Alexa হিজরি বর্ষের সূচনা: খুলে দেখবেন কী বদ নেকির হালখাতা?

ঢাকা, সোমবার   ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ১ ১৪২৬,   ১৬ মুহররম ১৪৪১

Akash

হিজরি বর্ষের সূচনা: খুলে দেখবেন কী বদ নেকির হালখাতা?

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৪৮ ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২০:৫১ ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

দেখতে দেখতে আমাদের থেকে আরো একটি হিজরি বছর বিদায় নিল। ১৪৪০ হিজরি শেষ, শুরু হয়েছে ১৪৪১ হিজরি। নবী করিম (সা.) এর হিজরতের সময়কে হিজরি সন গণনার ক্ষেত্রে মূল রাখা হয়েছে। 

হিজরি সনের প্রথম মাস নির্ধারণ করা হয়েছে মহররমকে। ঐতিহাসিক বিভিন্ন কারণে মহররম মাস মুসলমানদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসের দশ তারিখ হচ্ছে ফজিলতপূর্ণ একটি দিন। হাদিস শরিফে এসেছে প্রত্যেক আদম সন্তান সকালে উঠে ব্যবসা শুরু করে। ব্যবসায় ব্যক্তি কখনো নিজেকে লাভবান করে আবার কখনো সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লাভবান হওয়ার ফল হিসেবে সে জান্নাত পাবে আর ক্ষতির খেসারত দিতে হবে নিজকে জাহান্নামে পুড়িয়ে। অর্থাৎ মুসলমান যা করে তা হয়ত তার দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ বয়ে আনবে বা তাকে লোকসানের মধ্যে ফেলবে। তাই মুসলমান কখনো গাফেল থাকতে পারে না।

মুমিনের প্রতিটি ক্ষণ ব্যয় হবে হিসেবের ভেতরে। হিসেবের বাইরে কোনো সময় অপব্যয় হবে না। হিসেব হবে লাভ ও ক্ষতির। কথায় আছে ‘আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হিসেব নেয়ার আগে তোমরা নিজেরা নিজেদের কর্মের হিসেব নাও।’ এই উক্তিটিকে হাদিস মনে করা হয়। কিন্তু গ্রহণযোগ্য মতে তা হাদিস নয়। গত এক বছরে আমাদের কর্মের পর্যালোচনা হওয়া দরকার। নিজকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেখা দরকার বিগত বছরের কর্মের কারণে আমি আসামি না নিরাপরাধী। এতে গত বছর আমার লাভ-ক্ষতি, অর্জন ও ব্যর্থতার দিকগুলো বেরিয়ে আসবে। অতিতের ভুলগুলোকে শুধরিয়ে সামনে দ্বীনের পথে চলা সহজ হবে। আল কোরআনও সে ব্যাপারে মানুষকে নির্দেশ দিয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা  বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেক ব্যক্তির ভেবে দেখা উচিত আগামীর জন্য সে কী সংগ্রহ করেছে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলো। তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই সবিশেষ অবগত। (সূরা হাশর-১৮) আমরা সকলেই ভালো করে জানি কোনো ব্যবসায়ীই নিজের ব্যবসার হিসাব সারা বছরে একবার করে না। বরং সব সময় দিন শেষে সে হিসাব মিলায়। তাই হিসাবের খাতা বছরে একদিন নয় বরং প্রতিদিন খোলা দরকার।
সাধারণ জাগতিক বিষয়ে দেখা যায়, নতুন বছরে তার নতুনভাবে পথ চলার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করে। ব্যবসায়ী ব্যবসাকে নতুনভাবে সাজায়। কর্মজীবি নতুন কিছু করার উদ্যেগী হয়। প্রতিটি মুসলমানেরও উচিত বছরের শুরতে জীবনকে নতুনভাবে চালানোর জন্য দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করা। জীবনকে নতুন করে সাজানোর উদ্যেগ গ্র্রহণ করা। আজ বিশ্ব মুসলিম সমস্যায় জর্জরিত। কোথাও শান্তির সুবাতাস বইছে না। এর জন্য মুসলমানদের অশৃঙ্খল জীবন যাপনই প্রধান কারণ।

রাসূল (সা.) হাদিসে কুদসিতে বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি হচ্ছি বাদশাদের বাদশা। সকল বাদশাদের হৃদয় আমার কব্জায়। যখন সাধারণ মানুষ আমার অনুগত হয়ে চলে তখন আমি বাদশাদের হৃদয়কে তাদের দিকে রহমত, প্রেম ভালোবাসার সঙ্গে ফিরিয়ে দেই। আর তারা আমার অবাধ্য হলে বাদশাদের মনকে ওদের দিকে গোস্সা ও ক্ষুব্ধ অবস্থায় ফিরিয়ে দেই। যার দরুণ তারা প্রজাদের ওপর জুলুম করতে থাকে।’ তাই হিজরি নববর্ষের শুরুতে জীবন পরিবর্তনের দীপ্ত শপথ গ্রহণ করতে হবে।

মানুষ মূল্যবান দুটি সম্পদের ব্যাপারে খুবই উদাসিন। এক হচ্ছে সময়, অন্যটি শারীরক সুস্থতা।’ উল্লেখিত বাক্যটি নবী করিম (সা.) এর একটি উক্তি। ‘সময় ও নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না।’ বড় মনীষীদের সময়ের গুরুত্ব নিয়ে এ রকম আরো বহু উক্তি রয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সময়ের হেফাজত ও গুরুত্বের ব্যাপারে হেদায়েত দিয়েছেন। বিভিন্ন বিধান দিয়ে তা আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট সময় সীমা বেধে দিয়েছেন। যেমন নামাজের ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় নামাজ মুমিনগণের ওপর তার নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ’। তদ্রুপ রোজা, জাকাত, হজ, কোরবানি ও সদকাতুল ফিতরসহ বহু বিধান নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করতে হয়। এর দ্বারা শিক্ষা দেয়া হয়েছে সময়ের কাজ সময়েই করতে হয়। সময়ের ব্যাপারে গাফলতিকে খুবই খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। 

এক হাদিসে এসেছে ‘ওই নামাজ মুনাফিকের, ওই নামাজ মুনাফিকের, ওই নামাজ মুনাফিকের। এভাবে তিনবার বলার পর রাসূল (সা.) বলেন, যে নির্দিষ্ট সময় নামাজ আদায় না করে বসে থাকে। যখন সময় যায় যায় তখন ওঠে কনোমতে নামাজ আদায় করে নেয়, ওই নামাজই মুনাফিকের নামাজ। উলামায়ে কেরাম বলেন, ‘নামাজ তার নির্ধারিত সময়ে ফরজ’ এ কথা বিষেশভাবে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে নামাজের নির্ধারিত সময় পাঁচটি। কোনো ব্যক্তি দৈনিক নির্ধারিত সময়ে পাঁচবার নামাজ আদায়ে অভ্যস্ত হলে তার অন্যান্য কাজগুলোও সময়ের ভেতর চলে আসবে। উক্ত আলোচনার সার কথা হচ্ছে, ইসলামের বিধিবিধানগুলো দ্বারাও মানুষের সময়ের গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে। তাই এই মহামূল্যবান সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো উচিত। উপলব্ধিতে থাকা উচিত আমার মূল্যবান সম্পদের একটি অংশ ফুরিয়ে যাচ্ছে, যে সম্পদ কোনো কিছু দিয়েই কেনা যায় না।

ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে ভালোকাজ সামান্য হলেও তাকে তুচ্ছ মনে না করা। খারাপ দৃষ্টিতে না দেখা। সামান্য সামান্য আমল জমতে জমতে এক সময় এর দ্বারাই বান্দার আমলের পাল্লা ভারি হয়ে যায়। আরবি হিসেবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু বিষয় আছে যেগুলোকে সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে খুবই সামান্য। কিন্তু যত্নের সঙ্গে এগুলোর হেফাজত হলে মুমিনের ইহকাল ও পরকাল সুন্দর হবে। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কতজন বর্তমানে আরবি মাসের হিসেব রাখি? প্রতি মাসের মাঝের তিন দিনে রোজা রাখার বিশেষ ফজিলতের কথা এসেছে। কিন্তু আমরা জানিও না মাসের মধ্যবর্তী সময় কখন আসছে আর কখন যাচ্ছে। ইসলামের বহু বিধান আরবি বর্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। জাকাতের হিসাব শুরু হয় আরবি মাস অনুযায়ী। হজের কার্যক্রম পরিচালনা হয় আরবি মাসে। রমজান মাসের রোজা, শবে বরাত, জিলহজের প্রথম দশক, সদকাতুল ফিতরসহ আরো অনেক কিছু আরবি তারিখ অনুযায়ী সম্পন্ন হয়ে থাকে। ইসলামের ইতিহাস আলোচনার দ্বারা মুমিনের ঈমান তাজা হয়। যদিও তা আলোচনার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। তবুও আমাদের দেশে সাধারণত ইতিহাসে যখন যা সংঘটিত হয়েছিল ওই সময়গুলোতেই তা বিশেষভাবে আলোচনা হয়। কেউ যদি আরবি মাস সম্পর্কে বেখবর থাকে তাহলে সে কখনো আলোচনার প্রসঙ্গ ধরতে পারবে না। আর সে আলোচনা শুনে তৃপ্তিও পাবে না। তাই মুসলিম উম্মাহর জন্য আরবি মাসের হিসেব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ব্যাপারে বেখবর থাকা উচিত নয়।

মহাররম মাসে বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই মাসের দশ তারিখ। ঐতিহাসিকভাবে এই দিনের গুরুত্ব স্বীকৃত। ইহুদি ও খৃস্টানরাও এ দিনকে সম্মানের চোখে দেখে। হজরত মুসা (আ.) বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য এই দিনে মিসর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ইহুদি জাতি এর শোকরিয়া আদায়ার্থে এই দিনে রোজা রাখত। রাসূল (সা.) হিজরতের পর মদিনার ইহুদিদের এই আমল দেখে বলেন, আমরা হচ্ছি এর বেশি হকদার। তারপর থেকে তিনি রোজা রাখতেন এবং সাহাবাদেরকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন। তবে ইহুদীদের সঙ্গে সাদৃশ্য না হওয়ার জন্য তিনি দশ তারিখের আগে বা পরে একদিন অতিরিক্ত রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ইহুদিদের সঙ্গে মুসলমানদের ঐতিহাসিক এক যুদ্ধ এ মাসের শুরুতেই সংঘটিত হয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় যা খাইবার যুদ্ধ নামে খ্যাত। শেরে খোদা আলী (রা.) এর বীরত্বে আল্লাহ তায়ালা সে যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় দান করেন।

রাসূল (সা.) এক হাদিসে বলেছেন, আমি তোমাদেরকে পরিস্কার মাঠে রেখে যাচ্ছি, যেখানে দিন রাত সমান।’ অর্থাৎ ইসলামের সকল বিষয় সবার সামনে পরিস্কার। সময়ের পরিবর্তন দ্বীনের কোনো বিষয়কে অস্পষ্ট করতে পারবে না। তাই ইসলামে অন্ধ অনুকরণের কোনো সুযোগ নেই। তার প্রতিটি বিধান সুদৃঢ় প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। মনগড়া রসম রেওয়াজ, যার কোনো দালিলিক ভিত্তি নেই তা বেদাত হিসেবে গণ্য হয়। 

উপমহাদেশের মুসলমানদের সংস্কৃতিতে হিন্দু ও শিয়াদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। দশই মহররম বা আশুরাকে কেন্দ্র করে যা হয় তা শিয়াদের সংস্কৃতি। অনেকের ধারনা হচ্ছে আশুরার গুরুত্ব হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতকে কেন্দ্র করে। তাই এখনো গ্রাম গঞ্জের মহিলারা আশুরার দিনকে শোক দিবস হিসেবে পালন করে। তাজিয়া মিছিলে সুন্নি মুসলমানরাও অংশগ্রহণ করে। হায় হুসাইন! হায় হুসাইন! এভাবে আহাজারি করতেও দেখা যায় কোথাও কোথাও। হুসাইন (রা.) এর হত্যাকারী শিমার ও ইয়াজিদের ওপর লানত করতে থাকে। এগুলো হচ্ছে শিয়াদের রীতি।

দশই মহররমের দিন কালো পোশাক পরে শোক প্রকাশ করতে অনেককে দেখা যায়। ইসলামের বিধান হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার ফয়সালার ওপর রাজি থাকা। কোনো বিষয়ে এমন আচরণ না করা যা দ্বারা অস্থিরতা ও আল্লাহর ফয়সালার ব্যাপারে নাখোশ বুঝা যায়। কারো মৃত্যুতে কালো পোশাক পরাকে ফকিহগণ আল্লাহর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অস্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য করেছেন। তাই দশই মহররম এই গর্হিত কাজ থেকেও আমাদের বিরত থাকতে হবে।

হুসাইন (রা.) এর শাহাদাত ছিল দ্বীনের জন্য। তৎকালীন শাসকদের অন্যায় জুলুমের প্রতিবাদ ও ইসলামি শাসন ব্যবস্থাকে তার আপন অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। সেখানে তিনি একা নয় বরং পরিবারের সদস্যগণও ছিলেন। তার থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্ছার হয়ে নিজেদের অধিকার আদায় করতে হবে। সবকিছুকে নিরবে সয়ে যাওয়া হুসাইনি চেতনার পরিপন্থি। ইসলামের আদর্শের সাংঘর্ষিক। মুসলিম শরিফের এক হাদিসে নবী করিম (সা.) এর থেকে বর্ণিত হয়েছে ‘যে ব্যক্তি অন্যায় দেখে সে যেন হাত দ্বারা তা বন্ধ করে, তা সম্ভব না হলে জবান দ্বারা প্রতিবাদ করে। তাও সম্ভব না হলে অন্তর থেকে ঘৃনা করে। এটা হচ্ছে ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে