Alexa হজ সফরে নারীর সঙ্গে মাহরাম থাকার অপরিহার্যতা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৮ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৩ ১৪২৬,   ১৪ জ্বিলকদ ১৪৪০

হজ সফরে নারীর সঙ্গে মাহরাম থাকার অপরিহার্যতা

মাওলানা খাদিল সাইফুল্লাহ রাহমানী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:৫৩ ৯ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ২১:৫৫ ৯ জুলাই ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

হজ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। প্রত্যেক সুস্থ সবল ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ। যে নিজের ও তার সঙ্গে থাকা গোলামের খরচাদির পূর্ণ করার সক্ষমতা রাখে এবং হজের সময়গুলোতে হাজত পূরণের ওপর ক্ষমতাবান এমন ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ।

যদি শারীরিক সক্ষমতা থাকে। যদি সফর করার শারীরিক সক্ষমতা না থাকে তাহলে বদলি হজ করাতে হবে। এটা যেমন পুরুষের বেলায় ফরজ তেমনি নারীর বেলায়ও ফরজ। পুরুষের বেলায় শুধু অর্থ-সম্পদ শর্ত করা হয়েছে, তবে নারীদের বেলায় একটু বাড়ানো হয়েছে; তা হলো নারীর হজের সফরে সঙ্গে তার স্বামী বা মাহরাম কোনো পুরুষ থাকতে হবে। এটি যুক্তির কথা যে, নারীদের বেলায় একটু বেশি নিরাপত্তা দিতে হয়। আর একারণেই এই ব্যবস্থাপনা।

হজের সফরে নারীর সঙ্গে তার স্বামী বা মাহরাম থাকা না থাকা নিয়ে হাদিসের আলোকে ওলামায়েকেরামদের মাঝে তিনটি মতামত পাওয়া যায়-

আরো পড়ুন>>> দান-খয়রাত: ইসলামের নির্দেশনা

প্রথম অভিমত : হজের সফরে নারীদের সঙ্গে স্বামী বা মাহরাম থাকা অবশ্যক। হজরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.) আহমদ ইবনে হাম্বালসহ অন্যান্য মুজতাহিদ ইমামগণ যেমন ইবরাহিমে নাখয়ী, হাসান বসরী, ইসহাক ইবনে রাহওয়ায় ও আবু সাওর (রহ.) এদের মতেও অবশ্যক। (ইবনে আব্দুল বারকৃত তাহমিদ ১২ : ১৫০) তবে ইমাম আবু হানিফার (রহ.) এই শর্ত যখন মক্কামুকাররমা শরয়ি দূরত্বের মাঝে থাকে। এই শর্ত ফরজ হজের বেলায় যেমন তেমনি নফলের বেলায়ও।
 
দ্বিতীয় অভিমত : হজে গমনকারী নারীদের সঙ্গে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য নারী থাকে, তবে স্বামী ও মাহরাম পুরুষ ব্যতীত হজে যেতে পারবে। তবে শর্ত হলো তারা ফরজ হজ আদায়কারী হতে হবে। এই অভিমতটি ইমাম মালেক ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-সহ ইমাম আওযায়ি আতা (রহ.) প্রমুখদের। (ইবনে বিতালকৃত বোখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ ৪ : ৪৩২)।

তৃতীয় অভিমত : নারীরা নফল হজে মাহরাম ব্যতীত করতে পারবে। এই অভিমতটি অনেক শাফেয়ি আলেমদের। ইমাম মালেক (রহ.) এর থেকেও এমন একটি মতামত পাওয়া যায়। (ইবনে মুলকীনকৃত ই’লাম ৬ : ৮১)। ইবনে তাইমিয়াও এমনই বলেছেন ওই সব সফরের বেলায়, যার মধ্যে ইবাদতের নিয়ত থাকে এবং সফরটি নিরাপদ হয়। (ইবনে মাফলাহকৃত আলফুরু’ ৩ : ২৩৬)।

যেসব ওলামায়েকেরাম নারীদের সফরে স্বামী বা মাহরাম পুরুষের শর্ত লাগিয়েছেন; তাদের শর্তটি সহিহ হাদিসের অনুকুল্যে। যেমন হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নারীরা মাহরাম ব্যতীত তিনদিনের সফরে বের হবে না।’ (বোখারি ১০২৪)। ঠিক এই একই বিষয়ে আবু সাইদ খুদরি থেকে বর্ণিত হয়েছে (মুসনাদে আহমদ ১০৬১)।

অনেক রাবী হাদিসটি একটু বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, ‘নারী যদি তিন দিন অথবা তার থেকে বেশি দিনের সফরে বের হয়। তাহলে যেন তার সঙ্গে তার বাবা ভাই স্বামী ছেলে বা অন্যকোনো মাহরাম পুরুষ থাকে। (তিরমিযি ১০৮১)। অনেক রেওয়াতে দিনদিনের স্থলে একদিন একরাতের কথাও বলা হয়েছে। আর এমনটি বর্ণনা রয়েছে বুখারিতে আবু হুরায়রা সূত্রে যেমন ১০৩৮ নম্বর হাদিস। মুসলিমে ১৩৩৯ ও তিরমিযিতে ১০৯০।

হাদিসের ব্যাখ্যাকারকগণ বলেন, ‘একদিন এবং তিনদিনের মাঝে পার্থক্য হলো নিরাপত্তা বিধান ও শঙ্কা নিয়ে। যদি একদিনের সফরেও ফিতনার আশঙ্কা থাকে; তাহলে মাহরাম ব্যতীত সফর করা নিষেধ। আর তিনদিনের সফরে ফিতনার আশঙ্কা হোক বা না হোক মাহরাম বা স্বামী থাকতেই হবে।’

উল্লিখিত হাদিসতো সাধারণ সফরের ক্ষেত্রে। কিন্তু সতর্ককথা হলো হজের সফরেও এমন হাদিস রয়েছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, ‘মাহরাম ব্যতীত নারীদের সফরে বের হওয়া নিষেধ।’ বলে রাসূল যখন ঘোষণা করলেন। তখন এক সাহাবী বলে উঠলো হে রাসূলুল্লাহ! আমিতো সেনাবাহিনীতে কাজ করি (বাড়ী ছেড়ে দূরের দেশে থাকতে হয়) এদিকে আমার স্ত্রী হজের নিয়ত করেছে! এখন আমার স্ত্রী কীভাবে হজ করবে? রাসূলুল্লাহ বললেন, তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজের সফরের বের হও।’ (বুখারি ১৮৬২)। এই বর্ণনাটি মুসনাদে আহমদে আরো স্পষ্ট শব্দে উল্লেখ আছে যে, তুমি সেনাবাহিনী থেকে ফিরে এসো, স্ত্রী’র সঙ্গে হজের সফরের বের হও (মুসনাদে আহমদ ২২ : ১৬০)। 

হজরত আবু উমামা বাহালি (রা.) হতে বর্ণিত। আমি রাসূলুল্লাহ থেকে শুনেছি যে, ‘স্বামী বা মাহরাম ব্যতীত হজ করা জায়েজ নেই।’ (তিবরানিকৃত মুজামুল কাবীর)।

যে সব ওলামায়েকেরাম নিরাপদ সফর হলে বা সঙ্গে নির্ভরযোগ্য নারী থাকলে স্বামী বা মাহরাম ছাড়া সফর করাকে জায়েজ বলেছেন, তারা দলীল পেশ করে নিন্মের বর্ণিত ঘটনা দ্বারা। হজরত ওমর (রা.) এর খেলাফতের শেষ দিকে উম্মাহাতুল মুমিনিনকে হজ করার অনুমতি দেন। এবং তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বশীল নিযুক্ত করেন উসমানগণী ও আব্দুর রহমান ইবনে আওফকে (রা.)। (বুখারি ১৮৬০)। এ বিষয়টি অন্যান্য সাহাবীগণ অপছন্দ করেননি। ফতহুল বারিতে ইবনে হাজার আসকালানি এমনটিই লিখেছেন (৪ : ৯১)। 

হজরত আদী ইবনে হাতেম (রা.) এর হাদিস দ্বারাও দলিল পেশ করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, এমন এক সময় আসবে যখন নিরাপত্তা এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে বসরা থেকে মদীনা পর্যন্ত নারীরা আসবে তার কোনো আশঙ্কা হবে না। ডর-ভয় সৃষ্টি হবে না। (মুজামুল আওসাত ৬ : ৩৫৯)। 

হিজরতের সময় অনেক মহিলা মক্কা থেকে মদীনায় একাকী হিজরত করেছেন। তাদের সঙ্গে তাদের স্বামী বা মাহরাম ছিল না বলেও হাদিসে এসেছে। এগুলোর দ্বারা দলিল পেশ করে থাকেন। উল্লিখিত হাদিসগুলো ওইসব হাদিসের বিপরীতে দলিল হবার গ্রহণযোগ্যতা রাখে না। যেসব হাদিসে স্পষ্ট মাহরাম ব্যতীত সফরের নিষেধ এসেছে। আর উম্মাহাতুল মুমিনীন বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেননা তাঁরাতো পুরো উম্মতের মা। এবং পূর্ণ পবিত্রতা অর্জিত মহিলা। এছাড়া রাসূলুল্লাহ পরে তাদের বিবাহ করা কারো জন্য জায়েজ নেই। এবং তাদেরকে সবাই নিজের মা’র চেয়ে বেশি সম্মান করে।

খলিফাদের তরফ থেকে তাদের প্রতি বিশেষ নিরাপত্তা দেয়া ছিল। হজরত উসমান গণী ও আব্দুর রহমান ইবনে আওফ তাদের নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত। সুতরাং এদের বিষয়টি অন্যাদের সঙ্গে তুলনাযোগ্য নয়। হজরত আদী ইবনে হাতেম (রা.) এর সংবাদটি গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ তা শুধুমাত্র একটি সংবাদ বা খবর। যা ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এটি ভবিষ্যত বাণী। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইসলামের পরিপূর্ণ বিধান প্রতিষ্ঠার পর পৃথিবীতে কী পরিমাণ শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হবে এর পূর্বাস দেয়া। আর হিজরতের সময় নারীগণ একাকী চলেছেন এর দ্বারা দলিল হতে পারে না। কারণ এটি একটি বিপদাপন্ন সময় ছিল। অনোন্যোপায় হয়ে তারা সফর করেছেন।

ওলামায়েকেরাম যে নারীদেরকে স্বামী ও মাহরাম ব্যতীত সফর করার থেকে বারণ করেছেন এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো যেন তারা নিরাপদ ও শঙ্কামুক্ত অবস্থায় সফর করে। বিপদের কোনো ঝামেলায় না পড়ে। এখন যদি কোনো নারী একাকী না হয়, বরং একাধিক হয়, তাহলে উল্লিখিত উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যায়। তখন নিরাপদ নিরাপত্তা ও শঙ্কমুক্ত অবস্থার বিবেচনা করে উভয় হজের সফরে (ফরজ ও নফল) নারীকে মাহরাম ব্যতীত বের হওয়া জায়েজ করেছেন। অনেক ওলামায়েকেরাম বাঁধা নিষেধ ও নিরাপত্তা বিধানের মাঝে সামঞ্জস্য বিধান করে ফরজ হজের বেলায় স্বামী বা মাহরাম ব্যতীত বের হওয়াকে জায়েজ করেছেন। কিন্তু সামষ্টিক বিবেচনায় প্রথম অভিমতটি শরীয়ত ও রাসূলুল্লাহ এর হাদিসের উদ্দেশ্যের অধিক নিকটবর্তী। এবং এই অভিমতটি সর্বাধিক ওলামায়েকেরামের। বিশেষ করে হজের সফর একটি কষ্টসাধ্য সফর। আবহাওয়ার পরিবর্তন, পরিবেশের বৈরিতা, খাবার দাবারের ব্যতিক্রম, শারীরিক ক্লান্তসহ এরকম আরো শত অসুবিধার কারণে অধিকাংশ নারী হজে দুর্বল আর অসুস্থ হয়ে পড়ে। ফলে দেখা গেছে তার হজের কার্যক্রম বাঁধাগ্রস্ত হয়। শুধু কী তাই? কারো থাকার স্থান আবার হারামাইন শরীফাইন থেকে বহু দূরে হয়, ঠিকমত আসতে পারে না। রাস্তা ভুলে যায়। একস্থানে বারবার ঘুরার কারণে তাদের মাঝে বিরক্ত এসে পড়ে। এসবের ফলে দেখা গেছে অনেক নারী তার মুখের পর্দা খোলে ফেলে। এভাবে পরিস্থিতি ফিতনার দিকে ধাবিত হতে থাকে। 

একারণে ইমামদের মতদ্বৈধতার দিকে দৃষ্টি না দিলেও উপরোল্লিখিত পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে বর্তমান সময়ে ‘হজের সফরে নারীর সঙ্গে তার মাহরাম বা স্বামী থাকার শর্তকে’ উঠিয়ে দেয়া যুক্ত গ্রায্য নয়। কিন্তু বড়ই আফসোসের বিষয় যে, আল্লাহ তায়ালা যাদেরকে নারীর অভিবাবকত্ব দিয়ে সম্মান করেছেন, তারা এমন সব রীতিনীতির কথা বলেন যা প্রাশ্চাত্যকেই খুশি করে। অথচ সৌদি আরবের গ্রান্ডমুফতিরাও প্রথম অভিমতটির ওপর ফতওয়া প্রদান করেন।

সর্বশেষ কথা হলো, ইমামদের ইখতেলাফের দিকে নজর না দিলেও দ্বীনের মেজায শরীয়তের আবেদন ও বর্তমান নারীর ওপর সহজীকরণের ভিত্তিতে স্বামী বা মাহরাম থাকার শর্তটি স্থায়ীভাবে করে দেয়াই উত্তম। রাষ্ট্রের বা হজকমিটির এই বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

অনুবাদ : হাবীবুল্লাহ সিরাজ

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে