Alexa হজরত আলী (রা.) ও তার পুত্রদ্বয়ের বুদ্ধিমত্তা 

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২০,   মাঘ ১৪ ১৪২৬,   ০২ জমাদিউস সানি ১৪৪১

Akash

হজরত আলী (রা.) ও তার পুত্রদ্বয়ের বুদ্ধিমত্তা 

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৪৪ ৭ ডিসেম্বর ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

হজরত আলী (রা.) এর প্রজ্ঞাপূর্ণ বিচার: খনিস বিন মুতামির বর্ণনা করেন, কুরাইশ বংশীয় এক নারীর নিকট দুই ব্যক্তি আসলেন। তারা নারীর নিকট একশত দীনার আমানত রেখে বললেন, আমরা দু’জন একসঙ্গে এসে চাইলে এই আমানত আমাদেরকে ফেরত দিয়ে দেবেন। যে কোনো একজন এসে চাইলে ফেরত দেবেন না।

এক বছর পর তাদের একজন এসে বললেন, আমার সঙ্গীলোকটি মারা গেছে। আপনি আমাকে আমানতের ১০০ দীনার ফেরত দিয়ে দিন। নারী বললেন, তোমাদের শর্তানুযায়ী একজনকে তা আমি দিতে পারি না। দুইজন আসলে তখন দেব। 

লোকটি বারবার দীনার ফেরত দিতে পীড়াপীড়ি করল। তাতে নারীর কোনো ভাবান্তর হলো না। তিনি নিজ কথায় অটল রইলেন। সাফ জানিয়ে দিলেন, দুইজন একত্রে এসে দীনার নিয়ে যাও নয়ত বিদায় হও। লোকটা এতেও দমে গেল না। সে নারীর পাড়াপড়শী, আত্মীয় স্বজনের নিকট বারবার গিয়ে তাদের মাধ্যমে নারীর ওপর দীনার ফেরত দিতে চাপ প্রয়োগ করাল।

তারা নারীকে বলল, এত ঝামেলার মধ্যে যাওয়ার প্রয়োজন কী? তার দীনার তাকে দিয়ে দাও। ব্যাপার চুকে যাক। তাদের উপর্যুপরি চাপে নারীও ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে অবশেষে দীনার তাকে দিয়ে দিল। ঘটনা এখানে শেষ হলেই ভালো হতো, কিন্তু না। এই ঘটনার এক বছর পর দ্বিতীয় ব্যক্তি এসে পুনরায় দীনার দাবী করে বসল। বেচারী নারী দুই চোখে শর্ষ্যফুল দেখতে লাগল। কাতর স্বরে বলল, তোমাদের দীনার তো তোমার অপর সঙ্গী এক বছর পূর্বেই এসে নিয়ে গেছে।

লোকটি রাগত স্বরে বলল, কী বললে? ইয়ার্কি পেয়েছ? এসব কথায় কাজ হবে না। ভালোয় ভালোয় দীনার বের করো। নইলে তোমাকে ছাড়ব না। নারী বলল, আরে আমার কি দোষ? তোমার সঙ্গী তো বলল, তুমি মারা গেছ। এজন্য সব দীনার সে একাই নিয়ে গেল। তোমাদের দীনার আমানত রেখে মহা মুশকিলে পড়লাম দেখছি।

অবশেষে হজরত ওমর (রা.) এর নিকট এই মামলা পেশ করা হলো। হজরত ওমর (রা.) মামলার আগাগোড়া সব শুনে যখন রায় ঘোষণা করতে যাবেন তখন নারী বলে উঠল, হে উমর! এই মামলার রায় আপনি না ঘোষণা করে এর ভার হজরত আলী (রা.) এর ওপর ন্যস্ত করুন। তিনি যা সিদ্ধান্ত দেবেন তাই হবে। হজরত ওমর (রা.)-ও যেন মনে মনে তাই চাইছিলেন। তিনি আলী (রা.) এর নিকট মামলাটি পাঠিয়ে দিলেন।

সব শুনে হজরত আলী (রা.) তার স্বভাবজাত বিচক্ষণতার দ্বারা বুঝতে পারলেন যে ওই ব্যক্তি নারীকে ঠকানোর ফন্দি এঁটেছে। তিনি ওই ব্যক্তিকে ডেকে বললেন, তোমরা নারীর নিকট আমানত রাখার সময় বলেছিলে না যে, উভয় এক সঙ্গে আসলে আমানত ফেরত দেবেন। যে কোনো একজন আসলে ফেরত দেবেন না। এটা বলনি?

লোকটি জবাব দিল,  নিশ্চয়ই আমরা বলেছিলাম। তখন হজরত আলী (রা.) বললেন, তাহলে তুমি একা আমানত ফেরত চাইতে এসেছ কেন? তোমাদের শর্তানুযায়ী তোমার সঙ্গীকে নিয়ে এস এবং আমানত নিয়ে যাও। কেননা যে কোনো একজনের কাছে তো আমানত দিতে তোমরাই নিষেধ করেছ। এ কথা বলে তিনি মামলা খারিজ করে দিলেন। নারীও এই মহাবিপদ থেকে মুক্তি পেলেন।

আলী (রা.) এর ফিকহি দক্ষতা: একব্যক্তি কসম খেল, সে যদি রমজান মাসে দিনের বেলা স্ত্রী সহবাস না করে তাহলে স্ত্রী তিন তালাক। এখন রমজান মাসে রোজা রেখে স্ত্রী সহবাস করলেও কঠিন শাস্তির ধমকি এসেছে। এ দিকে সহবাস না করলে স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে। এ উভয়সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী?

এ ঘটনা হজরত আলী (রা.) এর কানে এলে তিনি বললেন, কোনো সমস্যা নেই। রমজানে রোজা না রাখার গুনাহও হবে না আর স্ত্রীও তিন তালাক হবে না। তা এভাবে যে, রমজানে স্ত্রীকে নিয়ে সফরে যাও। সফরে তো রোজা না রাখার অনুমতি আছে। তখন স্ত্রী সহবাস করে নাও তাহলে তো আর গুনাহও হবে না আবার স্ত্রীর ওপর তালাকও পতিত হবে না। লোকটা এই সমাধান শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

হাসান (রা.) এর আত্মরক্ষা: আবু ওয়াফা ইবনে আকীল লিখেছেন যে, যখন আলী (রা.) এর হত্যাকারী আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিমকে হজরত হাসান (রা.) এর নিকট ধরে আনা হলো তখন সে হাসান (রা.) এর কানে কানে কিছু কথা বলার অনুমতি প্রার্থনা করল। হাসান (রা.) তা মঞ্জুর করলেন না। তিনি বললেন, আমি আশংকা করছি সে আমার কানের কাছে তার মুখ আনার সুযোগ পেলে কামড় দিয়ে আমার কান ছিঁড়ে ফেলবে। পরবর্তীতে ইবনে মুলজিমকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে সে নিজেও তা স্বীকার করল। বলল তার আশঙ্কা ঠিকই আছে। আমি সুযোগ পেলে তার কান দাঁত দিয়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলতাম।

ইবনে আকীল বলেন, এখানে হাসান (রা.) এর সতর্কতা ভেবে দেখবার মতো। পিতার শাহাদাতে তিনি মানসিকভাবে প্রচণ্ড আঘাত পেলেও তখনও নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে অত্যন্ত সজাগ ও সতর্ক ছিলেন। তেমনিভাবে সেই হতভাগা হত্যাকারীর বিষয়টিও উপেক্ষা করার মতো নয়। হজরত আলী (রা.) এর মতো মহান ব্যক্তিকে হত্যার অপরাধে তাকে গ্রেফতার করা হলো। সকলে তার উপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত। মাথার উপর মৃত্যুদণ্ডের খড়গ ঝুলছে। এ অবস্থায়ও অন্তরে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। মনের নোংরামী তখনো আগের মতোই আছে। 

হুসাইন (রা.) এর সঙ্গে বেয়াদবির পরিণতি: ইব্রাহিম ইবনে রবাহ মুসিলি বর্ণনা করেন, এক লোক হজরত হোসাইন (রা.) এর ওপর কিছু সম্পদ প্রাপ্তির দাবি করল। তিনি তা অস্বীকার করলেন। উভয়ে বিচারকের নিকট উপস্থিত হলো। তার দাবীর বিপক্ষে হোসাইন (রা.) বললেন, সে যদি তার দাবীতে সত্যবাদী হয়ে থাকে তাহলে কসম খেয়ে বলুক। তাহলে তার দাবী অনুযায়ী সম্পদ তাকে আমি দিয়ে দেব। 
তখন সে কসম করতে শুরু করল--والله الذى لااله الا هو
অর্থ: আল্লাহর কসম যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই।

হোসাইন (রা.) তৎক্ষণাৎ বাধা দিয়ে বললেন, এভাবে নয়। বরং বলো 
আল্লাহর শপথ, আল্লাহর শপথ, আল্লাহর শপথ, আমার সম্পদ হোসাইন (রা.) এর দায়িত্বে আদায়যোগ্য রয়েছে। 

লোকটি সেভাবেই কসম করল এবং কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে তৎক্ষণাৎ মারা গেল। হোসাইন (রা.)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল আপনি তার কসমের শব্দাবলীকে পরিবর্তন করে দিলেন কেন? 

জবাবে তিনি বললেন, প্রথমে সে যে শব্দগুলো দ্বারা কসম করছিল তাতে আল্লাহর বুযুর্গী ও গুণাবলীর উল্লেখ রয়েছে। আমি ভেবে দেখলাম, ওই শব্দাবলী দ্বারা মিথ্যে কসম করলেও হয়ত আল্লাহ তাকে ছাড় দেবেন। তৎক্ষণাৎ আযাবে গ্রেফতার করবেন না। এ জন্যই উক্ত শব্দাবলী বাদ দিয়ে শুধু আল্লাহর নামে কসম করতে বলেছি। যার পরিণতি তোমরা দেখতেই পাচ্ছ। সে তৎক্ষণাৎ আযাবে পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।

সূত্র: প্রতিভভার গল্প

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে