হাজার বছর ধরে দেশে দেশে যেভাবে করোনার মতো ভাইরাসের আদান-প্রদান

ঢাকা, শনিবার   ০৪ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২১ ১৪২৬,   ১০ শা'বান ১৪৪১

Akash

হাজার বছর ধরে দেশে দেশে যেভাবে করোনার মতো ভাইরাসের আদান-প্রদান

ডেস্ক নিউজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২৩:৪৩ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ২৩:৫৩ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

যুদ্ধ, দাঙ্গা-হাঙ্গামার ভয় বাদ দিয়ে পুরো বিশ্ব কাঁপছে করোনাভাইরাসের আতঙ্কে। চীনের কয়েকটি প্রদেশে এটি ধারণ করেছে মহামারির আকার। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বে। আর এর ভয়াবহতা মানুষের জীবন-যাপনের ধরন, খাদ্যাভ্যাস সবকিছুই দিচ্ছে বদলে। যে মানুষটা কুকুর, বিড়াল, ইদুর, বাদুড়, সিদ্ধ, আধা সিদ্ধ কিংবা কাঁচা সবকিছুই গপাগপ খেয়ে সাবাড় করতো, সেও এখন কিছু মুখে তোলার আগে দুবার ভাবছে যে খাবারটা স্বাস্থ্যকর কিনা। এমনকি করোনার আতঙ্কে অনেকেই ছাড়তে বসেছে চাইনিজ খাবারও।

করোনা ভাইরাস এমন একটি সংক্রামক ভাইরাস যা এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে ছড়ায়নি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যে ধরনের করোনাভাইরাস থেকে সার্স ও মার্স ভাইরাসের জন্ম হয়েছিল এবং এখন নতুন করে যে ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দিয়েছে সেগুলোর কোনোটির উৎপত্তি মানুষ থেকে হয়নি। বরং এসবের জন্ম হয়েছে প্রাণী থেকে। 

ধারণা করা হয় আজ থেকে চার হাজার বছর আগে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৫০ লাখ। যা আমাদের আজকের ঢাকা শহরের জনসংখ্যা থেকেও অনেক কম। খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ সালে অর্থাৎ আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ কোটি। দ্বিতীয় শতকে এসে দ্বিগুণ হয়েছে; অর্থাৎ ২০ কোটি। আমাদের আজকের  ২০০০ সালে এসে হয়েছে ৭০০ কোটি। যে কোনো প্রাণীর তুলনায় এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিহার যে পরিমাণ ঘনবসতি, নগরায়ন আর সভ্যতার জগাখিচুড়ি ঘটিয়েছে তাতে পৃথিবী জুড়ে রোগবালাই ছড়িয়ে যাওয়াটাই বেশ স্বাভাবিক। 

যখন থেকে মানুষ জাহাজে করে সমুদ্র পাড়ি দিতে শিখলো তখন থেকেই মানব সভ্যতায় বিরাট এক আপদের সূচনা হলো। তার আগে ভৌগলিকভাবে আলাদা মানুষের সমাজগুলোর রোগবালাই ভিন্ন ভিন্ন ছিলো। যেমন, ইউরোপের রোগবালাই ছিল এক রকম আবার আমেরিকা মহাদেশের রোগের ধরন ছিলো ভিন্ন রকম। 

১৪৯৩ সালে আমেরিকা মহাদেশে প্রথম সোয়াইন ফ্লু বা শুকরবাহিত সর্দিজ্বর মহামারি রূপে দেখা দেয়। ভাইরাসটি দখলদার কলম্বাসের জাহাজে করে যে শুকরগুলোকে আমেরিকায় আনা হয়েছিল, সেখান থেকেই এই মহামারি সূচনা হয় যা ইতিহাসে নিউ ওয়ার্ল্ড মহামারি বলে পরিচিত। আবার ১৫১৮ সালে আরাওয়াক ও হিসপানিওয়ালার প্রায় অর্ধেক মানুষ মারা যায় দখলদারদের আগমনের সঙ্গে গুটিবসন্ত চলে আসায়। 

ভিনদেশি রোগের সংক্রমণের কারণে আজকের দক্ষিণ আমেরিকাকেও চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। স্পেনীয় দখলদার কর্তেসের মাধ্যমে গুটিবসন্ত মেক্সিকোতে ছড়ায় ১৫২১ সালে। সঙ্গে করে গুটিবসন্ত নিয়ে আসায় সেই সভ্যতার ৩ লাখ মানুষ মারা যায় অচিরেই। অন্যদিকে দশ বছর পরে আরেক স্পেনীয় দখলদার পিজারো ইনকাদের দখল করতে গেলে একই জিনিস ঘটে। আসলে গুটিবসন্ত তার অভিযানের আগেভাগেই পথ চলছিলো পেরুর দিকে। ফলে নিজেদের হাতে হত্যা করে হাত নোঙরা করার কাজটা করতে হয়নি তাকে; যা আগেভাগেই করে দিয়েছিলো এই রোগ। 

এরপর একে একে আসে সর্দিজ্বর, হাম, ও টাইফাস জ্বরের মহামারী। অনেক বছর পরে মেক্সিকো এবং আন্দিজ কিছুটা সামলে নিলেও ব্রাজিলের জনসংখ্যা প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যায়। ফলে ভয়াবহ জনসংখ্যার অভাব দেখা দেয়। জনসংখ্যার এ ঘাটতি পূরণে স্পেনীয় ও পর্তুগিজরা আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ধরে নিয়ে আসে দাস। এ দাসরা তাদের সঙ্গে করে আমেরিকায় নিয়ে আসে ম্যালেরিয়া ওপীতজ্বর। আফ্রিকা মহাদেশ ম্যালেরিয়ার আঁতুড়ঘর হওয়াতে সেখানকার বেশ কিছু মানুষ প্রাকৃতিকভাবে হয়ে উঠেছিল ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী। তাদের লোহিত রক্তকোষে এক ধরনের পরিবর্তন এসেছিলো যাকে সিকেল সেল এনেমিয়া বলে। এর ফলে যেটা হয়েছে তা হলো ইউরোপীয়রা আরো বেশি বেশি আফ্রিকার লোকদেরকে দাস হিসেবে রাখা শুরু করে। কারণ তাদের ম্যালেরিয়া হয় না। অন্যদিকে আমেরিকার মানুষজনের এরকম কোন জিনগত পরিব্যক্তি না থাকায় তারা খুব সহজেই ম্যালেরিয়ায় কাবু হয়। এ রোগের আদান প্রদান কিন্তু শুধু একপাক্ষিক ছিলো না। কলম্বাস যখন আমেরিকা থেকে ইউরোপে ফিরে গেলো, তখন সঙ্গে করে নিয়ে গেলো এক ভয়াবহ রোগ। ১৪৯৩-৯৪ তে ফরাসি-স্পেনীয় যুদ্ধে নেপলসে ছড়ায় এই বীভৎস রোগ। সেখান থেকে ছড়ায় সারা ইউরোপে। এ রোগে প্রথমে যৌনাঙ্গে ঘা দিয়ে উপসর্গ দেখা দেয়। তারপরে শরীরে বীজকুড়ি আসে এবং পঁচে যাওয়া শুরু করে, শেষ হয় একেবারে হাড়ের ক্ষয় দিয়ে। রোগটির নাম সিফিলিস। ইউরোপের বহু মানুষ এই অবিশ্বাস্য রকম বীভৎস রোগে ভুগেছে কলম্বাসের কারণে।

জবর দখল আর যুদ্ধের খেলায় পৃথিবীব্যাপী নানা রোগ ছড়িয়েছে সন্দেহ নেই। নিজেদের ছড়ানো রোগে নিজেরাই মরণ ফাঁদে পড়েছে এমন ইতিহাসও আছে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এর ফরাসি সৈন্যদল যখন ১৮১২ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরে রাশিয়া আক্রমণে মস্কো পর্যন্তই চলে গিয়েছিলো, তখন নেপোলিয়ন দেখতে পায় যে পুরো মস্কো শহর পরিত্যজ্য নগরী। কোন জনমানব নেই পুরো শহর শুধু খাঁ খাঁ করছে। পরের ৫ সপ্তাহে ফরাসি সৈন্যরা টাইফাস রোগের মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে পরে। ৬ লাখ সৈন্যের প্রায় সবাই মারা পড়ে সেই মহামারীতে। 

রাশিয়ার টাইফাস মহামারীর দুইশত বছর পর করোনাভাইরাস আতঙ্ক: অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে একের পর এক চীনা শহর। ধারণা করা হচ্ছে উহান নগরীতে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে। উহান এখন এক অবরুদ্ধ আতঙ্কের নগরী। সেখানকার একজন বাসিন্দা বলেছেন, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে এই পৃথিবী বুঝি এখানেই শেষ হয়ে গেল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ব জুড়ে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারির কথা ভাবছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই