Alexa হাজিগণের জীবনের পথচলা নতুনভাবে শুরু হোক!

ঢাকা, শনিবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৬ ১৪২৬,   ২১ মুহররম ১৪৪১

Akash

হাজিগণের জীবনের পথচলা নতুনভাবে শুরু হোক!

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৩৪ ২৪ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৯:১৮ ২৪ আগস্ট ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ইসলামের বিধি-বিধানগুলোর গুরুত্ব ও মর্যাদা সমান নয়। উপকার, ত্যাগ, কোরবানি  ও সময়ের বিবেচনায় একটি বিধান আরেকটি থেকে শ্রেষ্ঠ হতে পারে। 

সেদিক বিবেচনায় বলা যায় এক দিক থেকে হজ ইসলামের অন্যান্য বিধান যেমন- নামাজ, রোজা ও জাকাত থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হজের প্রস্তুতি, সামান ও খরচ অনেক বেশি। তা আদায়ের জন্য ব্যক্তিকে হতে হয় উচ্চমনোবল সম্পন্ন। 

যারা দুর্বল মনের অধিকারী, অর্থের লোভ যাদের প্রবল তাদের দ্বারা কখনো হজ করা সম্ভব নয়। সময়ের বিষয়টিও হজের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যকোনো ইবাদতের জন্য এত লম্বা সময় ব্যয় করতে হয় না যতটুকু হজে ব্যয় করতে হয়। এই সময়ে পরিবার, আত্মীয়স্বজন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। শারীরিক দিক থেকেও সুস্থ ও সবল থাকা সহীহ-শুদ্ধভাবে হজ আদায়ের জন্য জরুরি।
 
অতিশয়বৃদ্ধ কখনো হজের সফরের হিম্মত করতে পারবে না। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে হজ না করতে পারলে এ বছর আর হজ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া হজের মাসগুলোকে আল্লাহ তায়ালা সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন। যার দরুণ এ মাসগুলোতে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ। এর উদ্দেশ হচ্ছে হাজি সাহেবরা যেন নিরাপত্তার সঙ্গে হজে যেতে পারে। এ সকল দিকে লক্ষ করে বলা যায় হজ দ্বীনের অন্যান্য বিধান থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম।

সামাজিক জীবনেও হজের গুরুত্ব ভিন্ন। সমাজে হাজি পরিচয়ে কেউ পরিচিত হলে তার প্রতি অন্যদের শ্রদ্ধা, উৎসাহ ও প্রেম থাকে অন্যরকম। হাজিবাড়ি এলাকার সকলের পরিচিত। পর্দা-পোশিদার ব্যাপারেও তারা অন্যদের থেকে ভিন্ন। অন্যদের এ নেক ধারনা রক্ষা করার জন্য হাজি সাহেবরাও কঠোর শৃঙ্খলা মেনে জীবন যাপন করেন। অন্যদের থেকে কোনো অন্যায়কে যতটুকু খারাপ বিবেচনা করা হয়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি খারাপ বিবেচনা করা হয় হাজিদের কোনো খারাপ আচরণ-অন্যায়কে। যে পরিবারে একজন হাজি থাকেন সে পরিবার তাকে নিয়ে গর্ববোধ করেন। আমরা ছোট সময় দেখেছি যারা হজ করে এসেছেন তারা জীবনের বাকি সময় দ্বীনের ফিকিরেই ব্যয় করেছেন। মানুষের দৃষ্টিতে হজ করার পর জাগতিক কোনো চিন্তা ছিল বহু বড় সামাজিক অন্যায়। যদিও এ চিন্তা ছিল ভুল।

হজের গুরুত্ব বুঝে হজ করলে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও নিজের সংশোধনই ব্যক্তির একমাত্র লক্ষ উদ্দেশ হবে। আমল ওইটি উপকারী যা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নিজের সংশোধনের জন্য হয়। এর বাইরে আমলের কোনো অস্তিত্য নেই। যদিও তা অনেক অর্থ, সময় ও শক্তি ব্যয় করে আদায় করা হয়। তাই হজের নিয়তের সময়ই উদ্দেশ ঠিক করা চাই। সমাজের অবনতি আজ এত হয়েছে যে, রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, এলাকার মাতাব্বার বনা, মসজিদ কমিটির সভাপতির পদ লাভ করার জন্য অনেকে হজের সফরের ইরাদা করেন। এই অবস্থাকে তো রাসূল (সা.) কিয়ামতের আলামত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ফেতনার যুগ, যা কিয়ামতের আগের সময়কাল। সে যুগের পরিচয় দিতে গিয়ে রাসূল (সা.) বলেন, ‘মানুষ নিজের দ্বীনদারিকে দুনিয়ার বিনিময়ে বিক্রি করে দেবে।’ তাই এলাকায় হাজি হিসেবে নিজের পরিচয় দেয়া বা হজের বিভিন্ন ঘটনা লোকদেরকে শুনিয়ে নিজের হজের জানান দেয়া থেকে বিরত থাকা চাই। এগুলোর দ্বারা হজের আধ্যাত্মিক শক্তি হ্রাস পেয়ে যায়। বরং সদা চেষ্টা করা হজের বরকত কীভাবে ধরে রাখা যায়।

যখন হাজি সাহেবগণ দেশে ফিরে আসেন তখন তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোও মুসলমানদের দ্বীনি কর্তব্য। তাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের কাছে নেক দোয়ার আবেদন করা। হাদিসে এসেছে হাজিগণ ক্ষমাপ্রাপ্ত বান্দা হিসেবে হজ থেকে ফিরে আসেন। হাদিসের শব্দ হচ্ছে ‘যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করবে। সেখানে কাউকে গালি দেবে না এবং কোনো গোনাহের কাজে লিপ্ত হবে না। ওই ব্যক্তি হজ থেকে এমন পাক পবিত্র হয়ে ফিরে আসবে যেমন সন্তান জন্মের সময় পাক পবিত্র থাকে।’

যারা নিষ্পাপ বান্দা আল্লাহ তায়ালা তাদের দোয়া কবুল করেন। বিধায় নবী করিম (সা.) হাজিদের কাছে গোনাহ মাফের দোয়ার আবেদনের কথা বলেছেন। হাদিসটি হজরত ইবনে ওমর (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত। নবী করিম (সা.) বলেন, যখন হাজিদের সঙ্গে সাক্ষাত হয় তাকে সালাম দাও, মোসাহাফা কর। এবং তার কাছে তোমার গোনাহ মাফের দোয়ার জন্য আবেদন কর। এবং দোয়া চাওয়াটা যেন ঘরে প্রবেশের আগে হয়। (তার কাছে দোয়া চাওয়ার কারণ হচ্ছে) সে এখন ক্ষমাপ্রাপ্ত বান্দা (যার দরুন আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া এখন কবুল করবেন)। (মুসনাদে আহমদ ও মেশকাত)। এখানে হাজি সাহেব ঘরে প্রবেশের আগে তার কাছে দোয়া চাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে অন্যান্য বর্ণনা দ্বারা প্রমাণীত যে, ঘরে প্রবেশের পরেও তার কাছে দোয়া চাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে কতদিন পর্যন্ত দোয়া চাওয়া যাবে সে ব্যাপারে বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে স্পষ্ট কথা হচ্ছে, নিষ্পাপ হওয়ার কারণে যেহেতু দোয়া চাওয়ার কথা বলা হয়েছে তাহলে যতদিন তার এই অবস্থা বাকি থাকবে ততদিনই দোয়া চাইতে কোন সমস্যা নেই। তবে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি দোয়া চাওয়া। কারণ দিন যত যাবে হজের পবিত্রতা ও ব্যক্তির আমল দুর্বল হতে থাকবে। অন্যদিকে বদ আমলের পাল্লা ভারি হতে থাকবে। তাই দ্রুত দোয়া চাওয়া।

বর্তমান সময়ে হজের ব্যবস্থাপনা অনেক সুন্দর। আগের মানুষেরা পায়ে হেটে হজ করতে যেত। তারপর আসলো নৌকা বা জাহাজে করে হজে যাওয়ার যুগ। তখন সময় লাগত ছয় মাস থেকে একবছর। জাহাজেই থাকা খাওয়া সম্পন্ন করতে হত। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায় কত কষ্টের ছিল সে সফর। পূর্ণ একটা বছর ছোট একটা জায়গায় পানির ওপর ভাসমান থেকে হজের সফর আমরা চিন্তা করেই ভয় পাই। আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতে বর্তমানে হজ করা অনেক সহজ। যাতায়াতের জন্য রয়েছে দ্রতগতি সম্পন্ন বিমান। এয়ারপোর্টে যেন কষ্ট করতে না হয়, সে জন্য রয়েছে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত হাজিক্যাম্প। সামান্য রাস্তা তাও যাতায়াতের জন্য এসি বাস। তারপরও সামান্য কষ্ট হতে পারে। বা প্রত্যাশার তোলনায় সুযোগ সুবিধা কিছুটা কম হতে পারে। কিন্তু সফর যেহেতু মাওলার দরবারে তাই এগুলোকে তুচ্ছ মনে করতে হবে।

দেশে এসে এগুলো লোকদের কাছে বলে বেড়ানো পরিহার করে চলতে হবে। এগুলোর ক্ষতি বহু। যেমন দুর্বল মনের মানুষের এগুলো শুনে হজে যাওয়ার হিম্মত ছেড়ে দিতে পারে। অনেক সময় যতটুকু হয় তারচেয়ে বানিয়ে বেশি বলা হয়। যা সরাসরি মিথ্যা। এখন যেহেতু বিভিন্ন হজ ট্রাভেল্স হাজিদের আনা নেয়ার কাজ করেন তাই কখনো কখনো তাদের ব্যাপারে গিবতের মতো অতিখারাপ কাজে লিপ্ত হয়ে যায়। তাই কষ্ট বা অভিযোগের গল্প মানুষের সামনে না বলাও হজের আদবের মধ্যে গন্য হবে।

হজ আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সম্মেলন। সেখানে খোদা প্রেমে নিজেদের জীবন যৌবন কোরবান করে দিয়েছেন এমন লাখো লাখো বান্দার সমাগম হয়। তাছাড়া আল্লাহ তায়ালার মনোনীত দ্বীন ইসলামের বড় বড় প্রতীকগুলো সরাসরি দেখার সৌভাগ্য লাভ হয়। সেখানে আল্লাহর ঘর বাইতুল্লাহ বিদ্যমান। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জায়গা হিসেবে যা বিবেচিত। জান্নাতের পাথর হজরে আসওয়াদ, মাকামে ইব্রাহিম ও আল্লাহর কুদরতের বিশেষ নিদর্শন জমজম কূপ বিদ্যমান। ঈমানের সামান্য ঝলকও যার ভেতর আছে, এগুলো দেখার দ্বারা তার ঈমান অবশ্যই বৃদ্ধি পাবে। জযবা তৈরি হবে নেক আমলের। তাই হজের আগের ও পরের জীবনের মাঝে পার্থক্য থাকতে হবে। আগের চেয়ে হজের পরের আমল মান ও পরিমানগত দিক থেকে ভালো হওয়া চাই। 

নবীর প্রতি ভালোবাসা দরুদ বৃদ্ধি করা চাই। দুনিয়ার প্রতি অনাগ্রহ ও আখেরাতের প্রতি আকর্ষণও বাড়াতে হবে। উলামায়ে কেরাম এগুলোকে হজ কবুলের আলামত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যার জীবনে হজের পরে কোনো পরিবর্তন নেই তার শেষ পরিণতির ব্যাপারে বুযূর্গগণ আশংকা পেশ করেছেন। তাই  আমাদের হজের সফর থেকে জীবন পরিবর্তনের নিয়ত করতে হবে। অসৎ অন্যায় সকল কাজ ত্যাগ করতে হবে। তাওহিদ ও একত্ববাদের  ইবরাহিমি চেতনাকে শানিত করতে হবে।

ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। মুসলমান হিসেবে সফল হতে হলে পূর্ণাঙ্গ দ্বীনকে মেনে চলতে হবে। ইসলামের রঙ্গে রাঙ্গাতে হবে জীবন। কিছু মেনে, কিছু ছেড়ে কোথাও সফল হওয়া যাবে না। ইহকালেও নয়, নয় পরকালেও। এর পরিণতিতে দুনিয়ায় ভোগ করতে হবে লানত। আর আখেরাতে রয়েছে কঠোর শাস্তি। আল কোরআনে বলা হয়েছে ‘তবে কী তোমরা কিতাবের কিছু অংশকে মেনে চলো এবং কিছু অংশকে অস্বীকার কর? অতএব তোমাদের মধ্যে যারা এ কাজ করে ওদের জন্য দুনিয়ার জীবনে রয়েছে লানত আর কিয়ামত দিবসে ওদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে কঠিনতম আজাবের দিকে। আর আল্লাহ তায়ালা বেখবর নন তোমাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে।’ (সূরা: বাকারা, আয়াত: ৮৫)। 

ইসলামকে সত্য মেনে নেয়ার পরও যদি পদস্খলন হয় তাহলে এর জন্য কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। বড় পদস্খলন হচ্ছে দ্বীনের আংশিককে জীবনে বাস্তবায়ন করা। আল্লাহ তায়ালা দ্বীনের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশের কথা বলেছেন। বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামে প্রবেশ কর পরিপূর্ণরূপে। এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ  করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।’ (সূরা: বাকারা, আয়াত: ২০৮)।

শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরনের প্রসঙ্গ এখানে আনার উদ্দেশ হচ্ছে, শয়তান আল্লাহর তায়ালার সকল বিধানকে অমান্য করেছিল না। বরং সে সব মেনে নিয়ে শুধুমাত্র একটা বিধান পালন করতে অস্বীকার করেছিল। তারপরও সে বিতাড়িত। তো বান্দাদের মাঝে যারা দ্বীনের আংশিক মানবে আর আংশিক অস্বীকার করবে কেমন যেন সে শয়তানের অনুসরন করল। তাই শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরনের প্রসঙ্গ তোলা হলো। দ্বীন মানে শুধু নামাজ, রোজা, হজ জাকাত নয়। ইবাদত, চিন্তা চেতনা, সভ্যতা সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতেও দ্বীনের উপস্থিতি জরুরি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে