Alexa ‘হাসপাতালে সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে অসুস্থ হয়ে পড়ছি’

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৪ ১৪২৬,   ১৯ মুহররম ১৪৪১

Akash

শরণখোলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

‘হাসপাতালে সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে অসুস্থ হয়ে পড়ছি’

এমাদুল হক শামীম, শরণখোলা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২১ ১৯ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ২০:১৭ ১৯ আগস্ট ২০১৯

শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

দেড় লাখ মানুষের জন্য চিকিৎসক মাত্র দুইজন। এক্স-রে মেশিনটি একযুগ আর ছয় বছর ধরে অচল ইসিজি যন্ত্র। অপারেশন থিয়েটার বন্ধ এক বছর। টেকনিশিয়ানের অভাবে আট বছর ধরে হচ্ছে না প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা। 

শিশু ওয়ার্ড তালাদ্ধ দীর্ঘদিন। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নেই পর্যাপ্ত জনবল। ভবন ও ক্যাম্পাসের সবখানেই ময়লা-আবর্জনার স্তুপ। টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগী। অনেকদিন ধরে এমন হাজারো সংকট আর অব্যবস্থাপনায় জোড়াতালি দিয়ে চলছে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।  

সূত্র বলছে, এসব সমস্যার কারণে উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে এসে চরম বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন শত শত মানুষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে এরপর মিলছে সেবা। এছাড়া, চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়ায় সারাদেশের মতো শরণখোলাতেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। 

দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে নানান সমস্যা-সংকটে জর্জরিত থাকলেও তা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই। যার কারণে কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্লিনিক ও এলাকার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন মানুষ।

হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ৫০ শয্যা বিশিষ্ট এ হাসপাতালটিতে কনসালটেন্ট গাইনি ও শিশু বিশেষজ্ঞসহ ১৩ জন চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু সেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ মাত্র একজন চিকিৎসক রয়েছেন। বাকি ১১ জন চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এছাড়া ওয়ার্ড বয় তিনজনে আছে দুইজন। পরিচ্ছন্নতা কর্মী পাঁচজনের স্থানে আছে মাত্র একজন। আয়া নেই ও প্যাথলজিস্ট নেই। এক্স-রে ১২ বছর এবং ইসিজি মেশিন ছয় বছর ধরে নষ্ট। এই দুই পদে টেকনিশিয়ানও নেই। অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) যন্ত্রপাতি থাকলেও সেখানে হয় না কোনো অপারেশন। থিয়েটারটি ব্যবহার না হওয়ায় মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হতে বসেছে। 

সম্প্রতি হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, অব্যবস্থাপনার অসংখ্য চিত্র। ভর্তি রোগীরাও জানিয়েছেন নানা অনিয়মের কথা। হাসপাতালের পুরনো ভবনের ছাদ, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। ওয়ার্ড ও ভবনের সব জায়গা স্যাঁতসেঁতে। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় নোংরা আটটি বেড। সেখানে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত আব্দুল্লাহ (নয় মাস), সাইমুন (আট মাস) নামে দুই শিশু এবং রওশন আরা নামে এক নারী ভর্তি রয়েছেন।

ওই ওয়ার্ডে চারটি ফ্যান থাকলেও চলছে মাত্র দুটি। ছয়টি বাতির জ্বলে একটি। দুটি মহিলা ওয়ার্ডে ২৩টি বেড তা ময়লাযুক্ত। নয়টি ফ্যানের মধ্যে সচল পাঁচটি এবং ১১টি বাতির সাতটিই অকেজো। টয়লেটের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে ওয়ার্ড জুড়ে।
  
নতুন ভবনের চিত্র আরো ভয়াবহ। তিন তলায় পুরুষ ওয়ার্ডে ১৯টি বেড এবং চারটি কেবিন। তিনটি টয়লেটের মধ্যে একটি থাকলেও অন্য দুটি ব্যবহারের অনুপোযোগী। মলমূত্র ভরে উপচে পড়ছে। ভেতরে স্যালাইনের প্যাকেট, ইনজেকশনের সিরিঞ্জসহ বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা বোঝাই। সেখানে ১০টি ফ্যানের সচল চারটি এবং ১৬টি বাতির জ্বলে মাত্র চারটি। ভবনের তিন তলা এবং ছাদে উঠতে গিয়ে সিঁড়ি ও আশপাশে দেখা যায় ভয়াবহ অবস্থা।

সিঁড়ির ধাপ ও মেঝেতে কালো রঙয়ের পঁচা পানি কত বছর ধরে জমে আছে তা বোঝার উপায় নেই। সেই পঁচা পানির মধ্যে শত শত সিগারেটের অংশ, স্যালাইন ও দিয়াশলাইয়ের পোড়া কাঠিসহ ময়লা আবর্জনায় পা ফেলার জায়গাটুকুও ফাঁকা নেই। তার মধ্যে মশা ও অন্যান্য কীট কিলবিল করছে। সেখান থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।

অপরদিকে, অপরিষ্কার ড্রেন, সেপটিক ট্যাঙ্কের দুর্গন্ধে নাকে রুমাল দিয়ে ঢুকতে হয় হাসপাতালে। সবখানেই ময়লা আর চিকিৎসা বর্জ্যের স্তুপ। নানা প্রজাতির আগাছা জন্মে ঝোপঝাড়ে পরিণত হয়েছে পুরো ক্যাম্পাস।

মহিলা ওয়ার্ডে গিয়ে কথা হয় উপজেলার গোলবুনিয়া গ্রামের আসমা বেগমের সঙ্গে। তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হাফিজুর নামে তার দুই মাসের শিশুকে নিয়ে ভর্তি আছেন। তার অভিযোগ চিকিৎসক নিয়মিত আসেন না। সন্তানের কোনো উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসক, নার্সদের জানালে তারা রোগী নিয়ে খুলনা যেতে বলেন। নার্সরাও রোগীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না।

নূরজাহান ডলি নামে এক নারী স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হলেও কোনো চিকিৎসা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন। ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, ফ্যান, লাইট না থাকায় প্রচণ্ড গরমে থাকা দায়। রাতে অন্ধকারে থাকতে হয়। বিছানা থেকে দুর্গন্ধ আসে। এসব সমস্যার কথা বলার পরেও কেউ কোনো গুরুত্ব দেয় না।

পুরুষ ওয়ার্ডের এক নম্বর বেডের রাজৈর গ্রামের আমির হোসেন ও পাঁচ নম্বর বেডের জিলবুনিয়া গ্রামের আলমগীর হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সুস্থ হওয়ার চেয়ে আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছি। মল-মূত্রের দুর্গন্ধে দম আটকে আসে। ভাত-পানি খাওয়া যায় না।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য কমিটির সদস্য ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. হাসানুজ্জামান পারভেজ বলেন, আগে হাসপাতালের পরিবেশ এতোটা খারাপ ছিল না। ছোটখাটো অপারেশন ও সিজার খুবই কম খরচে করা হতো। এতে এলাকার গরিব অসহায় মানুষের অনেক উপকার হতো। তাই দেড় লাখ মানুষের কথা ভেবে দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে সরকারের কাছে দাবি জানাই।

এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সফিকুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের (ওটি)সহ গুরুত্বপূর্ণ সব বিভাগ চালু হওয়া জরুরি। চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল বরাদ্দ হলে ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষরা বিনামূল্যে সেবা পেয়ে উপকৃত হবেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জামাল মিয়া শোভন জানান, রোগীদের সব অভিযোগ সঠিক নয়। এতো কম সংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে একটা উপজেলার মানুষের কাঙ্খিত সেবা দেয়া সম্ভব নয়। তবে, স্থানীয় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করে এ পর্যন্ত ১০ জন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। এছাড়া চিকিৎসকসহ জনবল সংকট থাকায় চিকিৎসা-সেবা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে।

বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. জি.কে. শামসুজ্জামান বলেন, হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে সবাইকে নির্দেশ দিয়েছি। তাছাড়া চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল সংকট নিরসনে চেষ্টা চলছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম