Alexa হিজরি সনের জানা অজানা ইতিহাস

ঢাকা, সোমবার   ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ১ ১৪২৬,   ১৬ মুহররম ১৪৪১

Akash

হিজরি সনের জানা অজানা ইতিহাস

হাবীবুল্লাহ সিরাজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:০০ ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৯:০২ ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

কালের চাকা ঘুরে আমাদের মাঝে আবারো উপস্থিত হিজরি সন ১৪৪১। আরবি বর্ষপঞ্জি তথা হিজরি সনের প্রথম মাস মুহাররম। সেই মতে পহেলা মুহাররম হলো হিজরি নববর্ষ। 

হিজরি সূচনাবর্ষ তথা নববর্ষ মুসলিম উম্মাহর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হিজরি সনের সনের সঙ্গে মিশে আছে মুসলামনদের অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনা। এই হিজরি সন আমাদেরকে হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। আজকের নিবন্ধে আমরা হিজরি সনের সঙ্গে মিশে আছে এমন কিছু ইতিহাস জানবো। বিশেষ করে হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের করুন কাহিনী। 

আরো পড়ুন>>> অমুসলিম ভাইদের দাওয়াত দেয়ার গুরুত্ব

হিজরি শব্দটি এসেছে আরবি - শব্দ থেকে। এর অর্থ হলো ত্যাগ করা, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া। ইসলামের ইতিহাসে হিজরত বলে- আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম পবিত্র মক্কা নগরী ত্যাগ করে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য মদিনায় চলে যাওয়াকেই। শুধুমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মক্কা থেকে মদিনায় চলে যাওয়াকেই শুধু হিজরত বলে না। রাসূলুল্লাহ এর হিজরতের আগেও হিজরতের ঘটনা ঘটেছে। 

তাওহিদের ইতিহাস বলে যুগে যুগে প্রায় সকল নবী-রাসূলগণকেই নিজ জন্মভূমি ত্যাগ করে অন্য স্থানে যেতে হয়েছে। কেননা নবী-রাসূলগণের বিরোধিতা করা, তাদের অপবাদ দেয়া, গালমন্দ করা, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করা পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন কোনো ঘটনা নয়। সর্বশেষ মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আল্লাহ তায়ালার এই নির্দেশ প্রাপ্ত হন যে-

فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ

‘অতএব , আপনি  যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা প্রকাশ্যে প্রচার করুন’ (সূরাতুল হিজর, আয়াত : ৯৪)। 

তখন থেকেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার অধিবাসীদের মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য আহ্বান করতে লাগলেন। এই আহ্বানে অল্পকজন সাড়া দিয়েছে।  অন্যরা বিরোধিতা করেছে।  শুধু তাই নয়,  তার ওপর অকথ্য জুলুম নির্যাতন চালিয়েছে। দিয়েছে অবরোধ। কেউ কেউ আবার প্রাচুর্যেও  লোভ দেখাতে লাগল। তাদের সেই শত নির্যাতন ও  লোভকে পদদলিত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দৃঢ় প্রত্যয়ের  সঙ্গে ঘোষণা করলেন, ‘আমার এক হাতে চাঁদ আরেক হাতে যদি সূর্যও এনে  দাও তবুও আল্লাহ আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা পালন করা থেকে কোনো অবস্থাতেই আমি বিরত হব না।’

এমনিভাবে যখন দিন দিন নির্যাতন আর সহ্যের সীমা রইল না। এদিকে মক্কা থেকে এক এক করে সাহাবিগণ হিজরত করে মদীনায় চলে যেতে লাগল- তখন মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। আল্লাহ তায়ালার সেই নির্দেশে তিনি স্বীয় বিছানায় হজরত আলী (রাযি.)-কে রেখে অতি সন্তর্পণে গৃহ ত্যাগ করেন এবং তাঁর প্রিয় সাহাবী হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি)-কে সঙ্গী করে মক্কা থেকে ২৯৬ মাইল দূরে অবস্থিত মদীনার অভিমুখে রওনা হন। যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশে ওনার আগেই অনেক সাহাবীগণ একে একে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন।

দীর্ঘ ২৯৬ মাইল পথ পেরিয়ে ১৫ দিন পর মদীনার উপকণ্ঠ কুবা নামক মহল্লায় এসে পৌঁছলে হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হলো,

طلع البدرعلينا من ثنيات الوداع
وجب الشكرعلينا ما دعى لله داع
أيها المبعوث فينا جئت بالأمر المطاع
جئت شرفت المدينة مرحباً يا خير داع

এই হিজরত ইসলাম প্রচার ও প্রসারে যে অনন্য ভূমিকা রেখেছে তার কোনো তুলনাই হয় না। ইসলামের সুদূরপ্রসারী দিগন্ত উন্মোচিত করেছি  কেবলমাত্র এই হিজরত।

হিজরতের গুরুত্ব বলতে গিয়ে ইতিহাসবিদ যোসেফ হেল বলেন, It is a turning point in the life and work of the Prophet. The great tunring point in the historz of Islam.

তাই মুসলিম উম্মাহর জীবনে হিজরত একটি অতীব গুরুত্ববহ অধ্যায়। কেননা এই হিজরত থেকেই হিজরি সনের উদ্ভব হয়েছে।

হিজরি সন যেভাবে শুরু- 
খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রাযি.) এর শাসনামলে ১৬ হিজরি সনে, প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরী (রাযি.) ইরাক এবং কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একবার হজরত খলিফা ওমর (রাযি.) এর দরবারে হজরত আবু মুসা আশআরী (রাযি.) চিঠি লিখলেন যে, ‘আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কিংবা নির্দেশ সম্বলিত যেসব চিঠি আমাদের নিকট পৌঁছে তাতে দিন, মাস, কাল, তারিখ ইত্যাদি না থাকায় কোন চিঠি কোন দিনে তা নির্ণয় করা আমাদের জন্য সম্ভব হয় না। এতে করে আমাদেরকে নির্দেশ কার্যকর করতে খুব কষ্ট করতে হয়। অনেক সময় আমরা বিব্রতবোধ করি চিঠির ধারাবাহিকতা না পেয়ে।

হজরত আবু মুসা আশআরী (রাযি.) এর চিঠি পেয়ে হজরত ওমর (রাযি.) এ মর্মে পরামর্শ সভার আহ্বান করেন যে, এখন থেকে একটি ইসলামি তারিখ প্রবর্তন করতে হবে। উক্ত পরামর্শ সভায় হজরত উসমান (রাযি.) হজরত আলী (রাযি.)-সহ গণমান্য অনেক সাহাবি উপস্থিত ছিলেন।
উপস্থিত সকলের পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে ওই সভায় হজরত ওমর (রাযি.) সিদ্ধান্ত দেন ইসলামি সন প্রবর্তনের। তবে কোন মাস থেকে বর্ষের সূচনা করা হবে তা নিয়ে পরস্পরের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়।

কেউ মত পোষণ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের মাস রবিউল আউয়াল থেকে বর্ষ শুরু। আবার কেউ কেউ মত পোষণ করেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের মাস থেকে বর্ষ শুরু করা হোক। অন্যান্যের মতে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিজরতের মাস থেকে বর্ষ শুরু করা হোক। এভাবে বিভিন্ন মতামত আলোচিত হওয়ার পর হজরত ওমর (রাযি.) বললেন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের মাস থেকে হিজরি সনের গণনা শুরু করা যাবে না। কারণ খ্রিস্টান সম্প্রদায় হজরত ঈসা (আ.) এর জন্মের মাস থেকেই খ্রিস্টাব্দের গণনা শুরু করেছিল। তাই রাসূলের জন্মের মাস থেকে সূচনা করা হলে খ্রিস্টানদের সঙ্গে সাদৃশ্য হয়ে যাবে, যা মুসলমানদের জন্য পরিতাজ্য। আবার হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  এর ওফাত দিবসের মাস থেকেও গণনা শুরু করা যাবে না, কারণ এতে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুব্যথা আমাদের মাঝে বারবার উত্থিত হবে। পাশাপাশি অজ্ঞ যুগের মৃত্যুর শোক পালনের ইসলাম বিরোধী একটি কুপ্রথারই পুনরুজ্জীবন করা হবে।

হজরত ওমর (রাযি.) এর এই বক্তব্যকে হজরত উসমান (রাযি.) ও হজরত আলী (রাযি.) একবাক্যে সমর্থন করেন। অতপর বহু চিন্তাভাবনার পর হজরত ওমর ফারুক (রাযি.) হিজরতের বছর থেকেই ইসলামী দিনপঞ্জি গণনার সিদ্ধান্ত নেন।

হিজরি সনের প্রবর্তক:
হিজরি সনের প্রবর্তক হজরত ওমর ফারুক (রাযি.), হজরত আবু মুসা আশআরি (রাযি.), হজরত আলী (রা.) এবং হজরত ওসমান (রাযি.) এর যৌথ প্রচেষ্টায় ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে হিজরি সনের প্রচলন শুরু হয়। যা বর্তমান বিশ্বের প্রায় দেড়শ’ কোটি মুসলমানের নিকট অতীব মর্যাদাপূর্ণ এক আমানত।

হিজরি সনের গুরুত্ব:
হিজরি সন ও তারিখের গুরুত্ব মুসলিম জীবনে অনস্বীকার্য। কেননা হিজরি সন এমন একটি সন, যার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিশ্ব মুসলিমের তাহজিব-তামাদ্দুন। এছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনাবলি যেনন- বদর, খন্দক, তাবুক প্রভৃতি যুদ্ধ, রাজ্যজয় এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাবলি হিজরি সনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সম্পৃক্ত ইসলামের বিভিন্ন বিধি-বিধানও। যেমন- রোজা, হজ, ঈদ, শবে বরাত, শবে কদর, শবে মিরাজসহ ধর্মীয় নানান আচার-অনুষ্ঠান। হাদিসে এসেছে- ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং চাঁদ দেখে রোজা ভাঙ্গ। (মুসলিম, ১/৩৪৭)

তাই মুসলমানদের ধর্মীয় ইবাদতের ক্ষেত্রে হিজরি সনের আবশ্যকীয়তা রয়েছে। কোনো অবস্থাতেই এই সনের প্রতি অবহেলা করা যাবে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে