‘হাজারো মানুষের ঈদ করায়া দিচ্ছি তাই কষ্ট নাই’

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৫ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

‘হাজারো মানুষের ঈদ করায়া দিচ্ছি তাই কষ্ট নাই’

নুরুল করিম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:০১ ৪ জুন ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ঈদের চির‌চেনা দৃশ্য। প্লার্টফ‌র্মে অপেক্ষারত হাজার হাজার মানুষ, তবুও যেন জায়গাটা খা‌নিকটা নীরব! এমন সময় সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে কমলাপুর স্টেশনে একটি ট্রেন এসে থামলো। স্টেশনের পরিবেশটা যেন হঠাৎ একটু ভিন্ন হয়ে গেল। পুরো স্টেশনে এক মূহূর্ত আগেও যে নীরবতাটুকু ছিল তা আর নেই। মিলিয়ে গেল মানু‌ষের ভি‌ড়ে, ব্যাগপ্যা‌কের আওয়া‌জে। সবার গন্তব্যই এক, বাড়ি যেতে হবে। কিন্তু মো. আশরাফুল আহমেদ, তিনি কোথায় যাবেন? তার যে এখন বাড়ি গেলে চলবে না। কেননা তাকে যে আবার ছুট দিতে হবে রেললাইনের সেই পথ ধরে। তবে তিনি একা নন, নিজের সঙ্গে সঙ্গী করে নিয়ে যাবেন হাজার হাজার মানুষকেও।

এই মাত্রই ট্রেন থেকে ইঞ্জিনটা আলাদা করেছেন আশরাফুল সাহেব। একটু কথা বলা যাবে?—কথাটি বলতেই ঘুরে তাকালেন তিনি। কি যেন চিন্তা করে বললেন, বেশিক্ষণ পারবো না কিন্তু। পরক্ষণেই তার অদ্ভুত সব গল্প শুনতে উঠে পড়লাম তার পঙ্খীরাজে। 

ট্রেনের ভেতরেই যার দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয়। ছুটে যেতে হয় বাংলার চিরচেনা অপরূপ পথ ধরে। তার এই ছুটে চলার গল্পটা শুরু হয় আজ থেকে ৪ বছর আগে থেকে। তবে এর আগেও ট্রেনের সঙ্গেই তার সম্পর্ক ছিল। মূলত তখন ছিলেন একজন সহকারি হিসেবে। আর বর্তমানে সহকারি নয় বরং তার পাশেই একজন সহকারিকে বসে থাকতে হয় সারাক্ষণ।

ইঞ্জিনের ভেতরেই থাকতে হয় সারাদিন। ভেতরে কেমন যেন একটা ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। এ রকম গরমে সারাদিন বসে থাকতে কেমন লাগে? প্রশ্ন করতেই হেসে উঠে বললেন, ‘সারাদিন কই! এই তো ইঞ্জিন ট্রেনের সঙ্গে লাগালেই গরম শেষ। ট্রেন চলার সময় অনেক বাতাস থাকে, তখন তেমন কোনো সমস্যাই হয় না।’

মস্তিষ্কের বিশাল এক জায়গাজুড়ে যেন ট্রেনের বসবাস। কিভাবে সবাইকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন তা নিয়েই তার সকল চিন্তা। তবে এত ব্যস্ততার মাঝে পরিবারের কথাও মনে রাখতে হয় ৩৮ বছর বয়সী এ ট্রেন চালককে। বাড়িতে ছোট্ট একটি মেয়ে আর নিজের স্ত্রীকে নিয়ে ৩ জনের পরিবার। সারাদিনের ব্যস্ততা কাটিয়ে ক্লান্ত পথিকের মতো যখন বাসায় ফেরেন তখন ছোট্ট মেয়েটির বাবা ডাকটিই যেন সকল ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দিয়ে বুকের মাঝে পৃথিবীর সমস্ত সুখ এনে দেয়। তাই তো বিরামহীনভাবে ৪টি বছর ধরে এ পেশায় আছেন আশরাফুল।

ঢাকা থেকে সিলেট, আবার সিলেট থেকে ঢাকা এই তার এক দিনের ব্যস্ততা। কখনও বা রাতও কাটাতে হয় চিরচেনা ট্রেনেই। তবে দু-চোখের পাতা এক করার কোনো সুযোগ নেই। কেননা তার ওপরই যে নির্ভরশীল হাজার হাজার মানুষের জীবন, হাজার হাজার মানুষের নিরাপদে বাড়ি ফেরা। এত দায়িত্বের কথা মনে এলে কার-ই বা চোখে ঘুম থাকে?

ট্রেনের মূল ব্যস্ততা আসে মূলত ঈদ এলে। ঈদে ঢাকার বেশিরভাগ মানুষের বাড়ি ফেরার অন্যতম আশ্রয় এই ট্রেন। প্রিয়জনের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে তাই অনেকেই ভিড় জমান পরিচিত কমলাপুর স্টেশনে। আর সিলেটে যারা যাবেন তাদের আশ্রয় মেলে আশরাফুলের বিশাল এই ট্রেনটিতে। কেউ ট্রেনের ভেতরে, কেউ বা ছাদে।

দীর্ঘদিন ধরেই ঈদে সবাইকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেয়ার কাজটি করে আসছেন তিনি। তবে এতকিছুর ভিড়ে নিজেরও যে ঈদ বলে কিছু একটা আছে তা যেন বেমালুম ভুলতে বসেছেন এই ট্রেন চালক। ‘ছোট্ট মেয়েটা প্রায়ই অভিমান করে। সবসময় তো আর ঈদে বাসায় থাকতে পারি না। আর কাজ করি একটা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে, এখানে সেবা দেয়াটাই আসল। এ কাজ ফেলে তো আর বাসায় বসে থাকা যায় না।’—কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বললেন আশরাফুল। 

ঈদে পরিবারের জন্য টান সবারই থাকে, আশরাফুলও তার ব্যতিক্রম হবেন না ভেবে কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করলাম—‘ঈদে যখন সবাইকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হয় তখন কষ্ট হয় না এই ভেবে যে, আমি আমার পরিবারকে সময় দিতে পারছি না? মনে পড়ে না আপনার সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা? উত্তরে তিনি বললেন, ‘মনে তো পড়েই, কিন্তু যখন ভাবি আমার জন্য এত এত মানুষের ঈদটা সুন্দর হতে যাচ্ছে তখন সেই কষ্ট আর থাকে না।’

গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ। শেষবার ঠিক কবে গিয়েছিলেন তা স্পষ্ট মনে নেই। তবে সে যে অনেকদিন আগের কথা তা তার ভঙ্গিতেই স্পষ্ট ফুটে উঠছে। এতে বিন্দু পরিমাণ আক্ষেপের ছোঁয়া নেই মনে, নেই কোনো অভিমানের ছাপ। তবে প্রাপ্তির ছায়া যেন চোখে মুখে ফুটে উঠছে তার। সামনে পরিবারকে নিয়ে গ্রামে যাওয়ার কোনো চিন্তা-ভাবনা আছে? আমার এ প্রশ্ন শুনে এমন এক হাসি দিলেন যেন আমি সুয়োরাণী দুয়োরাণীর গল্প বললাম তাকে। উত্তরে একটু থেমে বললেন, ‘নাহ! কোনো চিন্তা নেই। তবে এ নিয়ে পরিবারেরও এখন আর তেমন কোনো আক্ষেপ নেই, ওরাও এখন এটা মেনে নিয়েছে।’

কাজের জন্য পরিবারকেও ঠিক মনের মতো করে সময় দিতে পারেন না তিনি। তবে এ আর নতুন কী? এতদিনে হয়তো ঠিকই গায়ে সয়ে গেছে তার, ঠিকই সয়ে গেছে সেই ছোট্ট মেয়েটিরও। প্রথমদিকের সেই আক্ষেপ হয়তো বা আজ আর সেরকমভাবে কাজ করে না মেয়েটির। কেননা এতটুকু বয়সেই যে জেনে গেছে তার বাবা কাজ করছে মানুষের জন্য, কাজ করছে দেশের জন্য! 

প্লাটফর্মে বেশকিছু মানুষ বসে আছে। একটু পরই কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাবে সিলেটের ট্রেনটি। আর অন্যদিকে আশরাফুলও বসে আছেন, তিনিও সিলেট যাবেন। তবে একা একা নন, তার পঙ্খীরাজে করে নিয়ে যাবেন হাজার হাজার মানুষকেও। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা একটু দেখে নিলেন তিনি। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘আজ যাই, আমার জন্য যে অনেক মানুষ অপেক্ষায় আছে। আমি না গেলে কে তাদের বাড়ি নিয়ে যাবে বলুন?’

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ