.ঢাকা, সোমবার   ২৫ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ১১ ১৪২৫,   ১৮ রজব ১৪৪০

হাজারীবাগের ‘আজাব’ এবার সাভারে!

ডেইলি বাংলাদেশ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ

 প্রকাশিত: ১৭:০৭ ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭   আপডেট: ১৬:০৭ ৪ অক্টোবর ২০১৭

সাভারের ভাকুর্তা গ্রামের মোগরাকান্দির গ্রামবাসী গেল তিন বছর আগেও একটু বেশি প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিতে গ্রামের চকে (বিস্তৃণ ফসলের মাঠ) যেত। কিন্তু এখন গ্রামের চকের একটা বড় অংশ গ্রামবাসীর জন্য নিষিদ্ধ। ঢাকার হাজারিবাগ থেকে প্রতিস্থাপিত ট্যানিরিগুলোর বর্জ্য দিয়ে এখানে তৈরি হচ্ছে মাছ-মুরগির খাবার। ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামাল তৈরির মালিকেদের দখলে সেই চক।

ক্ষতিকর এই বর্জ্যের বিষয়ে ২০১১ সালের ২১ জুলাই বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে তৎকালীন একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ এক মাসের মধ্যে ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে মাছ-মুরগির খাবার তৈরির কারখানা বন্ধের নির্দেশ দেন। হাইকোর্টের সেই রায়ের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীরা লিভ টু আপিল করেন। সেই লিভ টু আপিল আদালত খারিজ করে দেন। এরপর আবারও তারা আবেদন (আপিল ফর রেস্টোরেশন) করে। যে আবেদন ৯ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে খারিজ করে দেন সর্বোচ্চ আদালত।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ট্যানারির বর্জ্য থেকে পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্য তৈরি করা সম্পূর্ণ নিষেধ। অথচ সেই নিষেধাজ্ঞা না মেনে দেদারসে ট্যানারি বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে মাছ ও পোল্ট্রি ফিড। সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সাভারের ভাকুর্তা গ্রামের মোগরাকান্দি গ্রামে বিষাক্ত ফিড তৈরি চলছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে এখানে এমন ২০টি কারখানা আছে।

চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার জন্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কমপক্ষে ১৩২ ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। চামড়া ফিনিশিং করে বুশি বের করার স্তর পর্যন্ত কমপক্ষে ২০ রকমের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ক্রমিয়াম, সালফিউররিক এসিড, সোডিয়াম , লাইম, এলডি, সোডা, সোডিয়াম, ফরমিকা, ক্লোরাইড, সালফেট, এলুমিনিয়াম সালফেট ইত্যাদি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রফেসর ড. আবু জাফর মাহমুদ বলেন, এসব কেমিক্যালের মধ্যে যেগুলো ধাতব পদার্থ তা সবই আগুনে পোড়ানোর পরও থেকে যায়। পরে এগুলো ধাতব অক্সাইডে পরিণত হয়। এর মধ্যে সবেচেয় ভয়াবহ হল ক্রময়িাম। এটি আগুনে জ্বালালেও কোন ক্ষয় নেই। মাটিও হজম করতে পারেনা।

এর আগে বিসিএসআইআর-এ খোঁজ নিতে গেলে জানানো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগ এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ যৌথভাবে কাজ করেছে চামড়ার বর্জ্য মিশ্রিত খাবার নিয়ে। যেসব এলাকায় এসব খাবার যাচ্ছে তার মধ্যে ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ উল্লেখযোগ্য। গবেষকরা জানান, এই ৮ জেলার ডিম সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব এলাকার ডিমে ২৩.৪৮০৯ এমজি মাত্রার ক্রমিয়াম নামে রাসায়নিক পদার্থ ধরা পড়েছে। শিশুদের জন্য এ ডিম গ্রহণ করা খুবই ক্ষতিকর। কারণ ৮ বছর বয়সী শিশুর শরীরে দিনে ক্রমিয়ামের সহনীয় মাত্রা হল ১৫ এমজি। ইনস্টিটিউট অব মেডিসিন এর প্রতিবেদন মতে ৯ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের দিনে ক্রমিয়াম গ্রহণের সহনীয় মাত্রা হল ২৫ থেকে ৪৫ এমজি।

ভয়ঙ্কর এসব কেমিক্যাল ফুড চেইনের মাধ্যমে নানাভাবে মানবদেহে প্রবেশ করছে। ক্রমিয়াম এবং সীসা মানবদেহে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি প্রবেশ করলে মানুষের লিভার, কিডনী, ব্রেন ও নার্ভ সিস্টেম অচল হয়ে যায়। ক্রমেই নারীদের প্রজননক্ষমতাও ধ্বংস হয়ে যায়।

পিলে চমকানো তথ্য হচ্ছে, এই চক এলাকায় যে কেউ চাইলেই যেতে পারবে না। কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এসব পোল্ট্রিফিড তৈরির মালিকদের  নিজেস্ব নিরাপত্তা বেষ্টনি। যেখানে ক্যামেরা চালানো নিষেধ। অচেনা লোক মানেই হাজার প্রশ্ন! আদালতের রায় এখানে কোন বিষয় না।

চক থেকে একটু দূরেই গড়ে উঠেছে বেশকিছু কারখানা। চক থেকে কাচাঁমাল সংগ্রহ করে এখানে ভেঙ্গে গুড়ো করে। এরপর বিভিন্ন পোল্ট্রি ফিড তৈরির কারখানায় এই কাঁচামাল পাঠানো হয়। চামড়ার বর্জ্য সিদ্ধ করে শুটকী তৈরির সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা জানান, সারাদেশের মাছ ও মুরগীর খামারীরা এ শুটকি কিনে থাকেন। ময়মনসিংহ, গাজীপুর, ভৈরব, সিলেট, বগুড়া, খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা প্রভৃতি জেলা থেকে ক্রেতারা এসে কিনে নিয়ে যায় শুটকী ও শুটকীর গুড়া। মূলত মাছের খাবার তৈরি করে যেসব কারখানা, সেসব মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরা বেশি নেয়। অনেক নামকরা প্রতিষ্ঠানও এসব শুটকী কিনে থাকে।

স্থানীয় প্রশাসনের গুটিকয়েক লোক তাদের নিয়ন্ত্রণে। আর গ্রামবাসী যারাই বাধা দিতে চেষ্টা করেছে, তারাই এখন নিরাপত্তাহীনতায় আছে। ঢাকার যারা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের জনবল সংকট।

ব্যক্তিগতভাবে চিঠি দিয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর, মানবাধিকার কমিশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, রেজিস্টার সুপ্রিম কোট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এখন শুধু উত্তরের অপেক্ষায়।

সাভার থেকে, সাইফুল আলম।

ডেইলি বাংলাদেশ/আর কে