Alexa ‘উত্তেজক মধু’ সংগ্রহে ২৫০ ফুট খাড়া উপত্যকায় চড়া তার নেশা

ঢাকা, রোববার   ১৭ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২ ১৪২৬,   ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

‘উত্তেজক মধু’ সংগ্রহে ২৫০ ফুট খাড়া উপত্যকায় চড়া তার নেশা

সাহিদা আফরিন মিথিলা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:১৪ ২১ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৩:১৫ ২২ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

কোনো ধরনের নিরাপত্তা দড়ি ছাড়াই উপত্যকায় চড়লেন তিনি। বাঁশ ও দড়ির তৈরী ঝুলন্ত সিঁড়ি বেয়ে আড়াইশ ফুট ওপরে উঠে চলেছেন। কাঁধে তার ঝোলানো একটি বড় বাঁশ। তার সঙ্গে দড়িতে বাধা একটি ঝুড়ি এবং ধোঁয়া জ্বলানোর কিছু সরঞ্জাম। মৌচাক থেকে ১০ ফুট দূরত্বে থেকে বাঁশের আগায় ধোঁয়া জ্বালিয়ে সেটি তিনি মৌচাকের কাছে নেন। ধোঁয়ার তীব্রতায় অল্পক্ষণের মধ্যেই মৌচাক থেকে মৌমাছিগুলো বেড়িয়ে আসতে শুরু করে। 

মাউলি ধানতার শরীরে হুল ফুটায়। অবাক করা বিষয়টি হলো, প্রতি মুহূর্তে এতো এতো হিমালয়ান মৌমাছির কামড় খাওয়া সত্ত্বেও মাউলি বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তার চেহারায় ব্যাথার কোনো ছাপ ছিলোনা। তিনি আপন সুরে গুণগুণ করে একটি মন্ত্র জপতে থাকেন। মন্ত্রটি ক্রোধান্বিত মৌমাছিদের শান্ত করে বলে তার বিশ্বাস! মন্ত্র জপতে জপতে পরিপূর্ণ মৌচাকটি কাঁধে ঝুলে থাকা ঝুড়িতে ভরে নেন সেই ব্যক্তি। এই পুরো প্রক্রিয়াতে তার দুই ঘণ্টা সময় লেগেছিলো। ঝুলে থেকে বিষাক্ত সব মৌমাছির কামড় খেয়ে মধু সংগ্রহের কাজ করার এই অফুরন্ত শক্তি মাউলি কোথায় পান সে কথা একমাত্র তিনিই জানেন। বলছি এক মৌমাছি যোদ্ধার কথা। তিনি একজন মৌয়াল। নাম তার মাউলি ধান। 

দড়ি ও বাঁশ দিয়ে তৈরি করা ঝুলন্ত সিঁড়িশতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কুলুং সম্প্রদায়ের মানুষেরা অনেকটাই বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। এক কথায় বলা যায় দেশের অন্যান্য অপরাপর জনগোষ্ঠী থেকে একেবারে আলাদা এদের বসবাস। সেই কুলুং সম্প্রদায়েরই একজন হলেন মাউলি ধান। পেশায় তিনি একজন মৌয়াল। মাউলির বাবাও ছিল একজন মৌয়াল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবার হাতে মাউলির মধু সংগ্রহের হাতেখড়ি হয়।

বাঁশ আর দড়ির তৈরী ঝুলন্ত সিঁড়ি বেয়ে কয়েকশ ফুট উঁচুতে উঠে মধু সংগ্রহের কাজটি বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল ছোট মাউলির কাছে। মৌচাকটি পাথরের ওপর থেকে খুলে নেবার সময় মৌমাছি তার হাতে, পায়ে, মুখে সর্বত্র হুল ফুটাতে শুরু করলে ব্যথায় কাতর হয়ে যেতেন তিনি। তবু শক্ত করে দড়ি ধরে রাখতে হতো দীর্ঘক্ষণ। মৌচাকটি সম্পূর্ণ  আলাদা না করে নামতে পারতেন না তিনি।

ঝুলন্ত সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন তিনিকাজটি মাউলির জন্য কখনোই শখের বা নেশার ছিলোনা। তিনি এই কাজের ইতি টানতে চেয়েছেন বহুবার। কিন্তু পারেননি। খাদ্যশস্য এবং শাকসবজিতে তিনি স্বয়ংসম্পুর্ণ থাকলেও তেল, লবণ, পোশাকসহ আরো কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে তার অর্থের প্রয়োজন ছিল। তাই আর কেউ কাজটি না করলেও মধু সংগ্রহের এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি  তাকে করতেই হতো। কুলুং সম্প্রদায়ের সবাই মধু সংগ্রহের কাজটি বহু আগে ছেড়ে দিয়েছে। প্রায় পনেরো বছর তো হয়েছে তাদের এই পেশা ছেড়ে দেয়ার। এরপর মাউলিকেই তার সম্প্রদায়ের শেষ ব্যক্তি হিসেবে মধু সংগ্রহের কাজ করে যেতে হয়েছে।

ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছির বাসা ভাঙা হয়মাউলির পরিবার বেশ বড়। তার তিনজন স্ত্রী ছিলো। ছয়জন সন্তান রেখে তারা মৃত্যুবরণ করে। সন্তানদের মাউলিই পালন করেছে। তার দুই কন্যা বিধবা হওয়ার পর তারাও তার সঙ্গে থাকতে শুরু করে। ফলে তার কাঁধে তার পাঁচ জন নাতি-নাতনির দায়িত্বও ছিল। এভাবেই জীবনের ৪২ বছর কাটিয়েছেন মাউলি। মাউলি ধানের বয়স এখন ৫৭ বছর। গত বছর জুলাই মাসেই নিজের কাজের সমাপ্তি টেনেছেন এই মৌয়াল। কুলুং সম্প্রদায়ের শেষ ব্যক্তি হিসেবে মধু সংগ্রহ পেশার এবং রীতির ইতি টানেন তিনি।

মধুর চাক ভাঙা হচ্ছেহয়ত মাউলির এই ইতিহাস সম্পর্কে আমরা কখনোই জানতে পারতাম না। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একটি দল মাউলির অবসরের পুরো ঘটনাটি এবং তার অবসরের পূর্বের শেষ মধু সংগ্রহের ভিডিও চিত্র ধারণ করে। যার ফলে ইতিহাসের একটি গোষ্ঠীর রীতির সমাপ্তির দলিল থেকে যাবে চিরকাল। ভিডিওটিতে মৌয়াল মাউলির কর্মজীবনের ক্রান্তিলগ্নের কিছু মুহূর্তেরও অংশ রয়েছে। মাউলি বলেন, আমার সন্তানেরা স্কুলে পড়ালেখা করছে, তাদের আর এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা গ্রহণ করতে হবেনা। মাউলি তার এইকাজ করতে করতে এখন ক্লান্ত। মৌয়াল পেশাটি ছেড়ে দিয়ে এখন বাকিটা জীবন তিনি নির্বিঘ্নে কাটাতে চান। 

মধুর চাকএই পেশাটিকে বাঁচিয়ে রাখা নিয়ে মাউলির কোনো খেদ নেই। বরং কুলুং সম্প্রদায়ের শেষ মৌয়াল হিসেবে দীর্ঘদিন পেশাটিকে বাঁচিয়ে রাখা নিয়ে তিনি গর্বিত। তিনিই তার সম্প্রদায়ের পাহাড়ে চড়া সর্বশেষ মৌয়াল।  এটা ভেবে তিনি শিহরিত হন যে, তার ভিডিওচিত্রটি দেখার পর পৃথিবীর মানুষ জানতে পারবে নেপালের প্রত্যন্ত এক ছোট গ্রামে এরকম একটি পেশা ছিল। মৌচাকের মৌমাছিগুলো যদি বুঝতে পেরে থাকে যে মাউলি আর তাদের বাসা ভাঙতে আসবেনা তাহলে হয়ত তারাও অনেক খুশি হবে। গতবছর জুলাই মাসে মাউলি ধান তার সহযোগী আসধন কুলুংকে সঙ্গে নিয়ে শেষবারের মত হোংগু উপত্যকায় চড়েছিলেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির কর্মকর্তাদের বিস্ময় বাড়িয়ে দিয়ে তিনি তার শেষ খেলটি দেখিয়েছেন অত্যন্ত নিপুনভাবে।

পাগলা বা উত্তেজক মধুএখন নিশ্চয়ই ভাবছেন, বাজার থেকে মধু কিনে এনে খাওয়া কতো সহজ কাজ তাই না! তবে এই মধু সংগ্রহ করা আর জীবন বাজি রাখা একই কথা। নিশ্চয়ই মাউলি ধানের গল্প শুনে হাড় হিম হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে! এবার তবে পাগলা মধু সম্পর্কে জেনে নিন-

পাগলা বা উত্তেজক মধু 

হোংগু উপত্যকার পাশ থেকে বয়ে চলা হোংগু নদী আর তার আশেপাশের বনজঙ্গল ঘিরে একটি গ্রাম যার নাম সাদির। এই সাদির গ্রামটি জুড়েই তাদের পৃথিবী আবর্তিত। সাদির গ্রামের বাইরে যাওয়ার তাদের তেমন কোন প্রয়োজন হয়না। এই গ্রামের বৃদ্ধরা এখনও নেপাল বলতে শুধুমাত্র কাঠমুণ্ডুকেই বোঝেন। কাঠমুন্ডু তাদের গ্রাম থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই কুলুং সম্প্রদায়ের মানুষেরাই হিমালয় থেকে পাগলা মধু সংগ্রহের কাজ করতেন। হিমালয়ের হোংগু উপত্যকার কয়েকশ ফুট উপরে পাগলা মধুর মৌচাক অবস্থিত। 

মধুর মোমপাগলা মধু শুধুমাত্র হিমালয়েই পাওয়া যায়। হিমালয়ের মৌমাছিরা এই মধু উৎপাদন করে। হিমালয়ের মৌমাছির কিছু বিশেষত্ব আছে। সেখানকার মৌমাছিগুলো সাধারণ মৌমাছির মত নয়। আকারে এরা সাধারণ মৌমাছির থেকে অন্তত পাঁচ গুণ বড়। এরা অন্য মৌমাছির তুলনায় বেশি বিষাক্ত এবং এদের কামড় বা হুলের ব্যথাও অনেক বেশি। 

এসব মৌমাছির অবস্থান হলো সুউচ্চ গ্রানাইটের পাহাড়ের কয়েকশ ফুট উঁচু। কোনো এক খাড়া ঢালের গায়ে। হিমালয়ের মৌমাছিগুলো বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের মধু উৎপাদন করে। মধুর প্রকার সাধারণত মৌসুমের ওপর নির্ভর করে। মৌসুমী ফুলের বিভিন্ন রস আহরণ করে হিমালয়ান মৌমাছিগুলো মধুও উৎপাদন করে ভিন্ন ধরনের। তবে মার্চ ও এপ্রিল মাসে এরা এক ভিন্ন ধাঁচের মধু উৎপাদন করে।

রডোডেনড্রন গাছএসময়ে বড় বড় রডোডেনড্রন গাছগুলোতে বাহারি রঙের ফুল ফোটে। এই ফুলে এক ধরনের সাইকোট্রপিক টক্সিন থাকে। টক্সিন সমৃদ্ধ এই রস থেকে হিমালয়ান মৌমাছিগুলো যে মধু উৎপাদন করে সেগুলোকে বলা হয় ম্যাড হানি বা পাগলা মধু। শত শত বছর ধরে এই মধুকে কুলুং সম্প্রদায়ের মানুষ কাশির ঔষধ এবং অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে বেশ কিছু বছর ধরে এই মধু চোরাই বাজারে একটি বিশেষ কারণে একচ্ছত্র রাজত্ব করছে।

পাগলা মধুর আরেকটি নাম আছে সেটি হল উত্তেজক মধু। চোরাবাজারে এর মাদকীয় গুণের জন্য খ্যাত। এছাড়াও কাঠমুণ্ডুর অলিগলিতে দেব-দেবীর মূর্তি তৈরীর কারখানায় ব্রোঞ্জ মূর্তি তৈরী জন্য এই মধু ব্যবহার করা হয়। ফলে, এশিয়ার চোরা বাজারে এক পাউন্ড পাগলা মধুর মূল্য ৬০ ডলারেরও বেশি যা সাধারণ মধুর মূল্যের ৬ গুণ বেশি। এসব কারণেই বাজারে এই মধুর বিশেষ চাহিদা ছিলো। তবে চাহিদা এখনো আছে তবে মধু নেই! আসলে ভুল বললাম, মৌচাকে মধু ঠিকই আছে, তবে যা নেই সেটি হল এই মধু সংগ্রহকারী মৌয়াল। এই মধুটি এখন আর সংগ্রহ করা হয়না। মাউলি ধানই শেষ ব্যক্তি যিনি এই মধু শেষ বারের মতো সংগ্রহ করেছেন।  

ডেইলি বাংলাদেশ/মাহাদী/জেএমএস