হাসপাতালে লাশের স্তূপ, নিচ্ছে না স্বজনেরা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৭ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৪ ১৪২৭,   ১৬ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

হাসপাতালে লাশের স্তূপ, নিচ্ছে না স্বজনেরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:১৮ ১ জুন ২০২০   আপডেট: ২২:২১ ১ জুন ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ ভারতে মহামারি করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। করোনার তাণ্ডবে ভেঙ্গে পড়েছে দেশটির স্বাস্থ্যখাত। সম্প্রতি দেশটির করোনা মহামারির প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠা মহারাষ্ট্রের মুম্বাইসহ অন্যান্য শহরের হাসপাতালগুলোতে দেখা গেছে ভয়াবহ দৃশ্য।

হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে সারি সারি মরদেহ পড়ে আছে। শয্যা সঙ্কটে রোগীদের মেঝেতে ঘুমানোর নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। করোনাভাইরাস আক্রান্ত কিনা সেব্যাপারে প্রমাণ দেখাতে না পারায় বিনা-চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন রোগীরা। প্রত্যেকদিন নতুন নতুন ওয়ার্ড করা হচ্ছে। কিন্তু সন্ধ্যা হতে না হতেই সেসব ওয়ার্ড করোনা রোগীতে ভরে যাচ্ছে।

হাসপাতালের কর্মীরা দিনরাত ২৪ ঘণ্টা করোনা রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ায় জনবলের অভাবে অন্যান্য রোগীদের চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়ে পড়েছে।

সেন্ট্রাল মুম্বাইয়ের সরকারি কিং এডওয়ার্ড মেমোরিয়াল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক সাদ আহমেদ বলেন, আমরা প্রত্যেকদিন নতুন নতুন ওয়ার্ড চালু করছি। কিন্তু দিনের শেষে কোভিড-১৯ রোগী দিয়ে সেগুলো পূর্ণ হচ্ছে। বর্তমানে এটা অত্যন্ত খারাপ অবস্থা। বর্তমানে সব ওয়ার্ডই কোভিড-১৯ ওয়ার্ড এবং ধারণক্ষমতার পুরোটাই রোগী দিয়ে পরিপূর্ণ।

প্রায় দুই মাসের কঠোর লকডাউন সত্ত্বেও ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত মুম্বাইয়ে করোনার ভয়াবহ প্রকোপ শুরু হয়েছে। দেশটির মোট করোনা রোগী এক চতুর্থাংশই মুম্বাইয়ের; বর্তমানে ৪৭ হাজারের বেশি মানুষ সেখানে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। যেখানে পুরো ভারতে করোনা আক্রান্ত ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৯১।

করোনাভাইরাস মহামারির প্রাথমিক কেন্দ্র নিউইয়র্ক এবং ইউরোপ হয়ে উঠলেও বর্তমানে তা ঘুরছে ব্রাজিল এবং ভারতের দিকে। দুবর্ল স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো এবং নিম্নমানের জীবনযাত্রার কারণে করোনাভাইরাসের উর্বর জমি হয়ে উঠছে ভারত। গত বৃহস্পতিবার করোনায় মৃতের সংখ্যায় চীনকে ছাড়িয়ে গেছে ভারত।

গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুম্বাইয়ের সরকারি লোকমান্য তিলক হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে করোনাভাইরাসে মৃতদের দেহ পড়ে আছে। পাশের শয্যায় করোনা রোগীরা। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ডিনকে সরিয়ে দেয়। সম্প্রতি মুম্বাইয়ের কিং এডওয়ার্ড মেমোরিয়াল হাসপাতালের ওয়ার্ডে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

কিং এডওয়ার্ড মেমোরিয়াল হাসপাতালের নার্স মাধুরী রামদাস গৈকার বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে মরদেহ স্তুপ হয়েছে। কারণ অনেক পরিবার সংক্রমণের ভয়ে মরদেহ নিতে অস্বীকার করেছে। ভাইরাসটির কারণে চারপাশে তীব্র ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে; যা ভারতে নতুন একটি অস্পৃশ্য শ্রেণি তৈরি করেছে। সংক্রমতি রোগী অথবা তাদের পরিবারকে প্রতিবেশি অথবা বাসার মালিকরা বের করে দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, আমরা মরদেহের সব কাগজপত্র প্রস্তুত করে রেখেছি। কিন্তু সেগুলো কেউই নিয়ে যাচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুম্বাইয়ের সরকারি একটি হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, অন্যান্য সময়ের তুলনায় হাসপাতালের ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে দ্বিগুণ রোগী আসছে। একটি অক্সিজেন স্টেশন থেকে বহু রোগীকে সরবরাহ করা হচ্ছে। হাসপাতালের একটি শয্যা কয়েকজন রোগী ভাগাভাগি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

একই অবস্থা দেশটির রাজধানী দিল্লির হাসপাতালগুলোরও। দিল্লির লোকনায়ক জয় প্রকাশ নারায়ণ (এলএনজেপি) হাসপাতালের মর্গে রয়েছে করোনায় আক্রান্তদের লাশ। একের উপর আরেক লাশ রাখা হচ্ছে। কিন্তু স্বজনদের কেউই সেই লাশ নিতে আসছেন না। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে মর্গের বাইরের করিডোরে লাশগুলো স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছে।

দিল্লির এই হাসপাতালে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের প্রথম থেকেই চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শুধুমাত্র কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য কাজ করছে এই হাসপাতাল। এখানকার মর্গে রয়েছে ১০৮টি লাশ। কাজেই লাশ রাখার জায়গা অনেক আগে থেকেই পূর্ণ। তার মধ্যে প্রতিদিন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। এর ফলে দিন দিন লাশও বাড়ছে।

অন্যদিকে, করোনার ভয়ে লাশগুলো স্বজনেরাও নিতে আসছে না। সেগুলো সৎকার করা যাচ্ছে না উপযুক্ত লোকের অভাবে। ফলে মাটিতেই স্তূপ করে করোনায় মৃতদের লাশ ফেলে রাখতে বাধ্য হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এর আগে ভারতের কলকাতার এমআর বাঙ্গুর হাসপাতালের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, করোনা ওয়ার্ডে পড়ে থাকা সারি সারি লাশের পাশে চলছে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা। অথচ কেউ সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না সেই লাশগুলো।

দেশটিতে করোনাভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এর চেয়েও আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডেইলি বাংলাদেশ/মাহাদী