হজ পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত  স্থানসমূহ

ঢাকা, সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ১৩ ১৪২৭,   ১০ সফর ১৪৪২

হজ পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত  স্থানসমূহ

মুহাম্মদ গোলাম রহমান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:১৮ ১৩ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৫:২৫ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

কাবা ও তার চার পাশের মাতাফ, মাতাফের ওপারে বিল্ডিং, বিল্ডিংয়ের ওপারে মারবেল পাথর বিছানো উন্মুক্ত চত্বর এ সবগুলো মিলে বর্তমান মাসজিদুল হারাম গঠিত। কারো কারো মতে পুরা হারাম অঞ্চল মাসজিদুল হারাম হিসেবে বিবেচিত। 

কাবা ও তার চার পাশের মাতাফ, মাতাফের ওপারে বিল্ডিং, বিল্ডিংয়ের ওপারে মারবেল পাথর বিছানো উন্মুক্ত চত্বর এ সবগুলো মিলে বর্তমান মাসজিদুল হারাম গঠিত। কারো কারো মতে পুরা হারাম অঞ্চল মাসজিদুল হারাম হিসেবে বিবেচিত। 

পবিত্র কাবা মুসলিম জাতির কিবলা। ১৪১৭ হিজরিতে বাদশা ফাহাদ ইবনু ‘আব্দুল‘আজিজ সংস্কার করেন পবিত্র কাবা ঘর। ৩৭৭ বছর পূর্বে অর্থাৎ- ১০৪০ হিজরিতে সুলতান মারদান আল‘উসমানির সংস্কারেরর পর এটাই হলো ব্যাপক সংস্কার। 

১৪১৭ হিজরিতে বাদশা ফাহাদ ইবনু ‘আব্দুল‘আজিজ সংস্কার করেন পবিত্র কাবা ঘর।বাদশা ফাহাদের সংস্কারের পূর্বে পবিত্র কাবাকে আরো ১১ বার নির্মাণ পুনঃনির্মাণ সংস্কার করা হয়েছে বলে কারো কারো দাবি।

কাবার উচ্চতা ১২ মিটার, মুলতাজামের দিকে দৈর্ঘ্য ১২.৮৪ মিটার, হাতিমের দিকে দৈর্ঘ্য ১১,২৮ মিটার, রুকনে ইয়ামানি ও হাতিমের মাঝখানটার দৈর্ঘ্য ১২.১১ মিটার, হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানির মাঝখানটার দৈর্ঘ্য ১১,৫২ মিটার।

হাজরে আসওয়া (কালো পাথর ):

হাজরে আসওয়াদ জান্নাত থেকে নেমে আসা একটি পাথর

পবিত্র কাবার দক্ষিণ কোণে, জমিন থেকে ১.১০ মিটার উচ্চতায় হাজরে আসওয়াদ স্থাপিত। হাজরে আসওয়াদ দীর্ঘে ২৫ সেন্টিমিটার ও প্রস্থে ১৭ সেন্টিমিটার। শুরুতে হাজরে আসওয়াদ এক টুকরো ছিলো, কারামিতা সম্প্রদায় ৩১৯ হিজরিতে পাথরটি উঠিয়ে নিজেদের অঞ্চলে নিয়ে যায়। সে সময় পাথরটি ভেঙ্গে আট টুকরায় পরিণত হয়। এ টুকরোগুলো সবচেয়ে বড়টি খেজুরের মতো। টুকরোগুলো বর্তমানে অন্য আরেকটি পাথরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে যার চার পাশে দেয়া হয়েছে রুপার বর্ডার। রুপার বর্ডারবিশিষ্ট পাথরটি চুম্বন নয় বরং তাতে স্থাপিত হাজরে আসওয়াদের টুকরোগুলো চুম্বন বা স্পর্শ করতে পারলেই কেবল হাজরে আসওয়াদ  চুম্বন-স্পর্শ  করা হয়েছে বলে ধরা হবে।

হাজরে আসওয়াদ কেবলই একটি পাথর যা কারো কল্যাণ বা অকল্যাণ কোনোটাই করতে পারে না

হাজরে আসওয়াদ জান্নাত থেকে নেমে আসা একটি পাথর যার রং শুরুতে এক হাদিস অনুযায়ী দুধের বা বরফের চেয়ে সাদা ছিলো। পরে আদম সন্তানের পাপ তাকে কালো করে দেয়। হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলে গুনাহ মাফ হয়। হাজরে আসওয়াদের একটি জিহ্বাবা ও দুটি ঠোঁট রয়েছে, যে ব্যক্তি তাকে চুম্বন ও স্পর্শ করলো, তার পক্ষে সে কেয়ামতের দিন সাক্ষী দেবে। তবে হাজরে আসওয়াদ কেবলই একটি পাথর যা কারো কল্যাণ বা অকল্যাণ কোনোটাই করতে পারে না।

রুকনে ইয়ামানী:

রুকনে ইয়ামানী

রুকনে ইয়ামানী

রুকনে ইয়ামানী। কাবা শরিফের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ। তাওয়াফের সময় এ কোণকে সুযোগ পেলে স্পর্শ করতে হয়। চুম্বন করা নিষেধ। হাদিসে এসেছে, ইবনু ওমার (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দুই রুকনে ইয়ামানি ব্যতীত অন্য কোনো জায়গা স্পর্শ করতে দেখিনি। 

মুলতাযাম: হাজরে আসওয়াদ থেকে কাবা শরিফের দরজা পর্যন্ত জায়গাটুকুকে মুলতাযাম বলে। মুলতাযাম শব্দের আক্ষরিক অর্থ এঁটে থাকার জায়গা’ সাহাবায়ে কিরাম মক্কায় এসে মুলতাযামে যেতেন ও দু‘হাতের তালু, দু‘হাত ও চেহারা বক্ষ রেখে দোয়া করতেন। বিদায়ি তাওয়াফের পূর্বে বা পরে অথবা অন্য যেকোনো সময় মুলতাযামে গিয়ে দোয়া করা যায়। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রা.) বলেন,

যদি মুলতাযামে আসার ইচ্ছা করে-মুলতাযাম হলো হাজরে আসওয়াদ ও দরজার মধ্যবর্তী স্থান-অতঃপর সেখানে তার বক্ষ, চেহারা ,দুই বাহু ও দুই হাত রাখে ও দোয়া করে, মহান আল্লাহর কাছে তার প্রয়োজনগুলো সওয়াল করে তবে এরুপ করার অনুমতি আছে। বিদায়ি তাওয়াফের পূর্বে এরুপ করতে পারবে। মুলতাযাম ধরার ক্ষেত্রে বিদায়ি অবস্থা ও অন্যান্য অবস্থার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আর সাহাবারা যখন মক্কায় প্রবেশ করতেন তখন এরুপ করতেন। তবে বর্তমান যুগে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে মুলতাযামে ফিরে যাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই সুযোগ পেলে যাবেন অন্যথায় যাওয়ার দরকার নেই। কেননা মুলতাযামে যাওয়া তাওয়াফের অংশ নয়।

মাকামে ইব্রাহিম:

 মাকামে ইব্রাহিম: ইব্রাহিম (আ.) এঁর পদচিহ্ন, এই পাথরের ওপর তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন।

মাকাম শব্দের আভিধানিক অর্থ, দন্ডায়মান ব্যক্তির পা রাখার জায়গা। আর মাকামে ইব্রাহিম বলতে সেই পাথরকে বুঝায় যেটা কাবা নির্মাণের সময় ইসমাঈল (আ.) নিয়ে এসেছিলেন, যাতে পিতা ইব্রাহিম (আ.) এর ওপর দাঁড়িয়ে কাবা ঘর নির্মাণ করতে পারেন। ইসমাঈল (আ.) পাথর এনে দিতেন এবং ইব্রাহিম (আ.) তার পবিত্র হাতে তা কাবার দেয়ালে রাখতেন। উর্ধ্বে উঠার প্রয়োজন হলে পাথরটি অলৌকিকভাবে ওপরের দিকে উঠে যেত। তাফসিরের তাবারিতে সূরা আলে ইমরান এর ৯৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় এসেছে,

‘বায়তুল্লাহ মহান আল্লাহর কুদরতের পরিষ্কার নির্দেশন রয়েছে এবং খলিলুল্লাহ ইব্রাহিম (আ.) এর নির্দেশনাবলী রয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো তার খলিল ইব্রাহিম (আ.) পদচিহ্ন ওই পাথরে যার ওপর তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন।'

ইব্রাহিম (আ.) এর পদচিহ্নের একটি ১০ সেন্টিমিটার গভির ও অন্যটি ৯ সেন্টিমিটার। লম্বায় প্রতিটি পা ২২ সেন্টিমিটার ও প্রস্থে ১১ সেন্টিমিটার। বর্তমানে এক মিলিয়ন রিয়েল ব্যয় করে মাকামের বক্সটি নির্মাণ করা হয়েছে। পিতল ও ১০ মিলি মিটার পুরো গ্লাস দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে এটি। ভেতরের জালে সোনা চড়ানো। হাজরে আসওয়াদ থেকে মাকামে ইব্রাহিমের দূরত্ব হলো ১৪.৫ মিটার। তাওয়াফ শেষে  মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দু‘রাকাত সালাত আদায় করতে হয়। জায়গা না পেলে অন্য কোথাও আদায় করলে সালাত হয়ে যায়।

মাতাফ:

বর্তমানে শীতল মারবেল পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে মাতাফ যা প্রচন্ড রোদের তাপেও শীতলতা হারায় না

কাবার চারপাশে উন্মুক্ত জায়গাকে মাতাফ বলে। মাতাফ শব্দের অর্থ, তাওয়াফ করার জায়গা। মাতাফ সর্বপ্রথম পাকা করেন ‘আব্দুল্লাহ ইবনু জুবায়ের, কাবার চারপাশে প্রায় ৫ মিটারের মতো। কালক্রমে মাতাফ সম্প্রসারিত করা হয়। বর্তমানে শীতল মারবেল পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে মাতাফ যা প্রচন্ড রোদের তাপেও শীতলতা হারায় না, ফলে হজকারীরা আরামের সঙ্গে পা রেখে তাওয়াফ সম্পন্ন করতে পারেন।

সাফা: কাবা শরিফ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে,১৩০ মিটার দূরে, সাফা পাহাড় অবস্থিত। সাফা একটি ছোট পাহাড় যার ওপর বর্তমানে গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে এবং এ পাহাড়ের একাংশ এখনো উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সমতল থেকে উঁচুতে এই পাকা অংশের ওপরে এলে সাফায় উঠেছেন বলে ধরে নেয়া হবে। সাফা পাহাড়ের নির্দিষ্ট জায়গা থেকে এখনো পবিত্র কাবা দেখতে পারা যায়।

সাফা ও মারওয়া

মারওয়া: শক্ত সাদা পাথরের ছোট একটি পাহাড়। পবিত্র কাবা থেকে ৩০০ মিটার দূরে পূর্ব-উত্তর দিকে অবস্থিত। বর্তমানে মারওয়া থেকে পবিত্র কাবা শরিফ দেখা যায় না। মারওয়ার সামান্য অংশ খোলা রাখা হয়েছে। বাকি অংশ পাকা করে ঢেকে দেয়া হয়েছে।

মাস‘আ: সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানকে মাস‘আ বলা হয়। মাস‘আ দীর্ঘে ৩৯৪.৫ মিটার ও প্রস্থে ২০ মিটার। মাস‘আর গ্রাউন্ড ফ্লোর ও প্রথম তলা সুন্দরভাবে সাজানো। গ্রাউন্ড ফ্লোরে ভিড় হলে প্রথম তলায় গিয়ে সাঈ করতে পারেন। প্রয়োজন হলে ছাদে গিয়েও সাঈ করা যাবে তবে খেয়াল রাখতে হবে আপনার সাঈ যেন মাসআ‘র মধ্যেই হয়। মাস’আ থেকে বাইরে দূরে কোথাও সাঈ করলে সাঈ হয় না।

মাসজিদুল হারাম:

মাসজিদুল হারাম

কাবা ও তার চার পাশের মাতাফ, মাতাফের ওপারে বিল্ডিং, বিল্ডিংয়ের ওপারে মারবেল পাথর বিছানো উন্মুক্ত চত্বর এ সবগুলো মিলে বর্তমান মাসজিদুল হারাম গঠিত। কারো কারো মতে পুরা হারাম অঞ্চল মাসজিদুল হারাম হিসেবে বিবেচিত। 
পবিত্র কোরআনে এক আয়াতে এসেছে,

‘তোমরা অবশ্যই মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে।’ (সূরা: আল ফাতহ, আয়াত: ২৭)।

অর্থাৎ: হারাম অঞ্চলে প্রবেশ করবে। সূরা ইসরায় মাসজিদুল হারামের কথা উল্লেখ হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,

‘পবিত্র সেই সত্তা যিনি তাঁর বান্দাকে মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসায় রাতের বেলায় নিয়ে গেলেন, যার চার পাশ আমি করেছি বরকতময়।’ (সূরা: ইসরা, আয়াত: ১)।

মাসজিদুল হারাম

ইতিহাসবিতেদের মতানুসারে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে উম্মু হানীর ঘরের এখান থেকে ইসরা ও মিরাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর তৎকালে কাবার চারপাশে সামান্য এলাকা জুড়ে ছিলো মাসজিদুল হারাম, উম্মু হানীর ঘর মাসজিদুল হারাম থেকে ছিলো দূরে। তা সত্ত্বেও ওই জায়গাকে মাসজিদুল হারাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে