Alexa হিন্দি জরুরি, তবে মাতৃভাষার বিনিময়ে নয়

ঢাকা, বুধবার   ১১ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২৭ ১৪২৬,   ১৪ রবিউস সানি ১৪৪১

হিন্দি জরুরি, তবে মাতৃভাষার বিনিময়ে নয়

 প্রকাশিত: ১৪:৩৯ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সম্প্রতি ভাষা নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন তার সারবত্তা হলো- এক রাষ্ট্র, এক ভাষা। আর সেই ভাষা হোক হিন্দি। সম্ভবত তিনি শেখেন নি যে কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বলতে নেই। 

নিজে গুজরাটি হয়ে হিন্দির স্বপক্ষে এমন কথা কেন? একেই কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা প্রয়োগ আবার তারপরে এনআরসি নিয়ে তাকে তুলোধুনো করছে সোশাল মিডিয়ায় বেঁচে থাকা বামপন্থী জীবাশ্ম এবং ক্ষমতাসীন ঘাসফুল। অথচ তিনি নির্বিকার। আবার বলে দিলেন একটি অপ্রিয় সত্যি। সত্যিটা কী?

বহুভাষী ভারতে হিন্দি মাত্র ৪৩ শতাংশের মাতৃভাষা। ১৯৫০-এর ২৬ জানুয়ারি সংবিধান বলবৎ হওয়ার ১৫ বছর পর সরকারি ভাষা হিসেবে শুধু হিন্দির প্রস্তাবে প্রবল প্রতিবাদ করেছিল তামিলনাড়ুর ডিএমকে। তাকে প্রশমিত করতে ‘সরকারি ভাষা আইন ১৯৬৩’ চালু করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। ১৯৬৭-তে আইন সংশোধনে স্পষ্ট বলা হয়েছিল— যতক্ষণ না প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় আইনসভা হিন্দিকে সরকারি ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব নিচ্ছে, ততক্ষণ ইংরেজির ব্যবহার বন্ধ করা চলবে না। আবার, এর পরের বছর ‘থ্রি ল্যাঙ্গোয়েজ ফর্মুলা’ তৈরি করল মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক। ফর্মুলা অনুসারে, সব রাজ্যের শিক্ষার্থীকে তিনটি ভাষার পাঠ নিতে হবে। হিন্দি ও ইংরেজি বাদে অহিন্দিভাষীরা শিখবে আঞ্চলিক ভাষা আর হিন্দিভাষীরা শিখবে আধুনিক ভারতীয় ভাষা। ইন্দো-এরিয়ান অ্যান্ড হিন্দি বক্তৃতামালায় সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, নেশন হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভারতের একটি বড় বাধা বহুভাষিকতা।  

ভারতে যতবার হিন্দির স্বপক্ষে কোনো রাষ্ট্রনেতা কথা বলেন তখনই রব ওঠে আঞ্চলিক ভাষার উপর যে সাঁড়াশি আক্রমণ চলছে। কারা তোলেন? বিরোধী পক্ষের নেতা ও চামচে এবং বাংলা ভাষার কিছু কবিরা।  কিন্তু লক্ষ্য করুণ বাঙ্ময় এই গোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা নিশ্চিন্তে বাণিজ্যিক স্কুলে ইংরেজি ভাষায় পাঠ গ্রহণ করছে। কবিদের ক্ষমতা আর কত দূর? এক দিকে বলশালী শক্তি সরকার বাহাদূর। অন্য দিকে কর্পোরেট দৈত্যকুল যখন আঞ্চলিক ভাষার ওপরে সাঁড়াশি আক্রমণ চালাচ্ছে তখন তারা নিশ্চুপ। রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক রাজ্য সরকার। তাদের প্রণীত ভাষাশিক্ষায় ‘ভাষাবোধ’ গড়ে উঠছে কি? সবই তো অবজেকটিভ টাইপ। বানান-ব্যাকরণের প্রশ্ন হলে এত কচকচির দরকার পড়ত না। বানান ধ্রুব নয়, কিন্তু শুদ্ধ বানান সজাগ চেতনার একটা লক্ষণ। ব্যাকরণের, বিশেষত বাক্যগঠনের সঙ্গে চিন্তা করার, চিন্তার উপকরণ সাজাবার ক্ষমতা কতটা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে এই শিক্ষা ব্যবস্থায়? সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে বানান-ব্যাকরণের ভুল মাঝেসাঝে চোখে পড়ে; ক্রমাগত পড়ে ব্যক্তি-নেতা বা পার্টি-শাখার স্লোগান-বিজ্ঞপ্তি-ইস্তাহারে। খুঁত ধরতে বাধে, কারণ বানানের ব্যাপারে বঙ্গবাসী মাত্রে নীলকণ্ঠ। নিজের বা আপনজনের নাম ঠিকভাবে লিখতে আমরা অক্ষম, অগুনতি বাস-অটো-ট্যাক্সির গাত্রলিপি সাক্ষ্য। কর্পোরেট দৈত্যকুল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্থানীয় ভাষার ছদ্মবেশে কিছু অর্থহীন পাঠ সৃষ্টি করে চলেছে। একে আটকানোর উদ্যোগ তো চোখে পড়ে না।

এককালে ভারতে ‘শিক্ষিত’ লোক মাত্রে মোটামুটি ইংরেজি জানত। আজ এক ব্যাপক শিক্ষিত শ্রেণি ও আরও ব্যাপক সাক্ষর শ্রেণি গড়ে উঠেছে যারা ইংরেজিতে অস্বচ্ছন্দ। এ দিকে সরকারি-সামাজিক-আর্থিক এমনকী সাংসারিক সব ক্ষেত্রে ভাষার আনুষ্ঠানিক ব্যবহার বেড়ে চলেছে। কিন্তু সে কোন ভাষা?  ‘হিংলিশ’- একটা কৌতুকপ্রদ জগাখিচুড়ি, কিন্তু বহুপ্রচলিত ও বর্ধিষ্ণু। হতেও পারে, এক-দু’শো বছরে তা হয়ে উঠবে উর্দুর মতো সংমিশ্রণলব্ধ, একান্ত ভারতীয় একটা স্বতন্ত্র সমৃদ্ধ ভাষা। কিন্তু সমস্যা কোথায়? বহু বাঙালিই আড্ডায়, আলোচনায় এমনকি নিজেদের বাড়িতেও বাংলা নয়, ইংরেজি বলতেই বেশি পছন্দ করেন। বেশি 'কমফোর্টেবল ফিল' করেন তারা। অফিস আদালতে বাংলা ভাষায় লেখা সরকারি কোনো নির্দেশিকা বা কোনো ঘোষণাপত্রে চোখ রাখলে, মনে হয় যেন ঊনবিংশ শতকি বাংলা পড়ছি। এখন আবার সভা সমিতিতে আমাদের রাজ্যের নেতা-নেত্রী ও মন্ত্রীদের শ্রীমুখ থেকে অশ্রুতপূর্ব বাংলায় যে বক্তৃতা, কখনো আবার ছড়া-গানের ফুলঝুরি আমাদের কর্ণপটাহকে বিদীর্ণ করে - তখন আমার সত্যি মনে হয়, ‘মাগো তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসার বদলে - কত অশান্তি, কত যন্ত্রণাই না আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে।

অথচ এরাই চিৎকারে ফাটিয়ে ফেলে সোশাল মিডিয়া বাঙলা ভাষার ক্ষেত্রে কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ করে। অথচ এদের বোধের মধ্যেই নেই যে একটা সজীব ভাষা সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে আরো প্রভাবশালী কোনো ভাষার সংস্পর্শে এলে তলিয়ে যায় না, বরং কিছু-কিছু আত্মসাৎ করে শক্তি ও সমৃদ্ধির তাগিদে: কেবল শব্দভাণ্ডার নয়, হয়তো ব্যাকরণ বা প্রয়োগের উপকরণ। আরবি-ফার্সি থেকে তো বটেই, বাংলা এ ভাবে প্রচুর গ্রহণ করেছে পর্তুগিজ থেকে, করেছে ও করছে ইংরেজি ও ইদানীংকালে হিন্দি থেকে। এ ভাবেই আমাদের জীবৎকালে ‘সঙ্গে’র জায়গায় এসেছে ‘সাথে’, ‘তরকারি’র জায়গায় ‘সবজি’; খবর ‘শেয়ার’ করা হচ্ছে; ‘পেশ’ হচ্ছে কোনও পণ্য; পথে-ঘাটে বচসা বাধছে ‘আগে’-র প্রচলিত আর অধুনা হিন্দিলব্ধ অর্থ নিয়ে। এটা হিন্দি বা অন্য ভাষার আগ্রাসন নয়।

অনেকেই মনে করেন সরকারি পরিভাষার পিছনে একই মানসিকতা: ওটাও এক শক্তিশালী উচ্চবর্গের ভাষা, প্রজাদের সঙ্গে আদানপ্রদানে প্রভুদের অভ্যস্ত ভাষা। তাই তা চাপানোর প্রচেষ্টা হয়। কিন্তু অমিত শাহ নিজে গুজরাটি। তার কেন এমন বদখেয়াল হল? আসলে এই দলটির চড়া মাত্রার জাতীয়তাবোধ সবার পক্ষে হজম করা সম্ভব নয়। ইতিহাস জ্ঞান বেশ দুর্বল হলেও এদের সাথে কেউ কেউ হিটলারের তুলনা করেন। কিন্তু ভুলে যান যে আজাদ হিন্দ বাহিনীর মূল ভাষা ছিল হিন্দি। নেতাজি সুভাষের দেশপ্রেম তারা ভুলে গেছেন। আপত্তির জায়গাটা আরো নির্দিষ্ট হওয়া উচিৎ। ভারতে কাজের ভাষা যখন হিন্দি তখন তৃতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি শিখলে আখেরে ক্ষতিটা কোথায়? মাতৃভাষা শিক্ষার সাথে সংঘাতই বা কোথায়? অনেকেই বলবেন যে আবার একটা ভাষা চাপিয়ে দেয়া কেন? এখন তো সময় পালটে গেছে। আগে এক ফরাসী ও এক ভারতীয়র দেখা হলে দুজনে তৃতীয় ভাষা ইংরেজির সাহায্য নিত। কিন্তু এখন অবস্থা বদলে গেছে। কম্পিউটারে অনুবাদ প্রযুক্তি এবং 'ভয়েস রিকগনিজশন টেকনোলজি' বা 'কণ্ঠ সনাক্তকরণ প্রযুক্তির' উদ্ভাবনের ফলে এর দুজনেই এখন কিন্তু তাদের নিজেদের ভাষাতেই কথা বলতে পারেন। যন্ত্র বা প্রযুক্তি সেটা সঙ্গে সঙ্গে অন্যজনকে অনুবাদ করে বলে দেবে। তাহলে নতুন করে হিন্দি শিখব কেন? ক্যালকুলেটর আসার আগে আমাদের নামতা মুখস্থ রাখতে হত যে কারণে এটাও সে কারণে শেখার প্রয়োজন। গণিত, স্ট্যাটিসটিক্স, কম্পিউটর সায়েন্সে পৃথিবীব্যাপী ভারতীয়দের একটা জায়গা আছে তাদের সাবেক পদ্ধতিতে শিক্ষা গ্রহণের কারণে।

ভারত ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। কে কোথায় চাকরি পাবেন বা নিজেকে থিতু করবেন কেউ জানেন না। বাঙালিদের অবস্থা তো আরো সরেস। ব্যাঙ্গালোর, দিল্লি, হায়েদ্রাবাদ, মুম্বাইয়ের দিকে ছুটছেন সবাই। সেক্ষেত্রে হিন্দি ভাষাই যোগাযোগের মাধ্যম। এই যে দেশীয় রসায়ন পালটে যাচ্ছে তা অস্বীকার করি কী করে? বলিউডে যেমন সারা ভারতের মানুষের একমাত্র যোগাযোগ ও নিজেকে প্রকাশের মাধ্যম হিন্দি ভাষা সেখানে কেউ কখনও বলে– নাহ , হিন্দি ভাষা নিপাত যাক? সমস্ত ভারতকে এক সুতোয় গ্রন্থিত করেছে এই ইন্ডাস্ট্রি যাদের প্রভাব ভারতীয় জনসমাজে সবচেয়ে বেশী। এই ইন্ডাস্ট্রির অবাঙালি মানুষরা কষ্ট করে হিন্দি শিখেছেন। অনেকেই সফল হয়ে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন আবার অনেক আঞ্চলিক মহানায়ক ফিরে এসেছেন হিন্দি দুর্বলতায়।

শঙ্খ ঘোষের কবিতা – ‘আয় আরো হাতে হাত রেখে/ আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কথাটাই নিজস্ব ভঙ্গিতে বলেছেন অমিত শাহ। অনেকেই বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে আনছেন। পশ্চিম পাকিস্তান বাংলাকে মর্যাদা না দিয়ে উর্দুকে চাপিয়ে দিয়েছিল। সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনে পর্যবসিত হয়। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের পিছনে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের আর্থিক অসাম্য বড় কারণ ছিল। একটি জাতিকে ভিন্ন জাতির দাবিয়ে রাখার প্রবণতা ছিল। না হলে যে জিন্নাহ নিজে উর্দু বলতে পারতেন না, ইংরেজিতে ভাষণ দিতেন, অনুবাদক নিয়ে ঘুরতেন, তার এই প্রবণতা ছিল কেন? বাংলাদেশে শহিদ হতে হয়েছিল বহু মানুষকে। সৃষ্টি হয়েছিল দেশ। বহু মানুষের জীবনের ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে। বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশের বেশি মানুষ কথা বলেন একটি ভাষাতে। সেটা বাংলা। তাকে অসম্মান করার ভাবনা পশ্চিম পাকিস্তানকে টেনে ফেলেছিল গভীর গাড্ডায়। তার সঙ্গে ভারতের ভাষাচিত্রের কোনো সাযুয্য আছে? ভারতে হিন্দি কখনই চাপানো হয়নি। তবে হিন্দি সব ভারতীয়র শেখা উচিত একথা দলমত নির্বিশেষে অনেক নেতাই বলেছেন। বর্তমানে সারা ভারত ঘুরে এলে যে কেউ টের পাবেন হিন্দি শেখা জরুরি। অবশ্যই তা মাতৃভাষা শিক্ষার বিনিময়ে নয়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর