Alexa হিরো দ্য গ্রেট ইলিয়াস কাঞ্চন

ঢাকা, রোববার   ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯,   পৌষ ১ ১৪২৬,   ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১

হিরো দ্য গ্রেট ইলিয়াস কাঞ্চন

 প্রকাশিত: ১৭:৫৩ ২৫ নভেম্বর ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রতি ক্ষেপেছে পরিবহন সেক্টরের মানুষরা। ক্ষেপেছে পরিবহন মালিক, নেতা, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, মধ্যসত্তভোগী। তার গলায় জুতোর মালা পরিয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে। মনে হচ্ছে তার মতো এতো খারাপ, এতো অন্যায়কারী, এতো কদর্য মানুষ আর নেই! 

তার অপরাধ সবার জানা। নিরাপদ সড়ক চেয়েছেন তিনি। ৯০ সালে গড়ে তোলেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন। গত ২৬ বছর ধরে এই একটাই তার চাওয়া । স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে রোড একসিডেন্টে হারানোর পর থেকে নিরাপদ সড়কই তার মিশন। এ ব্যাপারে তিনি আপোসহীন। এখন নিরাপদ সড়ক চাই স্লোগানে পরিণত হয়েছে। আগে মানুষ ভাবত, দুর্ঘটনা হয় ভাগ্যের দোষে। এখন জনগণ জানে দুর্ঘটনা ভাগ্যের দোষে হয় না, হয় পরিবহন, রাস্তা আর চালকদের ত্রুটির কারণে। এ আন্দোলনের কারণে তিনি একুশে পদক পেয়েছেন। জাতিসংঘেও প্রশংসিত হয়েছে তার এই কার্যক্রম। 

যাদের যায় শুধু তারাই জানেন যাবার যন্ত্রণা কতটা। আমরা শুধু দূর থেকে আহা উহু করতে পারি। দুদিনেই ভুলে যেতে পারি। দেশে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে কত মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছে, কত মানুষ পঙ্গু হচ্ছে, কতজন ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তার কতটুকুই বা আমরা জানতে পারি! আমরা জানতে পারি শুধু তারেক মাসুদ বা মিশুক মুনিরের মত স্বনামখ্যাত লোকেরা মারা গেলে। এ জাতীয় মানুষের মৃত্যু শুধু পরিবারের জন্য নয়, দেশের জন্য, জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু যারা তারেক মাসুদ নন তাদেরও তো বিরাট মূল্য তাদের পরিবারে। বাবা মা ভাই বোন স্বামী স্ত্রী সন্তান সন্ততির কাছে। যে গৃহবধূ বাসে উঠতে গিয়ে বাসের আচমকা টানে ছিটকে গিয়ে মারা গেল, যে প্রতিভাবান ছাত্রী রাস্তা পারাপার হতে গিয়ে বাসের জেব্রা ক্রসিং না মানায় মারা গেল বা যে ছেলেটি বাসড্রাইভারদের পাল্লাপাল্লি লড়াইয়ে গাড়ি খাদে পড়ে মারা গেল তাদের প্রত্যেকেরই অপরিসীম মূল্য তাদের সংসারে। এমন অসংখ্য ছেলে মেয়ে, বাবা মা প্রতিদিন প্রতিক্ষণে মারা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান দিয়ে কোনো লাভ নেই। অমন পরিসংখ্যান মাঝেমাঝেই দেয়া হয়। তাতে ঘটনার কোনো রদবদল হয় না। 

অনেকে বলতে পারেন ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী তো চলেই গেছেন। সড়ক আন্দোলন করলে তো তিনি স্ত্রীকে ফিলে পারেন না। তাহলে তার কী দরকার এসব ঝামেলায় জড়িয়ে। এ ধরনের ভাবনা শুধুমাত্র আত্মকেন্দ্রিক মানুষেরাই ভাবতে পারেন। যারা মাটি মানুষ সমাজ দেশের কথা ভাবেন তারা এভাবে ভাবতে পারেন না। ইলিয়াস দেশের কথা ভাবেন। তাই তিনি ২৬ বছর ধরে একাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি মন্ত্রী হতে চাননি, উপদেষ্টা হতে চাননি। নিজস্ব কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা তার নেই। তার একটাই চাওয়া, নিরাপদ সড়ক।

ইলিয়াস শো বিজনেসের মানুষ। একসময় নামকরা নায়ক ছিলেন। তার বসুন্ধ্রা চলচ্চিত্রটি যারা দেখেছেন তারা জানেন কী অসাদারণ তার অভিনয়! আর কতটা গ্লামার তার ছিল। সুভাস দত্তের মতো পরিচালকের চোখে পড়া সহজ নয়। ক্যারিয়ারের একেবারে তুঙ্গে যখন তিনি তখনই নিহত হন জাহানারা কাঞ্চন। কাঞ্চন স্যুটিং-এ ছিলেন। স্বামীর স্যুটিং দেখতে যাচ্ছিলেন জাহানারা সড়কপথে। পথিমধ্যে এই দুর্ঘটনা। প্রথমে ইলিয়াসকে স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ দেয়া না হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জেনে যান, স্ত্রী তাকে ছেড়ে চিরদিনির মতো চলে গেছেন। শোক সামলে উঠে দাঁড়ান কাঞ্চন। স্থির করেন করণীয়। সেই থেকে নিজের সংগ্রামে অটল রয়েছেন তিনি। তার কোনো স্পন্সর নেই। নিজের পয়সা খরচ করে একাই লড়ে যাচ্ছেন। 

এই আন্দোলন করতে গিয়ে একের পর এক ছবি ছেড়ে দিয়েছেন। স্যুটিং-এ দেরি হওয়ায় পরিচালকদের গালমন্দ শুনেছেন। আস্তে আস্তে কমিয়ে দিয়েছেন অভিনয়। যে জায়গাটিতে তিনি পৌঁছাতে পারতেন তা পারেননি। নিজেকে উৎসর্গ করেছেন জনগণের সেবায়। 

এই যে মানুষটি যিনি এতগুলো বছর মানুষের জন্য কাজ করলেন কেন তার গলায় ঝুলানো হলো জুতোর মালা! কারণ একটাই। সরকার নতুন সড়ক আইন পাশ করেছে। সে আইনে কিছু কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা আছে। ইলিয়াস কাঞ্চন সে আইন সমর্থন করেছেন। 

এইতো সেদিনের কথা, শহিদ রমিজউদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজের দুজন শিক্ষার্থীকে ফুটপাতে উঠে পিষে ফেলে ‘জাবালে নূর পরিবহনের একটা বাস। দুটো বাসের মধ্যে কমপিটিশন দিচ্ছিল তারা। ছেলে মেয়ে দুটির রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকে ফুটপাতে। সে কথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর গোচরে আনলে তিনি তাচ্ছিল্যের সাথে হেসে বলেন, মহারাষ্ট্রে প্রতিদিন ৩৫ জন করে একসিডেন্টে মারা যায়। তারা তো এত হইচই করে না।একে সহপাঠীদের মৃত্যু তার ওপর মন্ত্রীর এই মন্তব্যে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ছাত্ররা। তাদের সাথে যুক্ত হয় অন্যান্য স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা। প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও নেমে আসে রাজপথে। নিরাপদ সড়ক চাই এই ইস্যুতে ৯টি দাবি তুলে ধরে তারা  সরকারের কাছে। নিজেরাই নেমে পড়ে রাস্তা সুশৃঙ্খল করার কাজে। 

আমাদের দেশে গাড়ির পাল্লা নতুন জিনিস না। ফিটনেসবিহীন অদক্ষ চালকের হাতে গাড়ি সাধারণ ঘটনা। জাবালে নূরের রুট পারমিট ছিল না।  রুট পারমিট ছাড়া পরবিহনটি রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। বিআরটিএ তাদের লাইসেন্স বাতিল করেছে। দিয়ার বাবা কী ফিরে পাবে তার মেয়েকে। দেখতে পারবে তার মেয়েকে ম্যাজিস্ট্রেট বানানোর স্বপ্ন! করিমের বাবা কি আর কোনদিন করিমকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবে! প্রিয়াংকার ব্রেনে হেমারেজ হয়েছিল। কি হয়েছে তার জানি না আমরা।

তখন কিশোররা গাড়ির রুট পারমিট আর ফিটনেস সার্টিফিকেট দেখেছে। চালকের লাইসেন্স দেখেছে। যাদের কাগজপত্র সঠিক পায়নি তাদের গাড়ি আটকে তুলে দিয়েছে পুলিশের কাছে। আর এই আন্দোলনে দেশের একটি গোপন চিত্র উদঘাটিত হয়েছে দেশবাসীর সামনে। আমরা জানতে পেরেছি, এদেশের মন্ত্রী, বিচারক, নির্বাচন কমিশনার, পুলিশের, সেনাবাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তা, বিজিবি, দুদক, ডিবি, সাংবাদিকেরা লাইসেন্সবিহীন গাড়িতে বছরের পর বছর চলাচল করেন। এদের অনেকের সামনে পেছনে পুলিশ থাকে, জাতীয় পতাকা থাকে, সিটি বাজিয়ে এদের চলাচলের জন্য রাস্তা পরিষ্কার করে পুলিশ। আমরা আমজনতা খাবি খাই। এরা উল্টো রাস্তায় চলেন।  সংসদে সমাবেশে টকশোতে নীতি আদর্শ শৃঙ্খলার অমীয় বাণী উচ্চারণ করেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনি। আর এদেরই  ভেতরে এত্তো এত্তো গলদ! 

অনেক মন্ত্রীকে শিক্ষার্থীরা গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছিল তখন। এদেশের ট্রাফিক পুলিশের কোনো সাহস নেই ভিআইপিদের কাগজপত্র চেক করার। এই শিক্ষার্থীরা তা করেছে। কোনো গাড়ি তারা ভাঙচুর করেনি। এমনকি অসুস্থ মানুষদের হাত ধরে রাস্তা পার করে দিচ্ছে এমন ছবিও এসেছে পত্রিকায়। তারা যেভাবে ট্রাফিক কন্ট্রোল করেছে, রাস্তা সৃশৃঙ্খল রেখেছে আমি কখনই তা দেখিনি। রাস্তাটাকে তিনভাগ করে একভাগে রিক্সা, একটাতে বাস, আর একটাতে কার সিএনজির লেন করেছে তারা। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এমারজেন্সি লেনও করেছে।

তখন জনগণ মাইলের পর মাইল হেঁটেছে। বাচ্চাগুলোর ওপর তাদের কোন রাগ ছিল না। বাচ্চাদের সমর্থন করেছে, তাদের উৎসাহ দিয়েছে। বাচ্চাগুলোকে খাবার আর পানি দিয়েছে। অন্যদিকে চালকেরাও হাসিমুখে একবাক্যে তাদের কাগজপত্র শিক্ষার্থীদের দেখিয়েছে। কারো মুখে বিরক্তি দেখিনি। এমনকি রিক্সাওয়ালাও বলেছে, এবার দ্যাশটা ঠিক হইব। পোলাপান ঠিক কাজটাই করতাছে।

তাদের দাবির প্রেক্ষিতে সড়ক নীতিমালা প্রবর্তিত হয়। ১৪ মাস পরে তা পাস হলো। এই নীতিমালা পাসের আগে পরিবহন সেক্টরের নেতা, মালিক, শ্রমিকনেতা, সুশীলসমাজসহ সর্বস্তরের জনগণের মতামত নেয়া হয়েছিল। কেউ তখন ভেটো দেননি। নিজেরা না করে নেতারা বা পরিবহন মালিকরা শ্রমিকদের দিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চনের সাথে এই ন্যাক্কারজনক কাজটি করালেন। 

ড্রাইভারের লাইসেন্স যদি সঠিক থাকে, সে যদি ট্রাফিক নিয়ম মেনে সঠিকভাবে গাড়ি চালায়, ট্রাফিক পুলিশ যদি সৎ হয়, আইন কানুন জানে, গাড়িগুলো যদি ক্রুটিমুক্ত হয়, জনগণ যদি সজাগ হয় তাহলে দুর্ঘটনা কমে যাবে। তাতে তো শুধু আপনার আমার নয়, ড্রাইভার পরিবহন মালিক, পরিবহন ব্যবসায়ী, শ্রমিক সবারই লাভ। অন্যায় না করলে, নিয়ম মানলে তো কারো কোনো সাজা হবে না। তাহলে এত ভয় কিসের। পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতি ডেকে কেন মানুষকে অশেষ দুর্গতির মধ্যে ফেলা! 

পরিবহন ব্যবসায়ের সঙ্গে যারা জড়িত তারা ধনী। উচ্চবিত্ত মানুষের সন্তানেরা বিদেশে থাকে। দেশে কী হচ্ছে না হচ্ছে, কয়টা একসিডেন্ট হচ্ছে তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। সড়ক দুর্ঘটনাকে অতি সাধারণ একটা ঘটনা হিসেবেই মনে করে তারা। কিন্তু তারা একবারও ভেবে দেখেন না, পরিণত বয়সে যদি একজন মানুষ মারা যান বা রোগভোগের পরে মারা যান তার একটা সান্ত¦না থাকে। কিন্তু ঘর থেকে তাজা মানুষ বেরিয়ে যদি না ফেরেন তার কোনো সান্তনা থাকে না। 

এদেশে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার মানুষ নেই। ইলিয়াস কাঞ্চন করছেন। একাই হ্যান্ডমাইক হাতে নিয়ে পথে নামেন। সভা-সমিতিতে বার বার সড়ক নিরাপত্তার কথা বলেন। সেই মানুষটির গলায় জুতার মালা ঝুলালো এক শ্রেণির মানুষ কিছু মানুষের নেপথ্য মদদে। তারা ইলিয়াসকে অপমান করতে চেয়েছিল, অসম্মান করতে চেয়েছি।কিন্তু তারা জানে না, এ মালা ইলিয়াসের গলায় ফুলের মালা হিসেবেই দেখেছে দেশের মানুষ। তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা শতগুণ বেড়ে গেছে। যারা তার গলায় জুতার মালা পরিয়েছে আর যাদের মদদে পরিয়েছে তাদের ধিক্কার দিচ্ছে দেশবাসী।

ইলিয়াস বলেছেন, নিরাপদ সড়কের এই আন্দোলন থেকে তিনি কখনই ফিরবেন না, সরবেন না। যতো আঘাতই তার উপরে আসুক না কেন! ইলিয়াস হিরো ছিলেন, এ ঘটনায় তিনি গ্রেট হিরো হয়েছেন। জয়তু ইলিয়াস কাঞ্চন। লড়ে যান। সঙ্গে আছি। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর