হাড় পোড়ানো ছাই দিয়েই আঁকা হয় বিখ্যাত ছবি!

ঢাকা, রোববার   ৩১ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৮ ১৪২৭,   ০৮ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

হাড় পোড়ানো ছাই দিয়েই আঁকা হয় বিখ্যাত ছবি!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:১৫ ২ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৬:৩৩ ২ জানুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বিভিন্ন আর্ট গ্যালারি আর জাদুঘরে সাজানো চিত্রকর্মগুলো দেখেছেন নিশ্চয়ই! এসব চিত্রকর্মের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য পেশাদার চিত্র সমালোচক হবার প্রয়োজন হয় না।

বোদ্ধা দর্শকরাও অনেক সময় চিত্রকর্মের অর্থ ও বার্তা খুঁজে নিতে পারেন। তবে পেশাদার চিত্র সমালোচকরা সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি একাধিক বিখ্যাত চিত্রকর্মে লুকিয়ে রাখা এমন কিছু বার্তা আবিষ্কার করেছেন। যা জানলে চমকে যাবেন তাদের মতো আপনিও। বিশ্বখ্যাত এমনই কিছু চিত্রকর্মে লুকিয়ে থাকা বার্তা বা রহস্য জেনে নিন- 

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সেলফ পোট্রেট  

সেলফ পোট্রেটঅতীতে যখন কোনো ক্যামেরা ছিল না তখন কারো ছবি তুলতে কোনো চিত্রশিল্পীর দ্বারস্ত হতে হতো। আর সেই শিল্পীরা যখন নিজের ছবি আঁকতেন তখন আয়নাই ছিল তাদের ভরসা। তারা আয়নাতে দেখে নিজেদের সেলফ পোট্রেট আঁকতেন। অতীতের বহু চিত্রশিল্পী এভাবেই তাদের সেলফ পোট্রেট এঁকে গেছেন। রেনেসাঁ যুগের কিংবদন্তী চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিও এর ব্যাতিক্রম নয়। তবে তিনি নিজের পোট্রেট কোনো ক্যানভাসে আঁকেননি। লিও তার নিজের ছবি এঁকেছিলেন ‘পাখির আকাশে উড়া’ শীর্ষক এক গবেষণাপত্রের উপরে। ১৫০৫ সালে ছবিটি তিনি লাল রঙের চক দিয়ে এঁকেছিলেন। গত দশকে এটি ইতালির এক সাংবাদিক আবিষ্কার করেন।  
 
মোনালিসা
ফ্রান্সের ল্যুভর মিউজিয়ামে সংরক্ষিত মোনালিসার এই চিত্রকর্মটির নাম শুনেনি এমন কেউ নেই নিশ্চয়ই! ১৬০০ শতকের রেনেসাঁ যুগের লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির আঁকা এ ছবিটি সারাবিশ্বের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ছবির নারীর মুখের লাস্যময় হাসি রোমাঞ্চিত করেছে সবাইকে। এমনো বলা হয়, মোনালিসার চোখ তার সামনে থাকা মানুষকে অনুসরণ করে। বিখ্যাত এই চিত্রকর্ম নিয়ে রোমাঞ্চোকর একাধিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে বিশ্ববাসী। তবে গত দশকে ফরাসি গবেষক পাচকাল কটের এক গবেষণা শিল্প বোদ্ধাদের মাঝে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। পাচকাল মূলত চিত্রকর্মের উপর শক্তিশালী আলোর প্রতিফলনকে কাজে লাগিয়ে সেটি পর্যবেক্ষণ করে। ফলে চিত্রকর্মটির নিচে কোনো আলাদা চিত্রকর্ম থাকলে তা চাক্ষুস করা যায়।

মোনালিসাএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাচকাল বহু চিত্রকর্মের নিচে লুকিয়ে থাকা এমন গুপ্ত ছবি আবিষ্কার করেছেন। কয়েক দফা মোনালিসার চিত্রকর্মটির গবেষণার আবেদন জানিয়ে ব্যর্থ হন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০০৪ সালে লুভ্যর কর্তৃপক্ষ তাকে গবেষণার অনুমতি দেয়। সেই গবেষণায়তেই বেরিয়ে আসে মোনালিসার চিত্রকর্মের আড়ালে রয়েছে আরো এক নারীর চিত্রকর্ম। সেই লুকানো নারীর ছবিটি নানাভাবে বিশ্লেষণ করার পর জানা যায়, মোনালিসা এবং ছবির নারীর বয়স এবং চেহারার অনেক অমিল রয়েছে। ছবি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই নারীর। তবে গুপ্ত ছবির নারীর বয়স মোনালিসার থেকে অনেক কম ছিল। ছবি বিশ্লেষক জানান, তাদের ধারণা শিল্পী মোনালিসার চিত্রকর্মটি করার আগে এই নারীর চিত্রকর্মটি এঁকেছিলেন। সেসময় যেহেতু একই ক্যানভাসে শিল্পীরা একাধিক ছবি আঁকতেন। তেমনই লিওনার্দোও হয়তো একই ক্যানভাসে এই দুটি চিত্রকর্ম এঁকেছিলেন।   
  
দ্য স্টারি নাইট
নেদারল্যান্ডসের চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগ তার ‘দ্য স্টারি নাইট’ শীর্ষক ছবিটি এঁকেছিলেন ১৮৮৯ সালে। তবে বিংশ শতকে এসে এই চিত্রকর্মটি নতুন করে সংবাদের শিরোনামে পরিণত হয়। আপত দৃষ্টিতে চিত্রকর্মটিতে তারকা খচিত রাতের আকাশের চিত্র ফুটে উঠেছে। তবে গত শতকের শেষ ভাগে এ ছবিটিতে লুকিয়ে থাকা এক রহস্যভেদ করেন বিজ্ঞানীরা। জেনে হয়তো আপনিও বিজ্ঞানীদের মতোই অবাক হয়ে যাবেন। এই বিজ্ঞানীরা মূলত মহাকাশ নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছিলেন। ১৯৯০ সালের পর নাসা এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি সম্মিলিতভাবে মহাকাশে হাবুল নামে একটি ট্যালিস্কোপ প্রেরণ করে। 

দ্য স্টারি নাইটএই টেলিস্কোপ ব্যবহার করে দূর দূরান্তের সব নক্ষত্রের পর্যবেক্ষণ করেন বিজ্ঞানীরা। তেমনই একটি পর্যবেক্ষণে ছায়াপথের ঘূর্ণায়মান নক্ষত্রগুলোকে কেন্দ্র করে গ্যাস ও ধূলিকণার সুবিশাল মেঘ দেখতে পান বিজ্ঞানীরা। এই মেঘগুলোর কম্পনকে টারব্যুলেন্স আখ্যা দেন তারা। এ টারব্যুলেন্সের সঙ্গে ভ্যানগকের আঁকা চিত্রকর্মের আকৃতির অদ্ভুতভাবে হুবহু মিল পেয়ে রীতিমতো চমকে ওঠেন বিজ্ঞানীরা। ভ্যানগগের ছবি আকার ধরণটি ইম্প্রেসনার ঘরানার অনেক চিত্রশিল্পী ব্যবহার করতেন। তাই বিষয়টিকে প্রথমে কাকতালীয় মনে করেছিলেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। পরবর্তী গবেষণায় টারব্যুলেন্সের সঙ্গে দ্য স্টারি নাইট চিত্রকর্মের আকৃতির গাণিতিক সাদৃশ্য খুঁজে পান তারা। স্বীকার করতেই হয় ভ্যানগগ ছিলেন ভিন্নমাত্রার প্রতিভার অধিকারী।      

দ্য ওল্ড ফিশারম্যান 
টিভাডোর কসকা সনভারি নামক হাঙ্গেরির চিত্রশিল্পীর আঁকা ওল্ড ফিশারম্যান ছবিটি দেখলেই শরীরে কাটা দেবে আপনার। ক্যানভাসে আঁকা বৃদ্ধ লোকটির মুখটি যেন কেমন অদ্ভুত। মনে হয় একজন না, দু’জনের মুখ দেখা যাচ্ছে। দুটি চেহারাকে এক করে ছবিটি একেছেন শিল্পী। চিত্রশিল্পী যেন ইচ্ছা করেই তার শিল্পকর্মে এমন ধোঁয়াশা রেখেছেন। মজার ব্যাপার হলো আসলেই এই চিত্রকর্মটি দুটি চেহারার সংমিশ্রণে আঁকা হয়েছে। 

দ্য ওল্ড ফিশারম্যান বিষয়টি বুঝতে ছবিটির মাঝ থেকে ক্যানভাসে সমকোণ করে একটি আয়না বসাতে হবে। তাহলেই দেখতে পাবেন ছবিটিতে ডানে এবং বামে দুটি চেহারার ছবি। শিল্প বোদ্ধাদের দাবি এ ছবিতে সনভারি মূলত মানুষের মাঝে লুকিয়ে থাকা শুভ এবং অশুভ শক্তির মুখ দুটি ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে অঙ্কিত এ চিত্রকর্মে অন্তর্নিহিত বার্তাটি কয়েক বছরের মধ্যে পুরোবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।  

দ্য ক্রিয়েশন অব অ্যাডাম 
মধ্যযুগ পরবর্তী রেনেসাঁ যুগে এসে মানবদেহের গঠনের ব্যাপারে কৌতূহলী ছিলেন অনেকেই। এই কৌতূহল শুধু চিকিৎসক বা জীববিজ্ঞানীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেই সময়কার বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর মাইকেল অ্যাঞ্জেলো যেমন এ বিষয়ে কৌতূহলী ছিলেন তেমনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তুলির আঁচড় কাটার ফাঁকে তিনি হাতে তুলে নিতেন মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদের ছুরি। যার ধারাবাহিকতায় মাইকেল মানবদেহ সম্পর্কে এতোটাই জ্ঞান অর্জন করেছিলেন যে তার তৈরি করা ডেভিট নামক ভাস্কর্যটিকে পুরুষের আদর্শ গঠনের ভাবা হয়। এই ভাস্কর্যের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলোর অনুপাত এতোটাই সুষম যে এখন পর্যন্ত কোনো ভাস্কর এর থেকে ভালো ভাস্কর্য তৈরি করতে পারেন নি। ডেভিটের পাশাপাশি ভ্যাটিকেন সিটির সিস্টেন চ্যাপেলির সিলিঙয়ে আঁকা দ্য ক্রিয়েশন অব অ্যাডাম চিত্রকর্মটি মাইকেল অ্যাঞ্জলোর অন্যতম সৃষ্টিগুলোর শ্রেষ্ঠ একটি সৃষ্টি।

দ্য ক্রিয়েশন অব অ্যাডাম এই ফ্রেস্কোটির সৌন্দর্য গত পাঁচশ বছরের বেশি সময় ধরে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরা উপভোগ করে আসছেন। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে যুক্তরাষ্ট্রের দু’জন নিউরোসার্জন এ চিত্রকর্মটির মধ্যে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেন। চিত্রকর্মটির ডানে যদি খেয়াল করে দেখেন, তবে বুঝতে পারবেন এটি মানবদেহের মস্তিষ্কের আকৃতির। এমনকি মস্তিষ্কে রক্ত সরবারহকারী ধমনী বোঝাতে শিল্পী সবুজ রঙের রিবন এঁকেছেন। এছাড়াও নিবিড় পর্যবেক্ষণে মস্তিষ্কের অপটিক্যাল নার্ভগুলোও চিনতে পারবেন। মার্কিন এই নিউরোসার্জনদের দাবি সত্যি হলে বলতে হবে মাইকেল অ্যাঞ্জেলো মানবদেহের জ্ঞানের ব্যাপারে তার সমসাময়িকদের তুলনায় প্রায় কয়েকশ’ বছর এগিয়ে ছিলেন।   

ব্ল্যাক স্কোয়ার 
ক্যাসামি মেলাভিসের আঁকা এই ব্ল্যাক স্কোয়ার চিত্রকর্মটি নিয়ে চিত্র সমালোচকরা দু’ভাগে ভাগ হয়েছেন। একদলের দাবি এটি মেলাভিসের মস্কোরা ছাড়া কিছুই না। তারা এও মনে করেন কালো একটি বর্গক্ষেত্র আঁকতে তেমন কোনো প্রতিভার প্রয়োজন হয় না। তবে অন্য একটি সমালোচক দল দাবি করেন এ চিত্রকর্মের মাধ্যমে মেলাভিস উত্তর আধুনিক যুগের হয়ে ওঠে বাহারী সব শিল্পকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এ বিতর্কের অবসান ঘটাতে শেষ পর্যন্ত চিত্রকর্মটির সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা আর্ট গ্যালারী ছবিটির উপর গবেষণা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। গবেষণায় মূলত এক্স-রে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করেও পরীক্ষা করেন গবেষকেরা।

ব্ল্যাক স্কোয়ার কয়েক বছরের দীর্ঘ গবেষণার পর বেরিয়ে আসে চমকপ্রদ বেশ কিছু তথ্য। প্রথমত, এ ক্যানভাসে ব্যবহৃত কালো রংটি তৈরি করা হয়েছে বিশেষ প্রক্রিয়ায়। মেলাভিস এ রংটি বানাতে খনিজ কয়লা এবং হাড় পোড়ানো ছাই ব্যবহার করেছেন। কালো রঙের প্রোলেপটির নিচে দুটি রঙিন চিত্রকর্ম রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গবেষক দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিল্প বিপ্লব পরবর্তী জলবায়ু দূষণের কারণে মানবজাতি ও শিল্পকর্মের ওপর যে হুমকির সম্মুখীন রয়েছে তার প্রতিবাদেই এই চিত্রকর্ম এঁকেছেন শিল্পী। যেখানে রঙিন চিত্রকর্মটি অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে তাই বুঝাতে চেয়েছেন তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস