হলিউড সিনেমাকেও হার মানানো রাকিটিচের প্রেমের গল্প

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৫ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১১ ১৪২৬,   ২০ শাওয়াল ১৪৪০

হলিউড সিনেমাকেও হার মানানো রাকিটিচের প্রেমের গল্প

 প্রকাশিত: ১৩:৫৯ ১৮ জুলাই ২০১৮   আপডেট: ১৩:৫৯ ১৮ জুলাই ২০১৮

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

রোমান্টিক প্রেমকাহিনী নাকি শুধু সিনেমার পর্দাতেই দেখা যায়। ইভান রাকিটিচ মুচকি হেসে বলতে পারেন, ‘তাহলে তো তোমরা আমার গল্প এখনো জানোই না!’ সদ্য বিশ্বকাপ মাতিয়ে আসা বার্সেলোনার এই ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডারের লাভ স্টোরি যেন সাক্ষাৎ কোন হলিউড সিনেমার চিত্রনাট্য। নিজের অবিশ্বাস্য সেই প্রেমকাহিনী সহ জীবনের আরও জানা অজানা নানা দিক রাকিটিচ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন তার ভক্তদের সঙ্গে। রাকিটিচের সেই গল্পই আজ শুনে নেয়া যাক রাকিটিচের নিজের বয়ানে। সবাইকে পড়ার আমন্ত্রণ।

“আমার জীবনে একটা গল্প আছে, যেটাকে আপনারা চাইলেই হলিউড সিনেমার গল্প বলে দিতে পারেন। রোমান্টিক কমেডি গল্প, কিন্তু একদম বাস্তব। যার শুরুটা একজন ক্রোয়েশিয়ানের এক বারে প্রবেশের মধ্য দিয়ে...

সময়টা ২০১১। আমার বয়স তখন ২১ বছর। রাত দশটায় আমি স্পেনের মাটিতে পা রাখলাম। গত চার বছর ধরে জার্মানিতে শালকের হয়ে খেলেছি আমি। পরের দিন সকালে সেভিয়ার সাথে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা আমার। আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে কেবল স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও কাগজপত্রে সই করাটাই বাকি ছিল।

আমার বড় ভাই দেজান আমার সাথে এসেছিল। এত রাতে হোটেলে উঠে ক্লাবেরই কয়েকজনের সাথে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম আমরা। কী কারণে জানি না, ডিনার শেষ করার পর আমি একটু স্নায়ুচাপে ভুগছিলাম, এবং আমি জানতাম এখন শুতে গেলেও ঘুম আসবে না আমার। তাই আমি আমার ভাইকে বললাম, ‘চলো কিছু পান করে আসি, তারপর ঘুমানো যাবে।’

এই কথাগুলোই আমার জীবন বদলে দিয়েছিল।

হোটেল বারে একটি মেয়ে কাজ করত... এত সুন্দর! সিনেমাতে যেমন এমন মুহূর্তে সবকিছু খুব স্লো মোশনে চলে, আমার সাথেও যেন তেমনটাই হচ্ছিল। মেয়েটা খুবই সুন্দর ছিল।

কিন্তু ‘হোলা’ (স্প্যানিশ ভাষায় হেলো) ছাড়া মেয়েটিকে আর কিছুই বলতে পারলাম না আমি। কারণ আমি স্প্যানিশের কিছুই জানতাম না। আমি জার্মান, ইংলিশ, ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ, সার্ব-ক্রোয়েশিয়ান এই ভাষাগুলো জানতাম, কিন্তু স্প্যানিশের কিছুই জানতাম না।

তো আমি আর আমার ভাই মিলে বসে হালকা গল্প করছিলাম। আমার ভাইয়ের কাছে ইউরোপের আরেকটি বড় ক্লাব থেকে ফোন আসে। তারা বলছিল যে আমার সেভিয়া আসার খবর তারা পেয়েছে, এবং আমি যেন সেভিয়ার বদলে তাদের সাথেই চুক্তি করি। এমনকি চুক্তি তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করার জন্য আমাকে নিয়ে যেতে তারা বিমান পাঠাতেও প্রস্তুত।

আমাদের তখনো সেভিয়ার সাথে কোন আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। আমার জন্য স্পেনে খেলতে আসাটা তখন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। নতুন পরিবেশ, নতুন ভাষা, তার উপর এখানে কাউকে চিনিও না। অপর যে ক্লাবটি আমার সাথে চুক্তি করতে চাচ্ছিল, তাদের সাথে মানিয়ে নেয়াটাই বরং বেশি সুবিধার হতো আমার জন্য।

আমার ভাই তাই আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমি কী করতে চাই। আমি বললাম, ‘দেখো, আমি সেভিয়ার সভাপতিকে এরই মধ্যে মৌখিকভাবে সম্মতি জানিয়ে দিয়েছি। আর আমার মুখের কথা চুক্তির চেয়েও দামী।’ বাদবাকি উত্তর আমার ভাই বুঝে নিলো।

এরপর আমি হোটেল বারের ওই মেয়েটিকে দেখিয়ে আমার ভাইকে বললাম, ‘ওই মেয়েটাকে দেখছ? ওই যে ওই ওয়েটার মেয়েটিকে। আমি এখানে সেভিয়ার হয়ে খেলব, আর ওই মেয়েটিকে বিয়েও করব।’

আমার ভাই হেসে উঠলো। ও ভাবলো আমি মজা করছি। বললো, ‘ঠিক আছে, তুমি যা বলবে তাই হবে।’

মেয়েটি আবার আমাদের টেবিলে ফিরে এলো এটা জানতে যে আমাদের খাওয়া হয়ে গেছে কি না। আমি ভাইকে বললাম, ‘আমি এখনো কিছুটা নার্ভাস। আমার মনে হয় এখনো আমার ঘুম আসবে না। চলো আরেকটু কিছু খাওয়া যাক।’

পরের দিন সকালেই সেভিয়ার সাথে চুক্তি হয়ে গেলো আমার। থাকার জন্য বাসা খুঁজে পেতে আমার তিন মাস লেগেছিল, আর এই তিন মাস আমি ওই হোটেলেই ছিলাম। মেয়েটির উপর আমি এতটাই মজে গিয়েছিলাম যে, প্রতিদিন সকালে উঠেই বারে এসে কফি আর অরেঞ্জ জুসের অর্ডার দিয়ে বসে থাকতাম আমি, যাতে করে সুন্দর ওই মেয়েটিকে কিছুক্ষণ দেখতে পাই।

আমি শুধু জানতাম মেয়েটির নাম রাকুয়েল। সে ইংরেজি জানত না, আবার আমি স্প্যানিশ জানতাম না। প্রতিদিন তাই শুধু দেখে দেখেই পার করতে হতো আমার।

আমি জানি না আমার অনুভূতিটা আমি ঠিক কীভাবে ব্যাখ্যা করব। ওকে দেখলেই আমার মধ্যে একটা অন্যরকম অনুভূতি হতো। যেন মনে হতো, বুকের ভেতর কেউ বোম মেরে দিয়েছে আমার! আস্তে আস্তে আমি স্প্যানিশ শেখার চেষ্টা করতে লাগলাম। যেখানে আটকে যেতাম, সেখানে হাত দিয়ে অঙ্গভঙ্গি করে ওকে মনের ভাব বোঝানোর চেষ্টা করতাম। ও নিজেও আমার এমন কাজকর্মে মজা পেতে শুরু করলো।

আমি ওকে ২০ থেকে ৩০ বার আমার সাথে বাইরে কফি খেতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছি। ও কখনোই সরাসরি না বলেনি, কিন্তু প্রতিবারই কোন না কোন অজুহাত ঠিকই দাঁড় করিয়ে ফেলত। তিন মাস পরে আমি বাসা পেয়ে গেলাম। হোটেল ছেড়ে যাওয়ার সময় ভীষণ খারাপ লাগছিল আমার, কারণ আমার মনে হয়েছিল আর কখনোই হয়তো ওকে দেখতে পাব না আমি। কিন্তু আমি হাল ছেড়ে দেইনি। সময় পেলেই আমি গাড়ি চালিয়ে বারে এসে কফি নিয়ে বসে থাকতাম। যদি দেখতাম যে ও নেই, তাহলে তখনই বার থেকে বেরিয়ে যেতাম। আর যদি সৌভাগ্যক্রমে ওকে পেয়ে যেতাম, তাহলে আমার সারা দিনটাই যেন মধুর হয়ে উঠত।

ততদিনে আমার স্প্যানিশ জ্ঞানও বেশ উন্নত হয়েছে। ফলে আমরা আরেকটু বেশি কথাবার্তা বলতে পারতাম। তাড়াতাড়ি স্প্যানিশ শেখার জন্য সারাক্ষণই আমি স্প্যানিশ টিভি প্রোগ্রাম ও রেডিও শুনতে থাকতাম। আমার মনে হয় আমি কিছুটা ভাগ্যবানও, কারণ বলকান অঞ্চলের মানুষদের একাধিক ভাষা শেখার ব্যাপারে বেশ একটা জন্মগত প্রতিভা আছে।

একদিন অনেক জোর করার পর রাকুয়েল স্বীকার করলো কেন সে আমার সাথে বাইরে যেতে চায় না। সে বললো, ‘দেখ তুমি তো একজন ফুটবলার। সামনের বছরই অন্য কোন দেশে খেলতে চলে যেতে পার। আমি দুঃখিত, কিন্তু এই কারণে আমি তোমার সাথে জড়াতে পারছি না।’

আমি ভাবলাম, ও হয়তো আমাকে এতটাই বাজে খেলোয়াড় ভেবেছে যে ওর ধারণা সামনের মৌসুমেই সেভিয়া আমাকে ছেড়ে দেবে! স্কোয়াডে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করতে তাই আমি উঠেপড়ে লাগলাম, যাতে করে আমি সেভিয়ায় আরও কিছুদিন থাকতে পারি এবং ওকে ডিনারে যাওয়ার জন্য রাজি করাতে পারি। প্রায় সাত মাস লেগেছিল ওকে রাজি করাতে। আমি সেভিয়ায় পা রেখেছিলাম ২৭ জানুয়ারি, আর সেই মাহেন্দ্রক্ষণটা এলো ২০ আগস্টে। ওইদিন আমি আমার ফোনে হঠাৎ একটা এসএমএস পাই, ‘রাকুয়েল বারেই আছে, তবে কাজে নেই। বোনের সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছে।’

ততদিনে শহরের অনেকেই আমার আর রাকুয়েলের ব্যাপারটা জেনে গিয়েছিল, তাই বারেরই কেউ একজন টেক্সট দিয়ে আমাকে খবরটা জানিয়ে দেয়। কে জানিয়েছিল সেটা অবশ্য বলব না আমি!

দেরি না করে তখনই এক বন্ধুকে ফোন করে ডেকে আনলাম, এবং ওকে নিয়ে বারে চলে গেলাম। গিয়ে রাকুয়েলের ঠিক পাশের সীটে বসে ওকে বললাম, ‘আজ তো তুমি কাজ করছ না। আজকে তো নিশ্চয়ই আমার সাথে ডিনারে যাওয়ার সময় হবে তোমার।’

আমাকে দেখে ও চমকে উঠেছিল। কী উত্তর দেবে বুঝতে না পেরে ইতস্তত করছিল ও।

আমি বললাম, ‘আজকে তোমাকে কিছুতেই ছাড়ছি না আমি। আমি জানি তুমি তোমার বোনের সাথে আছ, কিন্তু তাও আমাদের আজকেই যেতে হবে। দরকার পড়লে সবাই মিলে যাব! তাও যেতে হবে।’

ওইদিন আর আমাকে না করতে পারেনি রাকুয়েল। সবাই মিলেই ডিনারে গিয়েছিলাম আমরা।

পরের দিন শুধু আমি আর রাকুয়েল বাইরে লাঞ্চ করতে যাই। সেই শুরু, এরপর থেকে এখনো একসাথে আছি আমরা। দুটো ফুটফুটে মেয়ে আছে আমাদের এখন। রাকুয়েলকে রাজি করানোটা ছিল আমার জীবনের সবচাইতে কঠিন কাজ। এমনকি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতার চেয়েও কঠিন ছিল এটা!

প্রথমবার ওর পরিবারের সাথে দেখা করাটাও ছিল মজার অভিজ্ঞতা। আমি তখন আমার স্প্যানিশ জ্ঞান নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, কিন্তু ওর পরিবার এত দ্রুত কথা বলছিল, আমি কিছু বুঝতেই পারছিলাম না! তার উপর তাদের উচ্চারণে সেভিয়ার একটা বিশেষ টান ছিল, সেটাও আমার কাছে অপরিচিত ঠেকছিল।

ওর বাবা আমার সাথে হাসি ঠাট্টা করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু আমি উনার কথা বিন্দুমাত্রও বুঝতে পারছিলাম না! আমি কেবল বোঝার ভান করছিলাম, আর বাকিদের দেখে দেখে হেসে যাচ্ছিলাম। কিন্তু উনি ঠিকই ধরতে পারছিলেন যে আমি না বুঝেই হেসে যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত বলেই ফেললেন, ‘এটা কোন ব্যাপারই না। দুই তিন মাস সময় দাও, আস্তে আস্তে সবকিছুই বুঝে যাবে তুমি।’

আমার মনে হয় এটা সেভিয়ার মানুষের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ওরা খুবই উদার মনের মানুষ, সবাইকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো করে আপন করে নেয়। আমার স্ত্রীর ফুটবলের প্রতি এক ফোঁটাও আগ্রহ নেই। আমি তাই ধরে নিয়েছিলাম ওর পরিবারেরও বোধহয় আগ্রহ নেই। কিন্তু পরে দেখলাম তারা পাঁড় সেভিয়া ভক্ত। রাকুয়েলের দাদু তখন আর বেঁচে নেই, কিন্তু ওর বাবা আমাকে বলেছেন যে তিনি খুব বড় সেভিয়া ভক্ত ছিলেন। হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় শুয়েও তিনি তার সেভিয়া প্রেম দেখিয়েছেন। নার্সরা তাকে তার জামাকাপড় খুলে হাসপাতাল গাউন পরিয়ে দেয়ার পরে যখন হাতের ঘড়িটি খুলতে গেলো, তখন নাকি তিনি বলেছিলেন, ‘এটাকে আমার সাথে থাকতে দাও। জীবনের শেষ পর্যন্ত এটা আমার সাথে থাকবে। মারা গেলেও আমি আমার ক্লাবের স্মৃতিচিহ্ন নিয়েই মারা যেতে চাই।’ ঘড়িটা ছিল সেভিয়া থেকে উনাকে উপহার দেয়া বিশেষ এক ঘড়ি।”

ফুটবলার রাকিটিচের ফুটবল মাঠের কৃতিত্ব তো অনেকেই জানেন, কিন্তু তার বাস্তব জীবনের এই গল্প কয়জনই বা জানতেন!

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ