয়ে মতভেদেরও কমতি নেই। রয়েছে নানা তর্ক বিতর্কও। তারপরও সারাবিশ্বে ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে এই কাহিনী। 

আরেকটি মতবাদ অনুসারে বাঁশিওয়ালা যখন শিশুদের নিয়ে রওনা দেয়, তখন শহরের কারোরই কিছু করার ছিল না। কারণ সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বাঁশির সুর শুনছিল। স্বয়ং মেয়রের মুগ্ধতাও বাঁশির সুরেই নিবিষ্ট ছিল। বাঁশিওয়ালা মায়াবী সুরের টানে বাঁশি বাজাতে বাজাতে এগিয়ে যাচ্ছিল। আর শিশুরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুসরণ করছিল। একসময় বাঁশিওয়ালা শিশুদের নিয়ে হ্যামিলিন শহরের পাঁচিল বেয়ে একটা পাহাড়ের দিকে গেল। এরপর পাহাড়টি হঠাৎ দু'ভাগ হয়ে গেল। আর তখন বাঁশিওয়ালা শিশুদের নিয়ে সেই পাহাড়ের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল। সেই রহস্যময় বাঁশিওয়ালাকে কিংবা সেসব শিশুকে এরপর আর কখনোই দেখা যায়নি। বলা হয়ে থাকে ১২৮৪ সালের ২২ জুলাই ঘটনাটি ঘটেছে।

ইতিহাসবিখ্যাত এ ঘটনাটির সত্যতা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। অনেকে যেমন ঘটনাটিকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, তেমনি যুক্তি দেখিয়ে অনেকেই চেষ্টা করেন ঘটনাটির সত্যতা প্রমাণের জন্য। আবার একে নেহাতই গল্প বলে উড়িয়ে দেয়ার লোকের সংখ্যাও কম নয়।

দীর্ঘদিন অমীমাংসিত এই রহস্যের বিস্তর গবেষণা হয়েছে। এ ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে হ্যামিলিন শহরের পৌরসভায় রাখা কাগজপত্র তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়। সেখানে এরকম কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি। হ্যামিলিন শহরে এ সংক্রান্ত একটি জাদুঘর রয়েছে। সেখানে সঞ্চিত পঞ্চদশ শতাব্দীতে লেখা কয়েকটি বইয়ে এ রহস্যময় কাহিনীর বর্ণনা রয়েছে। বইটিতে এক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দেয়া আছে। ফ্রাউ ভন লিউড নামের এক ১৩ বছরের বালক বলেছে, বাঁশিওয়ালার বয়স আনুমানিক ছিল ৩০। দেখতে ছিল অস্বাভাবিক রকম সুদর্শন। তার বাঁশিটি ছিল রুপার তৈরি। অন্য এক নথিতে পাওয়া যায় ১৩০০ শতাব্দীতে হ্যামিলিনের বাজারে এক কাঠের ফলক ছিল। এছাড়াও হ্যামিলিন শহরের গির্জার জানালার কাঁচে আঁকা একটি ছবি পাওয়া যায়। সেখানে এক বংশীবাদক ও অনেক শিশুর ছবি ছিল। সেটা ১৭০০ সালে ঝড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। 

আরেকটি ঘটনায় হ্যামিলিন শহরে নিকোলাস নামের এক অসৎ ব্যক্তির বর্ণনা পাওয়া যায়। যে কি-না শিশুদের মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করে দিয়েছিল। অনেকে হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালার সঙ্গে এই ঘটনারও যোগসাজশ খোঁজেন। সেখানকার একটি রাস্তার নাম বাঙ্গেলোসেন্ট্রাস। যার অর্থ 'যে রাস্তায় বাজনা বাজে না'। ওই রাস্তার একটি কাঠের ফলকে খোদাই করা আছে ১৮২৪ সালের ২৬ জুন হ্যামিলিনের ১৩০টি শিশুকে এক রংচঙা ব্যক্তি অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল যাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা গল্পে ইঁদুর দ্বারা আক্রান্ত শহরের কথা বলা হয়েছে। কেননা মধ্যযুগে ইউরোপে প্লেগরোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তখন ইঁদুর ধরার জন্য এক ধরনের বিশেষ লোক দেখা যেত। যাদের পাইড পাইপারও বলা হয়। বিজ্ঞানের মতে, হাই ফ্রিকুয়েন্সির শব্দতরঙ্গ দিয়ে তারা ইঁদুরকে আকৃষ্ট করত। হ্যামিলিনের জাদুঘরে একটি প্রাচীন টিনের বাঁশি রাখা আছে। ধারণা করা হয় প্রাচীনকালে ইঁদুর ধরিয়েরা এ ধরনের বাঁশি ব্যবহার করত। 

ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, ১২৮৪ সালে হ্যামিলিনে দুটি ঘটনা ঘটে। একটি হচ্ছে প্লেগ, অন্যটি নাচুনে রোগ। এক বিশেষ ধরনের খাদ্য বিষক্রিয়ায় এ রোগ দেখা দেয়। এতে রোগী ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাচতে থাকে। লাল রং তাদের আকৃষ্ট করত খুব। সাধারণত ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাই এ রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। এ দুটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গল্পটির বর্ণনা দেন হ্যান্স ডোবারটিন। বর্তমানে হ্যামিলিনে যে পৌরসভা রয়েছে, তার নামের অর্থ হলো 'ইঁদুর ধরা লোকের বাড়ি'। এটি নির্মিত হয় ১৬০২ সালে। এর দেয়ালে বিশ্ববিখ্যাত কাহিনীটির ছবি চমৎকারভাবে আঁকা আছে।  
 
অনেকের মতে, জার্মানির উত্তর-পূর্বে স্লাভ অধ্যুষিত দেশগুলোতে উপনিবেশ গড়ে তোলার জন্য শহর ছেড়েছিল হ্যামিলিনের বেশ কিছু অল্পবয়সী অধিবাসী।তাদের এই দেশান্তরী হওয়ার ঘটনাই পরে গল্প-গাঁথায় উঠে এসেছে। কেউ বলেন, সে সময় ভয়ঙ্কর মরণরোগের শিকার হয়েছিল হ্যামিলিনের খুদে বাসিন্দারা। পরে সেই রোগকেই বাঁশিওয়ালার প্রতীকী রূপ দেয়া হয়।  

একটি তত্ত্ব অনুসারে, সে সময় শিশুগুলো প্লেগে মারা গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। যদিও ইতহাস বলে এই গল্পের পটভূমির অনেক পরে প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল। মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি বীভৎস, অমানবিক ও কালো ইতিহাস বহন করছে এই ব্ল্যাক ডেথ। ১৩৪৬-১৩৫৩ সালের মধ্যে ইউরোপে ব্ল্যাক ডেথ ছড়িয়ে পড়েছিল। যেহেতু  ধারণা করা হয় এটি ইঁদুরের মাধ্যমেই ছড়িয়েছিল। তাই হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা খ্যাত লোকটি এই রোগ ছড়িয়ে শিশুদের হত্যা করেছিল।

আবার আরেকটি তত্ত্ব বলে পাইড পাইপাররা আসলে যৌন নিপীড়নকারী ছিলেন। যারা ঘুমন্ত শিশুদের অপহরণ করতে হামিলিন শহরে প্রবেশ করেছিলেন। তবে আসল ঘটনা যে কি ছিল তার সমাধান আজো করতে পারেননি ইতিহাসবিদরা। হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা এখনো রহস্যের আড়ালেই রয়ে গেছেন।   

সূত্র: অ্যানসাইন্টঅরিজিন 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস