ঢাকা, শুক্রবার   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ৯ ১৪২৫,   ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০

হানি ট্র্যাপ: গুপ্তচরের সেরা ফাঁদ!

নাসীব উর রহমান

 প্রকাশিত: ১৪:৪৮ ৫ আগস্ট ২০১৮   আপডেট: ১৪:৪৮ ৫ আগস্ট ২০১৮

কভার, ছলনা ও প্ররোচনার মুখোশে ঢাকা গুপ্তচরবৃত্তি

কভার, ছলনা ও প্ররোচনার মুখোশে ঢাকা গুপ্তচরবৃত্তি

পাঠক,  আপনি কি মাসুদ রানা বা জেমস বন্ডের ভক্ত? স্বপ্ন দেখেন যদি দেশ মাতৃকার টানে হতে পারতেন গুপ্তচর ! বিশ্বে হাজারো সরকারি ও সামরিক প্রতিষ্ঠান আছে যারা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে যুক্ত। যারা নিজদেশের স্বার্থে ন্যায়-অন্যায় বোধের ঊর্ধ্বে উঠে দেশসেবায় নিজের সর্বোচ্চ বাজি ধরে।

এমন কিছু মানুষকে নিয়েই আজ আমাদের লেখা। তবে লেখাটি পড়ার আগে পাঠক কে বলবো এক অজ্ঞাত গুপ্তচরের উদ্ধৃতি,- “ তোমরা যারা মনে করছো আমাদের জীবন জেমস বন্ডের মত, তবে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, জীবন কোন সিনেমা নয়, আমরা চাইলেই কাউকে মুহূর্তে হত্যা করতে পারি না।  আমাদের সবসময় আউট-অফ-রেডার (সকলের দৃষ্টির আড়ালে) থাকতে হয়।

রাজী এক মেয়ে, স্ত্রী ও গুপ্তচরের উপাখ্যান  

আসলে কেমন হয় একজন গুপ্তচরের দ্বৈত জীবন? পাঠক এই সম্পর্কে ধারণা নিতে হলে দেখতে পারেন সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া আলিয়া ভাট অভিনিত হিন্দি চলচিত্র, ’রাজি’ সত্যি বলছি খুব কাছে থেকে একজন গুপ্তচরের জীবন ও হানি ট্র্যাপ সম্পর্কে প্রচ্ছন্ন ধারণা লাভ করতে পারবেন।  

মাতাহারি, হানিট্র্যাপের কিংবদন্তি

হানি-ট্র্যাপ বা মধু-ফাঁদ কে গুপ্তচর বৃত্তির সবচেয়ে সফল কৌশল হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এই কৌশল প্রক্রিয়ায় একজোন আকর্ষণীয় ব্যক্তিকে অন্য কোন ব্যক্তিকে হাত করার কাজে লাগানো হয়।

এই ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় ব্যক্তিটি তার লক্ষ্য ব্যক্তিটির সাথে ধীরে ধীরে নৈকট্য গড়ে তোলে। একসময় ব্যক্তিটি আকর্ষণীয় ব্যক্তিটির প্রতি অতিমাত্রায় দূর্বল হয়ে পড়ে। এরপরেই করা হয় আসল শিকার। আকর্ষণীয় ব্যক্তি তার প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেই, সাধারণ ভাষায় সকলের মধ্যে থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। তাকে কোন ভাবেই আর খুঁজে বের করা সম্ভব হয়ে উঠে না।  কারণ সে যে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলো ছদ্ম পরিচয়ে। যুক্তরাজ্যের আন্তঃরাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এমআই ফাইভ, ১৪ পাতা বিশিষ্ট এক বিশেষ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে যা শত শত ব্রিটিশ ব্যাংক, ব্যবসায় এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিতরণ করা হয়েছ ।" রিপোর্টটির শিরোনাম ছিল "The threat of Chinese Espionage।" বিখ্যাত ব্রিটিশ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন অনেক উদাহরণই সামনে নিয়ে আসে যেখানে পশ্চিমা ব্যবসায়ীদেরকে যৌনতার ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। মার্কিন সাবেক গুপ্তচর, এডওয়ার্ড স্নোডেনও, নিশ্চিত করেছেন যে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা হ্যাকার, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, সন্দেহভাজন অপরাধী ও অস্ত্র বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে হানিট্র্যাপ সহ অন্যান্য প্ররোচনামূলক কূটকৌশল প্রয়োগ করে থাকে। অন্যান্য ব্যবহৃত কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার ভাইরাস এর প্রয়োগ, সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের উপর গুপ্তচরবৃত্তি, ফোন এবং কম্পিউটার জ্যামিং, এবং হানি ট্র্যাপ ব্যবহার করে যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে ফেলা।

পাঠক, চলুন, ঠিক এমনই একটি ঘটনা জানা যাক।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ২০১৪ সালের মার্চ মাস। বেঞ্জামিন বিশপ, একজন ৫৯ বছর বয়সী, মার্কিন নাগরিক যিনি ছিলেন একজন প্রথম সারির প্রতিরক্ষা ঠিকাদার, বিয়ে করে ২৭ বছর বয়সী এক চীনা নাগরিককে। চীনা মেয়েটির প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিলো মার্কিনী ভিসা অর্জন। বিশপ এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগ উঠে যাতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। সম্পর্ক টি তিন বছর ধরে চলেছিল এবং

এর ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গোপনীয় দলিল ও স্পর্শকাতর তথ্য চীনের হাতে চলে যায়। শুধু চীন যে এই কৌশল খাটিয়েছে তা কিন্তু নয়। সময় সময় ব্রিটিশ, মার্কিনী, ইসরায়েলীরা সহ অন্যান্য রাষ্ট্রও হানি ট্র্যাপ কৌশল খাটিয়েছে। এমনকি আধুনিক ব্যবসায় পরিচালনার ক্ষেত্রে তথ্য চুরিতে হানি ট্র্যাপ কৌশল ব্যবহারের নজীর রয়েছে।

একতারিনা গ্রাসিমোভা:

একতারিনা গ্রাসিমোভা যে কাতিয়া নামেও পরিচিত, একজন নারী সহচর এবং রাশিয়ান গুপ্তচর যিনি পুতিনের সবচেয়ে বড় সমালোচকদেরকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। প্রতিপক্ষদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার জন্য ‘গ্রাসিমোভা’ বিখ্যাত। তার সাম্প্রতিক বিজয়ের নাম , সাংবাদিক ও ব্যঙ্গ রচয়িতা  ভিক্টর শেডারোভিচ । শেডারোভিচ ছিলেন ৫২ বছর বয়সী বিবাহিত পিতা, যিনি তার স্ত্রী’র সাথে প্রতারণার অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছিলেন এবং একই সাথে পুতিনের বিরুদ্ধে তাকে ফাঁদে ফেলার অভিযোগ আনেন। তিনি বলেছিলেন, "পুতিনের প্রশাসন ব্যাপক কৌতুকের সাথে অভিযোগের কথা শোনে, এবং  কোনরূপ অস্বীকার করা ছাড়াই পুনঃউত্তর দেয়"। তিনি আরও বলেন পুরো ব্যপারটি ছিলো আইনত অবৈধ।  এই বিবৃতিটি প্রকাশ পাবার কতিপয় ঘন্টা পূর্বে ইন্টারনেটে শেডারোভিচের সাথে কাতিয়ার 

মস্কোর একটি  ফ্ল্যাটে ভিডিও ফুটেজ মুক্তি পায়। একই ভিডিওতে দু’জন চরম জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ আলেকজান্ডার পোটকিন এবং এডুয়ার্ড লিমনোভের এক্স-রেট ভিডিও ক্লিপ সম্প্রচার করা হয়। পরক্ষণেই গুজব রটে সোভিয়েত যুগের KGB কৌশলগুলি প্রত্যাবর্তন করছে। মিডিয়ার কাছে শেডারোভিচের উত্তর ছিল, "আমি কাতিয়ার সাথে রাত্রি যাপন করেছি - যদিও খুব আনন্দিত ছিলাম না, কারণ কাতিয়া আনন্দময় মুহূর্তেও বিছানায় ছিলো অসার ও গেস্টাপোর (নাৎসি গুপ্ত পুলিশ) মতো বিরক্তিকর"।

একতারিনা গ্রাসিমোভা

অ্যানা চ্যাপম্যানঃ

রাশিয়ান ফেডারেশন এর বাহ্যিক গোয়েন্দা সংস্থা, এসভিআর এর অধীন অবৈধ গুপ্তচর চক্রের জন্য কাজ করার সন্দেহের উপর ভিত্তি করে, ২০১০ সালের জুনে রাশিয়ান নাগরিক অ্যানা চ্যাপম্যান কে গ্রেফতার করা হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকদের মধ্যে উচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে অ্যানা যুক্তরাষ্ট্রে সফল মডেল এবং অভিনেত্রী হিসেবে কর্মজীবন সুরু করেছিলো।এমন কি এক উচ্চপদস্থ ক্যাবিনেট অফিসারের সাথেও অ্যানা বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলো। অ্যানার লক্ষ্য ছিল তাদের রাশিয়ান কমরেডের হয়ে গোপনীয় ও সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ ও পাচার করা। চ্যাপম্যান ইউএস অ্যাটর্নি জেনারেলকে নোটিশ না দিয়ে একটি বিদেশী সরকারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ২০১০ সালের জুলাই মাসে বন্দি হন। পরবর্তীতে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

অ্যানা চ্যাপম্যান

জেরেমি ওলফেন্ডেনঃ

প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারী কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে পাতা হানি-ট্র্যাপ যে নারী হবে তা কিন্তু ঠিক নয়। জেরেমি ওয়েলেফেন্ডেন ছিলেন একজন সমকামী এবং লন্ডন ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রতিনিধি যে ১৯৬০ সালে মস্কোতে কর্মরত ছিলো। দুর্ভাগ্যবশত, কেজিবি ওলফেন্ডেন সম্পর্কে অবগত ছিলো। তিনি রাশিয়ান ভাষা জানতেন তাও কেজিবি জানতো। কেজিবি  এক আকর্ষণীয় পুরুষ যে রাশিয়ান মিনিস্ট্রি অফ ফরেন ট্রেডে কর্মরত ছিল, তাকে ওলফেন্ডেন এর সাথে সম্পর্ক গড়ে স্পর্শকাতর ছবি তোলার নির্দেশ দেয়। সে ছবি দিয়ে কেজিবি জেরেমি ওলফেন্ডেন ব্ল্যাকমেইল করে মস্কোয় অবস্থানরত পশ্চিমা কমিউনিটির উপর গুপ্তচরবৃত্তি চালায়। যখন ওলফেন্ডেন তাকে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা লন্ডনের সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস কে জানায়, তখন লন্ডন তাকে ডাবল হানিট্র্যাপ এজেন্ট হিসেবে কাজে লাগায়। ওয়লফেন্ডেন লন্ডন থেকে রাশিয়ায় ফেরত গিয়ে ডাবল এজেন্ট হিসেবে কাজ করা শুরু করে। এসময় তার সাথে ব্রিটিশ গোয়েন্দা, গাই বার্গেসের মত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করেন, যারা ক্যাম্বডেন পাঁচের সদস্য ছিলেন। ক্যাম্বডেন পাঁচ ছিলো গুপ্তচরদের গড়ে তোলা চক্র যারা কমিউনিস্ট কার্যকলাপে নানা ভাবে অবদান রাখে।

জেরেমি ওলফেন্ডেন

কাতিয়া জামাতিভিত্তরঃ

২০১১ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে  কাতিয়া জামাতিভিত্তর গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে, একজন সংসদীয় সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। লিবারেল ডেমোক্র্যাট, মাইক হ্যানকক, যিনি প্রতিরক্ষা কমিটির নির্বাচিত সদস্য ছিলেন, গ্রেফতারের পূর্বে কাতিয়া তার সহকারী হিসেবে ৩ বছর কর্মরত ছিলেন।  হ্যানকক রাশিয়াতে নিয়মিত ভ্রমনের সময় এক সাক্ষাত্কারে কাতিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হন ও তাকে সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বসেন। নিয়োগকর্তার অজ্ঞাতসারে কাতিয়া তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার সাথে সম্পর্কিত স্পর্শকাতর তথ্যের সনাধান পান। তার মধ্যে কিছু তথ্য অতি গোপনীয় পরমাণু গবেষণা ও অস্ত্রের সাথেও সম্পর্কিত ছিলো। আবার কিছু তথ্য জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার সাথে জড়িত ছিলো। হ্যানকক এর কাছে সাবমেরিনের অবস্থান, দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রাগারের তালিকা এবং নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডের নকশা সম্পর্কিত গোপনীয় নথিও ছিল। কাতিয়া শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়, মুক্তি পাওয়ার পিছনে সে যে নির্দোষ ছিল এমন কোন কারণ ছিল না, বরং তার বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

কাতিয়া জামাতিভিত্তর

ক্রিস্টিন কেলারঃ

ক্রিস্টিন কেলার ১৯৬০ সালের একজন জনপ্রিয় ব্রিটিশ আইটি-গার্ল ছিল" এবং বিবাহিত ব্রিটিশ সংসদ সদস্য এবং যুদ্ধকালীন রাজ্য সচিব, জন প্রফুমোর প্রেমিকা ছিলো। জন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্মিলিত ভাবে ক্রূজ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা প্রণয়নে নিয়োজিত ছিলেন যার লক্ষ্য ছিলো জার্মানি। ক্রিস্টিন লন্ডনে সোভিয়েত অ্যাটাশে ইয়েভগনি ইভানভের উপপত্নী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। অবশেষে, যখন মিডিয়াতে প্রোফোর সাথে ক্রিস্টিনের পরকিয়ার খবর ছড়িয়ে পরে, তখন হানি ট্র্যাপ ও গুপ্তচর বৃত্তির গুজব ছড়িয়ে পড়ে। ক্রিস্টিন কি ইভানভ দ্বারা প্ররোচিত হয়ে প্রফুমোর উপর গুপ্তচরবৃত্তি করেছিলো? এমনটি ধারণা করা হলেও এর স্বপক্ষে কোন তথ্য পাওয়া যায় নি। প্রফুমোকে মিথ্যে বলায় ও তথ্য গোপন করার দায়ে হাউস অফ কমন্স থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ইভানভ কে মস্কোতে ফেরত পাঠানো হয়। রাশিয়ায় ফিরে ইসামোভ পুরো পরিস্থিতিটিকে উপহাস করে বলেছিলেন, "এটি মনে করা নিতান্তই পাগলামি যে ক্রিস্টিন কোন রাতে বিছানায় জন প্রফুমো কে জিজ্ঞাসা করছেন, ' প্রিয়তম, কখন ক্রূজ মিসাইলগুলো জার্মানিতে নামছে?' "কি নিদারুন পরিহাস!

ইভানভ,ক্রিস্টিন ও জন

শুনতে খুবই রোমাঞ্চকর, কিন্তু গুপ্তচরের জীবনে কতটুকু সত্য আর কতটুকু ধোঁয়াশা, তা সে নিজেও বলতে পারবে কি !

আজ এই পর্যন্তই। ভবিষ্যতে আবারো ফিরবো নতুন কোন লেখা নিয়ে। ততদিন আমাদের সাথেই থাকুন।  

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ